অন্যরকম যুদ্ধ জয়ের গল্প শোনালেন যুব দলের ক্রিকেটার

অন্যরকম যুদ্ধ জয়ের গল্প শোনালেন যুব দলের ক্রিকেটার

করোনা প্রভাবে অনেক কিছুর মত যুব পর্যায়ের ক্রিকেটও থমকে ছিল দীর্ঘদিন। সর্বশেষ যুব বিশ্বকাপের ফাইনালে বাংলাদেশ-ভারত মুখোমুখি। এরপর দেড় বছরের বেশি সময় অতিক্রম করে বাংলাদেশ-আফগানিস্তান সিরিজ দিয়ে গত মাসে ফিরলো যুবাদের ক্রিকেট। তবে দিনের পর দিন টাইগার যুবাদের ক্যাম্পে থেকেও সে স্বাদ নিতে পারেনি তাওহিদুল ইসলাম ফেরদৌস। উইকেট রক্ষক এই ব্যাটসম্যান যে সিরিজ শুরুর দিন কয়েক আগে মাঠ নয়, জীবন যুদ্ধে জয়ের লড়াই করেছেন!

আফগানিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ শুরুর আগে ব্যক্তিগত অনুশীলনে মাথায় বলের আঘাতে জীবন মরণের সন্ধিক্ষণে পার করেছেন লম্বা সময়। পুরোপুরি সুস্থ হয়ে মাঠে নামা হয়নি ঠিকই, তবে সিরিজ চলাকালীনই গ্যালারি থেকে সতীর্থদের উৎসাহ দেওয়ার মত শক্তি পেয়েছেন। কোচ ও সতীর্থরাও তাকে সাহস জুগিয়েছেন।

বলের আঘাত পেয়ে হাসপাতালে যাওয়া, সেখানে থেকে নানা জায়গা ঘুরে, তীব্র ব্যথা সহ্য করে, রাতের পর রাত না ঘুমিয়ে এখন স্বাভাবিক জীবনে তরুণ এই ক্রিকেটার। কঠিন এই সময়টা পার করে অপেক্ষায় আছেন দ্রুতই মাঠে ফেরার। সব ঠিক থাকলে নভেম্বরে যুব দলের ভারত সফরেই স্কোয়াডে ফেরার কথা তার।

No description available.

‘ক্রিকেট৯৭’ এর সাথে আলাপে সিলেটের এই ক্রিকেটার জানিয়েছেন এই যাত্রার অদ্যোপান্ত। এক রাশ অন্ধকার হাতড়ে জীবনের নতুন মানে খুঁজে পেয়েছেন।

তাওহিদুল বলেন, ‘পরদিন আমার ঢাকায় যাওয়ার কথা। আমি আগেরদিন স্টেডিয়ামে অনুশীলন করতে যাই। মূলত সরঞ্জামগুলো নিয়ে আসতে আর কিছুক্ষণ অনুশীলন করতে। অনুশীলন প্রায় শেষেরদিকে, সব গুছিয়ে নিচ্ছি। ঐ সময়ে বল স্টাম্পের বেলে পড়েই আমার মাথায় লাগে। আমি কিপিং করছিলাম, বলটা বুঝতে পারিনি। আঘাত পেয়েই জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। ওখানে আবু জায়েদ রাহি ভাইরাও অনুশীলন করতো।’

‘উনি আর আমার কোচ ইমন স্যার (একে এম মাহমুদ ইমন) হাসপাতালে নিয়ে যায়। ২০-২৫ মিনিট পর আমার জ্ঞান ফিরে, দেখি অক্সিজেন লাগানো, হার্টেও অনেক কিছু লাগানো। ওখানকার কর্তৃপক্ষ জানায় ডাক্তার আসতে দেরি হবে, আমাকে যেন অন্য হাসপাতালে নেয়। পরে নাদেল (শফিউল আলম চৌধুরী , বিসিবি পরিচালক) স্যারের সাথে আলাপ করে ইমন স্যার ওসমানী মেডিকেলে ভর্তি করে ফেলে।’

‘সে সময় কি পরিমাণ যন্ত্রণা হচ্ছে বোঝাতে পারবোনা। ওখানে আমাকে স্যালাইন দেয়, ইনজেকশন ও ঘুমের ঔষুধ দেয়, ঘুমিয়ে পড়ি। এরপর দেখলাম অনেক লোকজন এসেছে ক্রিকেট বোর্ডের (সিলেট জোনের), আমাকে হাসপাতাল থেকে ছেড়েও দেয়। কিন্তু বাসায় এসেই আমার চোখ, মুখ ফুলে বন্ধ হওয়ার উপক্রম। এত বেশি যন্ত্রণা ছিল যে টানা ১৮ রাত না ঘুমিয়ে থাকতে হয়েছে। শুয়ে থাকলে মাথা ও নাক দিয়ে রক্ত বের হয়। এরপর বিসিবি থেকে বলা হয়েছে আমাকে আল হারামাইন হাসপাতালে ভর্তি করানোর জন্য।’

‘ওখানে দুইদিন ছিলাম, তারা বলল এখানে আমরা আর পারবোনা, সার্জারি করাতে হবে ঢাকায় নিয়ে, বোর্ডের সাথে যোগাযোগ করুন। এরপর স্যারেরা মিলে বোর্ডের সাথে পরামর্শ করে আমাকে ঢাকায় নেয় ৬-৭ দিন পর। তারপরও আমার ঘুম নাই। যতদিন হাসপাতালে ছিলাম ঘুম হয়েছে, উনারা পেইন কিলার দিতেন। বাসায় যতদিন ছিলাম কোনো ঘুম নাই। ঢাকায় এসে দেবাশীস (বিসিবির প্রধান চিকিৎসক) স্যারের সাথে কথা হয়, উনি বলল ডাক্তার দেখাতে, হাসপাতালে ভর্তি হতে।’

No description available.

‘তো যেদিন হাসপাতালে গেছি এরপরদিনই আমার সার্জারি হয়ে গেছে। এরপর ২-৩ দিন আবার আমার কোনো জ্ঞান ছিল না। যখন আমার জ্ঞান ফেরে তখন এত পরিমাণ ব্যথা অনুভব করেছি যে…হাতে পায়ে চারদিকে স্যালাইন। নাক দিয়ে রক্ত বের হয়েছে অনবরত, ৩ দিন ডাক্তাররা বন্ধ করতে পারছিল না। যে কারণে কিছু খাইতে পারিনি, কথা বলতে পারিনি। এক পর্যায়ে সব ঠিকঠাক করে আমাকে ছেড়ে দিয়েছে, বলল বাসায় চলে যাও ১৫ দিন পর আবার আইসো।’

‘বাসায় আসার পর পেইন কিলার খেয়েও কাজ হচ্ছিল না। সেলাই শুকায়নি বলে অনেক বেশি ব্যথা ছিল। ডাক্তার আর আমার দলের ফিজিও সানি (মুজাদ্দেদ সানি) স্যারের সাথে কথা বলেছি। এভাবে ১০ দিন কেটে গেছে। আবার ঢাকায় এসে হাসপাতালে যাই, ডাক্তার ইনজেকশন দেয়, পেইন কিলার দেয়।’

‘বলে আশা করি সব দ্রুত ঠিক হয়ে যাবে, মাঠে নেমে যেতে পারবে। উনি আমাকে মাঠে নামার মত অবস্থার কথা জানান। তবে দেবাশীস স্যার বলছেন ঝুঁকি না নিতে, বিশ্রাম নিতে। স্যার ২১ দিনের বিশ্রাম দিয়েছে, আজকে ১৯ দিন হল। আরও দুইদিন পর মাঠে নামতে পারবো। ফিজিও বলেছে সিরিয়াস অনুশীলন না করে হাল্কা হাতের কিছু কাজ করতে।’

সতীর্থরা যখন মাঠে খেলছেন তাওহিদুল তখন জীবন যুদ্ধে লড়াই করছিলেন। কিছুটা সুস্থ হয়ে অবশ্য ঘরে বসে থাকেননি। সিলেটে বাসা হওয়াতে সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে চলে যান টাইগার যুবাদের খেলা দেখতে। নিজে খেলতে না পারার আফসোস অবশ্য লুকাননি।

তাওহিদুল যোগ করেন, ‘একটু আফসোস তো ছিলই। নিজেদের মাটিতে খেলা, আর এই সিরিজ লক্ষ্য করে আমরা নিজেদের প্রস্তুত করছিলাম। অনেক ক্যাম্প হয়েও সিরিজ বাতিল হয়েছিল বেশ কয়েকটা। শেষ পর্যন্ত যে সিরিজ মাঠে গড়ালো সেটাই মিস করেছি। অনেক আফসোস ছিল। আমার সতীর্থরা আমাকে দেখেছে, খুব ভালো আচরণ করেছে। ওরা সবাই মাঠ থেকেই আমাকে অনেক উৎসাহিত করেছে।’

‘নাভিদ (প্রধান কোচ নাভিদ নেওয়াজ) স্যারকে ডাক দিয়েছি যখন আমাদের ব্যাটিং ইনিংস শেষ হয়েছে। গ্যালারি থেকে ডাক দিয়েছি, সার্জারির জন্য চুল কাটায় প্রথমে চিনতেছেনা। পরে চিনলো, বেশ কিছুক্ষণ কথা হয়েছে। কতদিনের বিশ্রাম সেসব জিজ্ঞেস করলো। স্যারকে সব বিস্তারিত বললাম, উনি বিশ্রামে থাকতে বলেছে।’

No description available.

এদিকে সামনের সিরিজগুলোতে নিজের অংশ গ্রহণ নিশ্চিতে যুব দলের নির্বাচক সাজ্জাদ আহমেদ শিপনের সাথে যোগাযোগও করেছেন উইকেট রক্ষক এই ব্যাটসম্যান। নির্বাচক, কোচ দুজনেরই পছন্দের বলে তাওহিদুল পেয়েছেন নিশ্চয়তা।

তিনি বলেন, ‘আমি নির্বাচক শিপন স্যারের সাথে কথা বলেছি। উনি বলছে কোনো সমস্যা নাই। উনি আর আমাদের প্রধান কোচ দুজনেই আমাকে খুব পছন্দ করে। উনি চায়না যে আমি এখান থেকে সরে যাই। উনারা চাচ্ছেন আমি যেন দ্রুত মাঠে নামি, দলের সাথে যোগ দেই। গতকাল ফিজিও স্যারও বলছে উনাকে নাভিদ নেওয়াজ স্যার বলেছেন আমি যেন সামনে ভারত সফরের জন্য প্রস্তুতি রাখি।’

নাজমুল হাসান তারেক

Read Previous

প্লে অফে যাওয়া দিল্লির আরও এক জয়

Read Next

জায়সওয়াল-দুবের ঝড়ে ম্লান রুতুরাজের শতরান, রাজস্থানের স্বস্তির জয়

Total
27
Share