‘ব্যারিয়ার’ ভাঙতে চাওয়া মাহমুদউল্লাহ’র দলে ‘নেতা’ মুস্তাফিজ

বড় হৃদয় নিয়ে বল করেছে বাংলাদেশ, মুস্তাফিজ ছিলেন দুর্দান্ত

সাকিব আল হাসানের নিষেধাজ্ঞায় ২০১৯ সালে টি-টোয়েন্টি দলের নেতৃত্ব পান অভিজ্ঞ মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। দুই বছরের ব্যবধানে বিশ্বকাপের মত মঞ্চে তিনিই নেতা। এ সময়ে দলকে গুছিয়েছেন, এই ফরম্যাটে দেশের সফল অধিনায়ক বনে গেছেন। তবে সব ছাপিয়ে বিশ্বকাপই যে হতে পারে সাফল্য-ব্যর্থতা বিচারের মানদন্ড মানছেন রিয়াদ নিজেই।

বিশ্বকাপ সামনে রেখে ‘ক্রিকেট৯৭‘ কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে টাইগারদের টি-টোয়েন্টি কাপ্তান কথা বলেছেন বাংলাদেশের শক্তিমত্তা, সম্ভাবনা, ক্রিকেট সংস্কৃতির পরিবর্তন নিয়ে। তরুণ ক্রিকেটারদের দিয়েছেন বার্তা, মুস্তাফিজুর রহমানকে বলেছেন বোলারদের নেতা। নিজের সাফল্যের পেছনে তুলে ধরেছেন সততার গল্প, সাকিবকে নিয়ে নেই একটুও চিন্তা। সেসবই তার ভাষাতে পাঠকদের জন্য দেওয়া হল-

ক্রিকেট৯৭: ২০০৭ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারানোর পর এত বছরেও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মূল পর্বে আর কোনো ম্যাচ জিতেনি বাংলাদেশ। এবার সে ধারায় পরিবর্তন আনায় কতটা আত্ববিশ্বাসী?

মাহমুদউল্লাহ: ইন শা আল্লাহ আমাদের সবারই লক্ষ্য থাকবে যেন সেই ব্যারিয়ারটা ভাঙতে পারি। ২০০৭ সালে আমরা প্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে জিতেছিলাম। খুব ভালো ক্রিকেট খেলেছিলাম আলহামদুলিল্লাহ। আমার এখনো মনে আছে ঐ ম্যাচটার কথা।

images 13

কিন্তু এরপরে হয়তো আমরা ভালো খেলতে পারিনি বা কিছু ক্ষেত্রে ভাগ্যও সহায় ছিল না। তবে ইন শা আল্লাহ এবার চেষ্টা করবো যেন (বাছাই পর্ব উতরে গেলে) গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলো জিততে পারি এবং ঐ ব্যারিয়ারটা ভাঙতে পারি।

ক্রিকেট৯৭: অভিজ্ঞতা বিচারে সবচেয়ে তরুণ দল বলা হচ্ছে বাংলাদেশকে। অধিনায়ক হিসেবে আপনার চোখে এই দল নিয়ে কতটা বাজি ধরা সম্ভব?

মাহমুদউল্লাহ: আমার মনে হয় আমাদের দলের কম্বিনেশনটা অনেক ভালো। তরুণদের সাথে অভিজ্ঞ দুই দিক থেকেই বেশ সমৃদ্ধ আমরা। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি আমাদের দলের ভারসাম্যটা বেশ ভালো। বিশেষ করে আমরা যেভাবে ক্রিকেট খেলছি গত তিনটা সিরিজ, সেই ধারা যদি বজায় রাখতে পারি তবে বিশ্বকাপে ভালো কিছু অর্জন সম্ভব ইন শা আল্লাহ।

ক্রিকেট৯৭: টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক হিসেবে গত দুই বছর দলকে নিজের মত করে গুছিয়েছেন। বিশ্বকাপই কি হতে পারে সাফল্য-ব্যর্থতা বিচারের বড় মঞ্চ?

মাহমুদউল্লাহ: অবশ্যই বিশ্বকাপ অনেক বড় একটা মঞ্চ এবং পুরো বিশ্ব ক্রিকেটই এখানে তাকিয়ে থাকে। আমি আশা করি সবার এটার প্রতি বাড়তি রোমাঞ্চ কাজ করবে। আর সবাই সেভাবেই উদ্দীপনা পাবে, আমি আশা করি আমরা এমন একটা বড় মঞ্চে নিজেদের সেরাটা দেখাতে পারবো ইন শা আল্লাহ।

ক্রিকেট৯৭: বাংলাদেশ দলকে যখনই টি-টোয়েন্টিতে বাজে দল বলা হয়েছে তখনই আপনি প্রতিবাদ করেছেন। পরিসংখ্যানকে এক পাশে রেখে অন্তত বোঝানোর চেষ্টা করেছেন দলটার সামর্থ্য আছে বহু দূর যাওয়ার। সেটাই কি এবার দেখতে পাবে বিশ্ব?

মাহমুদউল্লাহ: এই কথাটা আমি আগেও বেশ কয়েকবার বলেছি, র‍্যাংকিংয়ের যে হিসাবটা দেখাচ্ছিল তার চেয়ে ভালো দল আমরা। আমি নিজে এটা সবসময়ই বিশ্বাস করতাম এবং আমাদের সেই সামর্থ্য আছে। হয়তোবা আমাদের ওরকম পাওয়ার হিটার নাই তবে আমার কাছে মনে হয় আমাদের স্কিল লেভেল বিশেষ করে ব্যাটিংয়ে ভালো আছে।

বোলিং ইউনিটও ভালো, ফিল্ডিং ইউনিট এখন বেশ উন্নতি করেছে আলহামদুলিল্লাহ। তো আমি আশা করি আমরা যদি নিজেদের দিনে ভালো ক্রিকেট খেলতে পারি ফলাফল আমাদের দিকে আনাটা সম্ভব।

ক্রিকেট৯৭: সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমানের মত কন্ডিশনে নিজেদের শক্তির জায়গাটা আসলে কি হবে?

মাহমুদউল্লাহ: সংযুক্ত আরব আমিরাতে আমরা এর আগেও খেলেছি। ২০১৮ সালে এশিয়া কাপের ফাইনাল খেললাম, ফাইনালটাও প্রায় বেশ কাছাকাছি গিয়েছিলাম। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে হয়নি, ছোটখাটো একটা ভুলের কারণে। আমি মনে করি ওমান ও আরব আমিরাতে কন্ডিশন অনেকটা একই থাকবে। তো আমাদের কেবল ঐ জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে হবে, নির্দিষ্ট দিনে কন্ডিশন কেমন, উইকেট কি একটু স্পোর্টিং, স্লো নাকি ফাস্ট এই জিনিসগুলো চিহ্নিত করতে হবে।

আর সেভাবেই আমাদের প্রয়োগ করতে হবে। মূলত টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে আপনার স্কিলগুলোকে যত তাড়াতাড়ি বুদ্ধিমত্তার সাথে মানিয়ে নিতে পারবেন তত বেশি ভালো ফল পাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। তো এই জিনিসগুলো আমাদের আগে থেকেই চিন্তা ভাবনা করতে হবে, পরিকল্পনা করতে হবে এবং প্রয়োগটা যেন ঠিকঠাক করা যায় সেদিকে নজর দিতে হবে।

ক্রিকেট৯৭: আইসিসি ইভেন্ট বলে স্পোর্টিং উইকেট হবে বলেই ধারণা করা যায়। সেক্ষেত্রে স্পিনারদের সাথে পেসারদেরও ভালো ভূমিকা রাখতে হবে। এ জায়গাটায় বাংলাদেশের পেসাররা প্রস্তুতির দিক থেকে পিছিয়ে পড়লো কিনা?

মাহমুদউল্লাহ: প্রকৃতপক্ষে বেশিরভাগ সময়ই আইসিসি ইভেন্টগুলোতে উইকেট স্পোর্টিং থাকে, যা অবশ্যই ভালো ব্যাপার। আশা করি আপনারা সবাই খেলা উপভোগ করবেন। আমি মনে করি আমাদের তিনটা বিভাগেই সমান দক্ষতার সাথে খেলতে হবে এবং তাতেই আমরা ভালো কিছু অর্জন করতে পারবো। আমার কাছে ব্যক্তিগতভাবে মনে হয় আমাদের বোলিং ইউনিট (পেস বোলিং সহ) বেশ সমৃদ্ধ ও ভালো ফর্মে আছে। আমি আশা করি তারা তাদের এই ভালো ফর্ম টেনে নিতে পারবে বিশ্বকাপের মত বড় মঞ্চে।

ক্রিকেট৯৭: অনভিজ্ঞ দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ আপনি, সাকিব ও মুশফিক। বিশ্বকাপে এটাকে বাংলাদেশের মূল শক্তি বলা যায় কিনা?

মাহমুদউল্লাহ: প্রকৃতপক্ষে যেকোনো ক্রিকেটারের জন্যই বিশ্বকাপ অনেক বড় একটা মঞ্চ। আমি,সাকিব কিংবা মুশফিকের জন্য যদি এটা ৬-৭ বারের অভিজ্ঞতা হয়েও থাকে তবুও এটা একদমই নতুন বিশ্বকাপ। যারা এর আগে খেলেনি তাদের জন্যও এটা অনেক বড় সুযোগ।

আমি আশা করি তারা মুখিয়ে আছে ভালো ক্রিকেট খেলার জন্য এবং নিজেদের স্বভাবজাত চরিত্র দেখানোর জন্য। আমাদের অবশ্যই দল হিসেবে খেলতে হবে। যদি আমরা সেটা পারি, ছোট ছোট কাজগুলো নিজেদের দিনে করতে পারি আমাদের ভালো সুযোগ থাকবে ইন শা আল্লাহ।

ক্রিকেট৯৭: ৬-৭ জন ক্রিকেটার প্রথমবার বিশ্বকাপ দলে। একটা সময় এই প্রথমের রোমাঞ্চ ছুঁয়ে গেছে আপনাকেও। যতই চাপমুক্ত থাকার বার্তা দেওয়া হোক একটা অদৃশ্য চাপ তো থাকেই। সেটা যতটা সম্ভব দূর করতে চ্যালেঞ্জ জয়ের মন্ত্রটা কীভাবে গেঁথে দিচ্ছেন তরুণদের?

মাহমুদউল্লাহ: যারা তরুণ আছে তাদের প্রতি আমার একটাই বার্তা নিজের মত খেলো, ভয়ডরহীন ক্রিকেট খেলো। সাফল্য ব্যর্থতা নিয়ে যেন চিন্তা ভাবনা না করে। প্রত্যাশা তো সব সময়ই থাকবে, আপনি যখনই বাংলাদেশের জন্য খেলবেন। এই ব্যাপারগুলো এক পাশে রেখে নিজেদের মনটা উজাড় করে যেন খেলে। তাহলে আশা করি দলের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনতে পারবে।

mahmudullah mustafizur daily sun

ক্রিকেট৯৭: তরুণদের নেতা বললে অবশ্যই মুস্তাফিজকে সামনে আনতে হবে। দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্যও। অধিনায়ক হিসেবে তাকে সর্বশেষ সিরিজগুলোতে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন এবং বিশ্বকাপে তার ভূমিকা কীভাবে দেখেন?

মাহমুদউল্লাহ: মুস্তাফিজ গত কয়েক বছরে এক কথায় দুর্দান্ত। আমরা গত কয়েক সিরিজেও দেখেছি সে মা শা আল্লাহ কতটা দুর্দান্ত ফর্মে আছে। আমি আশা করি এই টুর্নামেন্টে সে অন্যতম মূল বোলার হবে। আর ও যেভাবে বল করছে, ছন্দে আছে সে অবশ্যই আমাদের বোলিং ইউনিটের নেতা। আর আমি আশা করছি বাংলাদেশের জন্য সে খুব ভালো কিছু দিবে (এই টুর্নামেন্টে)।

ক্রিকেট৯৭: সাকিবের মত ক্রিকেটারের কাছ থেকে সেরাটা পাওয়া যেকোনো অধিনায়কের জন্য আশীর্বাদ। নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ফেরা সাকিব ফর্মে আছেন, সিরিজ সেরা হচ্ছেন কিন্তু ঠিক যেন সাকিবময় পারফরম্যান্স হচ্ছেনা। বিশেষ করে ব্যাট হাতে তার কাছে প্রত্যাশা নিশ্চিতভাবেই আরও বেশি। বিশ্বকাপই কি হতে পারে সাকিবের স্বরূপে ফেরার মঞ্চ?

মাহমুদউল্লাহ: সাকিব একজন বিশ্বমানের ক্রিকেটার, এক নম্বর ক্রিকেটার, এক নম্বর অলরাউন্ডার অনেক বছর ধরে। হয়তো ২-১ টা ম্যাচ সে তার ক্যালিবার অনুযায়ী পারফর্ম করতে পারেনি। আপনারা যেটা বলছেন সম্ভবত ব্যাট হাতে…। তবে এগুলো নিয়ে আমি মোটেও চিন্তিত না।

1b85af69fdb846c109fc6004e2be9b9a 5dbd754a71083

আমি আশা করি সে নিজেও এসব নিয়ে খুব একটা চিন্তিত না। কারণ আমরা সবাই জানি ওর সক্ষমতা সম্পর্কে। আলহামদুলিল্লাহ সে আমাদের অন্যতম সেরা একজন ক্রিকেটার। আর সে এই টুর্নামেন্টেরও বড় খেলোয়াড় হবে বলে আমি আশা করছি ইন শা আল্লাহ।

ক্রিকেট৯৭: প্রায় এক যুগের ক্যারিয়ার, দলের নবীন সদস্য থেকে দলকে বিশ্বকাপের মত নেতৃত্ব দেওয়া, লম্বা একটা যাত্রা। আপনার কি মনে হয় আমাদের ক্রিকেট সংস্কৃতিতে এই সময়টায় বড় একটা পরিবর্তন এসেছে?

মাহমুদউল্লাহ: আলহামদুলিল্লাহ, পরিবর্তন সব দিকেই এসেছে। এটা একটা ইতিবাচক দিক বাংলাদেশের ক্রিকেটে। ড্রেসিং রুম, মাঠের পরিবেশ, সবার প্রস্তুতি, সবার ম্যাচ প্রস্তুতি যে দিকের কথাই বলিনা কেন সব দিক থেকেই সবাই এখন ইতিবাচকভাবে চিন্তা করে। আর ইতিবাচক মানসিকতা নিয়েই আমরা এখন মাঠে নামি। এই জিনিসগুলো অনেক ইতিবাচক লক্ষ্মণ, আর এভাবেই আমরা সামনের দিকগুলোতে আরও উন্নতি করতে পারবো ইন শা আল্লাহ।

ক্রিকেট৯৭: আপনার ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারেই যদি নজর দিই। নানা চড়াই উতরাই ছিল। বাজে ফর্ম ধাওয়া করেছে, কোচ বদলেছে, কোচের সুনজর, কুনজর বলে একটা বিষয় ছিল। এত চ্যালেঞ্জ জয় করে আজকের মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, বাংলাদেশের সফল টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক। নিজের জীবন থেকেই কি নিজেকে কোনো বার্তা দেন?

মাহমুদউল্লাহ: আলহামদুলিল্লাহ, বাংলাদেশের জন্য এখনো যতটুকু খেলেছি, প্রায় ১৪ বছর হয়ে গেছে। এই যাত্রাটায় অনেক চড়াই উতরাই আছে, সবকিছুর জন্যই আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করি। কারণ একটা বাজে, দুঃসময় আপনাকে অনেক কিছু শেখায়। আমার একটা জিনিসই সবসময় বিশ্বাস ছিল, আপনি যদি সৎভাবে কষ্ট করেন এটার ফল অবশ্যই পাবেন।

তো নিজের কাজের প্রতি সৎ থাকা, সতীর্থদের প্রতি সৎ থাকা এ জিনিসগুলোতে আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল। এই মূলমন্ত্রগুলো মেনে নিয়েই আমি সবসময় চেয়েছি নিজের দলকে সেবা দিতে। আর সামনে যতদিন খেলবো নিজেকে এভাবেই সৎ রাখার চেষ্টা করবো, সতীর্থদের সাথেও সৎ থাকবো। আর নিজের ভালো পারফরম্যান্স দিয়ে দলকে সেবা দিয়ে যেতে চাই ইন শা আল্লাহ।

নাজমুল হাসান তারেক

Read Previous

ইপিএল মাতাতে ভোরে দেশ ছাড়লেন তামিম ইকবাল

Read Next

ম্যাচ জিতেও শাস্তি পেল কোলকাতা, মরগানকে বড় অংকের জরিমানা

Total
34
Share