সাগরিকা এনে দিবে কি এক টুকরো স্বস্তি?

'জয়ে' মোড়ানো অনুশীলনে টেস্ট মিশন শুরু বাংলাদেশের

সাগরপাড়ের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়াম। বাংলাদেশের লাকি ভেন্যু হিসেবেই খ্যাত চট্টগ্রামে বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে অবস্থিত স্টেডিয়ামটি। আরেক দফা নিজেকে লাকি প্রমাণের সুযোগ পাচ্ছে সাগরিকার মাঠটি। বাংলাদেশের ক্রিকেট যে বড় অস্থিরতা, অস্বস্তির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে!

অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দাপুটে পারফরম্যান্সে টি-টোয়েন্টি সিরিজ জিতে আশার বেলুনে হাওয়া দিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে যায় বাংলাদেশ। কোনোমতে প্রথম পর্ব উতরালেও মূল পর্বে হেরেছে ৫ ম্যাচের সবকটিতেই। বিশ্বকাপ ব্যর্থতার রেশ কাটতে না কাটতেই কিনা পাকিস্তানের বিপক্ষে ঘরের মাঠে টি-টোয়েন্টি সিরিজে ধবল ধোলাই হওয়ার ধাক্কা।

এর বাইরে ক্রিকেটার, বোর্ড সভাপতির বিতর্কিত মন্তব্য, সংবাদ কর্মীদের প্রশ্নের জবাবে বিতর্কিত উত্তরে আরও যেন টালমাটাল দেশের ক্রিকেট। এমন পরিস্থিতিতেই নিজেদের সবচেয়ে নাজুক ফরম্যাটের ক্রিকেট খেলতে নামছে বাংলাদেশ।

আগামীকাল (২৬ নভেম্বর) জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে শুরু হচ্ছে বাংলাদেশ-পাকিস্তান প্রথম টেস্ট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের দ্বিতীয় চক্রে বাংলাদেশের এটাই প্রথম ম্যাচ। গত চক্রে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স ছিলো যাচ্ছে তাই। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেওয়া দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ছিলো তলানিতে। ৭ ম্যাচের ৬ টিতে হার, একটিতে ড্র করে অর্জন মাত্র ২০ পয়েন্ট। ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে হয়েছে ধবল ধোলাই।

এবার সেসব পেছনে ফেলে নতুন শুরুর অপেক্ষায় মুমিনুল হকের দল। অধিনায়ক নিজে চান গত চক্রের চেয়ে অন্তত ২-৩ ধাপ এগোতে এবারের চক্রে।

আজ ম্যাচ পূর্ববর্তী দিনের সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন,

‘যে জায়গায় এখন আছি তার থেকে ২-৩ ধাপ ওপরে উঠতে পারলে আমি খুশি।’

বাংলাদেশ সর্বশেষ টেস্ট খেলেছে গত জুলাইয়ে জিম্বাবুয়ে সফরে। সফরের একমাত্র টেস্টে বাংলাদেশে জিতেছে ২২০ রানের বড় ব্যবধানে। এদিকে পাকিস্তান গত আগস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে। সিরিজের প্রথম ম্যাচ ওয়েস্ট ইন্ডিজ জিতলেও দ্বিতীয়টা জিতেছে পাকিস্তান।

সর্বশেষ ১০ ম্যাচে পাকিস্তান জিতেছে ৫ টিতে, ড্র হয়েছে ২ টি, হেরেছে ৩ টিতে। যেখানে বাংলাদেশের শেষ ১০ ম্যাচে পরাজয় ৭ টি, জয় ২ টি ও ড্র মাত্র একটি।

দুই দল টেস্টে মুখোমুখি হয়েছে ১১ বার। যেখানে ২০১৫ সালে খুলনা টেস্ট ড্র করা ছাড়া আর কোনো অর্জন নেই বাংলাদেশের। বাকি ১০ টিতেই যে জিতেছে পাকিস্তান। চট্টগ্রামে এর আগে ২ বার মুখোমুখি হয় দুইদল। ২০০২ সালে এম এ আজিজ স্টেডিয়ামেইনিংস ও ১৬৯ রানে হারে স্বাগতিক বাংলাদেশ। ২০১১ সালে জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামেও সঙ্গী ইনিংস ও ১৮৪ রানের পরাজয়।

টেস্ট র‍্যাংকিংয়ে বর্তমানে পঞ্চম অবস্থানে থাকা পাকিস্তানের বিপক্ষে নবম অবস্থানে বাংলাদেশ আগামীকাল নামছে নিজেদের অভিজ্ঞ বেশ কয়েকজন ক্রিকেটার ছাড়া। চোটের কারণে নেই তামিম ইকবাল, সাকিব আল হাসান ও তাসকিন আহমেদ। সর্বশেষ জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ম্যাচে অপরাজিত ১৫০ রানের ইনিংস খেলা মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ তো সাদা পোশাকের ক্রিকেট থেকে বিদায়ই নিয়ে নিলেন।

সাকিব, তামিমদের ছাড়া মাঠে নামলেও বাংলাদেশকে হালকাভাবে নিতে নারাজ পাকিস্তান দলপতি বাবর আজম। তার মতে তরুণ দল হলেও নিজেদের কন্ডিশন বলে চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। দারুণ সাফল্যের মধ্যে থাকা পাকিস্তান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে এখানকার কন্ডিশনকে।

বাবর বলেন,

‘পার্থক্য এখানে কন্ডিশন। ওদের ঘরের মাঠ, নিজেদের কন্ডিশন। ওদেরকে কখনোই হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। কোনো দলকেই আসলে হালকা করে নেওয়ার সুযোগ নেই। ওদের কয়েকজন ক্রিকেটার নেই, দলটা তরুণ। তবে যারা আছে, এই কন্ডিশনেই তো খেলে। কাজটা তাই কঠিনই হবে (আমাদের জন্য)।’

এদিকে চট্টগ্রামের পিচ বরাবরই ব্যাটিং সহায়ক হয়ে থাকে। চলতি বছর জানুয়ারিতে রেকর্ড গড়ে ৩৯৫ রান তাড়া করে স্বাগতিকদের পরাজয় উপহার দেয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। পাকিস্তানের বিপক্ষে লড়াইয়ে নামার আগে টাইগার অধিনায়ক দিলেন ব্যাটিং নির্ভর উইকেটের আভাস।

তিনি বলেন,

‘আমার কাছে মনে হচ্ছে খুব ভালো, ব্যাটিং উইকেট হবে। ব্যাটিংয়ের জন্য সহায়ক হবে। গত সিরিজগুলোতে চট্টগ্রামের উইকেট ভালো ছিল। আমার থেকে আপনারা ভালো বোঝেন, বাইরে থেকে যারা দেখে তারা আরও ভালো বোঝে। চট্টগ্রামের উইকেট সবসময় ব্যাটিংয়ের জন্য ভালো হয়।’

গত দুইদিন অনুশীলন করা পাকিস্তান দলও উইকেট সম্পর্কে একটা ধারণা করছেন। পাকিস্তান অধিনায়ক বাবর আজম বলছেন বাংলাদেশের টিপিকাল স্পিন নির্ভর উইকেট হতে পারে।

বাবরের ভাষ্য,

‘পিচ দেখে মনে হচ্ছে টিপিকাল বাংলাদেশি উইকেট। কালতে যা দেখলাম, তাতে ঘাস ছিল কিছুটা সেখানে। আজকে আবার গিয়ে চূড়ান্তভাবে দেখব কী অবস্থা। এখানে তো স্পিনারদের সহায়তা মেলে, পেসারদেরও সহায়তা মেলে শুরুতে। আমার মতে তাই, যতটা কন্ডিশন কাজে লাগাতে পারব, আমাদের জন্য ততটা ভালো।’

বাংলাদেশ কেমন একাদশ সাজাবে তা অবশ্য খোলাসা করেননি মুমিনুল। অন্যদিকে নিজেদের সেরা ১২ সদস্যের তালিকা দিয়েছে পাকিস্তান। টাইগার কাপ্তান মুমিনুল একাদশ সাজাতে অপেক্ষা করবেন টসের আগে আরেক দফা উইকেট দেখা পর্যন্ত।

স্কোয়াডে প্রথমবার ডাক পাওয়া মাহমুদুল হাসান জয়ের খেলার সম্ভাবনা প্রবল। খেললে ওপেনার হিসেবেই খেলবেন যুব বিশ্বকাপ জয়ী দলের এই ব্যাটার। এমনটাই জানিয়েছেন মুমিনুল হক। সেক্ষেত্রে তার সঙ্গী হবে সাদমান ইসলাম, বাদ পড়ার সম্ভাবনা সাইফ হাসানের। অভিষেক হতে পারে ইয়াসির আলি রাব্বিরও। আর তেমন কিছু হলে এই ব্যাটারের আড়াই বছর দলের সাথে ঘুরে বেড়ানোর অবসান ঘটবে।

বাংলাদেশ একাদশে স্পিনারের চেয়ে পেসারদের আধিক্য দিতে পারে। আগে স্কোয়াডে থাকা তিন পেসার রেজাউর রহমান রাজা, এবাদত হোসেন, আবু জায়েদ রাহীর সাথে টি-টোয়েন্টি সিরজে অভিষেক হওয়া শহীদুল ইসলাম ও খালেদ আহমেদকে অন্তর্ভূক্ত করে নির্বাচকরা। সাথে স্পিন বিভাগে আছেন অভিজ্ঞ তাইজুল ইসলাম ও নাইম হাসান।

যাদের নিয়েই আক্রমণ সাজানো হোক টাইগার বোলারদের ২০ উইকেত নেওয়ার সামর্থ্য দেখেন অধিনায়ক,

‘রাহি, এবাদত, খালেদ, নতুন যে এসেছে রাজা, তাইজুল, মিরাজ, নাইম- ওরা ২০ উইকেট নেওয়ার সামর্থ্য রাখে।’

পাকিস্তানের মতো শক্তিশালী দলকে বাংলাদেশ চট্টগ্রাম টেস্টে নিজেদের কোন বিভাগ দিয়ে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে? এমন প্রশ্নে মুমিনুল বাজি ধরলেন ব্যাটারদের নিয়ে।

তিনি বলেন,

‘দুই ইউনিটই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ফরম্যাটেই এক বিভাগে ভালো করে পারবেন না। দল তখনই ভালো করে যখন তিন বিভাগই ভালো করে। তিন বিভাগে ভালো করলে ম্যাচ জিতব। আমার মনে হয় ব্যাটিং দিয়ে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারি।’

পাকিস্তান নিজেদের একাদশ সাজাবে আজ ঘোষিত ১২ সদস্যের স্কোয়াড থেকে। উপমহাদেশের দল বলে স্পিন নির্ভর উইকেট হলেও পাকিস্তানি ব্যাটাররা ভালোভাবে সামলে নিবে বিশ্বাস দলপতি বাবর আজমের।

তার মতে,

‘আমাদের যে ব্যাটিং লাইন আপ, তা অভিজ্ঞ ও স্পিনারদের বেশ ভালো খেলে। আগেও দেখেছি, বেশ ভালো ভালো স্পিনারদের বিপক্ষ রান করেছে। আমি বলতে পারি, এখানেও ওরা ভালো করবে ও দলকে জেতাবে।’

এদিকে নিজেদের স্পিনার নিয়েও উচ্ছ্বসিত বাবর। শাহীন শাহ আফ্রিদি, হাসান আলিদের মতো পেসারের সাথে ১২ সদস্যের স্কোয়াডে আছেন নোমান আলি ও সাজিদ খানের মতো স্পিনার।

বাবর এ প্রসঙ্গে বলেন,

‘এশিয়ায় তো স্পিনারদের জন্য সহায়তা সবসময়ই মেলে। আমাদের সেরা মানের স্পিনার আছে এবং অনেকে খেলে আসছে ওরা। পাকিস্তান দলের সবাই অনেক দিন ধরে খেলছে ও পারফর্ম করছে। এটা আমাদের জন্য বাড়তি সুবিধা যে অনেকে ফর্মে আছে এবং সেই ফর্ম আমরা টেস্ট সিরিজে ধরে রাখতে চাই।’

চট্টগ্রাম থেকে, ক্রিকেট৯৭ প্রতিবেদক

Read Previous

সার্জারির জন্য ভারতে গেলেন যুব বিশ্বকাপ জয়ী দলের পেসার অভিষেক দাস

Read Next

ডেকানকে উড়িয়ে দিয়ে বাংলা টাইগার্সের জয়ের হ্যাটট্রিক

Total
5
Share