বাংলাদেশের সব হারানো ম্যাচে সাকিবের প্রাপ্তি একটি গোলাপ

shakib

তখন করোনা ছিল না, টেস্ট ম্যাচেও হাজার পাঁচেক দর্শক অনায়েসেই জায়গা করে নিত গ্যালারিতে। এমনই এক শরতের দুপুরে গ্যালারির কাঁটাতার ডিঙিয়ে প্রিয় তারকা সাকিব আল হাসানের জন্য গোলাপ নিয়ে মাঠে হাজির ফয়সাল নামের এক যুবক। ২০১৯ সালের চট্টগ্রাম টেস্টের দ্বিতীয় দিনের ঘটনা এটি, ততক্ষণে নবাগত টেস্ট দল আফগানিস্তান নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে নিজেদের দিকে নিয়ে নিচ্ছে।

আফগানদের বিপক্ষে চট্টগ্রাম টেস্ট বাংলাদেশ ক্রিকেটেই বহু দিনের আক্ষেপ হয়ে থাকবে। আক্ষেপের চাইতে কালো অধ্যায় বললেও হয়তো দেশের ক্রিকেট ভক্ত সমর্থক, বিশ্লেষকদের কাছে বাড়াবাড়ি মনে হবেনা। দেশের ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনই যে এখনো সেই দুঃখ ভুলতে পারেননি।

3 4
ছবিঃ দ্য ডেইলি স্টার

উপরে উল্লেখিত গোলাপ পাওয়ার ঘটনাটাই ঐ টেস্টের একমাত্র প্রাপ্তি সেদিনের বাংলাদেশ অধিনায়ক সাকিবের। পুরো চট্টগ্রাম টেস্টকে এক সুতোয় গাঁথতে গেলে সাকিবই যে আসবেন ঘুরেফিরে, যার পুরোটাই আবার নেতিবাচকতায় ভরা। টেস্ট শুরুর আগে পরে মিলিয়ে ৬ দিনে ৪ বার সংবাদ সম্মেলনে এসেছেন তিনিই…

প্রতিটি সংবাদ সম্মেলনই ছিল বিস্ফোরক মন্তব্যে ভরা। তার টেস্ট অধিনায়কত্বে অনীহা, অধিনায়কত্ব করলেও কিছু বিষয়ে আলোচনা করার প্রয়োজনীয়তা, উইকেট নিজেদের চাহিদামত না হওয়া, দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের কাঠামো নিয়ে অভিযোগ ছিল উল্লেখযোগ্য।

তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে এই লেখার সারমর্মই হয়তো তুলে ধরেছেন ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে। যেদিন সাকিব নিজেদের পারফরম্যান্সকে বিশেষায়িত করতে খুঁজে পাচ্ছিলেন না শব্দও।

তার ভাষাতেই শোনা যাক, ‘খারাপ, এভাবে হারাটা খুবই খারাপ এবং এর থেকে বেশি……খারাপের থেকে নিচে কোনো শব্দ আছে কিনা, থাকলে সেটি বলতে পারেন। খুবই খারাপ পারফরম্যান্স, হতাশাজনক। যত কিছু আছে নেতিবাচক কথা, আমি যা পাচ্ছি না খুঁজে, চাইলে সবই বলে দিতে পারেন।’

৯ সেপ্টেম্বর প্রায় সারাদিনই চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে বৃষ্টি ঝরলো। তবে এদিন নিশ্চিতভাবেই বৃষ্টি থামার প্রার্থনা করেনি টাইগার সমর্থকরা। কারণ রাশিদ খানের নেতৃত্বাধীন আফগানিস্তানের কাছে আগের চারদিন যে অসহায়ত্ব সামনে এসেছে সেটির চূড়ান্ত রূপই নিবে বৃষ্টি থামলে। জয়ের জন্য আফগানদের প্রয়োজন কেবল ৪ উইকেটে।

নিজেদের টেস্ট ইতিহাসের মাত্র তৃতীয় ম্যাচ খেলতে নামা আফগানদের বঞ্চিত করতে চায়নি ক্রিকেট বিধাতাও। তবে কিঞ্চিৎ বাংলাদেশকে লজ্জা এড়ানোর সুযোগ দিয়ে তাদের কাজটা কঠিন করে দিয়েছিল।

৩৯৮ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে চতুর্থ দিন খেলা বন্ধের আগেই ৬ উইকেট হারিয়ে ১৩৬ তুলেছে বাংলাদেশ। সাকিব ৩৯ ও সৌম্য সরকার কোনো রান না করে অপরাজিত ছিল।

পঞ্চম দিনের শুরু থেকেই বৃষ্টি, মাঝে ১৩ বল মাঠে গড়িয়েছিল। এরপর থেমেছে শেষ বিকেলে। ততক্ষণে আফগানদের হতাশা, আক্ষেপ যেন বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশ যেন বড় এক লজ্জার হাত থেকে বাঁচার আভাস পাচ্ছিলো।

কিন্তু এই ম্যাচে সর্বকনিষ্ঠ টেস্ট অধিনায়ক হিসেবে যাত্রা শুরু করা রাশিদ খানের অলরাউন্ড নৈপুণ্য বৃথা যাওয়াটা হত অন্যায়। তাইতো সাগরিকায় রাশিদকে এক ঘণ্টায় সব নিজের করে নেওয়া সুযোগ দেন ক্রিকেট বিধাতা। রাশিদ দুই হাত ভরে নিলেন সেই সুযোগ, বাঁধ ভাঙা উচ্ছ্বাসের জোয়ার মিলেছে পাশের বঙ্গোপসাগরে গিয়ে।

সম্ভব ১৮.৩ ওভার খেলা মাঠে গড়াবে, হাতে ৪ উইকেট বাংলাদেশের। ড্র করতে কাটাতে হবে এই কয়টা ওভারই। বাঁহাতি চায়না ম্যান জহির খানের করা প্রথম বলেই ফিরেছেন সাকিব, অফ স্টাম্পের বেশ বাইরের বল কাট করতে গিয়ে কট বিহাইন্ড। ঐ সময় এমন কিছু নিতান্তই অহেতুক, পরে নিজেও সেটি স্বীকার করেছেন।

May be an image of 3 people

সাকিবের বিদায়েই মোমেন্টাম পুরোপুরি আফগানদের। দিনের সম্ভব ৩.২ ওভার বাকি থাকতেই একে একে সাজঘরে মেহেদী হাসান মিরাজ, তাইজুল ইসলাম ও সৌম্য সরকার। যাদের তিনজনকেই ফিরিয়েছেন রাশিদ খান। দুই ইনিংসে তার শিকার ১১ উইকেট (৫ ও ৬), সাথে প্রথম ইনিংসে ব্যাট হাতে হাঁকিয়েছেন ফিফটি। টেস্ট অধিনায়কত্বের অভিষেকে এমন কীর্তি নেই আর কারও।

দুই ইনিংস মিলিয়ে আফগানদের এক সেঞ্চুরি ও ৪ ফিফটি। রহমত শাহর ১০২ রানের ইনিংসটি ছিল দেশের হয়ে প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি। আসগর আফগান (৯২) ও ইব্রাহিম জাদরানও (৮৭) গিয়েছে সেঞ্চুরির দ্বারপ্রান্তে। যেখানে বাংলাদেশ পেয়েছে সাকূল্যে এক ফিফটির দেখা। তাতেই স্পষ্ট পুরো ম্যাচে কতটা দাপট দেখিয়েছে যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশের ক্রিকেটাররা।

এমনিতে ততদিনে ঘরে মাঠের স্পিন নির্ভর উইকেট বানানো শুরু করেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু স্পিনারে ঠাঁসা আফগানদের বিপক্ষে টিম ম্যানেজমেন্ট এতটাই স্পিন নির্ভরতা চেয়েছে যে একাদশে ছিল না একজন পেসারও। যা অবাক করেছে সবাইকে।

অথচ প্রতিপক্ষে রাশিদ খান, জহির খান, মোহাম্মদ নবি, কাইস আহমেদদের মত স্পিন বৈচিত্রে ভরপুর। প্রতিপক্ষের জন্য ফাঁদ তৈরি করে সে ফাঁদে নিজেরাই পড়েছিল টাইগাররা। যদিও উইকেট চাহিদামত হয়নি বলে ছিল বিস্তর অভিযোগ।

তৃতীয় দিন সাকিব জানান, ‘সত্যি আমরা অনেক অবাক হয়েছি। এটা আমরা আশা করিনি। যেটা আশা করেছি তার উল্টোটা পেয়েছি। তার মানে এই নয় যে আমরা ভালো করতে পারব না। অনেক সময় প্রত্যাশা মতো সবকিছু নাও হতে পারে।’

‘তবে ভালো দল এখান থেকেই প্রমাণ করে। ভাবনার বাইরের প্রশ্ন এলে তারা সেটির উত্তর দিতে পারে। আমাদের চেষ্টা থাকবে ওই উত্তর যেন দিতে পারি। তবে হ্যাঁ, এই পিচ প্রত্যাশার বাইরে ছিল।’

এই ম্যাচ দিয়েই টেস্ট ক্রিকেটে নিজের গ্লাভস জোড়া তুলে রাখেন মুশফিকুর রহিম। দেশের ও নিজের তৃতীয় টেস্টেই সাদা পোশাককে যত্ন করে সাজিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নেন আফগান অলরাউন্ডার মোহাম্মদ নবিও।

টেস্ট শেষে সংবাদ সম্মেলনে অধিনায়কত্ব নিয়ে প্রশ্নের জবাবে সাকিব বলেন, ‘ অধিনায়কত্ব যদি না করতে হয় তাহলে আমার মনে হয় সবথেকে ভালো হবে আমার জন্য। আমার কাছে মনে হয় ক্রিকেটের জন্য ভালো হবে ব্যক্তিগত দিক থেকে চিন্তা করলে। আর নেতৃত্ব যদি দিতেই হয় তাহলে অবশ্যই অনেক কিছু নিয়ে আলোচনা করার ব্যাপার আছে।’

তবে সেদিন সাকিব টেস্ট ক্রিকেটে উন্নতিতে ঘরোয়া কাঠামো সঠিক পথে নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে যোগ করেন, ‘ আমরা যদি ধারাবাহিক ভাবে ভালো খেলতে চাই আমাদের প্লেয়ারদের কোয়ালিটি আরও বাড়াতে হবে। তা না হলে সুবিধা বা ফেভার এই জিনিসগুলো নিয়ে আসলে রেজাল্ট করতে পারবো না।’

‘এটা তো ২০ বছর আগের কথা হওয়া উচিত ছিল আমাদের ডমেস্টিক ক্রিকেটে গুরুত্ব দেয়া উচিত। ২০ টেস্ট ক্রিকেট খেলার পর এই বিষয়টি নিয়ে আলাপ করার সাবজেক্ট হওয়া উচিত না।’

এরপর…।

এরপর বাংলাদেশ আরও ৯ টি টেস্ট খেলেছে। উন্নতির ছিটেফোঁটা দেখা যায়নি কোথাও। এই ৯ ম্যাচে পাওয়া দুইটি জয়ই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। হারা ৬ ম্যাচের ৩ টিই আবার ইনিংস ব্যবধানে, ঘরের মাঠে হারতে হয়েছে খর্ব শক্তির ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে ২-০ ব্যবধানে সিরিজও। একমাত্র সাফল্য বলতে হয় শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে পাল্লেকেলেতে প্রথম টেস্ট ড্র।

আফগান কালো অধ্যায় পেছনে ফেলে আজ দুই বছর পার হলেও কতটা বদলেছে বাংলাদেশের চিত্র সে প্রশ্ন রাখা যায় অনায়েসেই…

নাজমুল হাসান তারেক

Read Previous

বাংলাদেশের বিশ্বকাপ দল ঘোষণা কাল; থাকছেন যারা…

Read Next

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের জন্য ওমানের স্কোয়াড ঘোষণা

Total
28
Share