মিরপুরে ডেভিড গাওয়ারের খোঁজে ক্যারোলিন জোয়েটের একদিন!

featured photo updated v 7
Vinkmag ad

কিছু কাছের বন্ধু আর পরিবারের সদস্য বাংলাদেশে থাকেন, যারা কাজ করেন ব্রিটিশ কাউন্সিলে। সে সূত্রেই দিন দুয়েক আগে প্রথমবার বাংলাদেশে আসা ইংল্যান্ডের ক্যারোলিন জোয়েটের। গত ২৪ মে রুমে বসে রিমোট হাতে চ্যানেল বদলাতেই বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা টেস্ট ম্যাচে চোখ আটকে যায় তার। পরে জানতে পারেন খেলাটি বাংলাদেশেই হচ্ছে, তখনই সিদ্ধান্ত পরদিন মাঠে বসে খেলা দেখবেন। আর ঠিকই গতকাল ম্যাচের তৃতীয় দিন সকালে তাকে খুঁজে পাওয়া গেল মিরপুর শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের গ্র্যান্ড স্ট্যান্ডে।

এতটুকু পড়ে আপনার মনে হতেই পারে পঞ্চাশোর্ধ্ব এই নারী বুঝি ক্রিকেটের পাঁড় ভক্ত। বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা ম্যাচে একজন ইংলিশকে দেখে এই প্রতিবেদকেরও কৌতুহল জাগে। সাথে খানিক ক্রিকেটীয় আড্ডার লোভও পেয়ে বসে। কিন্তু মিনিট কয়েকের ব্যবধানেই ভুল ভাঙে, ক্রিকেট তার ছোটবেলার বিনোদনের খোরাক হয়েছে কেবল, এর বেশি কিছু নয়। তবে কথা যত এগোলো, আড্ডা যত জমলো, ততই যেন অবাক হতে হয়েছে।

২০১৯ সালে তার দেশ প্রথমবার ওয়ানডে বিশ্বকাপ জিতেছে ৪০ বছরের বেশি সময়ের আক্ষেপ ঘুচিয়ে। এই তথ্যটুকুও তার জানা নেই। ইংল্যান্ডের বর্তমান ক্রিকেটারদের অনেককেই চেনেন না। এমনকি মাঠে বসে যখন খেলা দেখছেন তখনো বলতে পারছেন না সাকিব আল হাসান এ মুল্লুকের সবচেয়ে বড় তারকা।

বরং তাকে সাকিবের নাম শোনানোর পর নিজেই তুমুল হাসিতে প্রায় লুটিয়ে পড়ছিলেন আর বলছিলেন, ‘ইশ, প্রশ্ন করার আগে তার নামটা বলতা! তাহলে আমি উচ্ছ্বসিত হয়ে উত্তর দিতাম ইয়েস, সাকিব আল হাসান।’

তার ক্রিকেট জ্ঞান নিয়ে ততক্ষণে যা বোঝার বুঝে গেছি ধরে নিয়ে ক্রিকেটীয় আড্ডার ইতি টানতে যাচ্ছিলাম। হুট করেই একটা কমন প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হল নিজের দেশ ইংল্যান্ডে তার প্রিয় খেলোয়াড় কে?

তখনই খানিক চমকে দিয়ে একের পর এক বলতে শুরু করলেন বব উইলস, মাইক ব্রিয়ারলি, গ্রাহাম গুচ, মাইক গ্যাটিং, ইয়ান বোথামদের নাম। ইয়ান বোথামের ক্রিকেটীয় অর্জন, মাঠের কীর্তি নিয়ে কথা বলার সুযোগই দিচ্ছিলেন না। ধরে আসা কন্ঠে কেবল ইয়ান বোথামের প্রশংসা। সমসাময়িক এসব ক্রিকেটারের বাইরেও কোনো একজনের কথা ঠিক মনে করতে পারছিলেন না। তবে খুব করে চাইছিলেন নামটা বলতে।

তার এমন আগ্রহ দেখে সাহায্য করতে চেয়েছি, ঐ সময়কার দুই, চারজন ক্রিকেটারের নামও বললাম। তাতেও ঠিক নামটা সামনে আসছিল না জোয়েটের। পরে নিজেই দিলেন কিঞ্চিৎ ইঙ্গিত, ‘লম্বা চুল উনার, এখন ধারাভাষ্যকার, নামটা বোধহয় ডেভিড দিয়ে শুরু।’

তাৎক্ষনিক যাদের কথা মনে এসেছে তাদের কেউই জোয়েটের কাঙ্খিত ক্রিকেটার নন। পরে নিজেই ফোন হাতে তুলে কিছু একটা লিখে গুগলে সার্চ দিলেন। অবশেষে তিনি পেলেন, তিনি হাসলেন, উচ্ছ্বাস দেখালেন। ওই ভদ্র লোক হলেন সাবেক ইংলিশ বাঁহাতি তারকা ব্যাটার ডেভিড গাওয়ার!

একজন মানুষ ডেভিড গাওয়ারকে চেনেন, জানেন, ইয়ান বোথামের মতো অলরাউন্ডারকে নিয়ে চোখে মুখে রোমাঞ্চ নিংড়ে দেন। অথচ বর্তমান ইংল্যান্ড দলের টেস্ট কাপ্তান বেন স্টোকসকে চেনেন না। স্টোকসকে চেনানোর সব চেষ্টাই বৃথা গেল। বরং তিনি অ্যালিস্টার কুককে মনে করতে পারেন, আর স্মৃতিতে অ্যান্ড্রু ফ্লিনটফও এখনো ছোট্ট করে টোকা দিয়ে যায়।

এলোমেলো ক্রিকেট আড্ডা ঠিক যেন জমেও জমছে না। পরে নিজেই পরিষ্কার করলেন ছোটবেলায় ক্রিকেটের প্রেমে পড়লেও সেটা কখনো জীবনের অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়নি। বরং পেশাগত জীবনের ব্যস্ততায় ক্রিকেটের সাথে চুটিয়ে প্রেম আর করা হয়নি। এখন যেটা হয় পুরোনো প্রেমিকের মতো যখন যেখানে দেখার সুযোগ হয় একটু দাঁড়িয়ে পড়েন, খানিক সময় কাটান, সাথে স্মৃতি রোমন্থনের ব্যর্থ চেষ্টা করেন।

এই যেমন কাজের প্রয়োজনে শ্রীলঙ্কা, অস্ট্রেলিয়া কিংবা ইংল্যান্ডেরই বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে ফাঁকে ক্রিকেট ম্যাচও দেখে ফেলেছেন। তবে বাংলাদেশের গ্যালারিতে খেলা দেখার অভিজ্ঞতাটা সবচেয়ে ভিন্ন বলে উল্লেখ করেছেন।

স্বল্প আলাপে দারুণ প্রাণবন্ত আর নির্ভেজাল মনে হওয়া ক্যারোলিন জোয়েট যেমনটা বলছিলেন, ‘আমি এর আগে শ্রীলঙ্কার গল, অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন মাঠ, ইংল্যান্ডের হেডিংলিতে খেলা দেখেছি। সব দেশের সমর্থকরাই তাদের দলকে দারুণভাবে উজ্জীবিত করতে চায় মাঠ থেকে। বাংলাদেশের সমর্থকরাও আলাদা নয়। তবে গ্যালারিতে তাদের বাঘ সেজে আসা, উদযাপনের ধরণ, গলা ফাটানো এসব আমার কাছে নতুন ব্যাপার।’

জোয়েট যেখানটায় বসে খেলা দেখছিলেন সেখানে জনা পঞ্চাশেক বাংলাদেশী সমর্থকের ভীড়ে একমাত্র শ্রীলঙ্কান সমর্থন দেশটির আইকনিক ফ্যান গায়েন সেনানায়েক। বাংলাদেশের মাঠে খেলা দেখছেন বলে বাংলাদেশকেই সমর্থন দিতে চেয়েছেন জোয়েট, কিন্তু বেচারা গায়েন একা হয়ে পড়ায় খারাপ লাগছিল তার জন্য। আর সে ভাবনা থেকেই শ্রীলঙ্কাকেও সমর্থন দেওয়া শুরু করেন রহস্যে মোড়ানো চরিত্র জোয়েট।

বাংলাদেশ থেকে যাওয়ার পর কেউ এখানকার সেরা মুহূর্ত সম্পর্কে জানতে চাইলে কি বলবেন এই ইংলিশ নারী?

এমন প্রশ্নে তার সোজা উত্তর, ‘অবশ্যই আজকের দিনটার কথা! কারণ আজকে আমি এখানে যা দেখেছি, যেভাবে উপভোগ করেছি এমন দিন সত্যি আমার জীবনে কম এসেছে। এখানকার সমর্থকদের সাথে খেলা দেখার অভিজ্ঞতা দারুণ, তাদের আচরণ আমাকে বেশ মুগ্ধ করেছ। নিজেকে ভিন্ন কিছু মনে হচ্ছিল, সবাই যখন এসে ছবি তুলছে, এতো দর্শকের ভীড়ে আমার সাথেই আলাদ করে কথা বলতে চাচ্ছে (হাসি)।’

বিদায় বলার সময় তার চোখে মুখে দেখা আনন্দের ঝিলিকই বলে দিচ্ছে একজন সাংবাদিককে খুশি করতে নয়। বরং সত্যি ক্যারোলিন জোয়েটের জীবনে নিশ্চিতভাবেই এমন দিন নিয়মিত আসে না…

নাজমুল হাসান তারেক

Read Previous

ইউএই টি-টোয়েন্টি লিগের গ্লোবাল মিডিয়া রাইটস পেল ‘জি’

Read Next

২য় ইনিংসেও বাংলাদেশের ব্যাটিং বিপর্যয়

Total
1
Share