‘তুমিতো বিশ্বকাপটাই ফেলে দিলে বাছা’

হার্শেল গিবস স্টিভ ওয়াহ

জিতলে সেমিফাইনাল নিশ্চিত, হারলে অস্ট্রেলিয়াকে ফিরতে হবে বাড়ি। ১৩ জুন ১৯৯৯ লিডসে বিশ্বকাপের সুপার সিক্সে মুখোমুখি অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা। বিশ্বকাপ মানেই দক্ষিণ আফ্রিকার একটা দীর্ঘশ্বাস। অজিদের বিপক্ষে সেদিন হারলেও সেমিতে যাবে প্রোটিয়ারা এমনটা জানাই ছিল। ম্যাচটা হেরেছেও তারা, তবে সব ছাপিয়ে হার্শেল গিবসের একটি ক্যাচ মিসই ঐ ম্যাচটিকে ইতিহাসের রূপকথায় জায়গা করে দেয়।

ম্যাচের আগের রাতে সতীর্থ শেন ওয়ার্ন দলের সবাইকে উদ্দেশ্য করে মজা করে বলেন, ‘হার্শেল গিবসের কাছে ক্যাচ গেলে প্যাভিলিয়নের পথে হাঁটার দরকার নাই। আগে থেকেই উদযাপন করার অভ্যাস আছে তার।’ কিংবদন্তী স্পিনারের কথা হেসেই উড়িয়ে দেন বাকিরা।

টস জিতে ব্যাটিং নেওয়া প্রোটিয়ারা হার্শেল গিবসের সেঞ্চুরিতে ভর করে ২৭১ রানের পুঁজি পায়। দুই দশক আগে ২৭১ রান তাড়া করে জেতাটা একদম সহজ বিষয় ছিলনা বলাই যায়। তার উপর দলীয় ৪৮ রানেই ফিরে গেছেন মার্ক ওয়াহ, অ্যাডাম গিলক্রিস্ট ও ড্যামিয়েন মার্টিন। টপ অর্ডারে ধ্বস নামা দলের হাল ধরতে ক্রিজে আসেন অধিনায়ক স্টিভ ওয়াহ। ঠান্ডা মাথায় ম্যাচ বের করে নেওয়াতে ততদিনে প্রতিষ্ঠিত অজি দলপতি।

রিকি পন্টিংকে নিয়ে চতুর্থ উইকেট জুটিতে ১০৪ রান যোগ করে ফেলেন। ল্যান্স ক্লুজনারের করা ৩১ তম ওভারের শেষ বল, অনেকটা হাঁফভলি লেংথে। শুরু থেকেই স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যাট করা অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক বলটির সংযোগ করাতে পারেননি যথার্থভাবে। ইনসাইড এজ হয়ে শর্ট মিড উইকেটে হার্শেল গিবসের হাতে সহজ ক্যাচ।

herschelle gibbs

ধারাভাষ্যকারের ভাষায় , ‘ইট ওয়াজ এ লিটল ললিপপ’। ক্যাচটা ধরেই ফেলেছেন তবে অতি উত্তেজনায় উদযাপন করতে গিয়েই বিপত্তি। প্রতিপক্ষের সেট ব্যাটসম্যানকে ফেরানোর আনন্দ মুহূর্তেই হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। শূন্যে ছুঁড়তে গিয়ে বলের সাথে ম্যাচ হয়তো বিশ্বকাপটাও ফেলে দিলেন গিবস।

ড্রেসিংরুমে ফেরার প্রস্তুতি নেওয়া স্টিভ ওয়াহ ততক্ষণে পপিং ক্রিজের দিকে হাঁটছেন। নন স্ট্রাইকে থাকা রিকি পন্টিংয়ের সাথে আলাপে বোঝার উপায় নেই ঠিক কোন পরিস্থিতি থেকে ফিরে ব্যাট করতে যাচ্ছেন। ৬১ রানে অপরাজিত রিকি পন্টিং আর নতুন জীবন পাওয়া স্টিভ ওয়াহ অপরাজিত ৫৬ রানে। পন্টিং ৬৯ করে ফিরলেও ১১০ বলে অপরাজিত ১২০ রানের অসাধারণ এক ইনিংসে দলকে সেমি ফাইনালে তোলেন স্টিভ ওয়াহ। ৫ উইকেট ও ২ বল হাতে রেখেই ম্যাচ জেতে অজিরা।

গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ক্যাচ মিস করে হতাশায় নিমজ্জিত গিবসের কাছে গিয়ে কি যেন বলতে দেখা যায় স্টিভ ওয়াহকে। ম্যাচ পরবর্তী বিভিন্ন আলাপ আলোচনায় অজি দলপতি জানিয়েছেন গিবসকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন ‘বিশ্বকাপটাইতো ফেলে দিলে বাছা।’ যা পরবর্তীতে ক্রিকেট ইতিহাসে এক ধুম্রজালের সৃষ্টি করে। নিজের আত্বজীবনীতে ওয়াহ উল্লেখ করেছেন বিশ্বকাপ নয় ম্যাচ ফসকে যাওয়ার কথা ইঙ্গিত করেছেন। হার্শেল গিবসও প্রায় সব জায়গায় বলেছেন বিশ্বকাপ ফেলা দেওয়ার মত কিছু বলেননি অজি কাপ্তান।

20 Years Ago, Herschelle Gibbs Dropped The Catch That Would ...

স্টিভ ওয়াহ সেদিন যাই বলুন না কেন আদৌতে বিশ্বকাপ ফসকে যাওয়ার অনুভূতিই হওয়ার কথা প্রোটিয়া তারকার। হারলেই বাড়ি ফিরতে হবে এমন সমীকরণে দাঁড়ানো অস্ট্রেলিয়া সেমি ফাইনালে মুখোমুখি হয় দক্ষিণ আফ্রিকারই। সুপার সিক্সে ক্যাচ মিস করা হার্শেল গিবসের অনুশোচনা বাড়াতেই হয়তো ম্যাচটা টাই করিয়েছেন ক্রিকেট বিধাতা। হেড টু হেড লড়াইয়ে এগিয়ে থাকা অস্ট্রেলিয়া পৌঁছে যায় ফাইনালে, স্বপ্ন ভঙের সাক্ষী হয়ে বাড়ি ফেরে প্রোটিয়ারা।

অথচ সেদিন অতি উত্তেজনায় সহজ ক্যাচ না ছাড়লে অস্ট্রেলিয়ার সেমি ফাইনালই খেলা হত কীনা ছিল সংশয়। লর্ডসের ফাইনালে পাকিস্তানকে হারিয়ে শিরোপাও উঁচিয়ে ধরেন স্টিভ ওয়াহ। গিবসের মিস করা সেই ক্যাচ যে পুরো বিশ্বকাপের শিরোপা নির্ধারণেও প্রভাব ফেলেছে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। ক্যাচ মিসের পর অধিনায়ক হ্যান্সি ক্রনিয়ে ও হার্শেল গিবসের অভিব্যক্তি বলে দিচ্ছিল স্টিভ ওয়াহের ক্যাচ ছাড়ার মূল্য তারা ভালো করেই জানেন।

সেদিন ক্যাচ মিস না করলে প্রোটিয়াদের জয়ের নায়ক হওয়ার কথা ছিল ওপেনার হার্শেল গিবসেরই। ১৩৪ বলে ১০ চার ১ ছক্কায় খেলেন ১০১ রানের ইনিংস। ম্যাচের আগে থেকেই একটা ভালো দিনের আভাস পাচ্ছিলেন সাবেক প্রোটিয়া এই ব্যাটসম্যান। নিজের আত্বজীবনী ‘টু দ্য পয়েন্টে’ লিখেন, ‘সেদিন ঘুম থেকে উঠেই আমার মনে হচ্ছিল সবদিকে ছড়ানো আমি সেঞ্চুরি করতে যাচ্ছি।’

তার অনুপ্রেরণা ছিল সঙ্গী হিসেবে আগের রাত কাটানো এক তরুণী। গিবস বলেন, ‘আমি জানতাম আমি সেঞ্চুরি করতে যাচ্ছি। বিছানায় আমার পাশে শোয়া মেয়েটি আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। সে হোটেলে কাজ করতো যেখানে আমি তার সাথে বন্ধুত্ব করি। সে আমার ভাগ্য কবজ ছিল। ব্যাটিংয়ের সময় এসব আমার মাথায় ছিল। চেয়েছি ফিল্ডিংয়ের সময়ও এই ক্ষমতাটা প্রসারিত করতে এবং বাজেভাবে ক্যাচটা পড়ে।’

How does it feel to drop the World Cup?' | Cricket | ESPNcricinfo.com

বলটি শূন্যে ছোড়ার আগ পর্যন্ত তার নিয়ন্ত্রণে ছিল উল্লেখ করে প্রোটিয়া ব্যাটসম্যান যোগ করেন, ‘সত্যি বলতে আমি সবসময় বিশ্বাস করি বলটি শূন্যে ছোড়ার আগ পর্যন্ত আমার নিয়ন্ত্রণেই ছিল এবং নিয়মানুসারে এটি ড্রপড বলে গন্য হয়। আপনি যদি স্লো-মোশনে ভিডিওটি পুনরায় দেখেন, আপনি দেখবেন প্রকৃতপক্ষে ক্যাচটি আমি নিয়েছি। আমি ধরেছি এবং ছুঁড়ে ফেলেছি। আমার দৃষ্টিকোণ থেকে বলটি আমি শতভাগ ধরেছি।’

এদিকে স্টিভ ওয়াহ’র  ‘তুমিতো বিশ্বকাপটাই ফেলে দিলে’ করা মন্তব্য খবরের শিরোনাম হলেও অস্বীকার করেছে খোদ দক্ষিণ আফ্রিকানরাই। তাদের মতে অজি দলপতি এমনটি বলতে শোনেননি তারা। হার্শেল গিবস এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমি কখনোই তাকে মাঠে এই শব্দগুলো বলতে শুনিনি। সম্ভবত সে পরবর্তীতে সংবাদ সম্মেলনে এমন কিছু বলেছে তবে মাঠে বলতে শুনিনি।’

যার কথা নিয়ে এত জল ঘোলা সেই স্টিভ ওয়াহই ২০০৫ সালে প্রকাশিত তার আত্বজীবনী ‘আউট অব দ্য কমফোর্ট জোন’ এ লিখেন, ‘আমি বলেছি (গিবসকে) আশা করি বুঝতে পারছো যে তুমি ম্যাচটাই ফসকে দিলে।’

নাজমুল হাসান তারেক

Read Previous

বন্ধু, শত্রু সবমহল থেকেই শুভকামনা পাচ্ছেন আফ্রিদি

Read Next

আইসিসির সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় মাহমুদউল্লাহ

Total
8
Share
error: Content is protected !!