৬৩ পেরোনো জাভেদ মিয়াদাদের রেকর্ডনামা

জাভেদ মিয়াদাদ

পাকিস্তান তো বটেই বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যানদের নাম নিতে গেলেও জাভেদ মিয়াদাদ থাকবেন উপরের দিকেই। ১৯৫৭ সালের ১২ জুন করাচিতে জন্ম এই পাকিস্তানি কিংবদন্তীর। পারিবারিকভাবেই ক্রিকেটের সাথে সম্পৃক্ত বড় মিয়াঁ খ্যাত পাকিস্তানি এই তারকা ক্রিকেটার। নিজের তিন ভাই খেলেছে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট।

জাভেদ মিয়াদাদ ‘ইএসপিএন ক্রিকইনফোর’ সর্বকালের কিংবদন্তী ক্রিকেটারদের তালিকায় আছেন ৪৪ তম অবস্থানে। ব্যাট হাতে নিজের সময়কার অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছেন। ১৯৮৬ সালে শারজায় ভারতের বিপক্ষে শেষ বলে ছক্কা হাঁকিয়ে দলের জয় নিশ্চিত করার মাধ্যমে ক্রিকেট প্রেমীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে আছেন।

আধুনিক ক্রিকেটে শেষ বলে ছক্কা হাঁকিয়ে জয় অনেকটা সহজ ব্যাপার হলেও তিন দশক আগে মিয়াদাদ প্রথম এমন রোমাঞ্চকর অনুভূতির সাথে পরিচয় করান। ১৯৯২ বিশ্বকাপে পাকিস্তানের শিরোপা জয়ের অন্যতন নায়ক নিঃসন্দেহে জাভেদ মিয়াদাদ। ব্যাট হাতে ৯ ম্যাচে রান করেছেন ৬২.৪২ গড়ে ৪৩৭।

টেস্ট ক্রিকেটে দুর্দান্ত অনেক রেকর্ডে নিজের নাম লিখিয়ে নিয়েছেন পাকিস্তানি এই কিংবদন্তী ব্যাটসম্যান। ১৯৭৬ সালে গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে অভিষেক টেস্টেই তুলে নেন সেঞ্চুরি। মাত্র ১৯ বছর ১১৯ দিন বয়সে সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে সর্বকনিষ্ঠ টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান হিসেবে রেকর্ড গড়েন। বর্তমানে যে রেকর্ডটি বাংলাদেশের মোহাম্মদ আশরাফুলের। ২০০১ সালে কলম্বোতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ১৭ বছর ৬১ দিন বয়সে সেঞ্চুরি হাঁকান আশরাফুল।

Javed Miandad: Whenever he played, 'it was war' - Pakistan - DAWN.COM

নিজের তৃতীয় টেস্টে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে একই সিরিজে করাচি ন্যাশনাল স্টেডিয়ামে ডাবল সেঞ্চুরি তুলে নেন মিয়াদাদ। ২০৬ রানের অসাধারণ ঐ ইনিংসের মাধ্যমে ক্যারিবিয়ান ব্যাটসম্যান জর্জ হেডলির ৪৭ বছরের পুরোনো রেকর্ড ভেঙ্গে সর্বকনিষ্ঠ ডাবল সেঞ্চুরিয়ান হিসেবে নিজের নাম লিখিয়ে নেন এই পাকিস্তানি ব্যাটসম্যান। ১৯ বছর ১৪০ দিন বয়সে গড়া তার রেকর্ডটি এখনো অক্ষুণ্ণ আছে।

টেস্ট ক্রিকেটে মাত্র দুজন ব্যাটসম্যানের গড় কখনোই ৫০ এর নিচে নামেনি। জাভেদ মিয়াদাদ তাদেরই একজন, বাকি জন হলেন ইংল্যান্ডের হারবার্ট স্যাটক্লিফ।

পাকিস্তানের হয়ে ১৯৭৬ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত খেলেছেন ১২৪ টেস্ট। ৫২.৫৭ গড়ে ২৩ সেঞ্চুরি ও ৪৩ ফিফটিতে ৮৮৩২ রান করেছেন। ইউনুস খানের পর পাকিস্তানের সর্বোচ্চ টেস্ট রান সংগ্রাহক তিনিই। শচীন টেন্ডুলকার, রিকি পন্টিং, বীরেন্দর শেবাগ, ইউনুস খান ও মারভান আত্তাপাতুর মত তারও আছে টেস্ট ক্যারিয়ারে ৬ টি ডাবল সেঞ্চুরি।

ভারতের বিপক্ষে ১৯৮৩ সালের হায়দ্রাবাদ টেস্টে খেলেন ক্যারিয়ার সেরা অপরাজিত ২৮০ রানের ইনিংস। নিশ্চিত ট্রিপলের দিকে ছুটতে থাকা মিয়াদাদকে থামিয়ে দেন অধিনায়ক ইমরান খান। ৩ উইকেটে ৫৮১ রানে ইনিংস ঘোষণা করলে ট্রিপলের আক্ষেপ নিয়েই মাঠ ছাড়তে হয় পাকিস্তানি কিংবদন্তী ব্যাটসম্যানকে। পাকিস্তানের বিশ্বকাপ জয়ী অধিনায়কের এমন সিদ্ধান্তের বেশ সমালোচনা হয় ঐ সময়। ঐ ইনিংসেই ডাবল সেঞ্চুরি হাঁকান পাকিস্তানের আরেক তারকা ব্যাটসম্যান মুদাসসর নজর (২৩১)। তারাই পাকিস্তানের প্রথম দুই ব্যাটসম্যান যারা একই ইনিংসে ডাবল সেঞ্চুরি তুলে নিয়েছিলেন।

১৯৯২ সালে ইংল্যান্ড সফরে এজবাস্টন টেস্টে মিয়াদাদ সবশেষ সেঞ্চুরির দেখা পান। প্রথম ইনিংসে তার ব্যাট থেকে আসে অপরাজিত ১৫৩ রান। এরপর অবসরের আগ পর্যন্ত খেলা ১১ টেস্টে ছিলনা কোন সেঞ্চুরি। ১৯৯৩ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে লাহোর টেস্ট দিয়ে ইতি টানেন টেস্ট ক্যারিয়ারের। নামের পাশে থাকা ৮৮৩২ রান তখনো পাকিস্তানের হয়ে সর্বোচ্চ টেস্ট রান সংগ্রাহক হিসেবে তাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।

যে রেকর্ড টিকেছিল ২০১৫ সাল অব্দি, ভেঙেছেন ইউনুস খান। যদিও মাত্র ৪ রান দূরে থকে ক্যারিয়ারের যতি চিহ্ন টেনে দেওয়ায় রেকর্ডটি ভাঙার সুযোগ হাতছাড়া হয় ইনজামাম উল হকের। টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে নিজের অভিষেক ও শততম টেস্টে সেঞ্চুরির দেখা পান পাকিস্তানের বড় মিয়াঁ খ্যাত মিয়াদাদ।

That little devil from Karachi | The Cricket Monthly | ESPN Cricinfo

ওয়ানডেতেও জাভেদ মিয়াদাদ ধারাবাহিকতার অনন্য নজির গড়েছেন। ১৯৭৫ সালে প্রথম বিশ্বকাপ দিয়ে তার আন্তর্জাতিক অভিষেক। বার্মিংহামে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ম্যাচে পাকিস্তানের জার্সিতে ব্যাট হাতে নামেন ৬৪ বছরে পা দেওয়া পাকিস্তানি কিংবদন্তী। ৬ টি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া জাভেদ মিয়াদাদ সর্বোচ্চ সংখ্যক বিশ্বকাপ খেলা ক্রিকেটার হিসেবে এককভাবে রেকর্ডের মালিক ছিলেন দীর্ঘদিন। ২০১১ বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে মিয়াদাদের রেকর্ডে ভাগ বসান ভারতীয় ব্যাটিং ঈশ্বর খ্যাত শচীন টেন্ডুলকার।

কাকতালীয়ভাবে মিয়াদাদ ওয়ানডে ক্যারিয়ার শুরু করেছেন বিশ্বকাপ দিয়ে, ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচটিও খেলেছেন বিশ্বকাপেই। ১৯৯৬ বিশ্বকাপে ব্যাঙ্গালোরে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটিই তার পাকিস্তানের জার্সিতে শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। ওয়ানডেতে ২৩৩ ম্যাচে ৪১.৭০ গড়ে ৮ সেঞ্চুরি ও ৫০ ফিফটিতে রান করেছেন ৭৩৮১। ওয়ানডেতে টানা ৯ ফিফটি করার রেকর্ড জাভেদ মিয়াদাদের দখলে।

১৯৮৬ সালে শারজায় অনুষ্ঠিত অস্ট্রেলিয়া-এশিয়া কাপ জয়ের মাধ্যমে প্রথম কোন বড় ইভেন্ট জেতে পাকিস্তান। মিয়াদাদ ভারতের বিপক্ষে ঐতিহাসিক ফাইনাল ম্যাচে খেলেন ১১৬ রানের অপরাজিত ইনিংস। শেষ বলে পাকিস্তানের প্রয়োজন ছিল ৪ রান, মিয়াদাদ ছক্কা হাঁকিয়ে জয় নিশ্চিত করেন। মিয়াদাদের শেষ বলে নায়ক বনে যাওয়া ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।

১৯৭৯-৮০ মৌসুমে ভারত সফরে প্রথমবার ম্যাচ ফিক্সিং অভিযোগ ওঠে পাকিস্তানি অধিনায়ক আসিফ ইকবালের বিরুদ্ধে। পাশাপাশি সিরিজ হারের ফলে অধিনায়কত্ব হারান আসিফ। মাত্র ২২ বছর বয়সে টেস্ট নেতৃত্বের ভার ওঠে মিয়াদাদের কাঁধে। তখনো জহির আব্বাস, সরফরাজ নওয়াজ, মাজিদ খান, ওয়াসিম বারিদের মত সিনিয়ররা ক্রিকেটাররা দলে ছিলেন।

টেস্টে অধিনায়ক হিসেবে পাকিস্তানকে নেতৃত্ব দেন ৩৪ ম্যাচে। যার মধ্যে সমান ১৪ জয় ও ড্রয়ের বিপরীতে হার ছিল মাত্র ৬ টিতে। অন্যদিকে ওয়ানডেতে নেতৃত্ব দেন ৬২ ম্যাচে। সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতার পাল্লাই ভারী অবশ্য সীমিত ওভারের ক্রিকেটে। ২৬ জয়ের বিপরীতে হার ৩৩ টিতে, পরিত্যাক্ত ও টাই হয়েছে সমান একটি করে।

This day, that year: The Jumping Miandad

১৯৯২ বিশ্বকাপে শিরোপা জয়ী টুর্নামেন্টে পাকিস্তানের এই কিংবদন্তী ব্যাটসম্যান এক অদ্ভুত কান্ড ঘটিয়ে বসেন। যা এখনো ক্রিকেট অনুরাগীদের কাছে হাস্য রসের খোরাক হিসেবে বিবেচিত। শচীন টেন্ডুলকারের ওভারে ভারতীয় উইকেট রক্ষক কিরণ মোরের স্লেজিংয়ের জবাবে ব্যঙের মত লাফ দিতে থাকেন মিয়াদাদ।

১৯৯৬ বিশ্বকাপ দিয়ে ক্রিকেট ক্যারিয়ারের ইতি টানা জাভেদ মিয়াদাদ পরবর্তী জীবনে কোচ হিসেবেও বেশ সুনাম কুড়িয়েছেন। যে কজন কোচ কয়েক দফায় পাকিস্তান জাতীয় দলের দায়িত্ব পেয়েছেন মিয়াদাদ তাদের একজন। সব মিলিয়ে বিভিন্ন মেয়াদে তিন বার পাকিস্তানের প্রধান কোচ হিসেবে কাজ করেছেন।

১৯৯৮ সালে প্রথম বার নিয়োগ নিয়োগ পাওয়া মিয়াদাদ আশ্চর্যজনকভাবে ১৯৯৯ বিশ্বকাপের ঠিক আগ মুহূর্তে পদত্যাগ করেন। পুনরায় ২০০০ সালে নিয়োগ পেয়ে পাকিস্তানকে শারজাহ কাপ, এশিয়া কাপ , ওয়েস্ট ইন্ডিজে ত্রিদেশীয় সিরিজ ও শ্রীলঙ্কায় টেস্ট জেতান পাকিস্তানকে। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি ও ২০০১ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ হারের পর অধিনায়ক মইন খানের সাথে চাকরিচ্যুত হন সাবেক এই কোচও।

২০০৩ বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বাজে পারফরম্যান্সের পর আবারও কোচ হিসেবে নিয়োগ পান জাভেদ মিয়াদাদ। তবে ২০০৪ সালেই তাকে বরখাস্ত করে বব উলমারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর ভারতে টিভি ধারাভাষ্যকার ও কোচিংয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়। পাকিস্তান বোর্ডের ব্যাটিং পরামর্শক হিসেবেও কাজ করেন ২০১২ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে।

বর্নাঢ্য ক্রিকেট ক্যারিয়ারে অসংখ্য রেকর্ডের মালিক, পাকিস্তানি ব্যাটিং কিংবদন্তী জাভেদ মিয়াদাদের আজ (১২ জুন) ৬৩ তম জন্ম দিন।

নাজমুল হাসান তারেক

Read Previous

‘সবাই নিজ নিজ কাজে ফিরছে, আমরা সেটা পারছিনা’

Read Next

ইংল্যান্ড সফরের জন্য পাকিস্তানের স্কোয়াড ঘোষণা

Total
53
Share
error: Content is protected !!