৩৩ পেরোনো বাংলাদেশের পোস্টারবয়ের রেকর্ডনামা

সাকিব আল হাসান

টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া, ১৪৭,৫৭০ বর্গ কিলোমিটারের এক ছোট্ট জনপদ। শোষণ, বঞ্চনা, নিপীড়ন, সংগ্রামে অভ্যস্ত এখানকার মানুষগুলো জাতিগতভাবেই নানাভাবে বিভক্ত। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ধর্মেই তারা চার জাত (আরো কিছু ধর্মাবলম্বী আছেন) , রাজনৈতিক অনুসরণেও লেগে থাকে নিয়মিত সংঘাত। এই জাতির মুখে হাসি ফোটানোর দায়িত্বটা পড়েছে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের উপর। নানা মত, ধর্মে বিভক্ত বাংলাদেশিদের একমাত্র (মতান্তরে) এক করা যায় ক্রিকেট দিয়েই। সদ্য ক্রিকেট খেলতে শুরু করা দলটা নিয়মিতই পায়না জয়, কালে ভদ্রে কোন বড় দলকে হারানো দেশজুড়ে এনে দেয় উৎসবের উপলক্ষ্য।

বাশার, রফিক, আফতাব, আশরাফুলদের হাত ধরে জয় কেবল ধরা দিচ্ছিল। ঠিক ঐ সময়টাতে আবির্ভাব সাকিব আল হাসান নামের এক নক্ষত্রের। ২০০৬ সালে জিম্বাবুয়ে সফরের ওয়ানডে স্কোয়াডে জায়গা পান সাকিব আল হাসান, ফরহাদ রেজা ও মুশফিকুর রহিম। ফরহাদ রেজা ও সাকিব আল হাসানকে দলে অন্তর্ভূক্তের পেছনে কারণ জানাতে গিয়ে প্রধান নির্বাচক ফারুক আহমেদ বলেছিলেন, ‘সব বিভাগেই দুজনে দারুণ ক্রিকেটার। তাদের নিয়ে বেশ আশাবাদী, এখনই সময় নিজেদের আন্তর্জাতিক আঙিনায় প্রমাণের।’

সিরিজে তিনজনেরই অভিষেক হয়েছে, সবার আগে দ্বিতীয় ওয়ানডেতে অভিষেক ফরহাদ রেজার। ব্যাট হাতে অভিষেকেই ফিফটি তুলে নেন এই অলরাউন্ডার, এ যেন ফারুক আহমেদের আশার প্রতিফলন। পঞ্চম ওয়ানডেতে অভিষেক সাকিব ও মুশফিকেরও। কে জানতো ফরহাদ রেজাকে ছাড়িয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেটের অন্যতম দুই স্তম্ভ হতে যাচ্ছেন এই দুই ক্রিকেটার। বল হাতে ৩৯ রান খরচায় ১ উইকেট , ব্যাট হাতে অপরাজিত ৩০। সাদামাটা অভিষেক না হলেও দেশের ক্রিকেটের কিংবদন্তী হতে যাচ্ছেন এমন ইঙ্গিত নিশ্চয়ই ছিলনা সাকিবের অভিষেক ম্যাচের পারফরম্যান্সে।

সময় গড়িয়েছে, ধীরে ধীরে একাদশে জায়গা পাকা করে ফেলা সাকিব হয়ে ওঠেন দলের সেরা খেলোয়ারদের একজন। দেশের ক্রিকেট যতটা এগিয়েছে, সাকিব এগিয়েছেন তার চাইতেও বেশি পাল্লা দিয়ে। যে পথে বাংলাদেশকে পরিচয় করিয়েছেন অসংখ্য প্রথমের সাথে। তিন ফরম্যাটে , তিন বিভাগে সমান তালে বিচরণ করেছেন বাংলাদেশের ‘পোস্টার বয়’ খ্যাত বাঁহাতি এই অলরাউন্ডার। বাঁহাতি স্পিন ঘূর্ণিতে খাবি খাইয়েছেন বাঘা বাঘা ব্যাটসম্যানদের, ব্যাট হাতে চোখে চোখ রেখে শাসন করেছেন বিশ্বসেরা বোলারদের। বাংলাদেশের কেউ এক নম্বর হতে পারে সে বিশ্বাস গড়ে ওঠে মাগুরা থেকে উঠে আসা বাংলাদেশ ক্রিকেটের স্বপ্ন যাত্রার অন্যতম সারথীর হাত ধরে।

ছবিঃ ক্রিকেট৯৭

২০০৯ সালে প্রথমবার টেলিভিশন চ্যানেলের ব্রেকিং, পত্রিকার পাতায় মোটা অক্ষরে লেখা হয় অলরাউন্ডার র‍্যাংকিংয়ে এক নম্বরে উঠে এসেছেন সাকিব আল হাসান। বিশ্ব ক্রিকেটের এক নম্বর বাংলাদেশেরই একজন, ভাবতেই গর্বে বুকের ছাতিটা ফুলে ওঠে। না, সাকিব সেখানেই সন্তুষ্ট রাখেননি, রেকর্ড ভাঙা গড়া যে তার নেশাতে পরিণত হয়ে গেছে ততদিনে। বিলুপ্ত প্রায় বিশেষজ্ঞ অলরাউন্ডার শিল্প যে আবারও ফিরিয়ে আনবেন যেন করেছেন পণ। ওয়ানডের পর ২০১১ সালে টেস্ট ও ২০১৪ সালে টি-টোয়েন্টি অলরাউন্ডার র‍্যাংকিংয়ের মুকুটটাও নিজের করে নেন।

২০১৫ সালে তিন ফরম্যাটেই এক নম্বর অলরাউন্ডার হয়ে গড়েন অনন্য এক কীর্তি। এখনো পর্যন্ত ইতিহাসে তিন ফরম্যাটেই সেরার তকমা গায়ে লাগানো একমাত্র ক্রিকেটার সাকিবই। মোহাম্মদ রফিকের পর স্পিন বিভাগের পুরো দায়িত্বটা সাকিবকেই সামলাতে হয়। ২০০৮ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে চট্টগ্রাম টেস্টে ৩৭ রান খরচায় নেন ৭ উইকেট। যা তখন ইনিংসে বাংলাদেশের সেরা বোলিং ফিগার হিসেবেই তালিকাভূক্ত হয়।

তার ঐ বোলিং ফিগার ২০০৮ সালে ইএসপিএন ক্রিকইনফোর সেরা বোলিং পারফরম্যান্সের জন্য মনোনীত হয়। ২০১৪ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তাইজুল ইসলাম ৩৯ রানে ৮ উইকেট নিলেও সাকিবের নেওয়া ৭ উইকেট এখনো দ্বিতীয় সেরা বোলিং ফিগার হয়েই আছে। ৫৬ ম্যাচের টেস্ট ক্যারিয়ারে ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়েছে ১৮ বার যেখানে আর কোন বাংলাদেশি বোলারের নেই ১০ বারও। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মেহেদী হাসান মিরাজ নিয়েছেন ৭ বার। ২০০৯ সালে নির্বাচিত হন উইজডেনের সেরা টেস্ট খেলোয়াড় হিসেবে।

২০০৮-৯ মৌসুমে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে সাকিব নিজেকে চিনিয়েছেন ভিন্ন রুপে। বিরুদ্ধ কন্ডিশনে চড়ি ঘুরিয়েছেন নিজের মত করে, মাখায়া এনটিনির সাথে টেস্ট সিরিজে সর্বোচ্চ ১১ উইকেট নেন মাত্র দুই ইনিংস বল করেই। মাঙ্গুয়াং ওভালে ৫ উইকেটের পর সুপারস্পোর্টস পার্কে ৬ উইকেট। ঐ সিরিজের পর অস্ট্রেলিয়ান লেগ স্পিনার কেরি ও’কেফেতো সাকিবকে সময়ের সেরা ফিঙ্গার স্পিনার স্বীকৃতিও দিয়ে দেন।

সাকিবের বিচরণে রেকর্ড বইয়ে যোগ হতে থাকে একের পর এক নতুন অধ্যায়। সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার হওয়ার পথে নিজেকে প্রতিদিনই ছাড়িয়ে যাওয়ার তীব্র ক্ষুধা বিশ্ব সেরা অলরাউন্ডারের। ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার বিবেচনায় নিলে স্যার গ্যারি সোবার্স, ইয়ান বোথাম, ইমরান খান, কপিল দেব, জ্যাক ক্যালিস, রিচার্ড হ্যাডলিরা থাকবেন উপরের দিকেই। পরিসংখ্যান হিসেবে নিলে সাকিব ইতোমধ্যে পেছনে ফেলেছেন প্রায় সবাইকেই। ক্যারিয়ারের শেষে নিশ্চিতভাবেই সাকিব হয়তো নিজেকে নিয়ে যাবেন আরও বড় উচ্চতায় যেখানে পরিসংখ্যান হাতড়ে বাংলাদেশের ‘পোস্টার বয়কে’ ছোঁয়াটা অসাধ্য বলে গন্য হবে।

মাঠের ক্রিকেটে নান্দনিক পারফরম্যান্সের সাথে শরীরি ভাষাতেও সাকিব নিজেকে তুলে ধরেন ভিন্ন আঙিকে। যেখানে প্রতিপক্ষ দেখে ভড়কে যাওয়া নয় দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করাই হয়ে ওঠে মূলমন্ত্র। আগ্রাসী ক্রিকেটে সাকিব জানান দেন হারতে নয় ২২ গজে সমানতালেই সামর্থ্যের প্রমাণ দিতে প্রস্তুত তিনি। তরুণ সাকিব দলের অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের সারিতে এসে পড়েছেন, আচরণে কিছুটা উগ্রতার আভাস। কাছের মানুষরা অবশ্য উগ্র নয় সাকিবকে স্পষ্টবাদী হিসেবেই তুলে ধরেন। দলের সেরা খেলোয়াড় হয়েও বোর্ডের নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েছেন দফায় দফায়, গুনতে হয়েছে জরিমানাও।

সব পেছনে ফেলে সাকিব ফিরে এসেছেন, একবার নয় বারবার। প্রতিবারই নিজের প্রত্যাবর্তনে আগের চাইতে বেশি ধারালো হয়েছেন, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করেছেন পুরোনো অস্ত্রে নতুন শক্তিতে। বোর্ডের অনাপত্তিপত্র না নিয়ে ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগ খেলতে যাওয়ার অভিযোগে ৬ মাসের জন্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিষিদ্ধ হন ২০১৪ সালের জুলাই মাসে। শাস্তি শিথিল হওয়ায় সাড়ে তিনমাস পর ফিরেছেন ঘরের মাঠে জিম্বাবুয়ে সিরিজ দিয়ে। প্রত্যাবর্তন সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে খুলনায় সেঞ্চুরির সাথে ম্যাচে ১০ উইকেট নিয়ে নাম লেখান স্যার ইয়ান বোথাম ও ইমরান খানের রেকর্ডে।

সাকিব অনুশীলন
ছবিঃ ক্রিকেট৯৭

ম্যাচে ১০ উইকেট ও সেঞ্চুরি হাঁকানো মাত্র তৃতীয় ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান। সাকিবের আগে ১৯৮০ সালে মুম্বাইতে ভারতের বিপক্ষে ইংলিশ অলরাউন্ডার ইয়ান বোথাম ও ১৯৮৩ সালে একই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এমন কীর্তির নজির গড়েন পাকিস্তানের বিশ্বকাপ জয়ী অধিনায়ক ও দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান।

২০১৫ সালে বাংলাদেশ পার করে দেশের ক্রিকেট ইতিহাসেরই সোনালী একটি বছর। ব্যাটে-বলে সাকিবও ছিলেন যথারীতি ফর্মের তুঙ্গে। ঘরের মাঠে পাকিস্তানকে ধবল ধোলাই, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজ জয়। দলীয় সাফল্যের মুকুটে যোগ হওয়া বেশ কয়েকটি পালকের মধ্যে সাকিবও ছুঁয়েছেন অনেকগুলো রেকর্ড। যদিও রেকর্ড খুব একটা ভাবায়না এই অলরাউন্ডারকে বলেছেন বহুবার। কিংবদন্তীরা যে ভেবেচিন্তে রেকর্ড গড়েন না সেটাই যেন প্রমাণের চেষ্টা সাকিব আল হাসানের।

দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজের তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডেতে হাশিম আমলাকে ফিরিয়ে তুলে নেন ওয়ানডেতে ২০০ তম উইকেট। ইতিহাসের মাত্র ৮ম ক্রিকেটার হিসেবে ততক্ষণে নামের পাশে যোগ হয়ে গেছে ৪০০০ ওয়ানডে রান ও ২০০ উইকেট। তালিকায় ৮ম ক্রিকেটার হলেও সবচেয়ে কম বয়সে রেকর্ডটি নিজের করে নেন সাকিব।

২০১৭ সালে ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়া বধ বাংলাদেশের, মিরপুরে ব্যাটে বলে নেতৃত্বটা বেশ ভালোভাবেই দিয়েছেন সাকিব। ২০ রানে জয়ী ম্যাচে ব্যাট হাতে প্রথম ইনিংসে ৮৪ রানের ইনিংসের পর বল হাতে দুই ইনিংসেই শিকার ৫ টি করে উইকেট। আর তাতেই ইতিহাসে ঢুকে পড়েন আরও একবার, মাত্র চতুর্থ বোলার হিসেবে টেস্ট খেলুড়ে দেশের প্রত্যেকটির বিপক্ষেই ৫ উইকেট শিকার সাকিবের (সবশেষ সংযুক্ত আফগানিস্তান ও আয়ারল্যান্ড ব্যতীত)। তার আগে এই কীর্তি ছিল কেবল দক্ষিণ আফ্রিকান পেসার ডেল স্টেইন, শ্রীলঙ্কান কিংবদন্তী স্পিনার মুত্তিয়া মুরালিধরন ও রঙ্গনা হেরাথের।

মোহাম্মদ রফিকের পর দ্বিতীয় বাংলাদেশি হিসেবে টেস্টে ১০০ উইকেট শিকার করা সাকিব ২০০ উইকেট শিকার করেছেন প্রথম হিসেবেই। ২০১৮ সালের নভেম্বরে একই ম্যাচে সাকিব গড়েছেন আরও একটি রেকর্ড। মাত্র ৫৪ ম্যাচেই ২০০ উইকেট ও ৩০০০ রানের ক্লাবে ঢুকেছেন দ্রুততম হিসেবে।

নানা অর্জনে নিজের সাফল্যের খাতাটা ভারী করা সাকিব ২০১৯ বিশ্বকাপে যেন ছাড়িয়ে গেলেন সবকিছুকে। প্রায় ১৪ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে বছরটি সাকিবের জন্য বিভিন্নভাবেই বিশেষ কিছু, দেখেছেন মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে খেলেছেন নিজের সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে। দলীয় ব্যর্থতার ভীড়েও সাকিব গড়েছেন লম্বা সময় মনে রাখার মত সব রেকর্ড। ব্যাটে-বলে ক্ষুধার্ত এক সাকিবের দেখা মেলে ব্রিসবেন, লর্ডস, বার্মিংহামে। মাত্র ৮ ম্যাচে ২ সেঞ্চুরির পাশাপাশি ৫ ফিফটিতে ৯৬.০৩ গড়ে রান করেছেন ৬০৬, বল হাতে উইকেট ১১ টি।

আর তাতেই নামের পাশে যোগ হয়েছে বহু রেকর্ড। বছরের শুরুতে আইপিএলে সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদের হয়ে খেলতে গিয়ে বেশিরভাগ ম্যাচেই ছিলেন বেঞ্চে। একাদশে সুযোগ না মিললেও নিজের ফিটনেস নিয়ে কাজ করেছেন প্রতিনিয়ত। বিশ্বকাপের আগে এক নতুন সাকিবের দেখা, শরীরের ওজন কমিয়েছেন বেশ খানিকটা। পারফরম্যান্স করতে মুখিয়ে থাকা সাকিব বলেছেন নিজের একটা কিক দরকার ছিল সেটা পেরেছেন এখন অপেক্ষা মাঠে কিছু করে দেখানোর। সাকিব শুধু পারফরমই করেননি নিজেকে নিয়ে যান অন্য উচ্চতায়ও। হয়তো বছরের শেষদিকে তথ্য গোপনের অভিযোগের শাস্তির মুখে পড়তে যাচ্ছেন জানতেন বলেই তার আগে বড় মঞ্চে নিজেকে আলাদা করে চেনানোর তাড়না ছিল।

কেনিংটন ওভালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে জয় দিয়ে শুরু বাংলাদেশের, ব্যাট হাতে সাকিবের অবদান ৭৫। বল হাতে বোল্ড করে ফেরান এইডেন মার্করামকে। আর তাতেও নতুন রেকর্ডে নাম লেখান বাংলাদেশের জান বাংলাদেশের প্রাণ। মার্করামকে ফিরিয়ে ২৫০ তম ওয়ানডে উইকেট শিকারের সাথে দ্রুততম ক্রিকেটার হিসেবে ২৫০ উইকেট ও ৫০০০ ওয়ানডে রানের মালিক বনে যান সাকিব। ৭৫ রানের ইনিংসেও নামের পাশে যোগ হয় রেকর্ড, একমাত্র ক্রিকেটার হিসেবে ২০০৭ সাল থেকে টানা তিন বিশ্বকাপে দলের প্রথম ম্যাচে ফিফটি হাঁকান সাকিব।

আফগানিস্তানের বিপক্ষে রোজ বোলে খেলেন ৫১ রানের ইনিংস, বল হাতে তুলে নেন ২৯ রান খরচায় ৫ উইকেট। এক ম্যাচেই খুলে বসেন রেকর্ডের ফুলঝুরি। প্রথম বাংলাদেশি বোলার হিসেবে বিশ্বকাপে ৫ উইকেট, প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে বিশ্বকাপে ১০০০ রান। যুবরাজ সিংয়ের পর দ্বিতীয় ক্রিকেটার হিসেবে বিশ্বকাপের একই ম্যাচে ফিফটি ও ৫ উইকেট শিকার।

ছবিঃ ক্রিকেট৯৭

ভারতের বিপক্ষে ৬৬ রানের ইনিংস খেলার পথে হয়ে যান প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে নির্দিষ্ট একটি বিশ্বকাপে ৫০০ রান ও ১০ উইকেট তুলে নেওয়া প্রথম ক্রিকেটার। টুর্নামেন্ট শেষ করেন ৬০৬ রান ও ১১ উইকেট নিয়ে। ফলে এখনো পর্যন্ত খেলা তিন বিশ্বকাপ মিলিয়ে তার রান দাঁড়িয়েছে ১১৪৬ ও উইকেট ৩৪ টি। সাকিবই একমাত্র ক্রিকেটার যিনি বিশ্বকাপে ১ হাজার রান ও ৩০ উইকেট শিকার করেছেন।

পাকিস্তানের বিপক্ষে রাউন্ড রবিন পর্বের শেষ ম্যাচে নাম্বার ওয়ান অলরাউন্ডার খেলেছেন ৬৪ রানের ইনিংস। তাতে বিশ্বকাপের এক আসরে সবচেয়ে বেশি ৫০+ ইনিংস খেলার রেকর্ডে শচীন টেন্ডুলকারের সাথে ভাগ বসান বাংলাদেশের ‘পোস্টার বয়’ সাকিব। পুরো টুর্নামেন্টে ৮ বার ব্যাট হাতে নেমে কেবল একবারই (৪১) ফিফটি ছুঁতে পারেননি এই অলরাউন্ডার।

সাকিব আল হাসান মানেই যেন রেকর্ডের ভাণ্ডার, টেস্ট, ওয়ানডের পাশাপাশি টি-টোয়েন্টিতেও সমান বিচরণ। খেলেছেন বিশ্বের প্রায় সব ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ। যেকজন ক্রিকেটারকে বলা হয় টি-টোয়েন্টির ফেরিওয়ালা সাকিব তাদেরই একজন। আন্তর্জাতিক হোক কিংবা ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ সাকিব বোকা বানিয়েছেন ব্যাটসম্যানকে, ব্যাট হাতে সাবলীলভাবে করেছেন রান।

৭৬ আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি খেলে রান করেছেন ১৫৬৭, উইকেট নিয়েছেন ৯২ টি। ২০১৮ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে মিরপুরে দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টিতে ২০ রানে ৫ উইকেট শিকারের মাধ্যমে বিশ্বের একমাত্র বোলার হিসেবে তিন ফরম্যাটেই ৫ উইকেট শিকারের নজির গড়েন কোটি ভক্তের প্রিয় সাকিব আল হাসান। সবধরণের টি-টোয়েন্টি মিলিয়ে ৩০৮ ম্যাচে সাকিবের রান ৭৪৫৯ ও উইকেট ৩৫৪ টি।

১৪ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে সাকিব দেশের জার্সিতে খেলেছেন ৩৩৮ ম্যাচ (৫৬ টেস্ট, ২০৬ ওয়ানডে ও ৭৬ টি-টোয়েন্টি)। রান করেছেন ১১,৭৫২ (টেস্টে ৩৮৬২, ওয়ানডেতে ৬৩২৩ ও টি-টোয়েন্টিতে ১৫৬৭), উইকেট নিয়েছেন ৫৬২ টি (টেস্টে ২১০, ওয়ানোদেতে ২৬০ ও টি-টোয়েন্টিতে ৯২)। ওয়ানডেতে ১৯৪ ইনিংসে ৩৭.৮৬ গড়ে ৯ সেঞ্চুরির পাশাপাশি ৪৭ ফিফটিতে, টেস্টে ১০৫ ইনিংসে ৩৯.৪০ গড়ে ৫ সেঞ্চুরির সাথে ২৪ ফিফটিতে ও টি-টোয়েন্টিতে ৭৬ ইনিংসে ২৩.৭৪ গড়ে ৯ ফিফটিতে রান করেছেন সাকিব। টেস্টে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে খেলা তার ২১৭ রানের ইনিংসটি দেশের হয়ে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ ইনিংসের রেকর্ড হিসেবে টিকেছিল প্রায় দুই বছর।

বিশ্বের তৃতীয় ক্রিকেটার হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১০ হাজার রান ও ৫০০ উইকেটের মালিক সাকিব আল হাসান। তার আগে এই ক্লাবে নাম লিখিয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকান অলরাউন্ডার জ্যাক ক্যালিস (২৫,৫৩৪ রান ও ৫৭৭ উইকেট) ও পাকিস্তানের শহিদ আফ্রিদি (১১,১৯৬ রান ও ৫৪১ উইকেট)। সাকিব ছাড়া বাংলাদেশি আর কোন বোলারের নেই ৫০০ বা তার বেশি উইকেট।

টেস্টে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ উইকেট সাকিবের ২১০ টি, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ তাইজুল ইসলামের ১১৪ টি। সাকিব-তাইজুলের আগে প্রথম ১০০ উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করেন সাবেক বাঁহাতি স্পিনার মোহাম্মদ রফিক (১০০)।

ছবিঃ ক্রিকেট৯৭

ওয়ানডেতে দেশের হয়ে সর্বোচ্চ উইকেট শিকার মাশরাফির (২১৮ ম্যাচে ২৬৯ উইকেট), ২০৬ ম্যাচে ২৬০ উইকেট নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে সাকিব আল হাসান। এ দুজন ছাড়া শুধু বাঁহাতি স্পিনার আব্দুর রাজ্জাকেরই আছে ওয়ানডেতে ২০০ উইকেট (২০৭), তিনিই প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এই মাইলফলক স্পর্শ করেন।

টি-টোয়েন্টিতে সাকিবের ৯২ উইকেট বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চতো বটেই সব মিলিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটেই তৃতীয় সর্বোচ্চ উইকেট। তার সামনে আছেন কেবল লাসিথ মালিঙ্গা (৯৮) ও শহীদ আফ্রিদি (১০৭)।

এক যুগের বেশি সময়ের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে সাকিব আল হাসান বারবার বাঙালি জাতিকে এনে দিয়েছেন উৎসবের উপলক্ষ্য, হতাশায় মোড়ানো জীবনযাত্রায় গর্বের কারণ হয়েছেন বহুবার। তথ্য গোপনের অভিযোগে বর্তমানে একবছরের নিষেধাজ্ঞায় থাকা সাকিব ২২ গজের ক্রিকেটে পারফরম্যান্স ছাপিয়ে হয়ে উঠেছেন নেতা, প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। নিদাহাস ট্রফিতে ‘নো’ বল বিতর্কে শাস্তি হবে জেনেও সামনে থেকে করেছেন প্রতিবাদ। ওয়াহাব রিয়াজের চোখে চোখ রেখে শাসানোর স্মৃতিও টাটকাই, সবশেষ অক্টোবরে ক্রিকেটারদের দীর্ঘদিনের দাবি দাওয়ার আন্দোলনেও ছিলেন সামনের সারিতে।

বলা হয়ে থাকে চাঁদেরও কলঙ্ক আছে, সাকিব আল হাসান দিনে দিনে নিজেকে বদলেছেন। আচরণে শুরুর আগ্রাসণ কমেছে, ব্যক্তিত্বে পড়েছে অভিজ্ঞতার ছাপ। সাকিব যে এখন কেবলই ক্রিকেটার কিংবা বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার নন, একজন দায়িত্ববান পিতাও। হারারে স্পোর্টস ক্লাবে অভিষেক হওয়া ১৯ বছরের তরুণ ক্রিকেটারটি আজ (২৪ মার্চ) পা দিয়েছেন ৩৩ পেরিয়ে ৩৪ এ। এই দীর্ঘ সময়ের পথ চলায় পার করেছেন নানা চড়াই উতরাই, তবে দিনশেষে ফিরে এসেছেন বাঘের গর্জনে। সাকিবরা বার বার ফিরবেন, একবছরের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে হয়তো আগের চেয়েও ভয়ঙ্কর রূপে ফিরবেন।

অতীত যে এমনটাই বলে, তার শৈশব কোচ মতিউর রহমান যেমন কিছুদিন আগে জানিয়েছেন, ‘এরকম সময়ে ও নিজেকে নিজে সামলে নিয়েছে আমার মনে হয়। ওর সে সাহসটা ব্যক্তিগতভাবেই আছে। সে নিজে এতই শক্ত যে আমাদের থেকেও এসব ব্যাপারে জ্ঞান অনেক ভালো ওর।’ শুভ জন্মদিন বাংলাদেশের জান, বাংলাদেশের প্রাণ সাকিব আল হাসান।

নাজমুল হাসান তারেক

Read Previous

ভারতে কারফিউ ভেঙে ক্রিকেট খেলায় আটক ৯

Read Next

কর্মীদের চাকরি বাঁচাতে ব্রড-গার্নিদের অভিনব উদ্যোগ

Total
103
Share