সাকিব প্রশ্নে রাজনীতি, আইন ও ক্রিকেটের জটিল সমীকরণ
৯৭ প্রতিবেদক: মোহাম্মদ আফজল
প্রকাশ: 3 ঘন্টা আগে আপডেট: 1 সেকেন্ড আগে
সাকিব প্রশ্নে রাজনীতি, আইন ও ক্রিকেটের জটিল সমীকরণ
সাকিব প্রশ্নে রাজনীতি, আইন ও ক্রিকেটের জটিল সমীকরণ
বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে সেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান এখন কেবল একজন ক্রিকেটার নন, তিনি এক জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ। মাঠের পারফরম্যান্স, সংসদ সদস্য পদ, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী মামলা। সব মিলিয়ে সাকিব এখন ক্রীড়াঙ্গনের গণ্ডি পেরিয়ে রাষ্ট্র ও রাজনীতির আলোচ্য বিষয়।
২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর মনোনয়নে মাগুরা-১ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন তিনি। ক্রিকেট মাঠের জনপ্রিয়তা তখন রাজনৈতিক মূলধনে রূপ নেয়। কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর সেই রাজনৈতিক পরিচয়ই হয়ে ওঠে তাঁর সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। আন্দোলন দমনে গুলিবর্ষণ ও প্রাণহানির ঘটনায় দায়ের হওয়া একটি হত্যা মামলায় তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত হয়। ফলে প্রশ্নটি আর কেবল নৈতিক বা রাজনৈতিক থাকে না, আইনি জটিলতাও সামনে চলে আসে। একজন সাবেক ক্ষমতাসীন দলের এমপি হিসেবে তাঁর অবস্থান নতুন ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হয়ে পড়ে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড-এর অবস্থানও নিছক ক্রীড়া-সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা কঠিন। ভারত অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ নিরাপত্তা ইস্যুতে না খেলার ঘোষণা, সম্ভাব্য আইসিসি নিষেধাজ্ঞার শঙ্কা এবং স্পনসরশিপের চাপ বোর্ডকে কৌশলগত সংকটে ফেলে। বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিচিত মুখকে বাইরে রাখা যেমন পারফরম্যান্সের ঝুঁকি, তেমনি ব্র্যান্ড ও অর্থনীতির প্রশ্নও জড়িত। ফলে সাকিবকে ফেরানোর আলোচনা ক্রিকেটের বাইরেও বার্তা বহন করে।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। নতুন সরকারের ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক সাকিবের দেশে ফেরার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখালেও মামলাগুলো আইনি প্রক্রিয়ায় মোকাবেলার কথা বলেছেন। সরকারের এই অবস্থান আপাতদৃষ্টিতে নিরপেক্ষ হলেও রাজনৈতিক ভারসাম্যের ইঙ্গিত দেয়। একদিকে জনপ্রিয় ক্রীড়া ব্যক্তিত্বকে পুরোপুরি দূরে সরিয়ে দেওয়া রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ, অন্যদিকে মামলার বিষয়টি উপেক্ষা করাও সম্ভব নয়।
এই জটিল বাস্তবতায় শুরু থেকেই সাকিবের পক্ষে কথা বলে আসছেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক খালেদ মাসুদ পাইলট। তিনি সাকিবের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে ভুল বলতে দ্বিধা করেন না, তবে সেটিকে চূড়ান্ত অপরাধ হিসেবেও দেখেন না। তিনি বলেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবে খালেদ মাসুদ পাইলট হিসেবে বলতে পারি, আমি সাকিবের বড় ভক্ত। মানুষ মাত্রই ভুল করে। সে হয়তো খেলা অবস্থায় কোনো একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িয়েছিল। কিন্তু জাতীয় দলে যখন খেলবে, তখন কোনো খেলোয়াড়েরই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকা উচিত নয়।”
জাতীয় দল ও জনআবেগের সম্পর্ক নিয়ে তিনি আরও বলেন, “জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের প্রতি সব মানুষের আবেগ থাকে। যখন আপনি কোনো একটি দলের সঙ্গে জড়াবেন, তখন বিষয়টি ভাগ হয়ে যায়। তাই জাতীয় দলে খেললে রাজনীতির বাইরে থাকাই ভালো।”
মামলার প্রসঙ্গে সাবেক এই অধিনায়কের মন্তব্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেন, “আমাদের দেশে অনেক ভুয়া মামলাও হয়। একজন আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় বিদেশ থেকে কাউকে হত্যা করবে, বিষয়টি আমার কাছে সন্দেহজনক মনে হয়।” একই সঙ্গে তিনি অভিযোগের বিষয়টি সরকারিভাবে পরিষ্কার করার আহ্বান জানান।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সাকিব ইস্যু তিনটি স্তরে দাঁড়িয়ে আছে। আইনি প্রক্রিয়ায় তিনি অভিযুক্ত, দোষী সাব্যস্ত নন। রাজনৈতিকভাবে তিনি সাবেক ক্ষমতাসীন দলের একজন এমপি ছিলেন, যা এখনো সংবেদনশীল পরিচয়। আর ক্রীড়া-অর্থনীতির দিক থেকে তিনি বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় ব্র্যান্ডগুলোর একটি।
সবশেষে পাইলটের বক্তব্যে এই বিতর্কের মানবিক দিকটি উঠে আসে। তিনি বলেন, “মানুষ ভুল করে। কিন্তু তাকে একজন খেলোয়াড় হিসেবে দেখা উচিত। আমি দোয়া করি, সে যেন সম্মানের সঙ্গে বাংলাদেশের জার্সিতে ক্যারিয়ার শেষ করতে পারে।”
অতএব প্রশ্নটি কেবল একজন ক্রিকেটারের প্রত্যাবর্তন নয়। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি আইনি প্রক্রিয়াকে চলতে দিয়ে একজন বিতর্কিত কিন্তু কিংবদন্তি খেলোয়াড়কে ক্রীড়াঙ্গনে পুনর্বাসনের পথ দেখাবে, নাকি তাঁকে রাজনৈতিক অধ্যায়ের অংশ হিসেবেই স্থায়ীভাবে চিহ্নিত করবে। সিদ্ধান্তটি তাই নিছক ক্রিকেটীয় নয়, বরং গভীরভাবে রাজনৈতিক।
