মুশফিকের কাব্যিক ইনিংস শেষে বাংলাদেশের একটুখানি হতাশা

মুশফিকের কাব্যিক ইনিংস শেষে বাংলাদেশের একটুখানি হতাশা
Vinkmag ad

অসময়ে রিভার্স সুইপ খেলে কত সমালোচনার মুখেই পড়েছেন মুশফিকুর রহিম। তবুও নিজের প্রিয় এই শট খেলা থেকে বিরত থাকবেন না বলে বারবারই জানিয়েছেন। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে মিরপুর টেস্টের দ্বিতীয় দিন রিভার্স সুইপে দারুণ এক চার মেরে দিয়েছেন বিস্তৃত এক হাসি। তবে বাংলাদেশ শিবিরে হাসি ফোটানোর কাজটা সেরে ফেলেছেন আগেই। লিটন দাসকে নিয়ে বিপর্যস্ত বাংলাদেশকে টেনে তুলেছেন আগেরদিন। তবে লিটন আজ দিনের শুরুতে ফিরলেও মুশফিক নিজের ইনিংসকে রূপ দিয়েছেন নান্দনিকতায়।

তার ১৭৫ রানের হার না মানা অমন ইনিংসের পরও অবশ্য বাংলাদেশের সংগ্রহ থামে ৩৬৫ তে। দিনের বাকি অংশে বোলাররা সুযোগ তৈরি করলেও লঙ্কানদের আটকানো যায়নি খুব একটা। ক্যাচ মিসের সাথে সঠিক রিভিউ না নেওয়া ও আম্পায়ার্স কল নিশ্চিতভাবেই আক্ষেপে পুড়িয়েছে টাইগারদের। ওশাদা ফার্নান্দো ও দিমুথ করুনারত্নের জোড়া ফিফটিতে প্রথম ইনিংসে শ্রীলঙ্কার সংগ্রহ ৩ উইকেটে ১৪৩ রান।

৫ উইকেটে ২৭৭ রান নিয়ে দিন শুরু করেছিল বাংলাদেশ। লিটন ১৩৫ ও মুশফিক ১১৫ রানে অপরাজিত।

আগেরদিনের অবিচ্ছেদ্য ২৫৩ রানের রেকর্ড জুটিকে আজ বেশি দূর টেনে নিতে পারেননি দুজনে। শুরুতেই আঘাত হানেন প্রথম দিন লঙ্কানদের সফল বোলার রাজিথা। একই ওভারে ফেরান লিটন ও মোসাদ্দেক হোসেনকে।

৯৩তম ওভারের প্রথম বলে দ্বিতীয় স্লিপে ক্যাচ দেন লিটন, ততক্ষণে নামের পাশে ১৪১। ২৪৬ বলে ১৬ চার ও ১ ছক্কায় ইনিংসটি সাজান। আর তাতে ভাঙে মুশফিকের সাথে ২৭২ রানের জুটি। যা যেকোনো উইকেটে এখন বাংলাদেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ রানের জুটি।

২ বল বিরতি দিয়েই রাজিথা ফেরান প্রায় ৩ বছর পর টেস্ট খেলতে নামা মোসাদ্দেককে। অফ স্টাম্পের খানিক বাইরের ডেলিভারিতে খোঁচা দিয়ে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেন কোনো রান না করেই।

দ্রুত দুই উইকেট হারালেও তাইজুল ইসলামকে নিয়ে মুশফিক ছিলেন দৃঢ়। রমেশ মেন্ডিসের করা ৯৯তম ওভারে নিজের প্রিয় শট রিভার্স সুইপে বাউন্ডারি বের করেন। পরের বলে দারুণ এক কাভার ড্রাইভে হাঁকান চার।

প্রভীন জয়াবিক্রমার করা পরের ওভারে সুইপ শটে মুশফিকের ব্যাটে চার। ১০১তম ওভারে স্কয়ার লেগে ঠেলে দিয়ে ২৯১ বলে ১৫০ পূর্ণ করেন মিস্টার ডিপেন্ডেবল। এটি এই নিয়ে টেস্ট ক্যারিয়ারে পঞ্চম বার ১৫০ পেরোনো ইনিংস।

মুশফিককে এমন সাবলীল ব্যাটিংয়ে সমর্থন দিয়ে যাওয়া তাইজুলও সুযোগ পেয়ে হাঁকিয়েছেন বাউন্ডারি। লফটেড শটে মিড অন দিয়ে চার মেরে তো কিছুটা অবাকই করে দেন ডাগ আউটে বসা ব্যাটিং কোচ জেমি সিডন্সকে।

কিন্তু দুজনের জুটি যখন ফিফটি থেকে এক রান দূরে তখনই ফেরেন তাইজুল। আসিথা ফার্নান্দোর লাফিয়ে বাউন্সার ছাড়বেন কি খেলবেন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই গ্লাভস ছুঁয়ে ক্যাচ উইকেটের পেছনে। ৩৭ বলে ১৫ রানেই থামতে হয় তাকে। ২ বলের বেশি টিকেননি খালেদ আহমেদ (০)।

লাঞ্চের আগে শেষ ওভারেই ফিরতে পারতেন এবাদত হোসেন। ফার্নান্দোর বাউন্সারে কট বিহাইন্ডের জোরালো আবেদনে সাড়া দেন আম্পায়ার। আত্মবিশ্বাসের সাথে রিভিউ নিয়ে বেঁচে যান।

আর সেখান থেকেই শুরু নাটকীয়তার। শেষ উইকেট জুটি বলে আম্পায়াররা খেলা চালিয়ে নেন লাঞ্চের সময় পেরোনোর পর আরও আধঘন্টা। তবে তাতেও মুশফিক-এবাদতকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি লঙ্কান বোলাররা। ১২ টা ৩০ মিনিটে যখন লাঞ্চ বিরতি দেওয়া হয় তখন স্কোরবোর্ডে ৯ উইকেটে ৩৬১! মুশফিক ১৭১ ও এবাদত ০ রানে অপরাজিত ছিলেন।

লাঞ্চের পর অবশ্য ৩.২ ওভারের বেশি টিকেনি জুটি। রান আউটে কাটা পড়েন এবাদত (০), মুশফিক অপরাজিত ছিলেন ৩৫৫ বলে ২১ চারে ১৭৫ রানে। দল পায় ৩৬৫ রানে সংগ্রহ। বাংলাদেশের মাটিতে প্রথম শ্রীলঙ্কান পেসার হিসেবে ৫ উইকেট নেন রাজিথা, ফার্নান্দোর শিকার ৪ উইকেট।

বাংলাদেশকে বড় রানের আগে আটকে দিয়ে নিজেরা চা বিরতির আগে দারুণ এক সেশন কাটায় শ্রীলঙ্কা।

ইনিংসের প্রথম ওভারেই ওপেনার ওশাদা ফার্নান্দোর বিপক্ষে কট বিহাইন্ডের আবেদনে সড়া দেন আম্পায়ার। তবে সাথে সাথেই রিভিউ নিয়ে বেঁচে যান ওসাধা, উইকেট বঞ্চিত খালেদ আহমেদ।

এরপর যত সময় গড়িয়েছে অধিনায়ক দিমুথ করুনারত্নেকে নিয়ে সাবলীল ব্যাটিং উপহার দেন ওশাদা। তবে ইনিংসের ১৫তম ওভারে তাইজুল ইসলামের বলে এলবিডব্লিউর জোরালো আবেদন নাকচ করেন আম্পায়ার শরফদ্দৌলা ইবনে শহীদ সৈকত।

রিভিউ নিলেও বাংলাদেশকে পুড়তে হয় আম্পায়ার্স কলের আক্ষেপে। যদিও খালি চোখে মনে হচ্ছিল সেটা প্লাম্ব এলবিডব্লিউ। তখন ৩৯ রানে ব্যাট করছিলেন ওশাদা। সাকিবের করা ১৮তম ওভারে ফিরতি ক্যাচ দিয়েও বেঁচে যান (তখন ৪৩ রানে ব্যাট করছিলেন)।

জীবন পেয়ে ২০তম ওভারে সাকিবকে ছক্কা মেরেই ক্যারিয়ারের পঞ্চম ফিফটির দেখা পান ওশাদা। চা বিরতির আগে ২২ ওভার ব্যাট করার সুযোগ পেয়ে বিনা উইকেটে ৮৪ রান তুলে শ্রীলঙ্কা। ওশাদা ৫২ ও করুনারত্নে ৩১ রানে অপরাজিত ছিলেন।

চা বিরতির পর ইনিংসের ২৬ তম ওভারে দুই ব্যাটারকেই সাজঘরে ফেরানোর রাস্তা তৈরি করতে পেরেছিলেন এবাদত হোসেন। তবে ওশাদাকে ফেরানো গেলেও ফেরানো যায়নি করুনারত্নেকে।

করুনারত্নের এলবিডব্লিউয়ের আবেদনে আম্পায়ার সাড়া না দিলে রিভিউও নেয়নি বাংলাদেশ দল। যদিও টিভি রিপ্লেতে দেখা যায় রিভিউ নিলেই আউট হতেন করুনারত্নে।

এর দুই বল বাদে অবশ্য স্লিপে শান্তকে ক্যাচ দিয়ে ফিরেছেন ওশাদা। ৯১ বলে ৮ চার ও ১ ছক্কায় ৫৭ রান তার ব্যাটে। তাইজুলের করা পরের ওভারেই শর্ট লেগে করুনারত্নের (তখন ৩৭ রানে) ক্যাচ ছাড়েন জয়।

ওশাদা বিদায় নিলেও কুশল মেন্ডিসকে নিয়ে সহজাত ব্যাটিং করে গেছেন করুনারত্নে। ৩২তম ওভারে ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে ঠেলে দিয়ে ৮৪ বলে ছুঁয়েছেন ক্যারিয়াএর ২৯তম টেস্ট ফিফটি।

দুজনে মিলে দিনের বাকি অংশ অনায়েসেই পার করে দিবেন বলে মনে হচ্ছিল। তবে সাকিবের বলে এলবিডব্লিউর ফাঁদে পড়ে মেন্ডিস ফেরেন ১১ রান করে। তাতে ১৩৯ রানে ৩ উইকেট হারায় সফরকারীরা।

যদিও নাইট ওয়াচম্যান রাজিথাকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত অপরাজিতই ছিলেন করুনারত্নে। ৩ উইকেটে ১৪৩ রান তোলার পথে লঙ্কান দলপতি অপরাজিত ১২৭ বলে ৭ চারে ৭০ রানে।

সংক্ষিপ্ত স্কোর (২য় দিন শেষে):

বাংলাদেশ ৩৬৫/১০ (১১৬.২), জয় ০, তামিম ০, শান্ত ৮, মুমিনুল ৯, মুশফিক ১৭৫*, সাকিব ০, লিটন ১৪১, মোসাদ্দেক ০, তাইজুল ১৫, খালেদ ০, এবাদত ০; রাজিথা ২৮.২-৭-৬৪-৫, আসিথা ২৬-৩-৯৩-৪

শ্রীলঙ্কা ১৪৩/২ (৪৬), ওশাদা ৫৭, করুনারত্নে ৭০*, মেন্ডিস ১১, রাজিথা ০*; এবাদত ৯-০-৩১-১, সাকিব ৯-৩-১৯-১

শ্রীলঙ্কা ২২২ রানে পিছিয়ে।

৯৭ প্রতিবেদক

Read Previous

আচরণবিধি ভঙ্গ করে দলের আগেই বাংলাদেশ ছাড়ছেন কামিল মিশ্র

Read Next

সাফল্যের রহস্য নিজের ভেতরেই রাখতে চান লিটন

Total
18
Share