আফতাব শোনালেন আক্ষেপের গল্প

আফতাব আহমেদ

আফতাব আহমেদের নাম নিলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বাংলাদেশের পতাকা মাথায় পরে ব্যাটিং করতে যাওয়া একজন আগ্রাসী ব্যাটসম্যানের চেহারা। ভয়ডরহীন ক্রিকেটে কার্ডিফে গিলেস্পিকে ছক্কা মেরে অস্ট্রেলিয়া বধ, বগুড়ায় টান টান উত্তেজনার ম্যাচে রান-বলের হিসাব চুকিয়ে দলকে জেতানো কিংবা প্রথম ভারত বধে ফিফটি করা আফতাবকে ভুলে যাওয়া কঠিনই। প্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারানো ম্যাচে আশরাফুলের সাথে দুর্দান্ত জুটি কিংবা মাখায়া এনটিনিকে ডাউন দ্যা উইকেটে এসে হাঁকানো ছক্কা আপনার আফসোস বাড়াবে।

অমিত সম্ভাবনা আর সামর্থ্য থাকার পরও নিজের অলসতা ও হেলাফেলায় করে বসা কিছু ভুল ক্যারিয়ারটা লম্বা করতে দেয়নি। মাত্র ৬ বছরেই শেষ হয় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট, নিষিদ্ধ ক্রিকেট লিগ আইসিএল থেকে ফিরে ছন্দ হারিয়েছেন। হতাশায় ছেড়েছেন ক্রিকেট, এখন পুরোদস্তুর কোচ। ক্রিকেটার হিসেবে যতটা অলস ছিলেন কোচ হিসেবে তততাই সফল হতে বধ্যপরিকর আফতাব এগোচ্ছেন সে পথেই। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে লিজেন্ডস অফ রুপগঞ্জের প্রধান কোচ কথা বলেছেন নানা বিষয়ে। ‘ক্রিকেট৯৭’ এর সাথে একান্ত আলাপচারিতায় ফিরে গেছেন সোনালী অতীতে, রোমন্থন করেছেন নানা স্মৃতি। পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল নিচে-

ছবিঃ রাইজিং বিডি

ক্রিকেট৯৭-কোচ হিসেবে বেশ ব্যস্ত সময় কাটাতে হয় আপনাকে এখন। কিন্তু করোনা ভাইরাসের কারণে সবকিছু থমকে আছে। গৃহবন্দী জীবনটা কেমন লাগছে?

আফতাব আহমেদঃ সারাবছর ঘর থেকে বের হয়েইতো কাজ করতে হয়েছে। এখন সারাক্ষণই ঘরে থাকতে হচ্ছে, আসলে খুব কঠিন। তারপরও মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি কারণ বাচ্চারা আছে বাসায়। আল্লাহ না করুক বের হলে ওদেরতো ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আমার কথা বাদই দিলাম, ওদের কথা চিন্তা করে, পরিবারের অন্যদের নিরাপদ রাখার লক্ষ্যে চেষ্টা করছি বাসায় থাকার। এটা কঠিন, কিন্তু তবুও কিছু করার নাই।

ক্রিকেট৯৭-ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত হল। এবার যদি মাঠে না গড়ায় বাকিটা তবে ক্ষতিটা কীভাবে দেখছেন?

আফতাব আহমেদঃ অবশ্যই ক্ষতি আমাদের জন্য, বিশেষ করে আর্থিক দিক থেকে বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। কারণ একটা বছর আমাদের জন্য ক্ষতি, এই বছরের চুক্তিতেই আগামী বছর হবে যেহেতু একটা ম্যাচ হয়েছে আমি যতটুকু জানি। অর্থাৎ এই দল, এই খেলোয়াড়েরাই থাকবে সেক্ষেত্রে এবারের টাকা দিয়েই আগামীবার খেলতে হবে, কোচিং করাতে হবে। যা ক্রিকেটার ও কোচদের জন্য পুরো এক বছরের ক্ষতি। এটা পুষিয়ে নেওয়াটা কঠিন হবে। কিন্তু শরীরতো আগে সুস্থ থাকতে হবে, সুস্থ থাকলে এসব পুষিয়ে নেওয়া যাবে। সুস্থ থাকাটাই এখন গুরুত্বপূর্ণ, অবশ্যই ক্ষতি তবুও সুস্থতাই এখন প্রাধান্য পাবে।

ক্রিকেট৯৭- একাডেমি, কোচিং পুরো ব্যাপারটা কতটা উপভোগ করেন?

আফতাব আহমেদঃ হ্যাঁ, উপভোগ করছি। আমরা মাঠের মানুষ, খেলা ছাড়ার পরেও আমরা মাঠেই সময় কাটাচ্ছি। তো এখন মাঠে যেতে পারছিনা এটা আমাদের জন্য কতটুকু কষ্টকর বলে বোঝানো কঠিন। মাঠের ছেলেপুলে, সবুজ ঘাস, বাতাস, বাচ্চাদের সাথে থাকা, সময় কাটানো অনেক বেশি মিস করছি। চার দেওয়ালের বন্দী জীবন কঠিন আসলে। একাডেমির ছেলেপুলে, কোচিং এসব প্রচুর মিস করছি।

ক্রিকেট৯৭- বিভিন্ন সময়ে বলেছেন ক্রিকেট ক্যারিয়ারে যতটা অলস ছিলেন ততটাই পরিশ্রম করছেন কোচিং ক্যারিয়ারে সর্বোচ্চ সাফল্য পেতে। সাফল্য ধরাও দিচ্ছে, নিজের একাডেমির বাইরে জাতীয় লিগ, ঢাকা লিগের মত বড় পর্যায়ের কাজ করছেন। কোচ হিসেবে যে লক্ষ্য ঠিক করেছেন সে পথেই আছেন কিনা?

আফতাব আহমেদঃ আমি যেটা চেয়েছি সেভাবেই এগোচ্ছি। অনেকে ক্রিকেট ছাড়ার পরই চিন্তা করে ধুম করে একটা জায়গায় কাজ করবো। আসলে ক্রিকেট খেলা আর ক্রিকেট কোচিং সম্পূর্ণ ভিন্ন ভূমিকা। ক্রিকেট খেলাটা নিজের ব্যক্তিগত আর কোচিং হচ্ছে সবাইকে নিয়ে। সবার মানসিকতা বোঝা, সবাইকে সামলাতে জানা, পরিস্থিতি বোঝা অনেক ব্যাপার-স্যাপার থাকে। যত ভালো জায়গাতেই খেলেন হুট করে এসে কাজ করা কঠিন। আমি চেয়েছিলাম ধীরে এগোতে। প্রিমিয়ার লিগে দুই বছর যখন সহকারী কোচ হিসেবে ছিলাম তখন কাজটা আমার জন্য সহজ হয়ে গেল। এখন যখন আমি হেড কোচ হলাম তখন কিন্তু ফলটা ভালো হয়েছে আলহামদুলিল্লাহ। আমি জাতীয় লিগেও কিন্তু সহকারী কোচ হিসেবে ঢুকেছি। সবকিছু বুঝতে চেষ্টা করছি, আস্তে আস্তে কাজ করাটা সহজ হচ্ছে। দ্রুত নয় ধীরেই যেতে চাই, যেন একটা ভালো জায়গায় পৌঁছাতে পারি।

ছবিঃ সংগ্রহীত

ক্রিকেট৯৭- টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের যাত্রা শুরুর আগেই হার্ড হিটার তকমা পান। সেক্ষেত্রে টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারতো বটেই ক্রিকেট ক্যারিয়ারটাই থেমেছে হতাশা নিয়ে। এ ব্যাপারে আপনার প্রতিক্রিয়া কি?

আফতাব আহমেদঃ তখন আসলে অনেক ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। অনেক ধরণের হতাশা থাকতে পারে, অনেক কিছু থাকতে পারে। তবে যত দিন যায় মানুষ পরিণত হয়। আমি যেমন এখন ছাত্র থেকে অভিভাবক, কোচ হয়ে গেলাম। এখন অনেক কিছু বুঝি, পরের ৫ বছর যদি বাঁচি, কোচিং করাই আরও অভিজ্ঞতা হবে আমার। এখন এই পর্যায়ে এসে আমি বুঝতে পারি কোন কোন জায়গায় ভুল না করলে, হেলাফেলা না করলে আমার ক্যারিয়ারটা হয়তো অনেক বড় হত। আরও অনেক কিছু দেওয়ার ছিল দেশকে। ঐ সময় আসলে যেটা করেছি, মনে হয়েছে ওটাই সঠিক। কিন্তু এখন বুঝছি কোথায় ঘাটতি ছিল। এসব না হলে অনেক কিছু দিতে পারতাম, শুরুর আগেই শেষ হয়ে গেল আমার ক্যারিয়ার। ভুলগুলো তখন বুঝলে হয়তো টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশকে আরও ৭-৮ বছর সেবা দিতে পারতাম, সেই সামর্থ্য ছিল।

ক্রিকেট৯৭- বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ক্রিকেটার হওয়ার পথে পরিবার বড় বাঁধা। আপনার হয়েছে উল্টো, বাবা জোর করে ক্রিকেটার বানাতে চেয়েছেন। ঠিক কখন নিজেরই মনে হয়েছে ক্রিকেটকে পেশা হিসেবে নেওয়া যায়?

আফতাব আহমেদঃ প্রথমে যখন আমার বাবা চেয়েছে আমি ক্রিকেটার হই তখন কিন্তু আমি আসলেই ক্রিকেট খেলতে চাইতাম না। আমাকে এক প্রকার জোর করে মাঠে নিয়ে যেত। আমি যেতে চাইতাম না, বাবাকে ভয় পেতাম সে হিসেবে নাও করতে পারতাম না। আম্মাকে বলতাম যে আমি যাবোনা। আমাকে বিকেএসপিতে ভর্তি করে দেওয়ার কথা ছিল তো আমি তখন বললাম বিকেএসপিতে গেলে আমি কিন্তু আর আসবোনা। এই ভয়ে আমাকে হয়তো দেয়নি। তারপর মাঠে নিয়ে যেত, এখানে সেখানে খেলা হত। ১৯৯৬ সালে স্কুল ক্রিকেট খেলতাম। স্কুলে কিছু ভালো ইনিংস খেলা শুরু করেছি। ১৯৯৯ সালে ঢাকা থেকে একটা স্কুল ক্রিকেট আসছে ম্যাপল লিফ। তাদের সাথে আমাদের স্কুলের খেলা।

তো আব্বা বলল দেখ ভালো কিছু করতে পারো কিনা। আমি তাদের বিপক্ষে সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছি আর আব্বার আশাও বেড়ে গেল। আমারও মনে হল কিছু একটা আছে আমার মধ্যে, খেলাটা চালিয়ে নিতে পারি। ওখান থেকে জেলায় সুযোগ পাই, জেলা থেকেই আমাকে অনূর্ধ্ব-১৭ তে পাঠায়। ঐ ক্যাম্প থেকেও আমি পালিয়ে চলে আসি। এরপর অনূর্ধ্ব-১৯ এ যখন গেলাম তখনো আমাকে ৩০-৩৫ জনের মধ্যে নির্বাচন করেছে। আমি কিন্তু বয়সভিত্তিকে ৩-৪ বছর খেলেই অনূর্ধ্ব-১৯ দলে খেলার সুযোগ পেয়ে যাই। আমার নিজের মনে হতে শুরু করলো যে হবে আমাকে দিয়ে, ক্রিকেটটাকে পেশা হিসেবে নেওয়া যায়।

ক্রিকেট৯৭- বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রথম হার্ড হিটার হিসেবে ধরা হয় আপনাকে। বাংলাদেশের অনেক প্রথম জয়েই আপনার অবদান দারুণ। দুর্দান্ত ফিনিশার হিসেবেও নিজেকে প্রমাণ করেছেন। কার্ডিফে অস্ট্রেলিয়া বধ, ভারতের বিপক্ষে ঢাকায় প্রথম জয়, বগুড়ায় শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জয়। ২০০৭ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারানো। নিজে কোনটাকে এগিয়ে রাখবেন?

আফতাব আহমেদঃ একটা ম্যাচে আপনি যখন সেঞ্চুরি করবেন এটার মজা একরকম আবার একটা ম্যাচে আপনি যখন ২০-৩০ রান করে শেষ করে আসবেন সেটার মজা আরেকরকম। শ্রীলঙ্কার সাথে যে ম্যাচটা আমাদের ৫ উইকেট পড়ে গিয়েছিল। ঐ সময়ে আমি আর অলক কপালি চিন্তা করছি আমাদের একজন আউট হলেই দল বিপদে পড়ে যাবে। তখন শ্রীলঙ্কা কিন্তু অনেক ভালো দল, অভিজ্ঞ সব ক্রিকেটার ছিল। যেকোন সময় খেলাটা ঘুরে যেতে পারে, শেষ দিকে ১০-১৫ রানে হেরে যেতে পারি। এসব জায়গা থেকে চেষ্টা ছিল শেষ পর্যন্ত থাকতে হবে। ভালো ব্যাটিংও করেছি শ্রীলঙ্কার সাথে ঐ ম্যাচটায় (২১ বলে ৩২)। আমার খুব ভালো লাগে অনেকবার হাইলাইটস দেখেছি এই ম্যাচের।

তারপরে অস্ট্রেলিয়ার সাথে কার্ডিফে শেষ ওভারে ছক্কা মেরে জেতানো। অস্ট্রেলিয়ার মত শক্তিশালী দল যাদের বিপক্ষে প্রথম দুই তিন বলে যদি কিছু করতে না পারি তাহলে এরা পরে আর কিছু করতে দিবেনা। তারা মানসিকভাবে এতটাই শক্ত। এজন্যই শেষ ওভারের প্রথম দুই-তিন বলকেই টার্গেট করেছি এবং সফল হয়েছি। ভারতের সাথে যে ম্যাচটা সেটাতেও কিন্তু আমাদের শুরুতে উইকেট পড়ে গিয়েছিল। তখন আমি আর সুমন ভাই একটা জুটি গড়ি (৪৪ রানের) শেষদিকে মাশরাফি গিয়ে ৩১ রান করে। সবমিলিয়ে একটা একটা পুঁজি পাই আমরা যেটা দিয়ে জিতেছি আমরা। ওখানে ক্যাচও ধরেছি (অজিত আগারকারের), শেষে রান আউটও করেছি। ওটাতেও অবদান ছিল ভালো।

২০০৭ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের যে ম্যাচটা ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে জিতেছি ওটায় তাদের আমরা ১৩০ রানে গুটিয়ে দিতে পারতাম কিন্তু শেষ ওভারটা (মূলত ১৯তম ওভার) আশরাফুল করায় ২৪ রান দেয় যাতে ওদের সংগ্রহ ১৬৪ হয়ে যায়। এতে সবাই হতাশ, নিরাশ যে এই ম্যাচটা আমাদের জেতার কথা ছিল আর বোধহয় পারা যাবেনা। কারণ ১৬৫ ঐ সময় কিন্তু অনেক কঠিন লক্ষ্য। তো আশরাফুলের একটা জেদ ছিল যে আমি যেহেতু রান দিয়েছি, আমার জন্য সবাই হতাশ। দারুণ এক ইনিংস খেলেছে (২৭ বলে ৬১) আমি তাকে সাপোর্ট করেছি (৪৯ বলে ৬২)। তো ফিনিশ করতে পেরেছি ভালোভাবে। দ্বিতীয় রাউন্ডে খেলার সুযোগ হয়, এসম মনে পড়ে। এসব স্মৃতি ভুলে যাওয়া যায়না।

ক্রিকেট৯৭- বল হাতেও বড় একটা রেকর্ডের সাথে জড়িয়ে আছেন। ২০০৪ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম বাংলাদেশি বোলার হিসেবে ওয়ানডেতে ৫ উইকেট শিকার।

আফতাব আহমেদঃ আমরা খুব কম রান করেছি (১৪৬)। ম্যাচটা হেরে যাচ্ছি, দর্শকরাও চলে যেতে শুরু করেছে। তো ঐ সময় সুমন ভাই আমাকে বল দেয়, সুমন ভাই কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমাকে বল করাতো। ২, ৩, ৫ ওভার করে আমাকে চেষ্টা করাতো। ঐ ম্যাচে এমন ফ্ল্যাট উইকেট, ম্যাককুলামের মত ব্যাটসম্যান ক্রিজে, সিনক্লেয়ারের (ম্যাচে ৬২ রান করেন) মত ব্যাটসম্যান ছিল। ঐ সময়ে আসলে সবাই ধরে নিয়েছে বাজেভাবে হারতে যাচ্ছি কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে আমি ৫ উইকেট পেয়ে যাই। ম্যাচটা প্রায় ঘুরেই যাচ্ছিল ( ২ উইকেটে ১০২ থেকে ৭ উইকেটে ১৩৩) তবে ক্রিস কেয়ার্ন্স (১৭) আবার ভালো ব্যাটিং করে ফেলে, আমরাই নাহয় জিততে পারতাম।

ছবিঃ আইসিএল

ক্রিকেট৯৭- ২০০৮ সালে আইসিএলে যাওয়াটাকে আপনার ক্যারিয়ারের গ্রাফটা নিম্নমুখী হওয়ার কারণ মনে করেন কিনা?

আফতাব আহমেদঃ আসলে ঐ সময় আমার আঙুলে চিড় ধরা পড়েছিল। আর আমিতো জানেনই কষ্ট করতে চাইতাম না। আমার আঙুলে অস্ত্রোপচার হয়, আমি ব্যাটিং করতে পারিনি, অস্ট্রেলিয়ায় যেতে পারিনি তবে পুরো শরীরতো ফিট ছিল। ফিটনেস নিয়ে প্রচুর কাজ করছিলাম, দল অস্ট্রেলিয়ায় গিয়েছে আমি এখানে একজন ট্রেনারের অধীনে কাজ করছিলাম। আরও কয়েকজন ছিল আমার মত। যেহেতু ব্যাটিং, বোলিং নাই সে প্রচুর কষ্ট দিচ্ছিল ফিটনেস ঠিক করাতে। এত কষ্ট পাচ্ছিলাম চিন্তা করতেছিলাম ক্রিকেটটাই ছেড়ে দিব। ঠিক ঐ সময়েই অফারটা আসছে, আর্থিকভাবে বড় অঙ্ক। শুধু একমাস খেলতে হবে বাকি ১১ মাস খেলতে হবেনা। জাতীয় দলে আমার এত ব্যস্ততা যাচ্ছিল যে চট্টগ্রামে আসার সুযোগ পেতাম না। সকালের ফ্লাইটে এসে বিকালে চলে গেছি এমনও হচ্ছিল। আর এসব কারণে ঐ প্রস্তাবটা বেশ আরামদায়ক মনে হয়েছে আমার কাছে, একমাস খেলে সারাবছর আরাম। আসলে ঐ সময়ের চিন্তাধারা ছিল আরকি, ছোট ছিলাম, বোঝার সেই ক্ষমতাটা ছিলনা।

ক্রিকেট৯৭- বাংলাদেশ দলের অবস্থা যখন এখনকার মত শক্ত ছিলনা তখনই ভয়ডরহীন ক্রিকেট খেলতেন, সাহসের জায়গাটা কি ছিল?

আফতাব আহমেদঃ আসলে ঐ সময়টায় মাত্র দুই তিনজন ছিল আগ্রাসী। আশরাফুল ছিল, সুমন ভাই রান করতো। তখনো যদি আমরা আরও ৪-৫ জন এমন মানসিকতা নিয়ে খেলতে পারতাম তাহলে ফল আসতো। এখন দেখেন ১১ জনই আগ্রাসী মানসিকতা নিয়ে নামে। আমাদের সময় সংখ্যাটা কম ছিল, আমরা দুই তিনজন ছিলাম। সাকিবরা পরে যোগ দিয়েছে, কিন্তু তখনো তারা পরিণত না। আমার চিন্তা ছিল এদের সাথে খেলার সময় আমি যদি ভয়ে খেলি তাহলে দলে প্রভাব পড়বে। আমিতো শুরু থেকেই আগ্রাসী, ছোটবেলা থেকেই। এই আগ্রাসী মানসিকতাতেই আমি সফল হয়েছি। যখন অনূর্ধ্ব-১৯ এ ছিলাম তখন একটা প্রস্তুতি ম্যাচ খেলছি বিকেএসপিতে। তখনো আমি এনটিনিকে ১০ টা চার মারছি। তখনই বুঝতে পারছি এটাই আমার সাফল্য পাওয়ার মন্ত্র হতে পারে।

ক্রিকেট৯৭- জাতীয় দলের পতাকা মাথায় পরে নামতে দেখা যেত আপনাকে। বিশেষ কোন কারণ ছিল?

আফতাব আহমেদঃ সত্যি বলতে আমি আসলে প্রথমে যখন ব্যাটিং করতাম প্রচুর ঘামতাম। ঘেমে পুরো মাথায় খুশকি হয়ে যেত। তখন আমি নরমাল একটা রুমাল মাথায় পরে ব্যাটিং করতাম। একদিন একটা জায়গায় যাওয়ার পর আমাদের সবাইকে একটা করে জাতীয় পতাকা দেওয়া হল। তখন আমার মাথায় আসলো যদি পতাকা মাথায় পরেই নামি তাহলেতো অনুভূতিটা ভিন্ন হওয়ার কথা, শরীরে একটা বাড়তি তেজ, অনুপ্রেরণা আসবে। আর সেভাবেই মাথায় পরা, এরপর এটা চালিয়ে যাই। ফিফটি করে কিংবা কোন কারণে হেলমেট খুললেই আমি কিছু একটা অনুভব করতাম যেটা অসাধারণ।

ক্রিকেট৯৭- মাশরাফির সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আপনার, একটা মজার মুহূর্ত যদি বলতে বলি?

আফতাব আহমেদঃ মাশরাফির সাথে সম্পর্কটা কিন্তু অন্যরকম। আমি কিন্তু তার সাথে জাতীয় দলের আগে থেকেই কাছের। প্রথম ঢাকা লিগ খেলছি আমি, মাশরাফি আর রাজ (আব্দুর রাজ্জাক) একসাথে। আমরা তিনজন প্রথম ঢাকায় প্রথম বিভাগে আজাদ স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে খেলি। এরপর তিনজনই বয়সভিত্তিকে একসাথে খেলি। ওখান থেকেই ক্যারিয়ারটা সামনে আগায় আমাদের। সেই প্রথম বিভাগ থেকে রাজ্জাক, মাশরাফি আমরা বন্ধু। এখনো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, সে (মাশরাফি) সংসদ সদস্য নাকি অন্যকিছু ওরকম কোন পার্থক্য নেই। সবকিছু স্বাভাবিক সময়ের মতই আছে।

একবার ইংল্যান্ড সফরে যাই, ওখানে একটা ভূতুড়ে হোটেল ছিল। ঐ হোটেলে আত্মা বা অন্যকিছু আছে এমনটা বলতো আরকি সবাই। তো আমার এমনও হয়েছে যে ভয়ে নিজের রুমে শুধু লাগেজটা রাখছি। ভয়ের কারণে রাতে আমরা এক রুমে ৪-৫ জন ঘুমাতাম। দুই খাটে দুইজন মাঝখানে খালি জায়গায় আমি কম্বল, বালিশ দিয়ে নিচে ঘুমাতাম। অন্য খালি জায়গায় আরও দুই একজন থাকতো। কিন্তু মাশরাফির কি সাহস দেখেন, সে অমন পরিস্থিতিতে রাতে সাদা কাপড় গায়ে দিয়ে বাইরে গিয়ে জানালার পাশ থেকে জাভেদ ভাই (জাভেদ ওমর) ও তার স্ত্রী এবং আমাদের সবাইকে ভয় দেখাচ্ছে। কি পরিমাণ সাহস ছেলেটার তখন চিন্তা করতাম আরকি।

ক্রিকেট৯৭- এখনতো ভূমিকা বদলে গেল। ক্রিকেটার হিসেবে একটা জীবন পার করেছেন, এখন পেশাদার কোচ। তরুণদের জন্য কোন বার্তা আছে?

আফতাব আহমেদঃ বার্তা বলতে পরিশ্রম আর সাহসিকতার বিকল্প নেই। আমি আমার ক্রিকেট ক্যারিয়ার দিয়েই এখন অনুধাবন করি পরিশ্রম কত গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। সবচেয়ে বড় কথা হল দলের সিনিয়র ক্রিকেটাররা যেমন তামিম, মুশফিক, রিয়াদ, সাকিবদের যে মানসিকতা সেটাই তাদের আজ এখানে নিয়ে আসছে। তরুণদের বলতে চাই নিজেদের মধ্যে সাহসটা বাড়াতে হবে, ভয়ডরহীন ক্রিকেট খেলতে হবে। আর পরিশ্রম করতে হবে প্রচুর, পরিশ্রমটা আপনাকে অনেক দূর নিয়ে যাবে সাথে যদি সাফল্য পাওয়ার ক্ষুধা, মানসিকতাটা থাকে।

নাজমুল হাসান তারেক

Read Previous

বিসিবির দেউলিয়া হবার খবরে বিসিবি কর্তাদের প্রতিক্রিয়া

Read Next

করোনার সময় বেড়েছে জুয়াড়িদের কার্যকলাপ

Total
78
Share
error: Content is protected !!