মুদ্রার এপিঠ – ওপিঠঃ টি-টোয়েন্টির আলো ঝলমলে অন্ধকার জীবন

97 Repoter: 97admin

Publish: messages.not_available Update: 1 second ago
মুদ্রার এপিঠ – ওপিঠঃ টি-টোয়েন্টির আলো ঝলমলে অন্ধকার জীবন

মুদ্রার এপিঠ – ওপিঠঃ টি-টোয়েন্টির আলো ঝলমলে অন্ধকার জীবন

মুদ্রার এপিঠ – ওপিঠঃ টি-টোয়েন্টির আলো ঝলমলে অন্ধকার জীবন

আধুনিক ক্রিকেট ভাসছে টি-টোয়েন্টির জোয়ারে! দ্রুত, সময় সঞ্চয়ী এবং ধুমধাড়াক্কা রানের এই খেলায় ডুবে আছে ক্রিকেট প্রেমীরা। এমন কি থেমে নেই জুয়াড়িরা পর্যন্ত! একেকটা টি-টোয়েন্টি লিগ চলা মানেই জুয়াড়িদের লাখ লাখ টাকার খেল। কখনও বা আয় হচ্ছে, আবার কখনও সব হারিয়ে পথে বসতে হচ্ছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের বড় বড় দেশ গুলো মজে আছে এই ক্রিকেটের জুয়ায়। কিছুদিন আগে চ্যাপেল ভাইদের বড়জন ইয়ান চ্যাপেল সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, এই টি-টোয়েন্টির কাছে হেরে যেতে পারে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট। যার প্রমান পাওয়া যায় আর কিছুদিন আগে শুরু হওয়া আইপিএল মৌসুমেই। কিছুক্ষন পরে এবারের আসরের ফাইনাল শুরু হতে যাওয়া লিগটায় যেনো ক্রিকেটাররা নিশ্চিন্তে খেলতে পারে সেজন্যে খেলোয়াড়েরা বোর্ডকে বলে রেখেছেন, আইপিএল চলাকালীন সময়ে কোনো দ্বি-পাক্ষিক আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আয়োজন যেন না করা হয়। বোর্ড খেলোয়াড়দের দাবি না মানলে তারা আইপিএলের কোটি টাকার মোহে জাতীয় দায়িত্বের থোড়াই কেয়ার করে খেলে যাচ্ছেন আইপিএল বা এর মত টি-টোয়েন্টি লিগ গুলোতে। প্রায় প্রতিটি ক্রিকেট খেলুড়ে দেশে এই টি-টোয়েন্টি লিগ চালু করার ফলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট হয়ে পড়েছে কোণঠাসা। বোর্ড চায় দলের হয়ে, দেশের হয়ে খেলুক খেলোয়াড়েরা কিন্তু খেলোয়াড়দের চিন্তা ভবিষ্যৎ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে ফ্রাঞ্চাইজি ভিত্তিক টি-টোয়েন্ট লিগ খেলে টাকা আয় করা। টি-টোয়েন্টি লিগের কারনে সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ড। অন্যান্য দেশ গুলোর মধ্যে দেশাত্মবোধ কাজ করলেও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ নিয়ে গড়া ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ডের অবস্থা এতটাই নাজেহান যে টি-টোয়েন্টি লিগের মোহে দলের তারকা খেলোয়াড়েরা বোর্ডের সাথে কেন্দ্রীয় চুক্তিতে পর্যন্ত যেতে চাচ্ছে না। এই চুক্তির বাইরে গিয়ে টি-টোয়েন্টি লিগ খেলে নিজেদের ফর্ম এবং ফিটনেস কতদিন ধরে রাখতে পারে তাই হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন আশংকার বিষয়। আর টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের অন্ধকারাচ্ছতা নিয়েই আজকের এই লেখা। বোর্ডের সাথে চুক্তিতে না গিয়ে আজকাল ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটাররা নিজেদের বানিয়েছেন টি-টোয়েন্টির ফেরারি। এদেশ ওদেশ ঘুরে তাদের পেশীশক্তির বলে ধুমধাড়াক্কা এক আমেজ নিয়ে একেকজন খেলে বেড়াচ্ছেন আর আয় করছেন কোটি কোটি টাকা। তাদের মধ্যে একজন হলেন ক্রিস গেইল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের এই দানব ক্রিকেটারের ইন্সটাগ্রাম ঘুরে দেখা গেলো আইভরি কোস্টের ফুটবল লিজেন্ড দিদিয়ের দ্রগমার সাথে পার্টিতে মগ্ন থাকার সব ছবি। কখনও বা কুমার সাঙ্গাকারার সাথে রাতের খাবার খাচ্ছেন কিংবা পুলে গা ভাসিয়েছেন অ্যালকোহলের গ্লাস হাতে নিয়ে। পরিধানে Cash is King (টাকাই রাজা) লেখা গেঞ্জি। টি-টোয়েন্টি লিগ গুলো মাতিয়ে বেড়ানো এই দানবের আলো ঝলমলে এই ছবি গুলো দেখে যে কোনো তরুন ক্রিকেটারের ঝোঁক যাবে টি২০ লীগ গুলোর প্রতি। কিন্তু এখানেই শুরু অন্ধকার এর জগতের! সারা বিশ্বজুড়েই লোকেরা নিজেদের চাকরী নিজেরাই দিয়ে বেড়াচ্ছেন। কামাচ্ছেন কাড়ি কাড়ি কিন্তু অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ব্যাপার টা খুব কম মানুষই ভেবে থাকেন। হয়ে পড়ছেন একা। ঠিক একই ভাবে টি-টোয়েন্টি লিগ খেলে বেড়ানো ক্রিকেটারেরা কামাচ্ছেন খুব কিন্তু রিস্কও কম নয়। “মানুষের চিন্তার চেয়েও এটা কঠিন কেননা নিজের সিদ্ধান্ত কে সঠিক করার দায়িত্ব একান্তই আপনার নিজের” – কথা গুলো বলেছেন ক্রিস গেইলেরই একজন সহ খেলোয়াড় স্যামুয়েল বাদ্রি। আরো বলেন,“পাশাপাশি আপনাকে আপনার কাজের এবং পরিবারের প্রতিও একটি সমন্বয় আনতে হয়।” অনিশ্চয়তার এই দুনিয়ায় কোনো চুক্তি ছাড়া টি-টোয়েন্টি খেলোয়াড়দের জীবন মানেই খেলা না থাকলে নিজের মনস্তাত্ত্বিক স্থিরতা ধরে রাখার দায়িত্ব সম্পূর্ণই নিজের। এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার্স এসোসিয়েশনের ফেডারেশন চেয়ারম্যান টনি আইরিশ বলেন, “নিজেদের ব্যাপারে এসকল স্বাধীন খেলোয়াড়দের নিজ দায়িত্বে অনেক বেশি চিন্তা ভাবনা এবং লক্ষ্য নির্ধারন করতে হয় নিজের দেখভালের পাশাপাশি। এক্ষেত্রে ক্রিকেট আজ আর কোনো দলীয় খেলা নয়।“ টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ফেরী করে বেড়ানো এই ফেরিওয়ালাদের জীবন রূপ নিচ্ছে টেনিস কিংবা গলফ খেলোয়াড়দের ন্যায় সম্পূর্ণ নিজস্বীতায়। যেখানে সাফল্য ব্যার্থতা সমান ভাবে তুলে নিতে হয় সম্পূর্ণ নিজের ঘাড়ে। “কোনো টি-টোয়েন্টি লিগ না চলাকালীন সময়ে চুক্তির মধ্যে আবদ্ধ না করা খেলোয়াড়দের নিজের ফিটনেস এবং পার্ফরম্যান্স ধরে রাখাটা এখানে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।“ – বলছিলেন স্যামুয়েল বাদ্রি। “খেলোয়াড়েরা যখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে নিজেদের বিরত রাখেন তখন ধারাবাহিকতা ধরে রাখাটা প্রায় অসম্ভবপর। কারন নিয়মিত ক্রিকেট না খেলার কারনে ক্রিকেটের সাথে তাদের একধরনের ব্যবধান চলে আসে।“ পূর্নাঙ্গ চুক্তির বাইরে থাকা খেলোয়াড়দের অনুশীলন থেকে শুরু করে সকল ধরনের ক্রিকেটীয় সহযোগিতা নিতে হয় ব্যক্তিগত কোচের কাছ থেকে। কিন্তু তা অধিকাংশ সময় অধিক ব্যয়বহুল। কারন ভালো কোচের অধীনে আপনাকে অনুশীলন করতে গেলে আপনাকে অধিক অর্থই লগ্নী করতে হবে। আবার বিভিন্ন লীগে বিভিন্ন দলের বিভিন্ন কোচের অধীনে খেলার কারনে তাদের খেলার উপর তা প্রভাব পরে। একেক কোচের একেক জ্ঞান গ্রহন করতে অনেকেরই সমস্যা হয়। “আবার ব্যক্তিগত কোচ পাওয়াও অনেকাংশে মুশকিল কারন এতে যেকোনো সময় চাকরি হারানোর ভয় থাকে তাই অনেক কোচ এই পথে হাঁটেননা।“ বলছিলেন টি-টোয়েন্টিরই একজন ব্যাটিং কোচ ট্রেন্ট উডহিল। টি-টোয়েন্টির এই মুক্ত জীবনে সবচেয়ে বড় যে সমস্যাটার মুখোমুখি হতে হয় চুক্তির বাইরে থাকা খেলোয়াড়দের তা হচ্ছে অনিশ্চিত এক ভবিষ্যৎ। ফ্রাঞ্চাইজি ভিত্তিক এই লিগ গুলোতে দলগুলো খেলোয়াড়দের নিয়ে থাকে শুধু মাত্র একটি মৌসুমের জন্যে। যদি কারো ফর্ম ঐ মৌসুমে খারাপ যায় তাহলে পরবর্তী মৌসুমে ওই খেলোয়াড় দল পাবেন কি পাবেননা তা অনেকাংশেই অনিশ্চিত। কেননা তারা নিজেদের প্রমান করার জন্যে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দেশের হয়ে খেলার সুযোগ পায় না। পায় না ফিরে আসার কোন মঞ্চ। পেশাদার ওই দল গুলো শুধু শুধু ঐ খেলোয়াড়কে কিনে টাকা নষ্ট করার জন্যে কখনই রাজি হয় হয় না। যার জন্যে ঝরে যায় অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড়। তাদের ভবিষ্যৎ নিমজ্জিত হয় ঘোর অন্ধকারে। একদিকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট তারকা খেলোয়াড়ের অভাবে হারাচ্ছে জৌলুস। আরেকদিকে টাকার লোভে পরে খেলোয়াড়দের খেলোয়াড়ি জীবন তলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে। যা থেকে মুক্তির একটিই উপায়, টি-টোয়েন্টি লিগ গুলোর জন্যে বেঁধে দেয়া উচিত বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা। যে সময়ের মধ্যে সব দেশের টি-টোয়েন্টি লিগগুলো অনুষ্ঠিত হবে। আর বাকি সময় চলবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট। সব খেলোয়াড়ের জীবন ক্রিস গেইলের ইন্সটাগ্রাম একাউন্টের মত নয়। এই অন্ধকার থেকে ক্রিকেট এবং খেলোয়াড়দের বাঁচানোর জন্যে তাই ক্রিকেট কন্ট্রোল সংস্থা আইসিসির উচিত অবিলম্বে টি-টোয়েন্টি লিগগুলোর ব্যাপারে একটি স্থায়ী পদক্ষেপ নেয়া। যেখানে দর্শক পাবে ক্রিকেটের নিখাদ স্বাদ, বোর্ড গুলোও আয় করতে পারবে আর খেলোয়াড়েরাও অর্থের মোহে পড়ে হারাবেনা ক্যারিয়ার। ক্রিকেট তার আকর্ষণ হারানোর আগেই একটি সুদূর প্রসারী ভাবনাই পারে ক্রিকেট কে নতুন যুগের সূচনা এনে দিতে। যার জন্যে এর চেয়ে উপযুক্ত সময় আর হয় না।