বাংলাদেশকে উড়িয়ে আফগানিস্তানের সিরিজ জয়

আফগানিস্তান মুশফিক
Vinkmag ad

ফেবারিট হিসেবে খেলতে নেমে আফগানদের কাছে সিরিজ হারল বাংলাদেশ। ১৪২ রানের হারে বোলিং–ব্যাটিং কোনোটিতেই রাশিদ-নবীদের বিপক্ষে বাংলাদেশের আধিপত্যের কোনো ছাপ ছিল না। টানা দুই জয়ে আফগানিস্তান প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জিতল। তাও আবার বাংলাদেশের মাটিতে। বিশ্বকাপ, এশিয়া কাপের আগে আফগানিস্তানের কাছে সিরিজ হার বড় ধাক্কা বাংলাদেশের জন্য।

প্রথম ম্যাচে অসহায় আত্মসমর্পণের পর এই ম্যাচে জয়ের কোনো বিকল্প ছিল না সাকিব, লিটনদের সামনে। কিন্তু এই সমীকরণ আর বাংলাদেশ মিলাতে পারল কই। সহজ জয়ে এক ম্যাচ হাতে রেখেই সিরিজ নিশ্চিত সফরকারী দলের। ঘরের মাঠে ওয়ানডে সিরিজ হারের লজ্জায় বাংলাদেশ। ২০১৫ সালের পর থেকে ইংল্যান্ড ছাড়া এই প্রথম কোনো দল বাংলাদেশের মাঠে ওয়ানডে সিরিজ জিতেছে। 

৩৩২ রানের পাহাড়সম লক্ষ্য তাড়ায় নেমে বাংলাদেশ গুটিয়ে গেছে ১৮৯ রান করতেই। আফগানিস্তানের ১৪২ রানের বড় জয়; রানের হিসাবে ওয়ানডেতে তাদের তৃতীয় সর্বোচ্চ জয়। একা হাতে লড়াই চালিয়ে শেষ ব্যাটার হিসেবে আউট হন ৬৯ রান করা মুশফিকুর রহিম। বোলিংয়ের সময় পায়ে চোট পাওয়া এবাদত হোসেন আর ব্যাটিং করতে নামতে পারেননি, তাই অলআউট বাংলাদেশ।

স্কোরবোর্ডে ২৫ রান উঠতেই বাংলাদেশ হারিয়ে ফেলে টপ অর্ডারের তিন ব্যাটারকে। অধিনায়ক লিটন দাস ব্যক্তিগত ১৩ রানে ফজলহক ফারুকির বলে ক্যাচ তুলে ফিরেন প্যাভিলিয়নে। তিনে নামা নাজমুল হোসেন শান্ত মুজিবের বলে হারিয়েছেন স্টাম্প। প্রথম ওয়ানডেতে ১২ করা শান্ত আজ ১ রানের বেশি পাননি।

তামিম ইকবালের বদলে সেরা একাদশে সুযোগ পাওয়া মোহাম্মদ নাইম শেখ ধুঁকতে ধুঁকতে শেষপর্যন্ত বিদায় নেন ২১ বলের বাউন্ডারি বিহীন এক ইনিংস খেলে। ডিপিএলের শীর্ষ রান সংগ্রাহক জাতীয় দলে ফিরে সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ। নাইমের প্রত্যাবর্তন ৯ রানেই থমকে যায়। বিশ্বকাপে ব্যাকআপ ওপেনার হিসেবে নেওয়ার জন্য নাইমকে সুযোগ দিয়েছিল টিম ম্যানেজমেন্ট। কিন্তু সেই ভয়ংকর ফারুকির বলেই ক্লিন বোল্ড নাইম।

তাওহীদ হৃদয় আর সাকিব জুটি গড়ে দলকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেও রাশিদ খান, নবীকে উইকেট দিয়ে বিদায় নিতে হয়েছে। ৪০ রানের জুটি ভাঙে তাওহীদ হৃদয় ১৬ করে রাশিদের গুগলিতে বোল্ড হলে। সাকিবও অবশ্য এরপর টিকে থাকতে পারেননি বেশিক্ষণ। মোহাম্মদ নবী সাকিবকে ফেরান লেগ বিফোরের ফাঁদে ফেলে।

আফিফ হোসেন ধ্রুবর গোল্ডেন ডাক। পরপর দুই ওভারে রাশিদ খান পকেটে নেন দুই শিকার। বিরতির পর জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়া আফিফও নিজেকে প্রমাণ করতে চরম ব্যর্থ; প্রথম ম্যাচে ৪, এই ম্যাচে ০। দলীয় ৭২ রানে ৬ষ্ঠ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ রূপ নেয় ধ্বংসস্তূপে। এই মুহূর্তে কাণ্ডারি হয়ে দাঁড়িয়ে যান মুশফিক-মিরাজ।

এই দুইয়ের ব্যাট থেকে স্কোরবোর্ডে যোগ হয় ৮৭ রান। তবে জুটি হুংকার দেওয়ার আগেই থামিয়ে দেন মুজিব-উর রহমান। লং অনে মিরাজের ক্যাচ লুফে নেন রহমত শাহ। ফেরার আগে ৪৮ বল খেলে মিরাজ করেন ২৫ রান। এর আগেই ৬৭ বলে পঞ্চাশ ছুঁয়ে যান মুশফিকুর রহিম।

মুজিব কোটার শেষ বলে তুলে নেন হাসান মাহমুদের উইকেট। মুজিবের তৃতীয় শিকারের সময় বাংলাদেশের নেই ৮ম উইকেট। এক ম্যাচ বাকি রেখে সিরিজ জিততে আফগানিস্তান দল তাদের পারফর্ম্যান্সের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখেছে।

রেকর্ড ব্রেকিং উদ্বোধনী জুটি! দুই ওপেনারের জোড়া শতক। রাজার মতো মুস্তাফিজ-মিরাজদের শাসন করে রহমানউল্লাহ গুরবাজের অনবদ্য ১৪৫, ইব্রাহিম জাদরান ফিরলেন শতরানে। উদ্বোধনী জুটিতেই আফগানিস্তানকে উড়ন্ত সূচনা এনে দিয়েছিলেন দুই ওপেনার গুরবাজ আর ইব্রাহিম। দুজনে মিলে ২৫৬ রানের জুটি গড়ে বাংলাদেশি বোলারদের হতাশায় ডোবালেন। এই এক জুটিতেই অনেক রেকর্ডের মালা গাঁথলেন তারা।

এর আগে বাংলাদেশ একাদশে ২ পরিবর্তন নিয়ে সিরিজের ২য় ওয়ানডেতে মাঠে নামে। শুরুর পাওয়ার-প্লের ১০ ওভারে কোনোপ্রকার পাত্তাই পায়নি বাংলাদেশি বোলাররা। বিপরীতে আফগানিস্তানের স্কোরবোর্ডে যোগ হয় ৬৭ রান। রহমানউল্লাহ গুরবাজ, ইব্রাহিম জাদরানের ওপেনিং জুটির দারুণ শুরু।

৪৬ বলে ৪০ রানে থাকা গুরবাজ সাকিবকে পরপর দুই বলে ৪, ৬ হাঁকিয়ে পঞ্চাশ ছুঁয়েছেন। ওয়ানডে ক্যারিয়ারের নিজের তৃতীয় ফিফটি খেলতে গুরবাজ খরচ করেন কেবল ৪৮ বল। গুরবাজের ব্যাটে ঝড়, জাদরানের।দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে মাত্র ১৪.২ বলেই আফগানদের দলীয় সংগ্রহ পৌঁছায় ১০৩ এ। ১৫ ওভার করতেই বাংলাদেশ অতিরিক্ত রান খরচে ২০।

২১.৫ ওভারে দেড়শত রান পূর্ন করে আফগানিস্তান। এর আগে উদ্বোধনী জুটি ভেঙেছে আগের সর্বোচ্চ ১৪১ রান। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ২০১২ সালের ম্যাচে শারজাহতে আফগান দুই ওপেনার জাভেদ আহমাদি ও করিম সাদিকের রেকর্ড এতোদিন অক্ষত থাকলেও গুরবাজ-জাদরানের ব্যাটে আজ লেখা হল নতুন রেকর্ড।

ক্যারিয়ারের তৃতীয় সেঞ্চুরির পর চট্টগ্রামেই নিজের চতুর্থ সেঞ্চুরির দেখা পান রহমানউল্লাহ গুরবাজ। সেঞ্চুরি করতে লেগেছে ১০০ বল, এরপর গুরবাজের উল্লাস ছিল দেখার মতো। আগের সেঞ্চুরির দিনে ২০২২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আফগানিস্তান পায় স্বস্তির জয়। বাংলাদেশের কাছে লজ্জার হোয়াইটওয়াশ থেকে রক্ষা পায় আফগানরা।

৭৫ বলে ফিফটি পূর্ণ করেন ইব্রাহিম জাদরান। পঞ্চাশ ছুঁয়ে ইব্রাহিম হন মারমুখী। উইকেটের দেখা মিলছিল না কোনো পরিকল্পনাতেই। ঘরের মাঠে ওয়ানডে ক্রিকেট ইতিহাসে এবারই বাংলাদেশ প্রথম ৩০ ওভারের মধ্যে ওপেনিং জুটি ভাঙতে ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশের বিপক্ষে ওয়ানডেতে দ্বিতীয় সেরা জুটি এটি। এর আগে ২০১৭ সালে প্রোটিয়া ওপেনার কুইন্টন ডি কক এবং হাশিম আমলা মিলে করেন হার-না-মানা ২৮২ রান।

অবশেষে মিলল উইকেটের সন্ধান। ২৫৬ রানে আফগানিস্তানের প্রথম উইকেট ফেলতে পারল বাংলাদেশ। সাকিব আল হাসান লেগ বিফোরের ফাঁদে ফেলেন রহমানউল্লাহ গুরবাজকে। ফেরার আগে অবশ্য ওয়ানডে ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ রানের ইনিংস খেলে গেছেন গুরবাজ। টাইগার বোলারদের বিরুদ্ধে এদিন প্রথম থেকেই আক্রমণাত্মক ইনিংস খেলা শুরু করেন তিনি। তার ইনিংসে ভর করেই বড় সংগ্রহের পথে এগোয় আফগানিস্তান। ১২৫ বলে ১৪৫ রানের অনবদ্য এই ইনিংস সাজানো ছিল ১৩টি চার এবং আটটি ছয়ে।

তিনে নামা রহমত শাহ দুই রান করতেই হয়েছেন এবাদতের শিকার। সমান দুই রানে অধিনায়ক হাশমতউল্লাহ শহীদি হয়েছেন বোল্ড। মিরাজের দারুণ এক ডেলিভারিতে স্টাম্প উঠে যায় আফগান অধিনায়কের। মাত্র ১০ রানের ব্যবধানে তিন উইকেট হারিয়ে ফেলে আফগানিস্তান।

মেহেদী হাসান মিরাজের দ্বিতীয় শিকার ১০ রানে থাকা নাজিবউল্লাহ জাদরান। ইব্রাহিম জাদরান শতক হাঁকিয়ে পরের বলেই নিয়েছেন বিদায়। প্যাভিলিয়নে ফেরার আগে ১১৯ বলে ৯ চার ও ১ ছয়ে এই ইনিংস সাজান ইব্রাহিম। ৬ রানের বেশি পাননি রাশিদ খান। সাকিবকে এগিয়ে খেলতে গিয়ে হয়েছেন স্টাম্পড। নিজের কোটার শেষ ওভারে মুস্তাফিজ দ্বিতীয় শিকার বানালেন আজমতউল্লাহ ওমরজাইকে (২)। হাসান মাহমুদ ফেরালেন ৫ রান করা মুজিব-উব-রহমানকে। 

শেষপর্যন্ত নির্ধারিত ৫০ ওভারে আফগানিস্তান স্কোরবোর্ডে যোগ করে ৩৩১ রান, ৯ উইকেট হারিয়ে।

৯৭ প্রতিবেদক

Read Previous

সাকিবের পুরনো ঘরে নেতা হয়ে এলেন তামিম

Read Next

ভারত, পাকিস্তান যা পারেনি এবার তা-ই করে দেখাল আফগানিস্তান

Total
0
Share