যেদিন সাকিব তার ‘স্ত্রী’ ও ‘সমর্থকদের’ আস্থার প্রতিদান দিয়েছিলেন

সাকিব আল হাসান

‘কাল রাতে আমি আমার স্ত্রীর সাথে কথা বলছিলাম। আমি বললাম মনে হয়না জিততে পারবো, কঠিন হয়ে গেল। আমার স্ত্রী বলল একমাত্র তুমি আছো যে জেতাতে পারে। তার এই বিশ্বাস ছিল।’ ২০১৭ সালের আজকের দিনে ইতিহাস গড়ে মিরপুর টেস্টে অস্ট্রেলিয়া বধের পর পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে সাকিব আল হাসান এভাবেই বলছিলেন।

২৬৫ রানের লক্ষ্য তাড়ায় ২ উইকেট হারিয়ে অজিরা তুলে ফেলে ১০৯ রান। ৭৫ রানে অপরাজিত ওপেনার ডেভিড ওয়ার্নার, তাকে যোগ্য সঙ্গ দেওয়া অধিনায়ক স্টিভ স্মিথ টিকে আছেন ২৫ রানে। বিশ্বের যে কোন উইকেটে, যে কোন বিরুদ্ধ কন্ডিশনে এই ম্যাচ অস্ট্রেলিয়া হারবে এমন ভাবনা কেবল টাইগারদের অন্ধ ভক্তদের মাথাতেই আসা সম্ভব।

সাকিব আল হাসান

হ্যা, চতুর্থ দিন সকালে যারা মিরপুর স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বাংলাদেশের জয় দেখতে এসেছেন তাদের অন্ধ ভক্ত বলতেই হয়। আক্ষরিক অর্থে তারা অন্ধ নন, তবে অন্ধকার হাতড়ে ঠিকই ছিনিয়ে এনেছেন জয় নামের মণি মুক্তো। আচ্ছা জয়ের অবদানটা কেনই বা তাদের দিচ্ছি?

পুরষ্কার বিতরণীতে ধারাভাষ্যকার শামীম চৌধুরীর কাছ থেকে মাইক্রোফোন চেয়ে নিয়ে বলা সাকিবের কথাতেই কারণ খুঁজুন, ‘ধন্যবাদ সবাইকে আমাদের সমর্থন দেওয়ার জন্য। আমি ড্রিংকসের সময় একটা কথা বলছিলাম পুরো দলকে যে বাংলাদেশ দলের সবাই হয়তো বিশ্বাস করে নাই আজকে আমরা জিততে পারবো। কিন্তু দর্শকরা আপনারা যখন মাঠে আসছেন, তার মানে আপনাদের মধ্যে বিশ্বাসটা ছিল আমরা জিততে পারবো। সুতরাং এই বিশ্বাসটা আমাদের অনেক কাজে আসছে। এ কারণে ধন্যবাদ।’

খোদ সাকিব আল হাসান নিজে জয়ের আত্মবিশ্বাস খুঁজে নিয়েছেন স্ত্রীর কথা ও মাঠে আসা দর্শকদের প্রত্যাশার মাঝে। তাহলে অনুমান করার অপেক্ষা রাখেনা কেমন ম্যাচটাই জিতেছে বাংলাদেশ। যে ম্যাচে সাকিব পাখি হয়েছেন, উড়তে চেয়েছেন ডানা মেলে। রক্তে মাংসের মানুষ বলে মাটিতেই থেকেছেন, তবে মনটা হয়তো উড়াল দিয়ে ঠিকই ঘুরে এসেছে প্রিয় কোন ঠিকানা। যে ম্যাচের চতুর্থ দিনের হাইলাইটস বলবে প্রতিপক্ষের বাউন্ডারির চেয়ে সাকিব, তাইজুল, মিরাজদের আবেদনের সংখ্যাই বেশি ছিল।

বাংলাদেশ সাকিব উদযাপন

টাইগারদের স্পিন ঘূর্ণিতে নাকাল ওয়ার্নার, স্মিথ, হ্যান্ডসকম্ব, ম্যাক্সওয়েল থেকে ওয়েড, লায়নরা। তবে দিনের শুরুটা ঠিকই ওয়ার্নার-স্মিথ সুলভই ছিল। ৭৫ রানে অপরাজিত থাকা ওয়ার্নার সেঞ্চুরিয়ে তুলে নিয়েও টিকে আছেন, স্মিথের সাথে আগেরদিন অবিচ্ছেদ্য ৮৯ রানের জুটিকে লম্বা করতে করতে ১৩০ রানে ঠেকিয়েছেন। স্ত্রীর দেওয়া টোটকা কিংবা মাঠে আসা দর্শকদের প্রত্যাশা কোন কিছুই যেন বাংলাদেশের পরাজয়ের সম্ভাবনাকে দূরে সরাতে পারছেনা।

অস্ট্রেলিয়ার জয়ের জন্য প্রয়োজন ১০৭ রান, ক্রিজে সেঞ্চুরি হাঁকানো ওয়ার্নার ও ঠান্ডা মেজাজে সমর্থন দিয়ে যাওয়া স্মিথ। তবে আগের রাতে সাকিবকে স্ত্রী বলে দিয়েছে তুমি পাঁচ উইকেট নিলেইতো হয়ে যায়! সাকিবও রাতে সেটা ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়েছেন। সকালে সম্বিৎ ফিরতে হয়তো একটু দেরি হয়েছে কিন্তু স্ত্রীর কথা রাখতে হলেও অন্তত আরও চারটা উইকেট যে লাগে। আগেরদিন উসমান খাজার উইকেট নেওয়া সাকিব শুরুটা করলেন রুদ্রমূর্তি ধারণ করতে থাকা ওয়ার্নারকে এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলে।

১১২ রানে ফেরা ওয়ার্নারকে অবশ্য বেশ কয়েকবারই পরাস্ত করেছে টাইগার স্পিনাররা। এমনকি নিশ্চিত আউট ভেবে আনন্দোল্লাসেও মেতে উঠতে চেয়েছিল সাকিব, তাইজুল, মিরাজরা। ওয়ার্নার ফিরেছে, সাকিব দুই হাতে অনেকটা আম্পায়ারের ছক্কার সংকেত দেওয়ার ভঙ্গিতে উদযাপন করেছেন। বাঁধ ভাঙা উল্লাস, ২২ গজে সাকিবের নৃত্য দেখা কিংবা ডানা মেলে উড়তে চাওয়ার শুরুটা তখনো হয়নি।

১৩ রান পর স্মিথকে মুশফিকের ক্যাচে পরিণত করে মুখের হাসিটা চওড়া হচ্ছিল টাইগার পোস্টারবয়ের। অনিশ্চিত এক প্রত্যাশায় বুক বেঁধে স্টেডিয়ামে আসা দর্শকরাও যেন বলতে চাইছেন আমরা জয় দেখতেই এসেছি, তোমরা পারবে। সাকিবরা পেরেছে, আগেরদিন হয়তো সম্ভব নয় সমীকরণকে লাঞ্চের আগেই বানিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ জিততে যাচ্ছে।

সাকিব আল হাসান
ছবিঃ সংগৃহীত

৭ উইকেটে ১৯৯ রান তুলে লাঞ্চে যায় অস্ট্রেলিয়া, ৩৭ রানের ব্যবধানে ৫ উইকেট হারিয়ে নতজানু। আর সে পথেই উইকেট রক্ষক ম্যাথু ওয়েডের ব্যাটের ফাঁক গলে সাকিবের করা দারুণ এক ডেলিভারি স্পর্শ করে প্যাড। ভালোবাসা, আবেগ ও পেশাদারিত্বের মিশেলে ক্রিকেট খেলা সাকিব ততক্ষণে কেবলই আবেগী একজনে পরিণত হয়েছেন। মাঠে কিংবা মাঠের বাইরে সাকিবের এমন কান্ডের দেখা মেলে কালে ভদ্রে।

আগের বছর ইংল্যান্ড বধের ম্যাচে বেন স্টোকসকে ফিরিয়ে স্যালুট উদযাপনও যেখানে পেছনে পড়ে গিয়েছে। বন্ধুদের পার্টিতে নাচ না জানা কোন তরুণের নৃত্যই দেখিয়েছেন সাকিব। হবেইনা না কেন? প্রথমবারের মত ক্রিকেটের অভিজাত সংস্করণে অজি বধের হাতছানি। মন না চাইলেও ভেতরের আবেগ যেন এদিন বের হয়েছে সব অজুহাতের দেওয়াল টপকে।

তবে কাটা হওয়ার শঙ্কায় রেখেছিলেন গ্লেন ম্যাক্সওয়েল। একবার টিকে গেলে প্রয়োজনীয় ৬৬ রান তেড়েফুঁড়েই নিয়ে ফেলার সামর্থ্য রাখেন। কিন্তু না, দিনটা যে সাকিবের, লাঞ্চের পর প্রথম বলেই বোল্ড করলেন ম্যাক্সিকে। ইতিহাসের দ্বিতীয় ক্রিকেটার হিসেবে একই টেস্টে ফিফটি ও ১০ উইকেটে তুলে নেওয়ার কীর্তি একের অধিকবার গড়লেন বাংলদেশের জান, বাংলাদেশের প্রাণ সাকিব আল হাসান।

তার আগে যা শুধুই কিউই কিংবদন্তী রিচার্ড হ্যাডলির দখলে ছিল। ১৪ রানে ম্যাক্সওয়েলকে সাজঘরের পথ দেখিয়ে সাকিব যেন ২০০ মিটার স্প্রিন্ট জয়ের মিশনে নেমেছেন। সাকিব ছুটছে, ভোঁ দৌড়ে তাকে ধরার চেষ্টা সতীর্থদের, কেউ পেরেছে তো কেউ পারেনি।

ম্যাক্সওয়েল ফিরে গেলেও আরেকটি মুলতান কিংবা ফতুল্লাহর শঙ্কা ঠিকই জাগিয়েছেন অজি পেসার প্যাট কামিন্স। সাকিব পত্নী জয়ের ছকে সাকিবের পাঁচ উইকেটই চেয়েছেন, সাকিবও থেমেছেন সেখানেই। শেষ দুই উইকেট ভাগাভাগি করেছেন মেহেদী হাসান মিরাজ ও তাইজুল ইসলাম। তবে ৩৩ রান করা কামিন্স নাথান লায়ন ও জস হ্যাজেলউডকে নিয়ে চোখ রাঙিয়েছেন ভালোভাবেই। নিজে অপরাজিত থাকলেও অন্য প্রান্তে লায়ন (১২) ও হ্যাজেলউডকে (০) করতে হয়েছে আত্মসমর্পণ।

হ্যাজেলউডের এলবিডব্লিউর আবেদন করে আম্পায়ার আঙুল তোলার পরও দুই হাত প্রসারিত করে যেন স্বস্তির এক নিঃশ্বাস ছাড়লেন তাইজুল ইসলাম। দাঁড়ানোর পরই সামনে পেলেন সাকিবকে, উঠে বসলেন কোলে। ২০ রানের ঐতিহাসিক জয়ের পর অধিনায়ক মুশফিক থেকে তরুণ মিরাজ, সাব্বির, কিংবা দুবারের চেষ্টায় দুই কঠিন ক্যাচ লুফে নেওয়া সৌম্যরা যখন জয়োল্লাসে ব্যস্ত সাকিব তখন একদমই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাই ফাইভে সীমাবদ্ধ।

সাকিব আল হাসান

যেন এতটুকুই তার দায়িত্ব ছিল, নাবিক হয়ে জাহাজকে বন্দরে নোঙরে ব্যবস্থা করে দেওয়া। ঘরে ফেরার আনন্দ তো কেবল সহযোদ্ধাদেরই, তাদের আনন্দ দেখে নিজের আনন্দের কথা হয়তো ভুলে থাকতে হয় ক্ষণে ক্ষণে। জয়ের পথটা তৈরি করে দিয়েছে অবশ্য তামিম ইকবাল। মিরপুরের মরা পিচে দুই ইনিংসেই গিয়েছিলেন সেঞ্চুরির কাছে (৭১ ও ৭৮)। প্রথম ইনিংসে ৮৪ রান করে দলের লিড পাওয়াতে ব্যাট হাতে বড় অবদান সাকিবেরও।

ম্যাচ শেষে সাকিব জানিয়েছেন সব ছাপিয়ে দলের জয়ে অবদান রাখাতেই সবসময় উপভোগ করেন, আনন্দ পান। জয়ের পুরো কৃতিত্বও নিজের বলতে নারাজ, দলীয় খেলা বলে কৃতিত্বটা ভাগ করে দিলেন সবার মাঝে। টাইগার অলরাউন্ডারের ভাষাতে, ‘দলের জন্য অবদান রাখতে পারলে ভালো লাগে, সেটা বড় আকারে করতে পারলে বেশি ভালো লাগে। যেহেতু এই উইকেটে রান করাটা কঠিন সেহেতু ব্যাটসম্যানদের কৃতিত্ব দিতেই হবে। যেভাবে তামিম ব্যাটিং করেছে অবিশ্বাস্য।’

‘ওর দুটো ইনিংসই সেঞ্চুরি হতে পারতো। এছাড়া মুশফিক ভাইয়ের অবদান, প্রথম ইনিংসে নাসিরের, দ্বিতীয় ইনিংসে সাব্বিরের অবদান এসব অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। একইভাবে খুব ভালো সমর্থন দিয়েছে তাইজুল ও মিরাজ। যেটা এই টেস্ট জেতার জন্য খুব প্রয়োজন ছিল। হয়তো আমি এক পাশ থেকে পাঁচ উইকেট পেয়েছি। অন্য পাশ থেকে আরও পাঁচটা উইকেট কিন্তু নিতে হয়েছে। দিনশেষে এটা একটা দলীয় খেলা, কোনদিন কেউ বেশি অবদান রাখে কেউ কম।’

ম্যাচ পরবর্তী ঐ সংবাদ সম্মেলনে আরেক দফায় স্ত্রী প্রসঙ্গে সাকিব বলেন, ‘সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা আমার স্ত্রী। সব সবময় পেছন থেকে সাহস জুগায়। একটু আগে টেক্সট করেছিল, নাউ আই ক্যান স্লিপ। এ ধরণের অনুপ্রেরণাগুলো অনেক কাজে আসে।’

নাজমুল হাসান তারেক

Read Previous

লঙ্কা সফরের প্রস্তুতিটা ভালোই হচ্ছে টাইগারদের

Read Next

পোলার্ডের অতিমানবীয় ইনিংসে টিকেআরের অসাধ্য সাধন

Total
6
Share
error: Content is protected !!