নির্ঘুম রাত শেষে মুমিনুলদের অবিশ্বাস্য জয়

featured photo updated v 3
Vinkmag ad

তখনো ভোরের আলো ফুটেনি, তবে রাতের নিকষ কালো আঁধার কেটে অপেক্ষা নতুন সূর্যোদয়ের। তার আগেই বাংলাদেশ ক্রিকেটের আঁধার কাটানো এক ঐতিহাসিক জয়ের সাক্ষী পুরো বিশ্ব। কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে নিউজিল্যান্ডের মাউন্ট মঙ্গানুইতে মুমিনুল হকরা হয়তো তখনো ঘোরের মাঝে। শীতের তীব্রতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ততক্ষণে বুনো উল্লাসে মেতে উঠেছে টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া।

শেষ কবে? হ্যাঁ শেষ কবে এমন কিছু নিয়ে আগের রাতে অপেক্ষায় ছিলো পুরো দেশ? এমন প্রশ্নের উত্তরে পেছনে ফিরতে হবে, দৃশ্যপটে আসবে বয়সে যুগ পেরিয়ে গেছে এমন কোনো স্মৃতি।

সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স বিবেচনায় নিউজিল্যান্ড সফরের ২ ম্যাচ টেস্ট সিরিজটি অন্তত ভালো খেলে ফিরুক এটাই হয়তো চাওয়া ছিলো টাইগার ভক্তদের। তবে এবার মুমিনুলরা যে চোয়াল বদ্ধ ছিলেন, ইতিহাস বদলাবেন। ম্যাচ সেরার পুরষ্কার জেতা আগুন ঝরানো বোলিং করা এবাদত হোসেনই যেমন বললেন পরবর্তী প্রজন্মের জন্য উদাহরণ তৈরি করতে চেয়েছেন এই জয়ে।

পুরো পাঁচ দিনই দাপট দেখিয়ে মাউন্ট মঙ্গানুইতে ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ। ৮ উইকেটের জয়টি স্রোতের বিপরীতে বাংলাদেশকে টেনে নিবে অনেক দিন। অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে টিকে থাকবে যুগ যুগ। অমন বিরুদ্ধ কন্ডিশনে যে ২০১১ সালের পর কোনো এশিয়ার দল জিততে পারেনি। এশিয়ার বাইরের কোনো সফরকারী দলও সর্বশেষ জিতেছে ১৭ ম্যাচ ও প্রায় ৪ বছর আগে।

উপলক্ষ্যটা তৈরি ছিলো চতুর্থ দিন শেষেই, ১৩০ রানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করা নিউজিল্যান্ড ৫ উইকেটে তুলেছিলো ১৪৭ রান। ১৭ রানের লিড নিয়ে দিন শেষ করা কিউইদের হারই তখন সম্ভাব্য ফল ছিলো। তবে খেই হারানোর অতীত ইতিহাস আছে বলে বাংলাদেশ শেষের কাজটুকু ঠিকঠাক করতে পারে কিনা তা নিয়ে কিছুটা দোটানা তো ছিলই।

বাংলাদেশ সময় ভোর ৪ টায় খেলা, পঞ্চম দিনের রোমাঞ্চকর গল্পের সাক্ষী হতে রাতভর উন্মাদনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। গতকাল (৪ জানুয়ারি) মিরপুরে সাংবাদিকদের সাথে আলাপে নির্বাচক হাবিবুল বাশারই যেমন বলেছেন রাতে তার ঘুম আসবেনা। আগেরদিন ৪ উইকেট নিয়ে কিউইদের বিপাকে ফেলে দেওয়া এবাদত হোসেনের পেছনে দিনের পর দিন বিনিয়োগ করে যাওয়ার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন সাবেক এই অধিনায়ক।

দেশের ক্রিকেটের পঞ্চ পান্ডবের (সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মাশরাফি বিন মর্তুজা, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ও মুশফিকুর রহিম) মাত্র একজন ছিলেন এই ম্যাচে। ম্যাচে অবশ্য তার প্রভাব ছিলো সামান্যই, প্রথম ইনিংসে ১২ রান করে আউট হলেও দ্বিতীয় ইনিংসে ৫ রানে অপরাজিত থাকা মুশফিকের ব্যাট থেকে এসেছে উইনিং শট।

এর বাইরে পুরো ম্যাচেই প্রভাব বিস্তার করা পারফরম্যান্স এবাদত হোসেন, তাসকিন আহমেদ, মেহেদী হাসান মিরাজ, মাহমুদুল হাসান জয়, নাজমুল হোসেন শান্ত, মুমিনুল হক, লিটন দাস, শরিফুল ইসলামদের।

৫ উইকেটে ১৪৭ রান নিয়ে দিন শুরু করা নিউজিল্যান্ড বাকি ৫ উইকেট হারিয়ে যোগ করতে পেরেছে মাত্র ২২ রান। আগেরদিন ৪ উইকেট নেওয়া এবাদত এ দিন শুরুতেই ফেরান প্রতিপক্ষের শেষ ভরসা রস টেইলরকে। খালি হাতে ফেরান কাইল জেমিসনকেও। পরে লেজ ছাঁটাইয়ের কাজটা করেন তাসকিন আহমেদ ও মেহেদী হাসান মিরাজ।

৪০ রানের লক্ষ্য তাড়ায় নেমে ৩ রানে সাদমান ইসলাম (৩) ও ৩৪ রানে নাজমুল হোসেন শান্তকে (১৭) হারালেও ৮ উইকেটের জয় পেতে ১৬.৫ ওভারই যথেষ্ট ছিলো মুমিনুল হকদের জন্য। মুমিনুল ১৩ ও মুশফিক ৫ রানে অপরাজিত।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ, শ্রীলঙ্কা ও জিম্বাবুয়ের পর নিউজিল্যান্ডের মাটিতে টেস্ট জয়ের কীর্তি গড়লো বাংলাদেশ। বিদেশের মাটিত ৬১ ম্যাচে সাকূল্যে ৬ষ্ঠ জয় টাইগারদের, সবমিলিয়ে ১২৮ টেস্টে ১৬ তম জয় এটি। আর তাতেই ঘরের মাঠে টানা ম্যাচ অপরাজেয় থাকার কীর্তেতে ছেদ পড়েছে নিউজিল্যান্ডের।

যারা টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম চক্রের চ্যাম্পিয়নও। আর এই জয় দিয়েই গত চক্রে একমাত্র দল হিসেবে কোনো পয়েন্ট না পাওয়া বাংলাদেশ এবারের চক্রে তৃতীয় ম্যাচে এসে পয়েন্টের দেখা পেলো।

ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে টাইগার অধিনায়ক মুমিনুল হক জানালেন আগের রাতে ঘুমাতেই পারেননি। জয়ের অনুভূতি জানানোর ভাষাও খুঁজে পেতে কষ্ট হচ্ছে বাংলাদেশ দলপতির।

তিনি বলেন, ‘আমি আমার অনুভূতি বর্ণনা করতে পারবোনা, এটা অবিশ্বাস্য। সত্যি বলতে আমি গতরাতে ঘুমাতে পারিনি, জানতাম না আজ কি হবে। আমাদের এই জয়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’

জয়টা আসলেই কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলো তা মুমিনুলের অধিনায়কত্বের পরিসংখ্যানে চোখ বুলালেই বোঝা যাবে। এর আগে ১১ ম্যাচে নেতৃত্ব দিয়ে জয় পেয়েছেন দুইটিতে,দুইবারই প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়ে, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে একটি ম্যাচের ভাগ্যে জুটেছে ড্র। বাকি ম্যাচগুলোতে সঙ্গী হয়েছে ইনিংস ব্যবধান কিংবা রান ও উইকেট বিবেচনায় বড় হার।

ভারতীয় কিংবদন্তী ভিভিএস লক্ষ্মণ যেমন এমন জয়ের পর টুইট করেছেন, ‘মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে ইতিহাস রচনার জন্য বাংলাদেশ দলকে অভিনন্দন। ৮ উইকেটের জয় এবং নিউজিল্যান্ডের মাটিতে প্রথম জয় প্রেরণার এবং অবিশ্বাস্য অর্জন। আমি নিশ্চিত এ জয় স্মরণীয় থাকবে অনেক দিন।’

ছুটিতে থাকায় নিউজিল্যান্ড সফরে না যাওয়া টাইগার তারকা সাকিব আল হাসান যুক্তরাষ্ট্রে পরিবারের সাথে থাকলেও ম্যাচ জুড়ে নিজের সরব উপস্থিতি জানান দিয়েছেন টুইটারে।

জয় থেকে কয়েক রান দূরে থাকতেই সাকিবের টুইট, ‘বছরটা কি দারুণভাবেই শুরু করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট। বড় অভিনন্দন অধিনায়ক, খেলোয়ার ও কোচিং স্টাফদের।’

হতাশার ২০২১ শেষে ২০২২ যেভাবে শুরু হয়েছে সেই ধারাই অব্যাহত থাকবে এমন প্রত্যাশা কোটি টাইগার ভক্তদেরও…

নাজমুল হাসান তারেক

Read Previous

ঐতিহাসিক টেস্ট জয়, টুইটারে প্রশংসায় ভাসছে বাংলাদেশ দল

Read Next

বাংলাদেশের বিজয় উদযাপিত হল অ্যাশেজের মাঠে

Total
21
Share