মাশরাফির সার্ভিস ব্যবহার করবে বিসিবি, বিশ্বাস আজহারউদ্দিনের

featured photo updated v 17

ভারতের তেলেঙ্গানা প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির হায়দ্রাবাদ জেলার ওয়ার্কিং প্রেসিডেন্ট তিনি, তিনি প্রেসিডেন্ট হায়দ্রাবাদ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনেরও। ৫৮ বছর বয়সী মোহাম্মদ আজহারউদ্দিনের এখন পরিচয় অনেক। তবে তাকে আজকের অবস্থানে এনেছে নিশ্চিতভাবেই ক্রিকেট।

ভারতের সর্বকালের অন্যতম সফল অধিনায়ক ও ব্যাটসম্যান মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন। ১৯৮৪ সাল থেকে ২০০০ পর্যন্ত ভারতের জার্সি গায়ে খেলেছেন ৯৯ টেস্ট, ৩৩৪ ওয়ানডে। রান করেছেন যথাক্রমে ৬২১৫ ও ৯৩৭৮। ২৯ টি আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরির মালিক আজহারউদ্দিন টেস্ট ক্যারিয়ার তথা ক্রিকেট ক্যারিয়ার শুরু করেন টানা ৩ সেঞ্চুরি দিয়ে। সাদা পোশাকে তার শেষ ইনিংসেও এসেছিল সেঞ্চুরি।

ফর্মের তুঙ্গে থাকার পরেও ফিক্সিং কান্ডে নাম জড়ালে ৩৭ বছর বয়সে শেষ হয় ক্রিকেট ক্যারিয়ার। সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই) এর কে মাধবানের প্রতিবেদন আমলে নিয়ে তাকে আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ করে আইসিসি (ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিল) ও বিসিসিআই (দ্য বোর্ড অব কন্ট্রোল ফর ক্রিকেট ইন ইন্ডিয়া)।

১২ বছর আদালতে লড়াইয়ের পর অবশেষে তার নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়। তবে ততদিনে আর মাঠের ক্রিকেটে ফেরার সুযোগ ছিল না আজহারের। ৯৯ টেস্টেই তাই শেষ হয়েছে আজহারের ক্যারিয়ার, সুযোগ মেলেনি ১০০ টেস্ট খেলার। তবে এনিয়ে কোন আক্ষেপ নেই ভারতকে ৪৭ টেস্ট ও ১৭৪ ওয়ানডেতে নেতৃত্ব দেওয়া আজহারউদ্দিনের।

এই মুহূর্তে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবু ধাবিতে অবস্থানরত মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন ক্রিকেট৯৭ কে বলেন,  ‘আমার কোন অনুশোচনা নেই (১০০ টেস্ট না খেলতে পারার জন্য)। আমি ক্রিকেট খেলাটা খুবই উপভোগ করেছি। আমি আল্লাহর কাছে সর্বদা কৃতজ্ঞ। আল্লাহ আমাকে অনেক কিছু দিয়েছেন, আমি অনেক ভাগ্যবান। আমার কোন অনুশোচনা থাকতে পারে না, নেই ও। যেটুকু ক্রিকেট আমি খেলতে পেরেছি তা নিয়ে আমি যারপরনাই সন্তুষ্ট। ৯৯ টি টেস্ট খেলা নিয়ে অনেক কথা হয়, আমার ভাগ্যে ৯৯ টি টেস্টই লেখা ছিল। আমি ক্রিকেট খেলাটা উপভোগ করেছি। দর্শকরা আমার খেলা দেখে এন্টারটেইনড হয়েছেন তাতে আমি খুবই খুশি।’

ক্রিকেটার, সংগঠক ও রাজনীতিবিদ- তিন পরিচয়ের মধ্যে নিশ্চিতভাবেই মোহাম্মদ আজহারউদ্দিনের কাছে ক্রিকেটার পরিচয়ই প্রিয়। তবে বাকি দুই এর মধ্যে রাজনীতিই আজহারউদ্দিনের বেশি প্রিয়। আর সেটা সহজে ফল পাওয়া যায় বলে।

আজহারউদ্দিন বলেন, ‘অর্গানাইজিং খুব সহজ কাজ না, এটা বেশ কঠিন। রাজনীতিতে আপনি ফল খুব দ্রুত পেয়ে যান। আপনি ভোটের জন্য ৩-৪ মাস ক্যাম্পেইন চালান এরপর সোজাসুজি ফল পেয়ে যান। ক্রিকেটে আপনাকে অনেক ধাপ পেরিয়ে আসতে হয়, ক্রিকেট অর্গানাইজিংয়েও আপনাকে অনেক কিছু শিখতে হয়। ক্রিকেটের পর তাই আমার রাজনীতিই বেশি পছন্দ, এটা সহজ বলে।’

রিস্টের ব্যবহার খুব দারুণভাবে করতে পারতেন, খেলোয়াড়ি জীবনে দর্শকদের মোহাবিষ্ট করে রেখেছিলেন দারুণ ফ্লিক শট দিয়ে। জহির আব্বাসের সঙ্গে তুলনা করা হত আজহারউদ্দিনকে। তবে আজহারউদ্দিন বর্তমান সময়ের ক্রিকেটারদের মধ্যে রিস্ট ব্যবহার করে খেলা ক্রিকেটারদের মধ্যে স্টিভ স্মিথকে এগিয়ে রাখছেন। আলাদা করে বলেছেন স্বদেশী রোহিত শর্মার কথাও।

আজহার বলেন, ‘এখন অনেকেই রিস্টের ব্যবহার করে। আমার রোহিত শর্মার ব্যাটিং ভালো লাগে, সে যেভাবে ব্যাট করে। আমার মতে স্টিভ স্মিথ রিস্টের ব্যবহার করে বেশি খেলে থাকে। আপনি যদি তার খেলা দেখেন তা খুবই ভিন্ন, আনকনভেনশনাল। তো আমি স্টিভ স্মিথের কথাই বলবো।’

নিজে যখন খেলেছেন তখন টি-টেন তো দূরে থাক, আসেনি টি-টোয়েন্টিও। তবে সংক্ষিপ্ত সংষ্করণ পছন্দ আজহারউদ্দিনের, বললেন টি-টোয়েন্টি খেললে হয়তো ভালোই করতেন তিনি।

‘আমরা যখন ক্রিকেট খেলতাম তখন আমাদের ভাবনাতেও আসেনি। এখন ক্রিকেট ভিন্ন এক যুগে প্রবেশ করেছে। টি-টোয়েন্টি বা অন্যান্য ফরম্যাট বিভিন্ন দেশকে ভালোমানের ক্রিকেটার দিচ্ছে। আগে কি হত ৩-৪ বছর রঞ্জি ট্রফি খেলার পর আপনি জাতীয় দলে সুযোগ পেতেন, এখন কয়েকটা ম্যাচ খেলেই লোকে আপনাকে চিনে ফেলবে। টি-টেনের মত ফরম্যাটে অনেক দলই ট্যালেন্ট হান্ট করে। আমার মতে সংক্ষিপ্ত সংষ্করণ ভালোই। অনেকে টি-টোয়েন্টি পছন্দ করে না। তবে আমার মতে ক্রিকেটে অ্যাটিটিউড সবসময় পরিবর্তন হবে। আপনাকে সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হতে হবে।’

‘আমি জানি না আসলে, আমি তো কখনো খেলিনি (টি-টোয়েন্টি)। তবে হয়তো ভালোই খেলতাম।’

একসময়ের সেরা ব্যাটসম্যানদের ছোট তালিকা করলে সেখানে নাম থাকত আজহারের। ক্রিকেট খেলাটার মনোযোগী দর্শক ক্রিকেট৯৭ কে জানালেন তার পছন্দের বর্তমান সময়ের সেরা ৫ ব্যাটসম্যানের নাম।

‘স্টিভ স্মিথ, কেন উইলিয়ামসন, ভিরাট কোহলি, জো রুটকেও রাখতে হবে, আর আমি ডেভিড ওয়ার্নারের খেলা বেশ পছন্দ করি।’

মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন জানিয়েছেন বাংলাদেশ দলে কাদেরকে পছন্দ করেন সেটিও। তবে খুব বেশি অনুসরণ করেন না বাংলাদেশ দলকে। যতটুকু অনুসরণ করেন তাতেই ধরা পড়েছে বেশ কিছু কমতি।

আজহারউদ্দিন বলেন, ‘বাংলাদেশের সাকিবকে ভালো লাগে, সে বেশ ভালো ক্রিকেটার। আরো কয়েকজন আছে- মাহমুদউল্লাহ রিয়াদও বেশ ভালো, মুশফিকুর রহিম আছে। বাংলাদেশে পোটেনশিয়াল আছে তবে পারফরম্যান্স আসছে না, ধারাবাহিকতা আসতে হবে।’

‘খুব বেশি ফলো করা হয় না বাংলাদেশ ক্রিকেটের। তবে আমি দেখছিলাম, জানলাম যে তোমরা অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডকে হারিয়েছো। তবে দেশের বাইরেও তোমাকে জিততে হবে, সিরিজ না হলেও অন্তত ম্যাচ। আমি এগেও কয়েক জায়গায় বলেছি যে উইকেটে পরিবর্তন আনতে হবে। ভালো উইকেট বানাতে হবে। ভালো করতে হলে ভালো মানের উইকেট বানাতে হবে। নিজের পছন্দ মত উইকেট বানিয়ে তো জেতাই যায়। স্পিন সহায়ক উইকেট বানালে পেসারদের বেশি কিছু করার থাকে না। তবে আমি দেখেছি তাসকিন আহমেদের মতো ভালো কিছু পেসার আছে, তাদের জন্য সেই মানের উইকেট আপনাকে বানাতে হবে।’

সাবেক ক্রিকেটারদের ক্রিকেট অর্গানাইজেশন ও কোচিং রোলে দেখার পক্ষে আজহারউদ্দিন। নিজেও আছেন হায়দ্রাবাদ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে। তার একসময়ের সতীর্থ সৌরভ গাঙ্গুলি তো বিসিসিআইয়ের সভাপতিই। রাহুল দ্রাবিড় এখন ভারতের প্রধান কোচ। নিজের দেশেই এমন উদাহরণ আছে, আজহারউদ্দিন বললেন মাশরাফি বিন মর্তুজার মত ক্রিকেটারের সার্ভিসও পেতে চাইবে বিসিবি।

আজহার বলেন, ‘যখন আপনি লম্বা সময় ধরে ক্রিকেট খেলবেন তখন আপনি ক্রিকেট টাকে বেশ ভালোভাবে জানবেন। আপনি জানবেন ছেলেদের কি দরকার। আমি মনে করি ক্রিকেটাররা এসবের জন্য ভালো। আমি বলছি না সব সাবেক ক্রিকেটারই ভালো কোচ হবে বা অর্গানাইজার হবে, তবে ৯০ শতাংশই ভালো।’

‘অবশ্যই তার (মাশরাফি) অভিজ্ঞতা ব্যবহার করা উচিৎ। সে তো এখনো অবসর নেয়নি, যখন অবসর নিবে তখন বাংলাদেশ ক্রিকেট অবশ্যই তার সার্ভিস নিবে। এটা সবসময়ই ভালো অবসর নেওয়া ক্রিকেটারের সার্ভিস নেওয়া। কারণ তারা অনেক কিছু দিয়েছে দলকে, অনেক স্যাক্রিফাইস করেছে।’

ফরম্যাট, অ্যাটিটিউডের মতো চিন্তার পরিবর্তনও ক্রিকেটে আবশ্যক বলে মনে করেন আজহারউদ্দিন। রবি শাস্ত্রী-ভিরাট কোহলির পর রাহুল দ্রাবিড়-রোহিত শর্মা জুটিতে যেমন সম্ভাবনা দেখছেন সাবেক এই সফল অধিনায়ক।

‘ক্রিকেটে পরিবর্তন অনিবার্য। একজন মানুষ সারাজীবন এক পদে থাকবে না। ট্রানজিশনের সময় রাহুল দ্রাবিড়কে পাওয়া বেশ ভালো ব্যাপার। সে বেশ অভিজ্ঞ, অনূর্ধ-১৯ দলের সঙ্গে কাজ করেছে, ন্যাশনাল ক্রিকেট অ্যাকাডেমি (এনসিএ) এর প্রধান ছিল। রোহিত শর্মা নতুন অধিনায়ক, সে নতুন আইডিয়া আনতে পারবে। নতুন আইডিয়া আসা সবসময়ই ভালো।’

ক্যারিয়ারের শেষ সিরিজটি বাংলাদেশে খেলেছেন, সেদফাতে ফল পক্ষে না এলেও ১৯৯৮ তে এই বাংলাদেশের মাটিতেই জিতেছিলেন ইন্ডিপেন্ডেন্স কাপ। বাংলাদেশে স্মৃতি ভালো ও মন্দ মিলিয়ে থাকলেও বাংলা টাইগার্সের সঙ্গে অভিজ্ঞতা দারুণ বলেই জানালেন আজহারউদ্দিন। কিভাবে বাংলা টাইগার্সের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসাবে যুক্ত হলেন সে গল্প শোনানো আজহার জানালেন প্রস্তাব পেলে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের হয়ে কাজ করার কথাও ভাববেন তিনি।

‘আমার এক বন্ধু আমাকে ইয়াসিন ভাই (বাংলা টাইগার্সের স্বত্বাধিকারী ইয়াসিন চৌধুরী) এর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। সে আমাকে বাংলা টাইগার্সের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর করতে চায়। সে ক্রিকেটের প্রতি খুবই প্যাশোনেট, আমাকে পেতে আগ্রহীও ছিল। তার ছেলে জাফিরও বেশ ক্রিকেটপ্রেমী। আমরা একবার বসেই সিদ্ধান্ত নিই, দ্বিতীয় মিটিংয়ের দরকার পড়েনি।’

‘আমি বাংলা টাইগার্সে যুক্ত হয়ে বেশ খুশি। এখানে সবাইই খুব ভালো। আমি আশা করি ভাগ্য আমাদের সঙ্গে থাকলে আমরা এবার চ্যাম্পিয়ন হতে পারি। আমি দলে যে পোটেনশিয়াল দেখেছি তাতে টুর্নামেন্ট না জেতার কোন কারণ দেখি না আমি।’

‘আমি আমার ক্রিকেট ক্যারিয়ারের শেষ ৩ ম্যাচ বাংলাদেশে খেলেছি। তবে আমরা সেখানে ভালো ফল করিনি (২০০০ এশিয়া কাপ)। তবে ১৯৯৮ তে ইন্ডিপেন্ডেন্স কাপে আমরা ভালো করেছিলাম। তাই অভিজ্ঞতা কেবল খারাপ না। আর হ্যা, আমি অবশ্যই ভেবে দেখবো (বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড থেকে প্রস্তাব পেলে)।’

Shihab Ahsan Khan

Shihab Ahsan Khan, Editorial Writer of Cricket97 & en.Cricket97

Read Previous

সাকিব-রাকিবুলরা খেলবে কোলকাতা ইডেন গার্ডেন্সে

Read Next

২০২১ সালে টি-টোয়েন্টিতে সর্বোচ্চ সংখ্যক জয় পাকিস্তানের, চারে বাংলাদেশ

Total
54
Share