‘ইতিহাস, সংগ্রাম, গৌরবের গল্প সাথে করে নিয়ে গেলেন রেজা ভাই’

রেজা-ই-করিম আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববি

স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে ক্রিকেট শুরু করাটা বেশ কঠিন কাজগুলোর একটি ছিল। যুধ্ববিধ্বস্ত একটা দেশের ভঙ্গুর অবকাঠামোতে ক্রিকেট তখন বেশ আয়েশি চিন্তার মধ্যেই পড়তো। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই ক্রিকেট পোকা মাথায় ঢুকে পড়া কয়েকজন সংগঠক সহজেই ছেড়ে দেবার পাত্র ছিলেন না। নিজেও ক্রিকেট খেলতেন তবে পরবর্তী সময়ে অন্যতম সফল সংগঠক হিসেবেই আবির্ভাব হয় সদ্য প্রয়াত বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের প্রথম কার্যনির্বাহী সম্পাদক রেজা-ই-করিম।

যে কয়েকজন ক্রিকেট সংগঠকের অক্লান্ত পরিশ্রম, ত্যাগের বিনিময় আজকের বাংলাদেশ ক্রিকেট কাঠামো দাঁড়িয়ে, রেজা-ই-করিম থাকবেন ঐ সারির সামনের দিকেই। খেলোয়াড়ি জীবনের ইতি টেনেছেন অনেক কম বয়সে। তবে দেশের ক্রিকেটকে একটা জায়গায় নিয়ে যেতে খেটেছেন অনেকটা গায়ে গতরেই। ক্রিকেট বোর্ডের ছিলনা নির্দিষ্ট অফিস, আফিস হলেও ছিলনা বিদ্যুতের ব্যবস্থা। মোমবাতির আলোতে প্রস্তুত করেছেন আজকের সাকিব, তামিম , মুশফিকদের জন্য মঞ্চ।

১৯৯৭ সাল, যে বছর কেনিয়াকে আইসিসি ট্রফির ফাইনালে হারিয়ে আকরাম খানরা রচনা করলো সোনালী এক অধ্যায়ের। সে বছরই সাংগঠনিক ক্যারিয়ারের ইতি টানেন রেজা-ই-করিম। যেন ঐ সাফল্যের অপেক্ষাতেই ছিলেন কোষাধ্যক্ষ, সহ সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, নির্বাচক, আম্পায়ারসহ সভাপতির পদ ছাড়া সম্ভাব্য প্রায় সব দায়িত্ব পালন করা এই দক্ষ ক্রিকেট সংগঠক।

দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্সার ও বার্ধক্যজনিত রোগের সাথে লড়াই করা রেজা-ই-করিম আজ (২২ মার্চ) ভোরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বর্তমান ক্রিকেট বোর্ডে তাকে কাছ থেকে দেখে সবচেয়ে বেশি অনুধাবন করতে পেরেছেন বিসিবি পরিচালক আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববি। রেজা-ই-করিমের মত স্বপ্নযাত্রার মশালধারীর প্রস্থানের দিনে ‘ক্রিকেট ৯৭’ এর সাথে আলাপকালে স্মৃতি রোমন্থন করেন বিসিবির এই পরিচালক।

আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববি আমিনুল সিওলাম বুলবুল রেজা-ই-করিম
আমিনুল ইসলাম বুলবুল (বামে) ও আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববির (ডানে) সঙ্গে রেজা-ই-করিম (মাঝে)

রেজা-ই -করিমকে নিয়ে বলতে গিয়ে সাজ্জাদুল আলম ববি জানান, ‘রেজা ভাইরা এমন এক প্রজন্মের লোক যারা আমাদের ক্রিকেটকে একটা ভিত্তির উপর বসিয়ে দিয়ে গেছে। যে ভিত্তির উপর আমরা এখন পুরো একটা ইমারত তৈরি করেছি। এখন ক্রিকেটের যে অবস্থান সেটার জন্য নিরবে নিভৃতে এরকম লোক কাজ করে গেছেন অনেকে। যেমন রেজা-ই-করিম, রাইস উদ্দিন, মোজাফফের হোসেন পল্টু।’

‘স্বাধীনতার পর ক্রিকেট প্রত্যাবর্তন হয়েছে তাদের হাত ধরে। কারণ ক্রিকেট খেলা ছিল অনেক ব্যয়বহুল। যুদ্ধ্ববিধ্বস্ত একটা দেশে আবার শুরু সত্যি একটু কঠিন ছিল। কারণ টাকা পয়সাতো লাগতো একটা খেলা চালাতে গেলে। আমাদের চাও কিনে খেতে হত একসময়। তো সে সময় তারা আবার ক্রিকেটে চালু করে। তারপর কিন্তু বাংলাদেশ আর পেছনে ফিরে তাকায়নি, এরমধ্যে অনেক চড়াই উতরাই গেছে, অনেক কঠিন সময় গেছে।’

১৯৭৭ সালে এমসিসির বাংলাদেশ সফরে আসাটা বেশ কাজে দেয় আইসিসির সহযোগী সদস্যপদ পেতে। যার পেছনে মূল কারিগর ছিলেন রেজা-ই-করিম, এমসিসির কাছে লেখা আমন্ত্রণপত্রটাও তার লেখা। এমসিসির ঐ সফর সম্পর্কে সাজ্জাদুল আলম বলেন, ‘১৯৭৭ সালে এমসিসি প্রথম আসে বাংলাদেশে। এমসিসি চলে যাওয়ার পরে আমাদের দেশে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা ও সম্ভাবনাটা বাড়ে। সম্ভাবনার দিকটা যাচাই করে আইসিসি আমাদের  সহযোগী দেশের সদস্যপদ দেয়। আর এই সহযোগী দেশের সদস্যপদ পাওয়ার পেছনে রাইস ভাই, রেজা ভাই এরকম ব্যক্তিত্বরা ছিলেন।’

কোন চাওয়া পাওয়ার বিনিময়ে নয়, নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে গেছেন রেজা-ই-করিমরা। ক্রিকেটের আইন দেশের ক্রিকেটারদের কাছে সহজবোধ্য করে তুলতে এমসিসি বাইলজকে অনুবাদ করে সারা দেশে পৌঁছে দিয়েছেন দেশের ক্রিকেটে অসামান্য অবদান রাখা ব্যক্তিটি, ‘আমাদের ক্রিকেট বোর্ডের যত খেলা আছে তার বাইলজ, প্লেয়িং কন্ডিশন এগুলো কিন্তু তার হাতেই তৈরি করা।’

‘একটা সময় আমার মনে আছে যে এমসিসি ল’জ অব ক্রিকেট আইনে যে নিয়মে ক্রিকেট চলে সারা বিশ্বে সেটার বাংলা অনুবাদ করে তখন আতাউল হক মল্লিক ছিলেন সাংবাদিক, উনিও আম্পায়ারিং করতেন রেফারিং করতেন। উনি সহ আমরা ঐ সময় বাংলায় এমসিসির ল’জ অব ক্রিকেট প্রকাশ করি এবং সারাদেশে এটা বিতরণ করা হয়। যাতে নিজের ভাষায়, মাতৃ ভাষায় আইনটা আমরা জানতে পারি।’

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ক্রিকেটের ছিলনা কোন নির্দিষ্ট অফিস। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (তৎকালীন ইপিএসএফ) ভবনের নিচতলায় বিদ্যুতহীন একটি রুমেই দেশের ক্রিকেটের অগ্রযাত্রার স্বপ্ন বুনতেন রেজা-ই-করিমরা। জানালেন সাজ্জাদুল ইসলাম ববি, ‘এখন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ যেটা আছে সেটার নাম ছিল ইপিএসএফ এবং এটাই ছিল সকল খেলা চালনার মূল ক্ষেত্র। তখন আমাদের ফুটবল ফেডারেশন, ক্রিকেট বোর্ড এদের নিজস্ব অফিস ছিলনা। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের নিচ তলায় একটা কনফারেন্স রুমের মত ছিল, স্কুল কলেজের শিক্ষকদের কমন রুমের মত।’

‘সেখানে বিভিন্ন আলমারি ছিল, একেকটা আলমারি একেকটা ফেডারেশন, বোর্ডের অফিস বলতে গেলে। বিকেল বেলা সবাই আসতেন, সবাইতো অনারারি বেসিস কাজ করতেন। এসে ওইখানে আলমারি খুলে ফাইল খুলে ক্রিকেটের যত কাজ আছে সেরে আবার বন্ধ করে চলে যেতেন। অনেকসময় এমনও হয়েছে বিদ্যুৎ ছিলনা, রেজা ভাইরা মোমবাতি কিনে সে আলোয় কাজ করেছেন। সেই দিন থেকে চলে এসেছি আমরা এখনকার যে অবস্থানটায়, আমাদের জৌলুশ, অর্থনৈতিকভাবেও সমৃদ্ধ। এটার জন্য কৃতিত্ব যদি দিতে হয় রেজা ভাই অন্যতম দাবিদার।’

বিভিন্ন টুর্নামেন্টের বাইলজ, সূচী সব রেজা-ই-করিম নিজে হাতেই করতেন সেসময়। এখনো তার গড়ে দেওয়া কাঠামোতেই বিসিবির অনেক দাপ্তরিক কাজ চলে জানালেন বিসিবির বর্তমান পরিচালক সাজ্জাদুল আলম ববি, ‘এখনো আমাদের ক্রিকেট বোর্ডের টুর্নামেন্টগুলোর বিভিন্ন বাইলজ, নিয়মকানুনের বেশিরভাগই কিন্তু রেজা ভাইয়ের লেখা। আমরা এখনো কাট, কপি, পেস্ট করে চালাচ্ছি।’

রেজা-ই-করিম
ছবিঃ বিসিবি

দেশের ঘরোয়া লিগে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ অন্যতম জাকজমকপূর্ণ টুর্নামেন্ট বেশ আগে থেকেই। ক্লাব ক্রিকেট ঘিরে তখনকার উন্মাদনার ছিটেফোঁটারও দেখা মেলেনা এখন। ঢাকা লিগে বিদেশি ক্রিকেটারদের অংশগ্রহণ যোগ করে নতুন মাত্রা। এমন ভাবনার পেছনেও মূল কারিগর ছিলেন রেজা-ই-করিম। যা দূরদর্শিতার দারুণ নিদর্শন ছিল উল্লেখ করে সাজ্জাদুল আলম যোগ করেন, ‘ঢাকার ক্লাব ক্রিকেট তখন বেশ সমৃদ্ধ ছিল, বড় বড় ক্লাবগুলোতে খেলা খুবই উত্তেজনাপূর্ণ ছিল। অনেকসময় বিভিন্ন সংঘাতেরও সূচনা হয়েছিল ঐ সব জায়গায়। সে সময় ঐসব বড় বড় ম্যাচ আস্থার সাথে পরিচালনা করতেন রেজা ভাই।’

‘একটা জিনিস বলতে হয় ঐ সময় বিদেশি খেলোয়াড়দের ঢাকা লিগে খেলতে দেওয়াটা খুব দূরদৃষ্টি সম্পন্ন ছিল। সেসময় যারা এটার পেছনে ছিলেন রেজা ভাই তাদের অন্যতম। কারণ তারা জানতেন যে বাইরের তারকারা যদি এখানে এসে খেলে তাহলে দর্শকরা আকৃষ্ট হবে, দর্শকরা আকৃষ্ট হলে মিডিয়াও আকৃষ্ট হবে, মিডিয়া আকৃষ্ট হলে স্পন্সর আকৃষ্ট হবে। সাথে সাথে আমাদের খেলোয়াড়দেরও অনেক উন্নতি সাধন হবে। ঐ সময় বিশ্বের প্রায় সব বড় বড় তারকারা কিন্তু বাংলাদেশে এসে খেলে গেছেন। এই সিদ্ধান্তটা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ন।’

রেজা-ই-করিমের আরও একটি গভীর চিন্তার উদাহরণ দিতে গিয়ে সাজ্জাদুল আলম টেনে আনেন ১৯৯৭ আইসিসি ট্রফির আগে দেশে সিনথেটিক টার্ফে খেলার সিদ্ধান্তকে। এ প্রসঙ্গে বিসিবির এই পরিচালক বলেন, ‘১৯৯৭ তে আইসিসি ট্রফি হয় মালয়েশিয়াতে, আমদের একটা সুবিধা ছিল যে জানতাম খেলা মালয়েশিয়াতে হবে। ওখানকার কন্ডিশন ও অন্যান্য বিষয়গুলোও কিছুটা অনুকূলে থাকবে। আমাদের সমর্থক ছিল সেখানে, আমাদের দেশের অনেক লোক চাকরির সুবাদে মালয়েশিয়াতে অবস্থান করতো তারা মাঠে আসতেন, সমর্থন দিতেন।’

খেলার মাঠে রেজা-ই-করিম (করমর্দনরত), পেছনে আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববি

‘মালয়েশিয়া যাওয়ার আগেই আমরা আমদের কয়েকটা মাঠে সিনথেটিক টার্ফ লাগিয়ে দিই। কারণ আগেই জানা মালেশিয়াতে সিনথেটিক টার্ফে খেলা হবে, ন্যাচারাল টার্ফে খেলা হবেনা। ঐ সিদ্ধান্তের বদৌলতেই আমরা দুইটা মৌসুম ঢাকা লিগ সিনথেটিক টার্ফে খেলি যেটা আমাদের দারুণ সাহায্য করেছে। এমন দূরদৃষ্টি সম্পন্ন ভাবনা ছিল, যেটার ফল আমরা ১৯৯৭ সালে (আইসিসি ট্রফি জিতে ৯৯ বিশ্বকাপ নিশ্চিত করা) পাই। এগুলো সব রেজা ভাই জড়িত থাকার ফল। এরকম অনেক দুর্দান্ত সিদ্ধান্তের সাথে তার সম্পৃক্ততা ছিল। একজন সৎ, নিপাট ভদ্রলোক, অসাধারণ সংগঠক ছিলেন।’

৮২ বছর বয়সে আজ (২২ মার্চ) পরলোকগমন করা সফল সংগঠক, দেশের ক্রিকেটের আজকের অবস্থানের অন্যতম কারিগর রেজা-ই-করিমকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন কাছ থেকে দেখা বিসিবি পরিচালক সাজ্জাদুল ইসলাম ববি, ‘তারা বাংলাদেশকে এমন একটা ভিত্তির উপর বসিয়ে গেছেন যার উপর আমরা একটা বিরাট ইমারত (ক্রিকেটীয় অবস্থান) তৈরি করেছি। রেজা ভাই অনেক কিছু দিয়ে গেছেন, আবার যখন উনি চলে গেলেন সাথে করে অনেক কিছু নিয়ে গেছেন। অনেক ইতিহাস, সংগ্রাম, গৌরববের গল্প আছে যেসব উনি সাথে করে নিয়ে গেলেন যেগুলো হয়তো পরবর্তী প্রজন্মের আর জানার সুযোগ থাকলোনা। রেজা ভাইকে আমাদের শ্রদ্ধাভরে সালাম জানাই।’

নাজমুল হাসান তারেক

Read Previous

পিএসএল স্থগিত হওয়াতে যত ক্ষতি হল পিসিবির

Read Next

অপ্রত্যাশিত ছুটিতে যেমন কাটছে আকবর, সাকিব, শরিফুলদের

Total
24
Share