৩১ পেরোনো তামিমের দেশের হয়ে যত রেকর্ড

তামিম ইকবাল

১৬ মার্চ ২০০৭, ত্রিনিদাদের পোর্ট অফ স্পেন ডাউন দ্যা ট্র্যাকে এসে জহির খানকে ছক্কা হাঁকালেন বয়স ১৮ ছোঁয়ার অপেক্ষায় থাকা এক তরুণ বাংলাদেশি ব্যাটসম্যান। ক্যারিয়ারের মাত্র পঞ্চম আন্তর্জাতিক ম্যাচ, প্রথমবারের মত শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ব্যাট হাতে নেমেই তুলে নিলেন ফিফটি। ঐ ম্যাচে ফিফটি করেন বাংলাদেশের আরও দুই ব্যাটসম্যান, কিন্তু ভারতকে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় করে দেওয়া হার উপহার দিতে তামিম ইকবালের অমন উড়ন্ত শুরুর ছিল বড় ভূমিকা। এরপর লম্বা সময় ধরে তার ব্যাটিংয়ের বিজ্ঞাপন চিত্র হয়েই ছিল ৫১ রানের ইনিংসটি।

দেশের ১৪৬ তম ওয়ানডে ম্যাচে অভিষেক চট্টগ্রামের খান পরিবারের ছেলে তামিম ইকবাল খানের। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে হারারে স্পোর্টস ক্লাবে লাল-সবুজ জার্সি গায়ে চাপিয়ে নামার পর বাংলাদেশ খেলেছে আরও ২৩০ ওয়ানডে যার ২০৭টিতেই ছিলেন বাঁহাতি এই ব্যাটসম্যান। দেশের হয়ে সবচেয়ে বেশি ওয়ানডে খেলা ক্রিকেটারদের তালিকায় তার উপরে আছেন মাত্র দুজন। আরেকটা পরিসংখ্যানে স্পষ্ট করা সম্ভব দলে অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে কতটা নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন দেশসেরা এই ওপেনার। তার ২০৭ ম্যাচের বিপরীতে নিয়মিত ওপেনারদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৭৮ ম্যাচ খেলেছেন ইমরুল কায়েস, ৭৫ ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা আছে শাহরিয়ার নাফীসের।

এক যুগের বেশি সময় ধরে ওপেনিং জুটিতে তামিম এক প্রান্তে স্থায়ী হয়ে গেলেও অন্যপ্রান্তে বদলেছে চেহারা। শাহরিয়ার নাফীস, জাভেদ ওমর, জুনায়েদ সিদ্দিকী, ইমরুল কায়েস, এনামুল হক বিজয়, সৌম্য সরকার হয়ে হয়ে হালের লিটন কুমার দাস এসেছেন সঙ্গী হিসেবে। এ সময়ে দেশের হয়ে ব্যাটিংয়ে প্রায় সব রেকর্ডই নিজের দখলে নিয়ে নিয়েছেন তামিম ইকবাল।

বাবা ইকবাল খান ছিলেন ফুটবলার, চাচা আকরাম খান দেশের ক্রিকেট ইতিহাসের রচয়িতা বললেও ভুল হবেনা, অন্যদিকে বড় ভাই নাফিস ইকবালও ছিলেন জাতীয় দলের ওপেনার। নাফিস যেখানে শেষ করেছেন তামিম সেখান থেকেই শুরু করেছেন। নাফিসের ক্যারিয়ারের এপিটাফ লেখা হয়ে যাবে তা ততদিনেও জানা ছিলনা তামিমের, তাইতো ক্যারিয়ারের শুরুতে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বহুবার বলেছেন স্বপ্ন দেখি বড় ভাইয়ের সাথে জাতীয় দলের জার্সিতে ওপেন করতে নামবো। এক প্রান্তে তামিম টেস্ট, ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টি মিলিয়ে প্রায় এক ডজন ব্যাটসম্যানের সাথে ওপেন করলেও অপর প্রান্তে নাফিসকে রেখে ওপেন করার স্বপ্ন রয়ে গেল অধরাই।

১৩ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার, দেশের জার্সিতে তিন ফরম্যাটে খেলেছেন ৩৪৫ ম্যাচ, রান করেছেন ১৩৩৬৫। ১৮ ছুঁইছুঁই বয়সে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে তোলা তামিম আজ (২০ মার্চ, ২০২০) পা দিলেন ৩২ বছরে। সময় গড়িয়েছে, পরিণত হয়েছেন, নানা অর্জনে নিজেকে করেছেন সমৃদ্ধ। ব্যাট হাতে দেশের হয়ে তামিমের কিছু অর্জন তুলে ধরা হল নিচে-

দেশের হয়ে সর্বোচ্চ টেস্ট সেঞ্চুরিঃ

৬০ ম্যাচের টেস্ট ক্যারিয়ারে তামিমের রান ৩৮.৬৪ গড়ে ৪৪০৫, ২৭ ফিফিটির বিপরীতে ৯ সেঞ্চুরি। যা মুমিনুল হকের সাথে যৌথভাবে দেশের হয়ে সর্বোচ্চ টেস্ট সেঞ্চুরির রেকর্ড। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে গতমাসে একমাত্র টেস্টে মুমিনুল সেঞ্চুরি তুলে ভাগ বসান তামিমের সাথে।

দেশের হয়ে টেস্টে সর্বোচ্চ ফিফটিঃ

২০০৮ সালে অভিষেকের পর থেকে খেলা ৬০ টেস্টে তামিমের ফিফটি ২৭টি, যা বাংলাদেশিদের মধ্যে সর্বোচ্চ। সমান ২৪ টি করে ফিফটি আছে সাকিব আল হাসান ও হাবিবুল বাশারের। মুশফিকুর রহিমের ফিফটি ২১ টি, এছাড়া ২০ বা তার বেশি ফিফটি নেই আর কারও।

দেশের হয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ টেস্ট রান সংগ্রাহকঃ

৪৪১৩ রান নিয়ে দেশের হয়ে সর্বোচ্চ টেস্ট রান সংগ্রাহক মুশফিকুর রহিম, দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা তামিমের রান ৪৪০৫। মাত্র ৮ রানে পিছিয়ে পড়া তামিমের কাছ থেকে রেকর্ডটি গত মাসে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ডাবল সেঞ্চুরি হাঁকানো ম্যাচেই নিজের করে নেন মুশফিক। মাত্র ৮ রানের পার্থক্য বলে যেকোন সময়ই রেকর্ডটি আবারও নিজেদের দখলে নেওয়ার সুযোগ আছে তামিমের সামনে।

তৃতীয় সর্বোচ্চ টেস্ট গড়ঃ

তামিমের ৩৮.৬৪ টেস্টে বাংলাদেশের হয়ে তৃতীয় সর্বোচ্চ গড়। তার উপরে আছেন সাকিব আল হাসান (৩৯.৪০) ও মুমিনুল হক (৪০.৮৫)।

ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকঃ

২০৭ ম্যাচের ওয়ানডে ক্যারিয়ারে তামিমের রান ৩৬.৭৪ গড়ে ১৩ সেঞ্চুরি ও ৪৭ ফিফটিতে ৭২০২। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সাকিব আল হাসানের ৬৩২৩ রান। ৬১৭৪ রান নিয়ে মুশফিকুর রহিম আছেন তালিকার তিন নম্বর অবস্থানে।

প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ওয়ানডেতে ৫, ৬ ও ৭ হাজার রানের মালিকঃ

সবশেষ জিম্বাবুয়ে সিরিজে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ওয়ানডেতে ৭ হাজার রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন বাঁহাতি এই ওপেনার। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ওয়ানডেতে ৫ ও ৬ হাজারী ক্লাবে প্রবেশ করা ব্যাটসম্যানও তামিম।

ওয়ানডেতে দেশের হয়ে সর্বোচ্চ সেঞ্চুরিঃ

জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সবশেষ সিরিজে হাঁকান ব্যাক টু ব্যাক সেঞ্চুরি। দুই সেঞ্চুরিতে ক্যারিয়ার সেঞ্চুরি সংখ্যা দাঁড়ায় ১৩ যা দেশের হয়ে সর্বোচ্চ সেঞ্চুরির রেকর্ড, তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি সাকিব আল হাসানের সেঞ্চুরি ৯টি, ৭ সেঞ্চুরি নিয়ে মুশফিক আছেন তিন নম্বরে।

ওয়ানডেতে দেশের হয়ে সর্বোচ্চ ফিফটিঃ

টেস্টের মত ওয়ানডেতেও ৪৭ ফিফটি নিয়ে সাকিব আল হাসানের সাথে যৌথভাবে সর্বোচ্চ ওয়ানডে ফিফটি তামিমের। মুশফিকুর রহিমের ওয়ানডে ফিফটি ৩৮ টি।

দেশের হয়ে ওয়ানডেতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গড়ঃ

সাকিব আল হাসানের ৩৭.৮৬ গড়ের পরই তামিম ইকবালের ৩৬.৭৪ গড় ওয়ানডেতে। ৩৬.৩১ গড় নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে যথারীতি মুশফিকুর রহিম।

প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটসম্যান হিসেবে ওয়ানডেতে দেড়শ রানের ব্যক্তিগত ইনিংসঃ

২০০৯ সালে বুলাওয়েতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৩১২ রান তাড়া করতে নেমে তামিম খেলেন ১৫৪ রানের দুর্দান্ত এক ইনিংস। প্রথমবারের মত বাংলাদেশি কোন ব্যাটসম্যান খেলে ১৫০ বা তার বেশি রানের ইনিংস। দেশের হয়ে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের ইনিংসটি অক্ষুন্ন ছিল জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে চলতি মাসের শুরুতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দ্বিতীয় ওয়ানডে পর্যন্ত। সিলেটে সিরিজের দ্বিতীম ম্যাচে ১৫৮ রানের ইনিংস খেলে নিজের রেকর্ড নিজেই ভাঙেন তামিম। যদিও এবারের রেকর্ড টিকেনি দুই দিনের বেশি, তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডেতে ১৭৬ রানের অনবদ্য ইনিংসে রেকর্ড নিজের করে নেন লিটন দাস। সর্বোচ্চ ১০ ব্যক্তিগত ইনিংসে তামিমের নাম আছে পাঁচবার।

 

View this post on Instagram

 

Captain (ODI) is happy. Today at SBNCS. #BANvZIM

A post shared by cricket97 (@cricket97bd) on

টি-টোয়েন্টিতে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকঃ

৭৪ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারে ২৪.৬৫ গড়ে রান করেছেন ১৭০১। যা আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৭৬ ম্যাচে ২৩.৭৪ গড়ে সাকিব আল হাসানের ১৫৬৭।

একমাত্র বাংলাদেশি হিসেবে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি সেঞ্চুরিঃ

গত ১৪ বছর ধরে টি-টোয়েন্টি খেলে মাত্র একজন বাংলাদেশি ব্যাটসম্যান আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে দেখা পেয়েছেন তিন অঙ্কের ম্যাজিক ফিগারের। ২০১৬ সালে ভারতে অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের বাছাই পর্বে ধরমশালায় ওমানের বিপক্ষে ৬৩ বলে ১০৩ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেন তামিম। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসটিও তামিমের (৮৮*), ২০১২ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ঢাকায়।

টি-টোয়েন্টিতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ফিফটিঃ

টেস্ট, ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ ফিফটির রেকর্ড নিজের দখলে থাকলেও টি-টোয়েন্টিতে সেটি বন্ধু সাকিব আল হাসানের। ৯ ফিফটি নিয়ে সাকিব আছেন সবার উপরে, ৭ ফিফটিতে তামিমের অবস্থা দুইয়ে।

টেস্টে সর্বোচ্চ জুটিতে তামিমঃ

২০১৫ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে খুলনায় তামিম-ইমরুলের ৩১২ রানের জুটিটি এখনো টেস্টে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ওপেনিং জুটি। যেকোন উইকেট বিবেচনায় নিলেও এটির অবস্থান দুই নম্বরে। সবার উপরে ২০১৭ সালে ওয়েলিংটনে সাকিব-মুশফিকের পঞ্চম উইকেট জুটিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৩৫৯ রান।

২০১০ সালে ঢাকায় ভারতের বিপক্ষে জুনায়েদ সিদ্দিকীকে নিয়ে প্রথমবার ২০০ রানের ওপেনিং জুটি এনে দেন তামিম ইকবাল। এরপর ২০১৪ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ঢাকায় ইমরুল কায়েসকে সঙ্গে নিয়ে গড়েন ২২৪ রানের জুটি। টেস্টে বাংলাদেশের তিনটি দুইশো পেরোনো ওপেনিং জুটিতেই আছে তামিমের নাম।

ওয়ানডেতেও সর্বোচ্চ জুটিতে তামিমঃ

জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে গত ৬ মার্চ সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে তামিম-লিটন ওপেনিং জুটিতে যোগ করেন ২৯২ রান। শুধু উদ্বোধনী জুটি নয় ৪০.৫ ওভার স্থায়ী জুটিতে তাদের যোগ করা ২৯২ যেকোন উইকেটেই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রানের জুটি। দুজনে পেছনে ফেলেছেন ২০১৭ সালে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে সাকিব আল হাসান ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের ২২৪ রানের জুটিকে।

ওপেনিং জুটিতে বাংলাদেশের আগের সর্বোচ্চ ছিল ১৯৯৯ সালে মেহরাব হোসেন ও শাহরিয়ার হোসেনের জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ১৭০ রান। দুজনের ২৯২ রান ওপেনিং জুটি সবমিলিয়েই বিশ্ব ক্রিকেটের তৃতীয় সর্বোচ্চ রানের জুটি, যেকোন উইকেটে যা ৬ষ্ঠ সর্বোচ্চ রানের জুটি। সবার উপরে এখনো ঠায় দাঁড়িয়ে ক্রিস গেইল ও মারলন স্যামুয়েলসের দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তোলা ৩৭২ রানের জুটি।

টি-টোয়েন্টিতে সবার উপরে তামিম-মাহমুদউল্লাহ জুটিঃ

২০১২ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদকে নিয়ে অবিচ্ছেদ্য দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে ১৩২ রান যোগ করেন তামিম ইকবাল। দুজনের ঐ জুটিটি এখনো পর্যন্ত টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের হয়ে যেকোন উইকেটে সর্বোচ্চ রানে জুটি। সবশেষ জিম্বাবুয়ে সিরিজের প্রথম টি-টোয়েন্টি তামিম-লিটন ওপেনিং জুটিতে তোলেন ৯২ রান। আর ৮ রান যোগ করতে পারলেই প্রথমবারের মত টি-টোয়েন্টির ওপেনিং জুটিতে বাংলাদেশ পেতে পারতো শতরানের জুটি। শতরানের জুটি না হলেও ৯২ রানের জুটিটিই টি-টোয়েন্টিতে ওপেনিং জুটিতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ।

নাজমুল হাসান তারেক

Read Previous

দুদকের মামলায় জামিন পেলেন বিসিবি পরিচালক

Read Next

মদের বদলে স্যানিটাইজার তৈরি করছে ওয়ার্নের কোম্পানি

Total
49
Share