প্রতিপক্ষের হৃদয় ভেঙে অন্তিম জুটির বীরত্বগাথা

ব্যাটিং দলের নয় উইকেটের পতন, দিল্লি বহুদূর – উইনিং টিমের সারণিতে নিজেদের নাম লেখাতে অসাধ্য সাধন করতে হবে। অন্যদিকে প্রতিপক্ষ ফিল্ডিং দল স্বাভাবিকভাবেই নির্ভার, ইতোমধ্যে জয়ের কাব্য অনেকটাই প্রস্তুত বাকি শুধু সমাপনী রেখাটা এঁকে দেবার। কিন্তু, ক্রিকেট বিধাতা আজ যে লিখবেন ভিন্ন ধারার মহাকাব্য। হঠাৎ বাড়া ভাতে ছাই ফেলে চরম নাটকীয়ভাবে ফিল্ডিং দলের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে শেষ উইকেট জুটিতে ম্যাচ নিজেদের করে নেয় ব্যাটিং দল, রূপকথার গল্প ও যেনো হার মানতে বাধ্য হয় এই নাটিকার সম্মুখে।

আজ পাঠকগণের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবো এমন কয়েকজন যুগলদের যাদের হাত ধরে রচিত হয়েছে অন্যরকম এক ইতিহাস। যার পরতে পরতে লুকিয়ে আছে হৃদয় ভাঙা, মন জয়ের গল্প।

কুশল পেরেরা –বিশ্ব ফার্নান্ডো জুটি (শ্রীলঙ্কা) :

এই জুটির গল্প তো এই সেদিনের। কোটি ক্রিকেট অনুরাগীদের স্মৃতিতে এখনো জ্বল জ্বল করছে, ফিকে হবার কোন সম্ভাবনাই নেই। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে এশিয়ার দেশ খাবি খাবে এটাই স্বাভাবিক, তবে দেশ ছাড়ার পূর্বে যেন পণ করেছিলো লঙ্কানরা। এবারে আর হতাশা নয় সফলতার অন্বেষণ তারা করেই ছাড়বে।

হ্যাঁ, সফল ও হয়েছে তারা। সাদা পোশাকে রাবণের সেনানীদের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি ম্যান্ডেলার দেশের ছেলেরা। পরিণাম ২-০ তে টেস্ট সিরিজ জয় করুনারত্নেবাহিনীর। সিরিজ জয়ের পথটা মোটেও মসৃণ ছিলো না, সিরিজটা সমতায় শেষ করতে চেয়েছিলো স্বাগতিক অধিনায়ক ডু-প্লেসিস। কাপ্তানের ডাকে বোলারাও সাড়া দিয়েছিলো বেশ সরবেই, কিন্তু বাধ সাধে কুশাল এবং ফার্নান্ডো।

অতিমানবীয়, ক্যারিয়ার সেরা এক ইনিংস খেলে দলকে জয়ের স্বাদ পাইয়ে দেয় বাঁহাতি উইকেট-রক্ষক ব্যাটসম্যান কুশাল পেরেরা, পাছে টেলেন্ডার ফার্নান্ডোর কথাও না বললে নয়। রাবাদা-ফিল্যান্ডারদের হতাশায় ডুবিয়ে মাটি কামড়ে নিজের উইকেট ধরে রাখে এই বা-হাতি পেসার। দুজনে মিলে ১০ম উইকেট জুটিতে যোগ করেন জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ৭৮ রান, পেরেরার উইলো থেকে রান আসে ১৫৩*!

ডেভ নোর্স-পার্সি শেরওয়েল জুটি (দক্ষিণ আফ্রিকা) :

১৯০৬ সালের জোহানেসবার্গ টেস্টে সফরকারী ইংল্যান্ডের কাছে রীতিমতো ধরাশায়ী স্বাগতিকরা। প্রথম ইনিংসে মাত্র ৯১ রানে গুটিয়ে যাওয়া দলটার সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য ২৮৪, প্রথম ইনিংসের বিচারে স্বাভাবিকভাবেই পাল্লা ভারী ইংলিশদের।

ঘরের দর্শক চাপ, অচেনা হয়ে ধরা দেয়া উইকেট সাথে প্রথম ইনিংসের বিভৎস স্মৃতি – সব মিলিয়ে আফিক্রানদের নিকটে সে এক ভুতুড়ে অবস্থা! ১০৫ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে রীতিমতো কোনঠাসা শের্লওয়েলের দল। আশার আলো জিইয়ে রাখা প্রোটিয়া অলরাউন্ডার ডেভ নোর্সের সঙ্গ দিতে শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে আসেন খোদ দলপতি শেরওয়েল।

অবশিষ্ট ৪৭ রানের সন্ধানে বল বাই বল অনুযায়ী ব্যাট সচল রাখেন দুই ব্যাটার। অবশেষে তাদের যোগ্য জুটির দৌরাত্ম্যে জয় নিয়ে মাঠ ত্যাগ করে দক্ষিণ আফ্রিকা, ৯৩ রানে অপরাজিত থাকেন নোর্স।

ইনজামাম উল হক-মুশতাক আহমেদ জুটি (পাকিস্তান) :

দক্ষিণ আফ্রিকা ছেড়ে আসা যাক এশিয়ার দেশ পাকিস্তানে। মঞ্চ বদলালেও দৃশ্যপট মোটামুটি একই। ১৯৯৬ সালে করাচির স্পিন উইকেটে চতুর্থ ইনিংসে পাকিস্তানকে ৩১৭ রানের জয়ের লক্ষ্য দেয় মার্ক টেইলরের অষ্ট্রেলিয়া। স্পিন বিভাগে “অল টাইম গ্রেট” খ্যাত লেগি শেন ওয়ার্ন বিপরীত দলে থাকায় বেশ বেগ হতে হবে পাকিস্তানের এমন ধারণা সবারই ছিলো।

২৫৮ রানে ৯ উইকেট হারিয়ে হারের দ্বারপ্রান্তে পাকিস্তান। অন্তিম সৈনিকের বেশে তৎকালীন গুনে মানে স্বয়ংসম্পূর্ণ লেগব্রেক বোলার মুশতাক আহমেদ জুটি বাঁধেন সপ্তম উইকেটে ক্রিজে নামা ইনজামাম উল হকের সাথে। তখনও জয় থেকে ৫৭ রান দূরে স্বাগতিকরা। দু’জনে দেখে শুনে লড়ে যান সমান তালে, জয়ের অস্তমিত সূর্যটা যেন ধীরেধীরে উঁকি দিতে শুরু করে করাচির নীল আকাশে।

ওদিকে অজি দলের কোচ থেকে ক্রিকেটার সকলের চোখেমুখে বিরক্তি আর হতাশার ছাপ ছিলো স্পষ্ট। মুশতাক এবং ইনজামাম উভয়েই অপরাজিত থাকেন যথাক্রমে ২০ এবং ৫৮ রানে। সেদিন ভাগ্যদেবীর কৃপাদৃষ্টির ও কমতি ছিলো না ইনজামামের উপরে, জয় থেকে ৩ রান দূরে থাকায় শেন ওয়ার্নের বাঁক খাওয়া বলটাকে উইকেটে এগিয়ে এসে সজোরে মারতে চান ইনজামাম, ব্যাটে বলে সংস্পর্শ না হওয়ায় বলে চলে যায় উইকেট রক্ষক ইয়ান হ্যালির কাছে, হ্যালি বলকে তালুবন্দী করতে ব্যর্থ হওয়ায় বলের ঠিকানা হয় বাউন্ডারি রোপের ওইপাশে। ফলশ্রুতিতে উপঢৌকন স্বরূপ এই বাই ফোরের সহায়তায় ১ উইকেটে ম্যাচ জিতে নেয় পাকিস্তান।

সিডনি বার্নস-আর্থার ফিল্ডার জুটি (ইংল্যান্ড) :

সময়টা ১৯০৮ সাল, ইতিহাস বিরোচিত মেলবোর্নে চলছে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী অষ্ট্রেলিয়া এবং ইংল্যান্ডের মধ্যকার মর্যাদার অ্যাশেজ টেস্ট সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচ। প্রথম ম্যাচে স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্যাটিং লাইল-আপ নিয়েও হার দিয়ে মৌসুম শুরু করে অতিথিরা। সিরিজে সমতা আনতে এ ম্যাচে তাদের প্রয়োজন ২৮২ রান। ব্যাকফুটে থাকা ইংলিশদের জন্য কাজটা মোটেও সহজ নয়।

বড় টার্গেটে ওপেনারদ্বয় এনে দেন মূল্যবান ৫৮ রান, ব্যস এরপরেই ছন্দপতন! অজি বোলারদের সম্মুখে নেহাৎ শিশুসম প্রতীয়মান হয়ে উঠে ইংলিশ ব্যাটসম্যানেরা। পাল্লা দিয়ে বাড়ে ইংলিশ ব্যাটসম্যানদের উইকেটে আসা-যাওয়ার মিছিল। একটা সময় তাদের সংগ্রহ দাঁড়ায় ২০৯-৮। সেখান থেকে ৩৪ রানের ছোট্ট এক প্রতিরোধ্য জুটি। সে জুটির ভাঙন ধরে ২৪৩ রানে, জিততে তখনও দরকার আরো ৩৮ রান।

স্বাভাবিকভাবেই জয়ের সুবাশ পাচ্ছে ঘরের ছেলেরা, উইকেটে তখন বার্নস এবং ফিল্ডার। দুজনের পরিচয় মূলত বোলার। কিন্তু না, দুজনেই যেন মনস্থির করলেন আজ অন্য পরিচয়ে পরিচিত হবেন তারা। যা ভাবা তাই কাজ, অবিস্মরণীয় এক জুটির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন দুই টেলেন্ডার। শেষ উইকেটের বিষাদময় হারে অজিরা হারলেও, ইংল্যান্ড টিকে রয় সিরিজে। ১-১ সমতা বিরাজ করছে তখন কাগজ-কলমের হিসেবের খাতায়। ৩৮ রানে মাঠ ছাড়া বার্নসের সময়োচিত সঙ্গ দেয়া ফিল্ডারের নামের পাশে জমা পড়েছে ১৮টি মহামূল্যবান রান।

ডগ রিং-বিল জনস্টন (অষ্ট্রেলিয়া) :

১৯৫১ সালে (শেষ হয় ১৯৫২ সালের ৩ জানুয়ারি) সিরিজের চতুর্থ টেস্টে মুখোমুখি স্বাগতিক অষ্ট্রেলিয়া এবং ওয়েষ্ট-ইন্ডিজ। সিরিজে দুই ম্যাচে অকৃতকার্য ক্যারিবিয়ানরা মেলবোর্ন টেস্ট জিতে সিরিজে ফিরতে মরিয়া। গতিবান্ধব উইকেটে নাজেহাল দু’পক্ষের ব্যাটসম্যানরায়। প্রথম তিন ইনিংসে তিনশো পেরোতে পারেনি কোন দলই। জোয়ার-ভাটার লুকোচুরি খেলার মতো কখনো ম্যাচে এদল এগিয়ে আবার পরক্ষণেই ওদল এগিয়ে।

অন্তকালে টেস্ট জয়ের তালিকায় আরো একটা সংখ্যা সম্প্রসারণে অজিদের প্রয়োজন ২৬০! ম্যাচের এভাগে মেলবোর্ন সাক্ষী হলো উল্টো চিত্রের। পেস সহায়ক পিচে যাদুকরী কারিশমা দেখালেন জ্যামাইকান বাঁ-হাতি স্পিনার আলফ্রেড ভ্যালেন্টাইন। তার স্পিন বিষে নীল অজিদের মজবুত ব্যাটিং লাইন-আপ, পটাপট নিজের ঘূর্ণি জাদুতে ব্যাটারদের একপ্রকার বোকা বানিয়ে ৮৮ রান খরচায় নিয়ে ফেললেন পাঁচখানা উইকেট।

২২২ রানে নবম উইকেটের পতন অজিদের, জয়োৎসবের আগাম প্রস্তুতি চলছে ক্যারিবীয় শিবিরে। ক্রিজে তখন একপ্রান্তে ১ রানে অপরাজিত আছেন স্পিনার রিং আর তার নব্য সাথী পেসার জনস্টন। নিখাদ বোঝাপড়া সাথে নিখুঁত তাল মিল, চোখ জুড়নো মন দোলানো ব্যাটিং করে যাচ্ছেন দু’জন অন্তিম যোদ্ধা। প্রত্যয়ী ক্যারিবীয় দূর্গে তখন চলছে হতাশার গোলাবর্ষণ, আর সেই হতাশার ইতি ঘটলো অজিদের ম্যাচ জয়ের মধ্যদিয়ে। জয়ের বাধা ডিঙোতে প্রয়োজনীয় ৩৮ রান তুলে নেয় এই জুটি। রিং করেন ৩২ আর জনস্টনের ব্যাট থেকে আসে ৭ রান, এই ঐতিহাসিক জয়ে সিরিজটাও নিজেদের করে নেয় ক্যাঙারু বাহিনী।

জিমি অ্যাডামস-কোর্টনি ওয়ালশ জুটি (ওয়েষ্ট-ইন্ডিজ) :

৭০-৮০ দশকের সেই অপ্রতিরোধ্য, এক রকম প্রায় অজেয় ওয়েষ্ট-ইন্ডিজ দলটির আজ নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে টানাটানি। টি-টোয়েন্টিতে তারা তাদের রাজত্ব কায়েম করলেও বাকি দুই ফরম্যাটে একেবারেই নিস্প্রভ। বিংশ শতাব্দীর শেষ থেকেই তাদের এমন হাভাতে অবস্থার আরম্ভ। তবে, ভস্মীভূত ছায়ে যেমন চাপা আগুন থাকে তেমনই ক্যারিবিয়ানরাও হাল ছাড়ার পাত্র না সেটা তারা পুনরায় জানান দেয় ২০০০ সালে ঘরের মাঠে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে।

একেবারে যে তারা ফুরিয়ে যায়নি, তাদেরকে যে বাতিলের খাতায় স্থান দিতে হবে এমন দৈন দশার সম্মুখীনও যে তারা এখনো হয়নি সেটা উক্ত সিরিজে পুরো ক্রিকেট বিশ্বকে তারা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলো।

সিরিজে প্রতাপ দেখানো ক্যারিবিয়ানদের সেন্ট জোনসের উইকেটে পাকিস্তান বধে প্রয়োজন মাত্র ২১৬ রান। পুরো সিরিজে দাপট দেখানো ঘরের ছেলেদের কাছে এতো মামুলি লক্ষ্য! ছোট টার্গেটের প্রারম্ভিকাও হলো মনোপূত। লারার ব্যাটে চড়ে বেশ ঘোড়ার বেগে ছুটছে জয়রথ। হঠাৎ যান্ত্রিক বিচ্যুতি, লারার বিদায়ে স্কোর ১৪৪/৩। এক তরফা ম্যাচে এলো টুইস্ট, গল্পে দেখা মিললো নতুন চরিত্রের। সে সময়ে পাকিস্তানের সুইং বিশারদ ওয়াসিম আকরামের আগুনে বোলিংয়ে তালকানা হয়ে পড়ে দ্বীপপাড়ের ছেলেরা। ৫১ রান তুলতেই নেয় ৬ উইকেট, রানের খাতায় জমা পড়েছে ১৯৭ রান। খোয়া গেছে নয় উইকেট।

চতুর্থ ইনিংসে ওয়াসিমের নামের পাশে যোগ হয়েছে ৫ উইকেট। ক্রিজে স্থিতু হয়ে যাওয়া অধিনায়ক জিমি অ্যাডামসের সাথে জুটি বেঁধেছেন গত অষ্ট্রেলিয়া সফরে ব্যাটিংয়ে ঝলক দেখানো পেসার কোর্টনি ওয়ালশ। একদিকে যেমন নিজের উইকেট বাঁচিয়ে ডিফেন্সের মহড়ায় ব্যস্ত ওয়ালশ অন্যদিকে বাকি রানের খোঁজে জিমি। চপলতা আর নিখাদ ধৈর্য্য দেখিয়ে ৭২ মিনিটের স্নায়ুযুদ্ধে জয়ী হয়ে বাকি ১৯ রান তুলে নেয় এই জুটি। অধিনায়ক অ্যাডামস খেলেন ২১২ বলে ৪৮ রানের এক ম্যারাথন নক। ২৪ বল খেলে ৪ রান করে অপরাজিত থাকেন কোর্টনি ওয়ালশ।

লেখা- বিপ্রতীপ দাস।

৯৭ ডেস্ক

Read Previous

চার মাসেও ম্যাচ ফি বুঝে পায়নি ক্যারিবীয় ক্রিকেটাররা, নেপথ্যে বাংলাদেশ!

Read Next

যেসব আলোচনা হল আইসিসির সিইসি সভাতে

Total
8
Share
error: Content is protected !!