সাউদাম্পটনে কালো মেঘ সরিয়ে দ্যুতি ছড়ালেন অ্যান্ডারসন

জিমি অ্যান্ডারসন

অপেক্ষার পথ দীর্ঘ হয়, কতটা দীর্ঘ? জীবনের নানা বাঁকে আপনাকেও হয়তো পাড়ি দিতে হয়েছে অপেক্ষার সেই দীর্ঘ পথ। লক্ষ্যে পৌঁছানোর আগে নানা বিপত্তি হয়তো সেই পথকে করে তুলেছিল আরও দীর্ঘতর। এই যেমন পাকিস্তানের বিপক্ষে সাউদাম্পটন টেস্টে ইতিহাস গড়ার দ্বারপ্রান্তে গিয়ে জিমি অ্যান্ডারসনকে কেবল অপেক্ষা, অপেক্ষা ও অপেক্ষাই করতে হয়েছে।

শতবছরের টেস্ট ইতিহাসে যে কীর্তি গড়তে পারেননি কোন পেসার তাই করেছেন জিমি। সবমিলিয়েও তার আগে মাত্র তিনজনের রয়েছে এমন কীর্তি। পাকিস্তান অধিনায়ক আজহার আলিকে জো রুটের ক্যাচে পরিণত করে মুত্তিয়াহ মুরালিধরন (৮০০), শেন ওয়ার্ন (৭০৮) ও অনিল কুম্বলের (৬১৯) পর চতুর্থ বোলার হিসেবে ৬০০ টেস্ট উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করেন।

২০১৮ সালে কেনিংটন ওভালে ভারতীয় ব্যাটসম্যান মোহাম্মদ শামিকে বোল্ড করে পেসারদের মধ্যে নিজেকে তুলে আনেন সর্বোচ্চ চূড়ায়। পেছনে ফেলেন অস্ট্রেলিয়ান গ্লেন ম্যাকগ্রার ৫৬৩ উইকেটের রেকর্ডকে। যেভাবে পারফর্ম করছিলেন তাতে অনুমেয়ই ছিল ইতিহাসের প্রথম পেসার হিসেবে সামনে থাকা ৬০০ উইকেটের মাইলফলকটা তিনিই স্পর্শ করবেন।

করোনা পরবর্তী ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম আন্তর্জাতিক সিরিজে মাঠে নামে জিমি অ্যান্ডারসনরা। ৫৮৪ উইকেট নিয়ে সিরিজ শুরু করা ইংলিশ ম্যান হয়তো ঐ সিরিজেই রেকর্ড বইয়ে নিজের নাম লিখিয়ে ফেলবেন ধারণা করেছিল অনেকেই। তবে ঠিক অ্যান্ডারসনময় পারফরম্যান্স ছিলনা, তিন ম্যাচ সিরিজে খেলেছেন দুটিতে। স্টুয়ার্ট ব্রড, বেন স্টোকসদের নজর কাড়া পারফরম্যান্সের ভীড়ে আড়ালেই থাকতে হয়েছে।

সিরিজে সাকূল্যে উইকেট পাঁচটি, ৫৮৯ উইকেট নিয়ে তাই অপেক্ষা বাড়লো পাকিস্তান সিরিজ পর্যন্ত। ওল্ড ট্রাফোর্ডে প্রথম টেস্টে ছায়া হয়ে থাকলেন ক্রিস ওকস, স্টুয়ার্ট ব্রড, জফরা আর্চারদের। দুই ইনিংসে ২৮ ওভার বল করে শিকার মাত্র এক উইকেট। বৃষ্টিতে ড্র হওয়া সাউদাম্পটনে দ্বিতীয় টেস্টে এক ইনিংসে বল করে শিকার তিন উইকেট। ৬০০ এর পথে আরেকটু এগিয়ে যাওয়া, উইকেট সংখ্যা ৫৯৩!

একই ভেন্যুতে তৃতীয় ও শেষ টেস্টটি এবারের ইংলিশ গ্রীষ্মে ঘরের মাঠে অ্যান্ডারসনদের শেষ ম্যাচ। ফলে মাইলফলক স্পর্শের সময়টা দীর্ঘতর করতে না চাইলে তুলে নিতে হবে পাকিস্তানের ৭ উইকেট। কিন্তু পাকিস্তানি ব্যাটসম্যানদের সাথে আবহাওয়া পূর্বাভাস অনুসারে লড়তে হবে প্রকৃতির সাথেও।

টস জেতা ইংল্যান্ড জ্যাক ক্রলির ২৬৭ রানের দুর্দান্ত ইনিংসে স্কোরবোর্ডে তোলে ৫৮৩ রান। দ্বিতীয় দিন শেষ বিকেলে ১০.৫ ওভার ব্যাট করার সুযোগ পায় পাকিস্তান। তাতেই অ্যান্ডারসনের সুইং বিষে কুপোকাত পাকিস্তান, ২৪ রান তুলতেই হারায় তিন উইকেট। যার সবকটিই তার পকেটে। নামের পাশে ৫৯৬ উইকেট নিয়ে তৃতীয় দিন শুরু করেন এই ইংলিশ পেসার।

সকাল সকাল আসাদ শফিককে ফিরিয়ে পৌঁছে যান মাইলফলকের আরও কাছে। মতান্তরে বলা যায় অপেক্ষা নামক পরীক্ষার শুরুটাও সেখান থেকে। ৩০ রানে ৪ উইকেট হারানো পাকিস্তানের তিনটি উইকেট নিতে পারলেই ইতিহাসের পাতায় নাম উঠে যাবে। নাহ, এবার বেরসিক বৃষ্টির হানা। লাঞ্চের বেশ কিছুক্ষণ আগেই সাউদাম্পটনের আকাশ থেকে ঝরা বৃষ্টি থেমেছে চা বিরতিরও অনেক পরে।

৭৫ রানে ৫ উইকেট হারানো পাকিস্তানকে একাই টেনে নিয়েছেন অধিনায়ক আজহার আলি। ১৪১* রানের অধিনায়কোচিত ইনিংসেও অবশ্য দলকে বাঁচাতে পারেননি ফলো অন থেকে। ২৭৩ রানে অল আউট, প্রথম ৪ উইকেট শিকার করা অ্যান্ডারসন শেষ ব্যাটসম্যানকে ফিরিয়ে তুলে নেন ২৯ তম বারের মত ইনিংসে পাঁচ উইকেট। যা গ্লেন ম্যাকগ্রার সাথে যৌথভাবে পেসারদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ফাইফারের রেকর্ড।

তবে নিজের চতুর্থ ও পঞ্চম উইকেটের মাঝের সময়টায় নিদারুণ ও নির্মম অপেক্ষা ও আক্ষেপে কাটাতে হয়েছে। তার করা ১০ বলের ব্যবধানে ক্যাচ পড়েছে তিনটি। যার সবকটিই ছিল যেকোন বাজে ফিল্ডারের জন্যও সহজতর। বিশেষ করে আজহার আলির যে ক্যাচটি মিড অনে দাঁড়িয়ে মিস করেছেন স্টুয়ার্ট ব্রড সেটি দৃষ্টিকটুও বলতে হয়। যে ক্যাচ মিসের পর ব্রডের চোখে মুখে অনুশোচনার আভা ধরা পড়ে। শেষ পর্যন্ত নাসিম শাহকে ফিরিয়ে ৫৯৮ তম শিকার।

তৃতীয় দিন যে সময়ে পাকিস্তান অল আউট হয় তখনও দ্বিতীয় ইনিংসে অন্তত ১০ ওভার ব্যাট করার মত সময় ছিল আজহার আলিদের জন্য। আর এমনটা হলেই হয়তো সেদিনই ৬০০ স্পর্শ করতে পারতেন জিমি অ্যান্ডারসন। হুমায়ুন আহমেদ বলে গেছেন অপেক্ষা হলো শুদ্ধতম ভালোবাসার একটি চিহ্ন। অ্যান্ডারসনের অপেক্ষা বেড়েছে, ভালোবাসার পথটা দীর্ঘ হয়েছে।

আলোক স্বল্পতায় ৩১০ রানে পিছিয়ে থাকা পাকিস্তানকে নামতে হয়নি ব্যাট করতে। চতুর্থ দিন শুরুতেই অ্যান্ডারসন পেতে পারতেন ৫৯৯ তম উইকটর দেখা, এবার শান মাসুদের সহজ ক্যাচ ফেলে দিয়েছেন উইকেট রক্ষক জস বাটলার। অ্যান্ডারসনের করা ৩৭ বলের ব্যবধানে চার চারটি ক্যাচ মিস। ভেতরের দহন নেভানোর সুযোগ দিতে রোজ বোলে আবারও নামে বৃষ্টি। স্থানীয় সময় ১২:২৫ এ শুরু হওয়া বৃষ্টি থামার পর বল মাঠে গড়াতে গড়াতে ৩:৪৫!

চতুর্থ দিন খেলা হয়েছে মোটে ৫৬ ওভার। দুই উইকেট হারিয়ে পাকিস্তান তোলে ঠিক ১০০ রান। স্টুয়ার্ট ব্রডের সাথে একটি উইকেট ভাগে জোটে অ্যান্ডারসনেরও। আবিদ আলিকে কারও ক্যাচ নয় এলবিডব্লিউ’র ফাঁদে ফেলেই ৫৯৯ তম শিকারে পরিণত করেন। বৃষ্টির সাথে এদিন যোগ হয় আলোক স্বল্পতাও, এতটাই আলো কমে যে শেষদিকে কেবল স্পিনাররাই বল করার অনুমতি পায়।

 

View this post on Instagram

 

Amazing, Scary as well! Scene in Southampton. #ENGvPAK

A post shared by cricket97 (@cricket97bd) on

ফলে ডম বেসের সাথে হাত ঘুরাতে বাধ্য হয় অধিনায়ক জো রুটও। এক পর্যায়ে সেটিও সম্ভব না হলে নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই দিনের খেলা শেষ হয়। ম্যাচ বাঁচাতে শেষদিনে পাকিস্তানকে ব্যাট করতে হবে সারাদিন। মাইলফলক স্পর্শ করতে অ্যান্ডারসনের প্রয়োজন মাত্র এক উইকেট। তবে আবহাওয়া পূর্বাভাস জানান দিচ্ছিল সাউদাম্পটনের আকাশ জুড়ে মেঘেদের আধিপত্য দেখা যাবে।

ব্রিটিশ সাহিত্যিক স্যামুয়েল জনসন বলেছেন অসাধারণ কাজগুলো শক্তি নয়, অসীম ধৈর্য দিয়ে সম্পন্ন করতে হয়। স্বদেশী জিমি অ্যান্ডারসন হয়তো এতক্ষণে এই উক্তি মগজে গেঁথে নিয়েছেন। পঞ্চম দিনের শুরু থেকেই বৃষ্টি, ক্রিকবাজে মজা করে লেখা হয় আজ কেবল অ্যান্ডারসন হেটারস ও পাকিস্তান ভক্তরাই বৃষ্টি কামনা করবে। আদৌতে পাকিস্তানি ভক্তরাও হয়তো জিমি অ্যান্ডারসনের অপেক্ষা দীর্ঘ হোক চাননি।

তবে বৃষ্টি ঠিকই হয়েছে, অনেক সময় ধরে। থামার পরেও মাঠ খেলার উপযোগী করতে সময় লেগেছে ঘন্টা চারেকের মত। যখন শুরু হয় তখন থেকে মাত্র ৪৫ ওভার খেলা মাঠে গড়ানো সম্ভব ছিল। ক্রিজে থাকা আজহার আলি ও বাবর আজম এমন সমীকরণে ম্যচ বাঁচাতে পারবেন অনেকটা নিশ্চিতই ছিল। অপেক্ষা শুধু অ্যান্ডারসনের একটি উইকেটের। নাহ, এবার আর অপেক্ষা দীর্ঘ হয়নি।

দিনের ৬ষ্ঠ ওভারের দ্বিতীয় বলেই অফ স্টাম্পের বাইরে লাফিয়ে ওঠা বলে স্লিপে ক্যাচ দেন আজহার আলি। নিজের ৬০০ তম শিকারকে ভিন্ন মাত্রা দিতেই হয়তো দুই দলের অধিনায়ককে একই ফ্রেমে বন্দী করেছেন অ্যান্ডারসন। পাকিস্তানি দলপতির ক্যাচ নিয়েছেন ইংলিশ অধিনায়ক জো রুট। ফলে ইতিহাসের প্রথম পেসারের ৬০০ তম উইকেটে জড়িয়ে আছে দুই দলের অধিনায়কের নামই।

প্রায় ১৫০ বছরের ক্রিকেট ইতিহাসে এই কীর্তি নেই কোন পেসারের। যুগের পর যুগ, প্রজন্মের পর প্রজন্ম দেখেছে কত আগুনে গতির পেসার। অথচ ৫০০ উইকেটধারী পেসারই মাত্র চারজন। যার মধ্যে জিমির সতীর্থ স্ট্রুয়ার্ট ব্রড একজন, গত মাসে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজেই এই কীর্তি গড়েন। এর বাইরে কোর্টনি ওয়ালশ ও গ্লেন ম্যাকগ্রার রয়েছে ৫০০ উইকেটের মাইলফলক স্পর্শের নজির। তবে দেড় যুগের বেশি সময় ধরে সাদা পোশাককে আপন করে নেওয়া অ্যান্ডারসন নিজেকে হয়তো একটু আলাদা দূরত্বেই নিতে চেয়েছেন।

৩৮ বছর বয়সেও প্রতিপক্ষ শিবিরে হানা দেন একই উদ্যমে। একজন পেসারের জন্য ১৫৬ টেস্ট খেলতে পারাটাই অনেক বড় অর্জন। আর এই অর্জনকে বিশেষ কিছু দিয়ে মুড়িয়ে রাখতেই অ্যান্ডারসন নামের পাশে এমন কীর্তির স্মারক যোগ করেন যার চর্চা হবে বছরের পর বছর ধরে। যতদিন ক্রিকেটের অস্ত্বিত্ব থাকবে ততদিনই জিমি অ্যান্ডারসন সমাদৃত হবেন বিশেষভাবে।

ধারাভাষ্যকার হার্শা ভোগলে টুইটারে লিখেছেন, ‘একজন পেসারের জন্য ৬০০ উইকেট অনেক। এটি তার দক্ষতা ও সুস্থতার একটি স্মারক। আর অ্যান্ডারসন দেখিয়েছেন তিনি যে কোন দিক থেকে ভালো। দুর্দান্ত ক্যারিয়ার ও খেলাটির গ্রেটদের একজন সে।’

নাজমুল হাসান তারেক

Read Previous

লুইসের সেঞ্চুরি মিসের আক্ষেপ ঘুচল দলের জয়ে

Read Next

লো স্কোরিং ম্যাচে জ্যামাইকার জয়

Total
5
Share
error: Content is protected !!