শুভ জন্মদিন লিজেন্ড, মুছে যাওয়া দিনগুলি

৯৭ প্রতিবেদক: টি ইসলাম তারিক

প্রকাশ: 4 ঘন্টা আগে আপডেট: 1 সেকেন্ড আগে
শুভ জন্মদিন লিজেন্ড, মুছে যাওয়া দিনগুলি

শুভ জন্মদিন লিজেন্ড, মুছে যাওয়া দিনগুলি

শুভ জন্মদিন লিজেন্ড, মুছে যাওয়া দিনগুলি

আমি মোহামেডানের একজন খুদ্র সমর্থক । সেই ১৯৮০ থেকে মাঠে বসে খেলা দেখা শুরু, যা আজো অব্যাহত আছে । বিশেষ করে মোহামেডান আবাহনী ম্যাচ ফুটবল, ক্রিকেট কিংবা হকি কোনটা বাদ গেছে তা মনে পড়ে না । আজ ক্রিকেটের শ্বাসরুদ্ধকর মোহামেডান আবাহনী একটা ম্যাচের গল্প বন্ধুদের সামনে তুলে ধরার চেস্টা করবো ।

২৭ মার্চ ১৯৯৫ সালের কথা । ক্রিকেট লীগের দুই জনপ্রিয় দল মোহামেডান আবাহনী ম্যাচ । সকালেই স্টেডিয়াম পাড়ায় দুই দলের সমর্থকদের ঢল । আমিও সকালেই স্টেডিয়ামে চলে যাই । আমার অবস্থান মোহামেডানের পশ্চিম গ্যালারীর মশালের কাছাকাছি । মাঠে ঢুকেই বরাবরের মতো দশ টাকার না ধুয়া প্লেটের তেহারি চালিয়ে দেই । আবাহনীর ব্যাটিং চলছে । আবাহনীর পাকিস্তানি রিক্রুট ইকবাল সিকান্দার ৪৮, হারুনুর রশীদ লিটন ৪৩, দুর্জয় মাত্র ১৯ বলে ৪৩, নান্নু ৩৬, আকরাম খান ২৯ এবং সাইফুল মাত্র ৭ বলে ২২ ! আবাহনীর কোন ব্যাটসম্যান ফিফটি না করতে পারলেও ৪৫ ওভারে ৬ উইকেটে দলীয় স্কোর ২৬০ রানের টার্গেট ছুড়ে দেয় মোহামেডানকে । শেষ দিকে আবাহনীর সাইফুল আর দুর্জয়ের বেপরোয়া ব্যাটিং বুকের মধ্যে যেন তীর বাধছিলো । সাইফুল মাত্র ৭ বলে ২২ রান করে তার শক্তিমত্তার পরিচয় দেন । উৎফুল্ল আবাহনীর শিবির । দুশ্চিন্তার ভাজ পড়েছে আমার কপালে । 

সমর্থকদের ভীড়ে ঠেলে লাঞ্চ করতে বাইরে যাবার উপায় নাই । সকালের সেই দশ টাকার তেহারির ফুয়েলেই টিকে আছি । করতালির আওয়াজ বলে দিচ্ছে মাঠে নামতে প্রস্তুত ওপেনার নাদিম ইউনুস আর নোবেল । মোহামেডানের ব্যাটিংয়ের সময় বুকটা ধড়াস ধড়াস করে । প্রচন্ড গরমে রৌদ্র মাথায় নিয়ে মোহামেডানের ব্যাটিং শুরু । দলীয় ৭ রানের মাথায় রান আউটের ফাদে পড়ে আউট হন নোবেল । রানের পুজি ১৬ হতেই মোহামেডানের রান মেশিন পাক রিক্রুট নাদিম ইউনুস আর ভারতীয় প্রবীন আমরেকে প্যাভিলিয়নের পথ দেখান পর পর দুই বলে আবাহনীর আরেক পাক রিক্রুট নাভেদ আঞ্জুম । 

প্রবীন আমরের প্রতি আমার আস্থা কখনোই ছিলো না, তবুও বিগ ম্যাচে হয়তোবা কিছু একটা করতে পারে এমন ভাবনা ছিলো কিন্তু নাভেদ আঞ্জুমের প্রথম বলের মোকাবেলাতেই শুন্য রানে আমরে আউট হয়ে গেলে আমি হতাশ হয়ে পড়ি । এমনিতেই আমার নার্ভ খুব দুর্বল তারপর ১৬ রানে ৩ উইকেটের পতন আমাকে আর স্থির হতে দেয় নি । আমি ডান বাম না তাকিয়ে সোজা বাসার পথে রিক্সা যোগে রওনা দেই । মালিবাগ রেলগেটের কাছে একটা কনফেকশনারি থেকে কোক নিয়ে গলাটা ভিজিয়ে নেই । দোকানি রেডিওতে খেলার ধারাবিবরণী শুনছেন । সেখান থেকেই জানলাম উইকেট সেই তিনটাই গেছে । বাসায় এসে গোসল সেরে দুটো ভাত মুখে দিয়ে রেডিও অন করি । মোহামেডানের স্কোর ২০ ওভারে ৪ উইকেটে ৮৬ । স্বীকৃত ব্যাটসম্যান বলতে আমিনুল ইসলাম বুলবুল আর সেলিম সাহেদ । মোহামেডানের প্রয়োজন ২৫ ওভারে ১৭৪ । একটু কঠিনই বটে । ম্যাচ যখন পুরো নির্ভর করছে বুলবুলের উপর তখন বুলবুলের রান সবে মাত্র ৩ ! ঠিক সে মুহুর্তে দুর্জয়ের করা বল বুলবুলের ব্যাট আলতো ভাবে ছুয়ে একটা সহজ ক্যাচে পরিনত হয়েছিলো যা ইকবাল সিকান্দার ফেলে দেন । তা না হলে জয়ের উৎসবটা আবাহনী তখনই সেরে ফেলতে পারতো । মেধাবী বুলবুল একপ্রান্ত আগলে রেখে অন্যান্যদের দিয়ে এগিয়ে চলেছেন । 

ধীরে ধীরে মোহামেডান লক্ষ্যে পৌছতে থাকে । এক সময় শেষ ৫ ওভারে জয়ের জন্য প্রয়োজন ২৯ রান, হাতে উইকেট ২ । হাসিবুল হোসেন শান্ত ১৩ বলে ১৩ করে আউট হলে শেষ ২ ওভারে প্রয়োজন হয় ৭ রানের । ক্রিজে দেশ সেরা ব্যাটসম্যান বুলবুলের সাথে বাঁহাতি বোলার মোর্শেদ আলী খান সুমন । ৪৪ তম ওভারে নাভেদ আঞ্জুমের বলে ৬ রান যোগ হলে স্কোর সমান হয়ে যায় । অর্থাৎ জয়ের জন্য আর মাত্র ১ রান । আমার দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম । সার্কাসে দড়ির উপর দিয়ে যখন কেউ হেটে যায় তখন দর্শকদের চোখ থাকে সে ব্যাক্তির উপর । এই বুঝি পড়ে গেলো এমন একটা অবস্থা । ম্যাচের এই অন্তিম মুহুর্তে যেন দুই দলের সমর্থকদের অবস্থা অনেকটা সেরকম । ব্যাটিং প্রান্তে আছেন সুমন । আবাহনীর বোলার পাকিস্তানি ইকবাল সিকান্দার । সুমন আউট হলে ম্যাচ টাই হবে আর কম উইকেট হারানোর ফলে আবাহনীর জয় হবে । কি হতে পারে ! সমর্থকেরা উৎসুক হয়ে আছেন । রেডিওতে তখন মাইক্রোফোন মঞ্জুর হাসান মিন্টু ভাইয়ের কাছে । আমি বিছানায় উপুড় হয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছি । মিন্টু ভাই উত্তেজনাকর ম্যাচের শেষ দৃশ্যের বর্ননা করছেন তার দারুন কন্ঠে প্রস্তুত মোর্শেদ আলী খান সুমন, প্রস্তুত বোলার ইকবাল সিকান্দার । একপা দুপা করে এগিয়ে বল ছুড়লেন কিন্তু কোন রান নয় । দ্বিতীয় বল করার জন্য তার বোলিং প্রান্তে ফিরে গেলেন । এবারো কোন রান নয় । আমার হার্টবিট বেড়ে চলেছে তবে কি আর হবে না ? এই যায়গায় এসে মোহামেডান হেরে যাবে ? তৃতীয় বল করতে প্রস্তুত সিকান্দার । মিন্টু ভাইয়ের সেই কন্ঠ আজো কানে বাজে, 
ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বল করছেন সিকান্দার এবং সপাটে ব্যাট চালিয়েছেন সুমন, স্ট্রেইট ড্রাইভ, বল চলে যাচ্ছে সীমানার দিকে এবং চার, মোহামেডান জিতে গেছে । আমি চিতকার দিয়ে বলতে থাকি গো ও ও ল, গো ও ও ল ! মোহামেডান জিতে গেছে । খেলা যে ক্রিকেট আমার যেন সেটা মাথায়ই নাই । পরে ইনকিলাবের খেলার পাতায় শিরোনাম 
"ক্রিকেট লীগের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় এক ম্যাচ" 
বুলবুলের অধিনায়কোচিত অসাধারন ইনিংস দেখেছিলাম । সে ম্যাচে ৫৮ বলে ৭৫ রানের জ্বলজ্বলে ইনিংসের কথা আজো অনেক সমর্থকদের মনে আছে । ঘরোয়া ক্রিকেটে এমন শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচ এবং গ্যালারি ভর্তি দর্শক ইদানীং দেখা যায় না । রেডিওতে শুনতে পাইনা মঞ্জুর হাসান মিন্টু , আব্দুল হামিদ, খোদবক্স মৃধা কিংবা নুর আহমেদ ভাইয়ের কন্ঠ ! এরকম অনেক শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচের স্বাক্ষী হয়ে আছি । অবসরে হাতড়ে বেড়াই সেসব কালজয়ী ম্যাচের স্মৃতি গুলোকে । মনের অগোচরেই বাজতে থাকে মুছে যাওয়া দিন গুলি আমায় যে পিছু ডাকে !

শুভজন্মদিন লিজেন্ড আমিনুল ইসলাম বুলবুল