‘১০’ এর চেয়ে ‘১১’ এর স্মৃতি শফিউলের বেশি প্রিয়

শফিউল ইসলাম বাংলাদেশ

এখনো পর্যন্ত বিশ্বকাপতো বটেই বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর জয়গুলো বিবেচনায় নিলে নিশ্চিতভাবেই উপরের দিকে ঠাই পাবে ২০১১ বিশ্বকাপে চট্টগ্রামে ইংলিশদের হারিয়ে দেওয়া ম্যাচটি। বোলার শফিউল ইসলাম সেদিন যেন হয়ে উঠেন ব্যাটসম্যান। গতকাল (২১ এপ্রিল) আইসিসিও বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সেরা পাঁচ মুহূর্তের স্মৃতি সামনে আনে, যেখানে জায়গা পায় দারুণ শুরুর পরও পথ হারানো বাংলাদেশকে শফিউল-রিয়াদ জুটির এনে দেওয়া ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই জয়টিও।

ইংলিশদের দেওয়া ২২৬ রানের লক্ষ্য তাড়ায় তিন উইকেটে ১৫৫ রান তুলে ফেলে বাংলাদেশ। সোয়ান-শেহজাদের বোলিং তোপে মুহূর্তেই বাংলাদেশ পরিণত হয় ৮ উইকেটে ১৬৯ রানের দল! জয়ের জন্য প্রয়োজন আরও ৫৭ রান, ক্রিজে স্বীকৃত ব্যাটসম্যান শুধু মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ।

নিশ্চিত পরাজয় ধরে নিয়ে গ্যালারি ছাড়তে শুরু করে দর্শক, টিভি সেটের সামনেও লোক কমতে শুরু করে। ব্যাট হাতে ২৪ বলে অপরাজিত ২৪ রানের এক অসাধারণ ইনিংসে সেদিন সব ছাপিয়ে নায়ক বনে যান পেসার শফিউল ইসলাম। রিয়াদের সাথে ৫৮ রানের জুটিতে এক ওভার হাতে রেখেই বাংলাদেশকে এনে দেন ২ উইকেটের ঐতিহাসিক জয়।

বাংলাদেশের প্রথম ইংল্যান্ড বধেও শফিউলের নাম জড়িয়ে আছে বেশ ভালোভাবে। ২০১০ সালে ব্রিস্টলের সেই ম্যাচে শেষ ওভারে ইংলিশদের প্রয়োজন ১০ রান, হাতে উইকেট একটি। তবে ৯০ রানে অপরাজিত থাকা জনাথন ট্রট স্ট্রাইকে বলেই টাইগারদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। শফিউলের করা প্রথম দুই বলে চার রান নিয়েও ফেলেন ট্রট, কিন্তু শফিউলের স্লোয়ার দেওয়া তৃতীয় বলেই ধরা পড়েন উইকেট রক্ষক জহরুলের হাতে। বাংলাদেশ পায় ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম জয়, তাও তাদের মাটিতেই।

স্মৃতি হাতড়ে ম্যাচ দুটো নিয়ে ‘ক্রিকেট৯৭’ এর সাথে কথা বলেছেন পেসার শফিউল ইসলাম। মুঠোফোনের আলাপে উঠে এসেছে আরো অনেক প্রসঙ্গ। পাঠকদের জন্য পুরোটাই তুলে ধরা হল নিচে-

ক্রিকেট৯৭- ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম জয় ও ২০১১ সালে বিশ্বকাপের সেই অবিশ্বাস্য ম্যাচ দুটোতেই আপনার অবদান অনেক। নিজের কাছে কোনটা সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে?

শফিউলঃ বিশ্বকাপেরটাই বেশি ভালো লাগা এন দেয়। কারণ একেতো বিশ্বকাপের মত ইভেন্ট অন্যদিকে ইংল্যান্ডের মত শক্তিশালী দলের বিপক্ষে জয়। সবচেয়ে বড় কথা আমার মূল ভুমিকা ছিল বোলার হিসেবে, সেটার বাইরে ব্যাটিং দিয়ে ম্যাচ জেতানো। ব্যাটিংতো আমার সেভাবে করা হতনা, যদিও ব্যাট হাতে কিছু করার সামর্থ্য ছিল।

সে হিসেবে একজন বোলার হয়ে ব্যাট হাতেই দলকে বিশ্বকাপের কোন ম্যাচ জেতানো সত্যি দুর্দান্ত। পাশাপাশি ২০১০ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম জয় তাও আবার তাদের মাটিতেই। সেটাও বেশ আনন্দের কিন্তু তুলনামূলক চিন্তা করতে গেলে আমি ২০১১ বিশ্বকাপের ঐ ম্যাচটার কথাই বলবো।

ক্রিকেট৯৭- ২০১১ বিশ্বকাপের ম্যাচটাকে এগিয়ে রাখার আর কোন বিশেষ কারণ?

শফিউলঃ কারণ ওটার অনুভূতিটাই অন্যরকম। মনে পড়লে ভালো লাগে, রাজ্জাক ভাই আউট হওয়ার পর আমি যখন ব্যাটিংয়ে নামছিলাম তখন দর্শক বের হয়ে যাচ্ছিলো। আমি যখন ক্রিজে যাই ততক্ষণে গ্যালারির তিন ভাগের দুই ভাগ ফাঁকা হয়ে গেছে।

ক্রিকেট৯৭- ক্রিজে যাওয়ার পর কখন মনে হয়েছে জেতানো সম্ভব?

শফিউলঃ যখন ব্যাটিং করছিলাম, তিন-চারটা বল মোকাবেলা করলাম রিয়াদ ভাই আমাকে বলল যে আমরা শেষ পর্যন্ত খেললে জেতা সম্ভব। মোটকথা আমরা দুজন ক্রিজে থাকবো শেষ পর্যন্ত ফল যাই হোক এমন পরিকল্পনা ছিল। দুই একটা ওভার যাওয়ার পর কেন জানি মনে হচ্ছিল ম্যাচটা জিতবো। জেদ হোক বা যেকোন কারণে আত্ববিশ্বাস পাচ্ছিলাম যে ম্যাচটা জিতবো। রিয়াদ ভাই আর আমি বলাবলি করছি ৫০ ওভার পর্যন্ত টিকে গেলে জিতবো।

ক্রিকেট৯৭- যখন ড্রেসিং রুম থেকে আসছিলেন তখন কেউ কোন বার্তা দিয়েছিল?

শফিউলঃ যখন ড্রেসিং রুম থেকে আসি, আসলে ম্যাচটা আমাদেরই জেতার মত অবস্থা ছিল হঠাৎ হাত ফসকে যাচ্ছিলো। কোচ আমার নামার সময় কোন কথা বলেনি, সাকিব ভাই ছিল অধিনায়ক তো উনি, তামিম ভাই, মুশফিক ভাই আমাকে বেশ সাহস দেয়। তামিম ভাই আমাকে আলাদা ডেকে নিয়ে বলল তুই কিন্তু ব্যাটিং পারিস। তুই শুধু রিয়াদ ভাইকে শেষ পর্যন্ত সাপোর্ট দিবি এই একটা কথা বলছে। উনার এই কথাতেই আমার মধ্যে কাজ করতে শুরু করে আসলেইতো আমি ব্যাটিং পারি।

ক্রিকেট৯৭- এমন আরও একটা সুযোগ এসেছিল, যেখানে ব্যাট হাতে আবারও নায়ক হয়ে যেতে পারতেন। ২০১৬ সালে চট্টগ্রাম টেস্টে ইংল্যান্ডের বিপক্ষেই, জয়ের জন্য পঞ্চম দিন আপনি যখন শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে ক্রিজে আসেন তখন দরকার ২৩ রান। অপর প্রান্তে সেট ব্যাটসম্যান সাব্বির রহমান। কিছুটা সমর্থন দিতে পারলে হয়তো ঐ ম্যাচেই আমরা ইংল্যান্ডকে প্রথমবার টেস্টে হারাতে পারতাম। টিকতে পারেননি দুই বলের বেশি। আফসোস হয়?

শফিউলঃ হ্যাঁ, কিছুটা আফসোস তো কাজ করেই যে ঐ সময়টা সাব্বিরকে সাপোর্ট দিলে আমরা হয়তো ঐ ম্যাচেই ইংল্যান্ডকে হারাতে পারতাম। আসলে প্রতিদিনতো একই রকম হয়না, বিশেষজ্ঞ ব্যাটসম্যানেরই সবসময় ভালো করা সম্ভব হয়না। আমার আগেও ভালো ব্যাটসম্যানরা ছিল। আমিতো মূলত বোলার, তবুও আফসোস হয় কারন ব্যাট হাতেও আমাকে নামতে হয়, দলে অবদান রাখাটাই আমার কাজ। সেটা হয়তো পারিনি বলে খারাপ লাগে, ভালো বল করেছিল।

ক্রিকেট৯৭- করোনার সময়টায় সবকিছু স্থগিত, স্বাভাবিক জীবন যাপন হয়ে পড়েছেন কঠিন। কীভাবে সময় কাটছে?

শফিউলঃ বাসায় আছি, পরিবারকে সময় দিচ্ছি। এছাড়া আর কিছুই করার নাই। এর বাইরে ফিটনেস নিয়ে বাসায় বসে যতটুক কাজ করা যায় সেটা করছি।

ক্রিকেট৯৭- ২০১৩ সাল থেকেই জাতীয় দলে অনিয়মিত। কখনো চোট তো কখনো বাজে পারফরম্যান্স। ২০১৬ সালের পর ওয়ানডেতে লম্বা বিরতি, ফিরলেন গতবছর বিশ্বকাপের পর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ দিয়ে। অনেকদিন পর ফিরে দারুণ কামব্যাক করেছেন। মানসিকভাবে ঠিক থাকতে কেউ সাহায্য করেছে?

শফিউলঃ শ্রীলঙ্কা সিরিজে যে আমি খেলবো বা কামব্যাক করবো এটা আসলে আমি ভাবতেও পারিনি। তামিম ভাই অধিনায়ক ছিল ঐ সিরিজে। উনি, সুজন ভাই (খালেদ মাহমুদ), চম্পাকা বোলিং কোচ ছিল উনারাই আমাকে অনেক সাহায্য করছে। আমিতো দলের সাথে পরে যোগ দেই । এতদিন পর ফেরা! মুশফিক ভাই, রিয়াদ ভাইসহ সিনিয়র ক্রিকেটাররা অনেক সাহায্য করেছে। এতদিন পরে এসে উনাদের এমন সমর্থন আমাকে কামব্যাক করতে সাহায্য করেছে।

ক্রিকেট৯৭- অনেকদিন পর ফিরে সবকিছু নতুন মনে হচ্ছে কিনা কিংবা ক্যারিয়ারটাকেই নতু শুরু ভাবছেন কিনা?

শফিউলঃ যখন আমি অনেকদিন পর জাতীদ দলের জার্সিতে আবার বল হাতে নিলাম সেরকম মনে হয়নি যে অনেকদিন পর কিংবা নতুন করে ফেরা এসব। সবাই আমাকে একটা কথাই বলছে মন খুলে খেলবি। আর লক্ষ্য ছিল একটাই, যেন চোটে না পড়ি।

ক্রিকেট৯৭- নিজেই বললেন শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ফিরবেন আশাই করেননি। ঘরোয়া ক্রিকেট, বিপিএলে পারফরম্যান্স দিয়ে জাতীয় দলে আবার নিয়মিত হচ্ছেন। ক্যারিয়ারের এ জায়গায় দাঁড়িয়ে ভবিষ্যত লক্ষ্য কি?

শফিউলঃ আমিতো অনেকবারই ফিরেছি কিন্তু চোটের কারণে আবারও মাঠের বাইরে যেতে হয়েছে। এখন লক্ষ্যই এটা যতদিন খেলি যেন চোট ছাড়া খেলতে পারি। সবারই ইচ্ছে থাকে পুনরায় সুযোগ পেলে স্থায়ী হওয়ার। আমারও সেরকম ইচ্ছেই তবে চোট থেকে মুক্ত থাকতে হবে এটা মূল বিষয়। পারফরম্যান্সতো আগে থেকে বলতে পারিনা, চেষ্টা করবো শতভাগ দিয়ে ধারাবাহিকভাবে ভালো করতে। যেকদিনই খেলি চোট ছাড়া যেন খেলতে পারি এটা আমার মূল ইচ্ছে।

ক্রিকেট৯৭- সব ফরম্যাটের জন্যই নিজেকে প্রস্তুতু করছেন নাকি নির্দিষ্ট কোন ফরম্যাটে বাড়তি মনযোগ?

শফিউলঃ অবশ্যই তিন ফরম্যাটে খেলতে চাই, নিজেকে সেভাবেই প্রস্তুত রাখি। টিম ম্যানেজমেন্ট যে ফরম্যাটের জন্য বিবেচনা করে সে ফরম্যাটেই নিজের সেরাটা দিতে চেষ্টা করবো। নিজেকে সেভাবেই ফিট করছি যেন যেখানেই ডাক আসে সেরা দিতে পারি। আমার নিজের কোন নির্দিষ্ট ফরম্যাট নেই, সবই খেলতে চাই। নির্বাচকদের আস্থার প্রতিদান দিতে চাই।

নাজমুল হাসান তারেক

Read Previous

সাকিব জানালেন আজকের অবস্থানে আসতে অবদান যাদের

Read Next

গেইলকে ছেড়ে দিল জ্যামাইকা, নতুন দলে ইউনিভার্স বস

Total
11
Share
error: Content is protected !!