‘আমার সোনার বাংলা, কবে যাবো বাংলাদেশ’

'আমার সোনার বাংলা, কবে যাবো বাংলাদেশ'

আহ, এই সেই শারজাহ স্টেডিয়াম! নব্বই দশকে আমাদের গ্রামের ক্লাবের সাদাকালো টিভিতে যখন পাকিস্তান-ভারতের ক্রিকেট ম্যাচ দেখতাম, তখন টিভি স্ক্রিনে এই স্টেডিয়ামের নামটা ভেসে উঠতো। আজ (২৯ অক্টোবর) যখন স্টেডিয়ামের ভেতরে আমার প্রানপ্রিয় বাংলাদেশের খেলা দেখতে ঢুকি, তখন ভেতরে দারুন উত্তেজনা কাজ করছিলো।

কঠোর নিরাপত্তা বলয় পার হয়ে যখন গ্যালারিতে আমরা, তখন ইউএই’তে বসবাসরত প্রবাসী ভাইদের, “বাংলাদেশ বাংলাদেশ” চিৎকারে এই স্টেডিয়াম ততক্ষনে আমাদের হোম গ্রাউন্ড মিরপুর শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের রূপ ধারণ করেছে।

উইন্ডিজের গুটিকয়েক সমর্থকের সামনে পুরো গ্যালারিতে তখন বাংলাদেশের আধিপত্য। কিছুক্ষণ পরেই স্টেডিয়ামের লাউড স্পিকারে আমাদের জাতীয় সঙ্গীত বেজে উঠলো, ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’।

পুরো স্টেডিয়ামে যখন জাতীয় সঙ্গীতের সুরের মূর্ছনায় ঢেকে আছে মুগ্ধতার চাদরে, তখন হঠাৎ করে পাশ থেকে একটা প্রচন্ড আবেগ মিশ্রিত কন্ঠ আমার কানে ভেসে উঠলো, ‘আমার সোনার বাংলা, কবে যাবো বাংলাদেশ।’

সেই কন্ঠের মানুষটাকে পেলাম। নিজের পরিচয় দিয়ে তাঁর সম্পর্কে জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, ‘নাম সাইফুল, কুমিল্লায় বাড়ি। প্রায় আড়াই বছর আগে ইউএই’তে আসি। একটা চাকুরী করি শারজায়, এখন পর্যন্ত দেশে যেতে পারিনি। আজ শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় পাঁচ ছয়জন বন্ধু মিলে খেলা দেখতে এসেছি। বাংলাদেশের কথা খুব মনে পড়ে ভাই সাথে পরিবারের কথা। জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার সময় অটো মুখ থেকে বের হয়ে গেছে “কবে যাবো বাংলাদেশ”।’

No description available.
লেখকের সঙ্গে সানগ্লাস পরা (লাল ক্যাপ) ব্যক্তি সাইফুল

প্রিয় ক্রিকেটার কে, আমি জানতে চাইলাম। একটা মুচকি হাসি দিয়ে বললেন সাকিব আল হাসান।

ছেলেটার প্রতি এক অদ্ভূত ভালোবাসা অনুভব করলাম। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যে প্রায় ৪৮.০৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছুঁয়েছে, তাতে এই সাইফুল ভাইয়েরও ছোট্ট অবদান আছে।

এরপর থেকে উইন্ডিজের যত উইকেট পড়েছে আমি সাইফুলের সাথে হাই ফাইভ করেছি। আন্দ্রে রাসেলের অদ্ভুতুড়ে আউটের পরে পুরো স্টেডিয়াম বাংলাদেশ বাংলাদেশ চিৎকারে মুখরিত। বাউন্ডারি লাইনে মুশফিক ফিল্ডিং করতে আসলে এক দুষ্টু দর্শক “এই আয়না ভাই” বলে ডাক দিলে আশে পাশের বাকি দর্শকরা তাকে এমনভাবে শাসালো, ভাইটি ভয়ে তখন চুপসে গেছেন।

তাসকিন ৪ ওভারে ১৭ রান দিয়ে যখন বাউন্ডারি লাইনে আসলো, তখন আমাদের গ্যালারিতে একটাই আওয়াজ, ‘তাসকিন, তাসকিন’।

সবাইকে অবাক করে তাসকিন গ্যালারির দিকে তাকিয়ে দু’হাত তুলে মোনাজাতের ভঙ্গী করে দর্শকদের আল্লাহর কাছে দোয়া করতে বললেন। কিন্তু শেষের দিকে খরুচে বোলিংয়ে উইন্ডিজ ১৪৩ রানের লক্ষ্য ছুঁড়ে দিলো বাংলাদেশকে।

No description available.

No description available.

আমি-‘সাইফুল, কি মনে হচ্ছে আপনার?’
সাইফুল- ‘ভাই আজ বাংলাদেশ জিতবেই। টেনশন নিয়েন না।’

টেনশন বাড়ালেন সাকিব দলীয় একুশ রানে আউট হয়ে। তারপর ম্যাচ যখন প্রায় আমাদের হাতে চলে এসেছে তখন মুশফিকের সেই আত্মঘাতী রিভার্স সুইপ। এবার গ্যালারিতে শুনশান নিরবতা, এমনকি দর্শকেরাও অবিশ্বাস নিয়ে মুশফিকের প্যাভিলিয়নের দিকে যাওয়া দেখছেন, কিছুতেই এই সময়ে এভাবে আউট হওয়া মেনে নিতেই পারছেন না।

এরপর লিটনের ক্যাচটা যখন বাউন্ডারি লাইনে হোল্ডার ধরে ফেললো তখন, তখন আর কারোরই মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছিল না, কেউ কেউ মাথায় হাত দিয়ে মুখ নিচু করে বসে ছিলো। আন্দ্রে রাসেল যখন ইনিংসের শেষ বলটা করে সতীর্থদের নিয়ে উল্লাসে মেতে উঠলেন, তখন রাজ্যের হতাশা, অবিশ্বাস আমাদের চোখে মুখে।

সাইফুলের মলিন মুখ, চোখ টলমল করে, হয়তো এখনই কেঁদে ফেলবেন। আমার ভেতরটাও ক্ষত-বিক্ষত হয়, আমি আর ওঁর দিকে তাকাতে পারিনা, চোখ ভিজে আসে আমার।

লেখক-

মুহাম্মাদ নুরুল ইসলাম (মিঠু)
সাধারণ সদস্য, বাংলাদেশ ক্রিকেট সাপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএসএ)।

নুরুল ইসলাম

Read Previous

ধোনির রেকর্ডে ভাগ বসালেন রিজওয়ান

Read Next

সাকিব-মালিঙ্গাদের পেছনে ফেলে রাশিদ খানের দ্রুততম ‘১০০’

Total
24
Share