মুশফিকুর রহিম: শিরোপা ছুঁয়ে দেখে রবার্ট ব্রুস হতে না পারার কথকতা

মুশফিকুর রহিম বিমর্ষ

মূল ছবি কৃতজ্ঞতাঃ ঢাকা ট্রিবিউন

এক যুগ ধরে ভার বইছেন লাল-সবুজের ক্রিকেট দলের। আবেগ তাড়িত হয়ে অগ্রীম উদযাপনে হয়েছেন ভারতীয়দের চক্ষুশূল, অবিমৃশ্যকারীতার বশে উচ্চাভিলাষী শট খেলে হেরেছেন ম্যাচ। সেসব নিয়ে মুশফিকুর রহিমের মনে ক্ষোভের অস্তিত্বের কথা আঁচ করা যায় এমনিতেই। তিনি পুড়তে পারেন আরেকটি দহনেও। কখনো শিরোপার স্বাদ অথবা ‘চ্যাম্পিয়নে’র তকমা গায়ে আটাতে না পারায়।

সেটা জাতীয় দল, বিপিএল কিংবা বিশ্বের যেকোন প্রান্তেই হোক না কেন, রঙিন পোশাকে কোন টুর্নামেন্টের শিরোপা তার হয়নি উঁচিয়ে ধরা (সম্প্রতি মাশরাফি বিন মর্তুজার অধিনায়কত্বে জিতেছিলেন ত্রিদেশীয় সিরিজের শিরোপা)। ২০১২ সালে সাকিবকে জড়িয়ে ধরে তার সেই কান্না কিংবা ২০১৬ সালে ব্যাঙ্গালুরুর বিমর্ষ মুখ, এসব ছবির জন্ম হয়েছে অনেকবার। কাঁদিয়েছেন মুশফিক, দিয়েছেন যন্ত্রণা, আর বাড়িয়েছেন বিষণ্নতা। আবার ক’দিন বাদেই বীরত্ব দেখিয়ে এনে দিয়েছেন আনন্দ উপলক্ষ্য। ব্যাট হাতে ঝড় তুলে জিতিয়েছেন ম্যাচ, ভাসিয়েছেন উল্লাসে। তবে একটা জিনিস তিনি পারেননি কখনো, অধিনায়ক হিসাবে ‘চ্যাম্পিয়ন’ হতে।

বিপিএলের সপ্তম আসরের আগের ছয়টির সবকটিতে খেলেছেন। শিরোপা তো দূর, ফাইনালেই কখনো ওঠা হয়নি মুশফিকের। সপ্তমবারে বিশেষ বিপিএলে এসে সেটা পারলেন, নিজের সঙ্গে অন্যরা তুলনা করতে শুরু করলো স্কটিশ লোককথার রবার্ট ব্রুসের। ছয়বারের ব্যর্থতা ভুলে সপ্তমবারের চেষ্টায় নাকি সফল হয়েছিলেন এই যোদ্ধা। মুশফিক তা পারলেন কই!

ব্যাট হাতে বঙ্গবন্ধু বিপিএলে মুশফিক ছিলেন দুর্দান্ত

পুরো আসরজুড়েই দুর্দান্ত মুশফিক, দলের প্রয়োজনে হাজির সবার আগে। ব্যাট হাতে আর উইকেটের পেছনে তো বটেই, নেতৃত্বগুনেও। ১৪ ম্যাচে ৭০.১৪ গড়ে ব্যাট হাতে ৪৯১ রান, উইকেটের পেছনেও ৯ ডিশমিসাল। দলকে কোয়ালিফায়ারে তুলেছেন শীর্ষ দল হিসেবে।

দুটি শতক ছোঁয়া ছোঁয়া ইনিংসেও পৌঁছাতে পারেনি তিন অঙ্কে। ব্যাট আর হেলমেটটা উঁচিয়ে ধরতে ধরতেও পারেননি। পারলেন না বহু কাঙ্ক্ষিত সেই দৃশ্যটির মঞ্চায়ন করাতেও। বঙ্গবন্ধু বিপিএলের ফাইনালে মুশফিকের খুলনা টাইগার্স হেরে গেছে ক্যারিবীয় আন্দ্রে রাসেলের নেতৃত্বের রাজশাহী রয়্যালসের কাছে। যার বলেই স্টাম্পটা উপড়ে গেছে বাংলাদেশের সেরা ব্যাটসম্যানের, জ্বলে উঠেছে জিং বেলগুলো।

যে দৃশ্যে নিশ্চয়ই দাগ কেটে যাবে মুশফিকের মনে, স্থান করে নেবে স্মৃতির অনেকটা জুড়ে। তবে তাতে কেবল বাড়বে দুঃখই। জীবনের শেষটায় যখন ধুলো পড়ে যাওয়া ছবির অ্যালবামে অতীত খুঁজে ফিরবেন মুশফিক, সে সময় নিশ্চয়ই রাসেলের বলে বোল্ড হওয়ার ছবিটা বিষণ্ন করে তুলবে তার চারপাশ।

তবে তাতেও মুশফিক হয়তো খুঁজে নেবেন ভালো দিক, এটাই তো তার স্বভাব। অভিমানী মনের জন্য, এমনভাবে আউট হওয়ার জন্য, দলকে জিতিয়ে ফিরতে না পারার জন্য, তখন হয়তো রাগ হবে ভীষণ। কিন্তু বারবার এমন পরিস্থিতি থেকে উতরে আসা, নিজের দৃঢ়চিত্তের কথা ভেবে, আত্মপ্রত্যয়ের স্মৃতিচারণে সেই চোখে ছানি পড়া বয়সেও মুশফিককে প্রেরণা যোগাবে নিশ্চিত।

আরও একবার হবে হবে করেও হয়নি। আগের দিনে যে ট্রফির সঙ্গে দাঁড়িয়েছিলেন হাসিমুখে, ভেতরে ছিল তা জয়ের তীব্র বাসনা। একদিন বাদেও তার হাতছোঁয়া দূরত্বে দাঁড়িয়ে মুশফিক, তবে এবার দেখছেন অন্যদের উদযাপন। তাতে হয়তো তার মনে আগমন ঘটবে বেদনার, সবাই তো বলে তার রঙ নাকি নীল। মুশফিক যতই পুরস্কার বিতরণের মঞ্চে দাঁড়িয়ে মিথ্যে হাসিতে লুকাতে চেষ্টা করেন না পাওয়ার অতৃপ্তি, বরবারই তিনি সেখানে হবেন অকৃতকার্য। বেদনার রঙ যদি সত্যিই নীল হয়, তবে মুশফিক আশা খুঁজতে পারেন অন্য জায়গায়। এই রঙেই হয়তো একদিন সাদা ক্যানভাসে লেখা হবে মুশফিকের শিরোপা হাতের বিজয়উল্লাসের গল্প।

ফিচার লেখক- মাহমুদুল হাসান বাপ্পী।

৯৭ প্রতিবেদক

Read Previous

বঙ্গবন্ধু বিপিএলে মুশফিকের চোখে যত প্রাপ্তি

Read Next

প্রাইজমানি না পেয়েও হতাশ নন আন্দ্রে রাসেল

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

Total
18
Share
error: Content is protected !!