কোচ বাবার রাতের ঘুম কেড়ে নেওয়া কাইল মায়ের্স

টুইটার জুড়ে চলছে কাইল মায়ের্স বন্দনা

১৯৯৫ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সফরে আসেন শ্যারলে ম্যাকডোনাল্ড ক্লার্ক। ঢাকা স্টেডিয়ামে খেলতে নেমে রীতিমত অবাকই হয়েছেন বারবাডোসের এই ক্রিকেটার। মূলত জুনিয়র লেভেলের ক্রিকেটে প্রায় ৩০ হাজার দর্শক গ্যালারিতে হাজির থাকাটাই তাকে বিস্মিত করেছে। এমনকি গ্যালারির দর্শকদের ছোঁড়া ফায়ারক্রেকের ভয়ে অধিনায়ককে অনুরোধ করে বাউন্ডারিতে ফিল্ডিং করা থেকেও বিরত ছিলেন।

২০২১ সালে তারই ছেলে কাইল মায়ের্স বাংলাদেশের মাটিতে বাংলাদেশের বিপক্ষে অভিষেক টেস্টেই খেললেন মহাকাব্যিক এক ইনিংস। যে ইনিংসে বিশ্ব ক্রিকেটে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে মায়ের্সের নাম। কিন্তু করোনার কারণে চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামের ফাঁকা গ্যালারির সামনেই রেকর্ড গড়ে অবিশ্বাস্য এক জয় উপহার দিয়েছেন ক্লার্ক পুত্র। এ দফায় অবশ্য অবাক, বিষ্ময়ের চাইতে কিছুটা আক্ষেপেই থাকার কথা মায়ের্সের বাবার।

২৬ বছর আগে জুনিয়র পর্যায়ের ক্রিকেট দেখতে গ্যালারি ভরে যাওয়া শ্যারলে ক্লার্ককে অবাক করেছিল। তবে এবার নিশ্চিতভাবেই প্রচন্ড রকমের খুশি হতেন সাগরিকার গ্যালারি ভর্তি দর্শক সিনিয়র পর্যায়ে ছেলের কীর্তির সাক্ষী হলে। খালি গ্যালারি হলেও কাইল মায়ের্স যা করেছেন তাতে ক্রিকেট বিশ্বে আলোড়ন ফেলেছেন বেশ ভালোভাবে। একের পর এক রেকর্ডে ধুলোজমা বেশ কিছু পরিসংখান করিয়েছেন হালনাগাদ।

২৮ বছর বয়সে চট্টগ্রাম টেস্টে অভিষেক হওয়া কাইল মায়ের্স বেড়ে উঠেছেন ক্রিকেট পরিবারে। ছোট বেলা থেকেই ক্রিকেটীয় আবহে বড় হলেও জাতীয় দলের দরজাটা উন্মোচিত হয়েছে বেশ দেরিতেই। এর মাঝে দেখতে হয়েছে, লড়তে হয়েছে, শিখতে হয়েছে অনেক কিছু।

চট্টগ্রাম টেস্টের চতুর্থ দিন শেষ করেছেন ৩৭ রানে অপরাজিত থেকে। পঞ্চম দিন যখন ব্যাট করতে নামেন তখন ইস্ট ক্যারিবিয়ান ঘড়িতে সময় রাত সাড়ে ১১ টা। লেভেল থ্রি কোচ বাবা শ্যারলে ক্লার্ক টিভি চালু করে ছেলের ব্যাটিং দেখতে বসলেন। ভাবলেন আউট হলেই টিভি বন্ধ করে ঘুমাতে যাবেন। কিন্তু মায়ের্স তো আউট হলেনইনা সাথে নানা রেকর্ড সঙ্গী করে দলকে জেতালেন অবিশ্বাস্যভাবে।

সে রাতে আর ঘুমাতে পারলেন না শ্যারলে ক্লার্ক। ছেলে যে ব্যাটিং করেছেন সারাদিন (ক্যারিবিয়ান সময়ে সারারাত)। সকাল হতেই ঐতিহাসিক জয়ের নায়ক বনে গেলেন। নিদ্রাবিহীন রাত কাটানো ক্লার্কের শরীরে ক্লান্তি আসেনি একটুও। চারদিক থেকে আসছে অভিনন্দন বার্তা। একের পর এক ফোন, ম্যাসেজে বেশ ব্যস্ত সময়ই কাটছিল। রাত পেরিয়ে সকাল, সকাল গড়িয়ে বেলা বেশ আনন্দ চিত্তে হাজার মাইল দূরে বসে ছেলের গড়া কীর্তির আনন্দ জোয়ারে ভাসছিলেন।

কাইল মায়ের্সের কারণে এবারই প্রথম রাতের ঘুম বিলীন হয়নি শ্যারলে ক্লার্কের। ২০১৭ সালে একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্টের প্রস্তুতি ক্যাম্পে অংশ নিতে জ্যামাইকায় যান মায়ের্স। কিন্তু হঠাত সেখানে শুরু হয় হ্যারিকেন মারিয়া। যে ঝড়ে লন্ডভন্ড হয়ে যায় শহর, বিচ্ছিন্ন হয় যোগাযোগের সব মাধ্যম। মায়ের্সের অবস্থান করা বাড়ির ছাদও উড়ে গিয়েছিল, প্লাবিত হয়েছিল আশেপাশের সবকিছুই।

তবে প্রাণহানি কিংবা আহত না হওয়া মায়ের্স নিরাপদে থাকলেও যোগাযোগ করতে পারেননি পরিবারের সাথে। টানা দুইদিন ছেলের খোঁজ না পেয়ে পাগলপ্রায় শ্যারলে ক্লার্ক সহ গোটা পরিবার, কেটেছে ঘুমবিহীন রাত। পরে জ্যামাইকান পুলিশ ও কোস্ট গার্ডদের সাহায্যে যোগাযোগ হয় মায়ের্স ও তার পরিবারের।

জাতীয় দলের জার্সি গায়ে না উঠলেও ক্যারিবিয়ায়ন ক্রিকেটে পরিচিত মুখ শ্যারলে ক্লার্ক। ৪৪ বছর বয়সী ক্লার্ক খেলেছেন ১২ টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ, আছে ৫ টি লিস্ট’এ’ ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতাও। ২০০৮ সালে স্বীকৃত ক্রিকেটে সর্বশেষ খেলা এই অলরাউন্ডার শেষদিকে ছেলে কাইল মায়ের্সের সাথেও একই দলে খেলেছেন। পরবর্তীতে কাজ শুরু করেন পেশাদার কোচ হিসেবে। ফলে কাইল মায়ের্স কোচ হিসেবে বাবা শ্যারলে ক্লার্ককে পেয়েছেন সবসময়ই।

তবে মায়ের্সের ক্রিকেট প্রতিভা আবিষ্কার করেন তার চাচা টেরি ক্লার্ক। এরপর ছেলের রক্তে মিশে আছে ক্রিকেট সেটা জেনেছেন নিজেও। বাবা-চাচারা যখন খেলতো তখন শিশু মায়ের্সও অনুসরণ করতেন তাদের, মাঠে কাটাতেন দিনের পর দিন। ক্রিকেটের প্রতি ভাতিজার ভালোবাসা দেখে টেরি ক্লার্কই স্কুল পর্যায় থেকে ক্লাব পর্যায়ে নিয়ে যান মায়ের্সকে। ঐ বয়সেই ছেলের প্রতিভা অবশ্য ধীরে ধীরে মনে ধরতে শুরু করে বাবা ক্লার্কের।

সময়ের সাথে সাথে বাবাই দিয়েছেন সবচেয়ে বেশি সঙ্গ। ক্রিকেট ব্যাকরণের তালিমটা ঠিকঠাক মাথায় গেঁথে দিতে চেয়েছেন পুত্রের। বয়সভিত্তিক পেরিয়ে ২০১১ সালে সিনিয়র ক্রিকেটে পদার্পন বাঁহাতি এই ব্যাটসম্যানের। প্রথম শ্রেণি, লিস্ট ‘এ’ ও টি-টোয়েন্টি অভিষেক চার বছরের ব্যবধানে। ২০২১ সালে এসে গায়ে উঠে জাতীয় দলের জার্সি। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি অভিষেকের পর চলমান বাংলাদেশ সফরেই হল ওয়ানডে অভিষেক।

আর সদ্য সমাপ্ত চট্টগ্রাম টেস্টেতো অভিষেকেই রেকর্ড বইয়ে তুললেন ঝড়। তার ২১০ রানের হার না মানা ইনিংসে দল পেয়েছে ৩৯৫ রানের পাহাড়সম লক্ষ্য তাড়া করে ৩ উইকেটের জয়। এশিয়ার মাটিতে সর্বোচ্চ রান তাড়া করার পথে অভিষেকে চতুর্থ ইনিংসে ডাবল সেঞ্চুরি হাঁকানো একমাত্র ব্যাটসম্যান বনে যান কাইল মায়ের্স। তার মহাকাব্যিক এই ইনিংসে চারদিন চালকের আসনে থেকেও হারতে হয়েছে বাংলাদেশকে।

ম্যাচ শেষে বারবাডোস থেকে বাবার সাথে যোগাযোগ হয় কাইল মায়ের্সের। ফোনে কথা শুনে বাবা শ্যারলে ক্লার্ক আঁচই করতে পারেননি এমন কীর্তি গড়ার পরও কোন আবেগ ছুঁয়েছে কিনা কাইল মায়ের্সকে। তবে তার দেখা সবচেয়ে ইতিবাচক মানসিকতার একজন ছেলে মায়ের্স, বিনয়ের দিক থেকেও বাঁহাতি এই ব্যাটসম্যানকে জায়গা দিয়েছেন অনেক উচ্চতায়। অভিষেকটা রাঙিয়েছেন স্বপ্নের চেয়েও বেশি মধুরভাবে। অনন্য কীর্তি গড়া মায়ের্সের পা মাটিতেই থাকবে বিশ্বাস শ্যারলে ক্লার্কের।

বাবার প্রতি কৃতজ্ঞ মায়ের্সও জানিয়েছেন তার ক্রিকেট ক্যারিয়ারে বাবার অবদান কতখানি। রেকর্ড গড়া ইনিংস খেলার পথে নিজেকে প্রস্তুতের যাত্রায় বাবাই তাকে গড়ে তুলেছেন ইস্পাত কঠিন করে।

গতকাল ম্যাচ শেষে বাবার সাথে জুম কলে আলাপে মায়ের্স বলেন, ‘তুমি জানো এই সফরের জন্য যখন বারবাডোসে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, কতটা পরিশ্রম করেছি আমি। তুমি জানো সুযোগ পেয়ে আমার কেমন অনুভূতি হয়েছিল। তুমি যেভাবে আমাকে সাহায্য করেছো, কোচিং করিয়েছো এবং আমাকে এই সিরিজের জন্য তৈরি করেছো তার জন্য তোমাকে শুধু ধন্যবাদ ছাড়া আর কি দিতে পারব!’

লকডাউনের সময়টা কঠিন হলেও ঘরে যখন বাবাই কোচ, প্রস্তুতিতে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে থাকারই কথা ছিল কাইল মায়ের্সের। মায়ের্স নিজেই শোনালেন সেই গল্প, ‘লকডাউন খুব কঠিন ছিল। তবে আমার সৌভাগ্য যে বাবাকে পেয়েছিলাম, তিনি একজন লেভেল-থ্রি কোচ। লকডাউনের পুরো সময়টায় বাবা আমার সঙ্গে লেগে ছিলেন। আমরা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করেছি।’

তথ্য সূত্রঃ ক্রিকবাজ, ইএসপিএনক্রিকইনফো ও ক্যারিবিয়ান গণমাধ্যম

নাজমুল হাসান তারেক

Read Previous

আইসিসি ক্রিকেটার অব দ্য মান্থ পান্ট-শাবনিম

Read Next

২৩ দিনের জন্য এনে ৭০ দিনের বেতন দিতে হত ভেট্টোরিকে!

Total
12
Share