জোর করে সাকিব-তামিম বানানোর মিশনে নেমেছে অভিভাবকরা

জোর করে সাকিব-তামিম বানানোর মিশনে নেমেছে অভিভাবকরা
Vinkmag ad

গতকাল শুক্রবার (২৯ জুলাই) ছুটির দিন, বিকেল পাঁচটায় রাজধানীর আফতাব নগর ব্রিজ পার হয়ে কিছুটা সামনে এগোতেই চোখে পড়লো বেশ কিছু ক্ষুদে ক্রিকেটার অনুশীলন করছে। অনুশীলন মাঠের খানিক দূরেই কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে চেয়ার পেতে বসে আছে ৮-১০ বা বড়জোর ১২ বছর বয়সী সন্তানের অভিভাবকরা। ছুটির দিনেও ছেলেকে নিয়ে মাঠে আসায় একটুও ক্লান্তি নেই এসব বাবা-মায়ের। বরং ছেলে ভবিষ্যত ক্রিকেটার হবে এমন স্বপ্নে নিজেদের সব ত্যাগ স্বীকারে আপত্তি নেই।

খুব কম বয়সী শিশু বলেই অনুশীলন চলাকালীন এই প্রতিবেদকের আলাদা একটা আগ্রহ তৈরি হয়। কিছুক্ষণ অনুশীলন দেখার পর কথা হয় তাদের কোচের সাথে। ঐতিহ্যবাহী মোহামেডান ক্লাবের আয়োজনে দিন কয়েক পরই শুরু হচ্ছে অনূর্ধ্ব-১২ একাডেমি কাপ। সে টুর্নামেন্টে অংশ নিতে শর্ত একাডেমি নিবন্ধিত হতে হবে। কিন্তু ক্ষিলক্ষেত মিলন একাডেমির নেই নিবন্ধন। তাই বলে কি কোচ সৈকত মিলনের একাডেমিতে থাকা প্রতিভাবান ক্রিকেটাররা এই টুর্নামেন্টে অংশ নিবে না?

উপায় একটা ঠিকই বের করেছেন মিলন। নিবন্ধন থাকা বনশ্রী ক্রিকেট একাডেমিতে ট্রায়াল দেওয়ান ১০ ক্রিকেটারকে। সেখান থেকে নির্বাচিত হয় ৭ জন, যারা আসন্ন টুর্নামেন্টে অংশ নিবে। আর এই ক্ষুদে ক্রিকেটারদের বাবা মা-ই অপেক্ষা করছে বাইরে।

No description available.

একটা সময় বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া প্রায় প্রতিটি সন্তানের বাবা-মা চাইতো তাদের ছেলে-মেয়ে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হবে। জাতীয় দলের বহু ক্রিকেটারের ক্ষেত্রে লেখা হয়েছে পরিবারের অবাধ্য হয়ে শেকল ভাঙার গল্প। কত শত প্রতিভা অকালেই ঝরে পড়েছে বাবা-মায়ের ইচ্ছে পূরণে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হতে গিয়ে।

তবে সেই প্রেক্ষাপট বদলেছে, সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবালরা সে পথে এনেছেন পরিবর্তন। দেশের ক্রিকেটেরও গতি বদলেছে। দল হিসেবে বাংলাদেশকে সমীহ করে সবাই তারকাদের তালিকা করলে ক্রিকেটাররাই আছেন উপরের দিকে।

তারকা খ্যাতির সাথে ক্রিকেট এখন পেশা হিসেবে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে বেশ ভালোভাবে। তাইতো ঘরে ঘরে চলছে সাকিব, তামিম, রিয়াদ, মুশফিক,মাশরাফি কিংবা হালের আফিফ, মিরাজ, লিটন তৈরির মিশন।

কিন্তু বিপত্তিটা এখানেই, সন্তান জন্মের আগেই কেউ কেউ ঠিক করে ফেলছেন ভবিষ্যতে ক্রিকেটার বানাবেন। যে কারণে বোধ শক্তি আসার আগেই শিশুদের স্কুল ব্যাগের সাথে ক্রিকেট সরঞ্জাম নিয়ে নামানো হচ্ছে ক্রিকেটার বানানোর মিশনে। যেখানে শিশু নিজে কি হতে চায় কিংবা আদৌ তার ক্রিকেটার হওয়ার মতো প্রতিভা আছে কীনা সেটা জানার প্রয়োজনও মনে করছে না কিছু কিছু অভিভাবক।

অভিভাবকদের এমন আগ্রহ নিশ্চিতভাবেই প্রশংসনীয়, দেশের ক্রিকেটের জন্য ইতিবাচক। তবে জোর করে ক্রিকেটার বানানোর ভাবনাটা অবশ্যই প্রশংসার চাইতে নিন্দার কারণই হবে বেশি। দেশের প্রায় সব ক্রিকেট একাডেমিতেই উপচে পড়া ভীড়। সামান্য একটু জায়গাতে কয়েকটি ক্রিকেট একাডেমি মিলে-মিশে শতাধিক ক্রিকেটারকে এক সাথে অনুশীলন করাচ্ছে। এতে করে একজন প্রতিভাবান খুঁজে বের করে তাকে সঠিক পরিচর্যা করা কঠিনই হচ্ছে।

No description available.

বনশ্রী ক্রিকেট একাডেমির সহকারী কোচ ও সাবেক প্রথম শ্রেণি ক্রিকেটার মহিউদ্দিন মহি ‘ক্রিকেট৯৭’ কে যেমন বলছিলেন তারা প্রচুর ক্রিকেটার পেলেও ভালো মানের ক্রিকেটার পাচ্ছেন কমই। অভিভাবকদের বাড়তি জোরাজুরিকেই এর জন্য দায়ী করছেন তিনি।

তার ভাষায়, ‘এখন অবশ্য কিছুটা বদলাচ্ছে (পরিবারের আগ্রহ)। পরিবার থেকেই চায় তাদের সন্তান ক্রিকেটার হোক। এই আগ্রহই একদিন আমাদের ক্রিকেটকে সমৃদ্ধ করবে, এই ছেলেরাই ভবিষ্যত জাতীয় দলের বিকল্প হবে। এদের এখন থেকে পর্যাপ্ত গাইডে রাখলে এদের মধ্য থেকেই সাকিব, তামিম বেরিয়ে আসবে।’

‘আমরা খেলোয়াড় পাচ্ছি কিন্তু খেলোয়াড়ের কোয়ালিটি কম। কারণ আগে সবাই ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বানাতে চাইতো এখন সবাই ক্রিকেটার বানাতে চায়। তার মেধা আছে কি নাই সেটা দেখে না। আমাদের উচিত বাচ্চাটাকে স্বাধীনতা দেওয়া। তার জন্য পড়াশোনা, খেলাধুলা ও অন্যান্য যে বিকল্প আছে সব উন্মুক্ত রাখেন।’

‘তার মনযোগ আসলে কোথায়, খেলাধুলা, পড়াশোনা নাকি অন্য কিছুতে সেটা বের করুন। যে পড়াশোনায় বেশি আগ্রহী তাকে সেদিকে প্রস্তুত করুন, যে খেলাধুলায় আগ্রহী তাকে খেলাধুলায় বাড়তি সময় দিন। এ জিনিসটাই আমাদের অভিভাবকরা সেভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।’

তবে একদিক থেকে এই কোচের ভাবনা ইতিবাচক। প্রতিভা না থাকায় ভবিষ্যতে ক্রিকেটার না হলেও অন্তত ছোটবেলায় খারাপ কাজে জড়ানো থেকে বিরত থাকবে শিশুরা।

তার মতে, ‘দেখেন এই ছোট ছোট বাচ্চারা ক্রিকেটের কিছুই হয়তো বোঝে না। কারও কারও প্রতিভার ঘাটতি আছে। কিন্তু তাদের এখানে আসার একটা ইতিবাচক দিকও আছে। ধরেন এখনকার যে সময় তাতে বাজে অভ্যাস তৈরির নানা পথ খোলা। সে দিক থেকে সেসবে না জড়িয়ে মাঠে আসলে মন মানসিকতা অন্তত ভালো হবে, একজন একজনের সাথে মেশা, নিয়ম শৃঙ্খলার মধ্যে থাকার ব্যাপারগুলো শিখতে পারবে।’

No description available.

এদিকে প্রতিবেদনের শুরুতে উল্লেখ করা মিলন ক্রিকেট একাডেমির কোচ সৈকতও মনে করেন প্রতিভা ছাড়া জোর করে ক্রিকেটার বানানো সম্ভব না। তার কাছে প্রচুর অভিভাবক আসেন তাদের সন্তানকে ক্রিকেট শেখানোর জন্য।

তিনি বলেন, ‘হ্যা এরকম আছে। অনেকেই নিয়ে আসে কিন্তু প্রতিভা ছাড়া ক্রিকেটার হওয়া সম্ভব না। জোর করেতো কিছু হয় না।’

যদিও অপেক্ষা করা অভিভাবকদের সাথে কথা বললে বেশিরভাগই জানান ছেলের আগ্রহের উপর ভিত্তি করেই একাডেমিতে ভর্তি করিয়েছেন।

আফ্রিদি নামের এক ক্ষুদে ক্রিকেটারের মা যেমন বলছিলেন দুই বছর বয়সেই তার মাঝে ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা খুঁজে পান তারা।

শেষ বিকেলে আফতাব নগরে ছেলের অনুশীলন দেখার ফাঁকে তিনি বলছিলেন, ‘ওর বাবা সাকিব আল হাসানের একটা ছবি টাঙিয়ে রেখেছিল আমাদের বাসায়। আফ্রিদির বয়স যখন দুই বছর, তখন ও বারবার গিয়ে এটা জড়িয়ে ধরতো।’

‘খেলাতো বুঝতো না, শুধু গিয়ে সাকিব সাকিব করতো। তখন ওর বাবা কাঠ দিয়ে ছোট করে একটা ব্যাট বানিয়ে দিল, প্লাস্টিকের বল এনে দিয়েছিল। আমাদেরও অনেক আগ্রহ ছিল, সেখান থেকেই যাত্রা শুরু।’

নাজমুল হাসান তারেক

Read Previous

আরভিনের মতে, সিরিজের মোমেন্টাম জিম্বাবুয়ের দিকে

Read Next

ফিনিশার কার্তিকের দিনে ভারতের বড় জয়

Total
14
Share