বাংলাদেশ সফরে আসা তরুণদের উদ্দেশ্যে লয়েডের বিশেষ চিঠি

বাংলাদেশ সফরে আসা তরুণদের উদ্দেশ্যে লয়েডের বিশেষ চিঠি

দু’বারের বিশ্বকাপ জয়ী প্রাক্তন ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক ও কিংবদন্তি ব্যাটসম্যান ক্লাইভ লয়েড বাংলাদেশ সফরে আসা নিজের দেশের তরুণ ক্রিকেটারদের ভালো করার অনুপ্রেরণা দিতে পাঠিয়েছেন বিশেষ চিঠি। বাংলাদেশ সফর ভীতিকর নয়, বরং তরুণ ক্রিকেটারদের জন্য বড় সুযোগ; বলেছেন লয়েড। টেস্ট অধিনায়ক ক্রেইগ ব্র‍্যাথওয়েটের ওপর রেখেছেন আস্থা, নতুন নেতৃত্বে নতুন যুগের সূচনা ঘটাতে দিয়েছেন আশ্বাস।

১৯৭৫ সালের ২১ জুন লর্ডসে উদ্বোধনী বিশ্বকাপে ক্লাইভ লয়েডের নেতৃত্বে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ফাইনালে ১৭ রানে হারিয়েছিল অস্ট্রেলিয়াকে। ১৯৭৯ সালের বিশ্বকাপেও সেরা হয়েছিল লয়েডের দল। তখন বিশ্বক্রিকেটে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ছিল অপ্রতিরোধ্য। মাত্র ২২ বছর বয়সে ভারতের বিরুদ্ধে টেস্ট অভিষেক হয়েছিল ক্লাইভ লয়েডের৷ রেকর্ড বলছে, ১১০টি টেস্টে তিনি ৭৫১৫ রান করেছেন ৷ গড় ৪৬.৭। অন্যদিকে ৮৭টি ওয়ানডে ম্যাচ খেলে লয়েড করেছেন ১৯৭৭ রান৷

নিজের অভিষেকের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশ সফরে আসা তরুণদের কাছ থেকেও এমন কিছু আশা করছেন লয়েড। ক্লাইভ লয়েড জীবনের প্রথম বিদেশ সফরে ইনফর্ম সিমুর নার্স হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় প্রথম টেস্টের মূল একাদশেও জায়গা পেলেন! অভিষেক টেস্টের প্রথম ইনিংসে ১৫ চার ও ১ ছক্কায় ৮২ রানের ইনিংস খেলেন। এরপর দ্বিতীয় ইনিংসে লয়েড অপরাজিত থাকেন ৭৮ রানে। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরুটা হল দুর্দান্ত!

তিন ওয়ানডে ও দুই টেস্টের সিরিজ খেলতে একঝাঁক নতুন মুখ নিয়ে গত ১০ই জানুয়ারি বাংলাদেশে এসেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দল। অবশ্য এই দল নিয়েই বড় স্বপ্ন দেখছেন কিংবদন্তি ক্লাইভ লয়েড। কাগজে–কলমে দুর্বল মনে হলেও এখান থেকেই লয়েড দেখছেন তরুণদের সুযোগ। বিশ্বকে নিজেদের প্রতিভা ও দক্ষতা দেখানোর আদর্শ সুযোগ। বাংলাদেশ সফর ভীতিকর মনে না করে ক্যারিবীয় অঞ্চলকে জয় এনে দিতে লড়াইয়ে নামতে লয়েড দিয়েছেন অনুপ্রেরণা।

নিয়মিত অধিনায়ক জেসন হোল্ডার না থাকায় টেস্টে অধিনায়কের দায়িত্ব ক্যারিবিয়ান ওপেনার ক্রেগ ব্রেথওয়েটের কাঁধে। ক্রেইগ ব্র‍্যাথওয়েটের নেতৃত্বে উইন্ডিজ ক্রিকেটের নতুন যুগের সূচনা করতে তরুণদের বললেন কিংবদন্তি লয়েড।

বাংলাদেশ সফরে আসা নিজ দেশের তরুণ সব ক্রিকেটারদের উদ্দেশ্যে লয়েডের এক বিশেষ চিঠি ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান রিকি স্কেরিটের মাধ্যমে ক্রিকেটারদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

লয়েডের চিঠি,

“প্রিয় ছেলেরা,

আমি ভেবেছিলাম যে এই বার্তাটি পাঠাবো কারণ আমি জানি যে তোমরা এমন একটি সফরে যাচ্ছো, যার জন্য সম্ভবত প্রস্তুত নও। তোমরা হয়তো ভাবছ তোমাদের গভীর কূপে ফেলে দেওয়া হয়েছে এবং সেখান থেকেই তোমাদের উঠতে হবে। তোমাদের বোঝা উচিত যে এটা ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলে জায়গা পাকা করার জন্য ভালো সুযোগ। তোমরা এখানে শুধুই শূন্যস্থান পূরণ করতে আসনি। মেধার ভিত্তিতে তোমাদের নেওয়া হয়েছে। এটাই তোমাদের প্রাপ্য ছিল। এটাই বিশ্বকে নিজেদের প্রতিভা ও দক্ষতা দেখানোর আদর্শ সুযোগ। তোমরা যে দ্বিতীয় সারির খেলোয়াড় নও, তা প্রমাণের এটাই সুযোগ।

১৯৬৬ সালে আমি টেস্ট দলে নির্বাচিত হয়নি। সৌভাগ্যক্রমে, সিমুর নার্স আহত হয়েছিলেন এবং প্রথম টেস্টের ৪৫ মিনিট আগে আমাকে জানানো হয়েছিল যে আমি খেলছি এবং আমি ৩৫ টি টেস্ট ম্যাচ খেলেছি কারণ আমি দুর্দান্ত পারফর্ম করেছি। আমরা সিরিজ জিতেছি। আমি সেই সুযোগটাকে আমার প্রতিভা ও সামর্থ্য দেখানোর মঞ্চ হিসেবে নিয়েছি। আমি বিশ্বাস করি, আমাদের অঞ্চলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে খেলাটা সর্বোচ্চ সম্মান হিসেবে দেখা হয়। আগেও বিশ্বাস করতাম, এখনো করি।

তোমরাও তোমাদের ঠিক একই অবস্থায় পেয়েছ। এটাই তোমাদের সুযোগ নিজেদের নির্বাচনকে সঠিক প্রমাণ করার। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্লেজার ও টুপি পরা গর্বের ব্যাপার। তোমরা ক্রিকেটের অন্যতম সেরা একটি দলের প্রতিনিধিত্ব করছ, যাদের রেকর্ড গর্ব করার মতো। মনে রাখবে, আমরা মাত্র ৫০ লাখ মানুষের দেশ।

আমাদের কিছু রেকর্ড: টানা ২৯ টেস্টে অপরাজিত। টানা ১১ জয়। টানা ১৭ বছর কোনো সিরিজ হার নয়।

এগুলো আমাদের অতীতের অর্জনের কিছু চিত্র। কঠোর পরিশ্রম, প্রতিশ্রুতি এবং সঠিক লক্ষ্যের সাহায্যে এটা অর্জন সম্ভব হয়েছে। সবকিছুর ওপরে আমি তোমাদের ফিটনেসে নজর দিতে বলব। তুমি ব্যাটসম্যান কিংবা বোলার হও না কেন, নিজের টেকনিক ও দক্ষতা উন্নতি করার চেষ্টা সব সময় করে যাবে। আমার দল এটা করেছে। আমার বিশ্বাস, তোমরাও পারবে।

আমাদের টেস্ট র‍্যাঙ্কিং উন্নত করার এবং আমাদের ক্রিকেটে সম্মান বাড়ানোর সুযোগ তোমাদের আছে। এটা শুধু আমার প্রত্যাশা নয়, পুরো ক্যারিবীয় অঞ্চলের। তোমাদের জয় কিন্তু তাদেরও জয়।

বাংলাদেশ সফর হয়তো ভীতিকর মনে হচ্ছে কিন্তু এখানে ভালো করা অসম্ভব নয়। বরং ভালো করার আদর্শ সুযোগ। তোমাদের দৃঢ়তা, পেশাদারিত্ব ও নিবেদন দিয়ে টেস্ট ক্রিকেটের নতুন যুগের সূচনা করতে পারো ক্রেইগ ব্র‍্যাথওয়েটের নেতৃত্বে। আমি মিথ্যা আশ্বাস দিচ্ছি না। সব আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলা। আমি অধিনায়ক হওয়ার আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল টানা ২০এর বেশি টেস্ট ম্যাচে পরাজিত হয়। দলের নতুন করে গড়ার প্রয়োজনীয়তা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। আমারও বেশ কয়েকজন অচেনা ক্রিকেটার ছিল। এখন তোমাদের যেমন, ঠিক তেমনই। কিন্তু আমার দল চ্যালেঞ্জ থেকে সরে যায়নি এবং ঠিকই শীর্ষে উঠেছে। আমার বিশ্বাস, তোমরাও নতুন করে গড়তে শিখবে। আমরা পেয়েছি, কারণ আমরা বিশ্বাস রেখেছি নিজেদের সামর্থ্যে। তোমরাও পারবে। সাফল্যের প্রথম ধাপ আত্মবিশ্বাস।

একটা উক্তি তোমাদের সবসময় মনে রাখতে হবে, উচ্চতা অর্জন করার জন্য অবশ্যই সঠিক মনোভাব থাকতে হবে। ইতিবাচক মানসিকতা তোমাকে অনেক কঠিন অবস্থা পার করতে সাহায্য করবে। আমি নিশ্চিত, তোমরা এই সিরিজে সেটাই করবে।

সবার শেষে, একমাত্র অভিধানেই সাফল্য শব্দটা পরিশ্রমের আগে আসে। আমি তোমাদের শুভকামনা জানাই। দয়া করে মনে রাখবে, বেশির ভাগ মানুষকে মনে রাখা হয় তারা কতটা বাধা পেরিয়ে এসেছে তার ওপর।”

এই চিঠি অনুপ্রাণিত করেছে বাংলাদেশ সফরে আসা ক্যারিবীয়দের। ১৪ জানুয়ারি সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তা জানিয়েছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের ওয়ানডে অধিনায়ক জেসন মোহাম্মদ।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ টেস্ট দলঃ

ক্রেইগ ব্র্যাথওয়েট (অধিনায়ক), জার্মেইন ব্ল্যাকউড, রুমা বোনার, জন ক্যাম্পবেল, রাখিম কর্নওয়াল, জশুয়া ডা সিলভা, শ্যানন গ্যাব্রিয়েল, ক্যাভেম হজ, আলজারি জোসেফ, কাইল মায়ার্স, শেন মোজলি, ভিরাসামি পেরমল, কেমার রোচ, রেমন রেইফার, জোমেল ওয়ারিক্যান।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ ওয়ানডে দলঃ

জেসন মোহাম্মদ (অধিনায়ক), সুনিল আমব্রিস, রুমা বোনার, জশুয়া ডা সিলভা, জাহমার হ্যামিল্টন, শেমার হোল্ডার, আকিল হোসেন, আলজারি জোসেফ, কাইল মায়ার্স, আন্দ্রে ম্যাকার্থি, কেজর্ন ওটলি, রভম্যান পাওয়েল, রেমন রেইফার, কিয়ন হার্ডিং, হেইডেন ওয়ালশ জুনিয়র।

৯৭ ডেস্ক

Read Previous

অতীত ভুলে নিজেকে যেভাবে ‘মোটিভেট’ করতে চান জেসন মোহাম্মদ

Read Next

কোহলিকে টপকে ‘দ্য পারফেক্ট ক্যাপ্টেন’ ইমরান খান

Total
2
Share
error: Content is protected !!