সাকিব-নাসুমের স্পিন বিষে নীল অস্ট্রেলিয়া

সাকিব-নাসুমের স্পিন বিষে নীল অস্ট্রেলিয়া

দলের অল্প পুঁজির আগের ম্যাচে সাকিব আল হাসান এক ওভারেই হজম করেন পাঁচ ছক্কা। ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মত ম্যাচে খরচ করেন ৫০ রান। তবে সাকিব চ্যাম্পিয়ন বোলার, এমন দিন আসতেই পারে বলেছেন অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। রিয়াদের কথা বাস্তবে রূপ দিতে সাকিব সময় নিয়েছেন মাঝে ২৪ ঘন্টা। তার স্পিন ভেল্কিতে বিধ্বস্ত অস্ট্রেলিয়া মিরপুরে সোমবার (৯ আগস্ট) হেরেছে ৬০ রানের বড় ব্যবধানে।

এই জয়ে পাঁচ ম্যাচ টি-টোয়েন্টি সিরিজটি বাংলাদেশ শেষ করলো ৪-১ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে। অস্ট্রেলিয়া এদিন পড়েছে নিজেদের টি-টোয়েন্টি ইতিহাসের সর্বনিম্ন দলীয় সংগ্রহের লজ্জায়। অলআউট হয়েছে মাত্র ১৩.৪ ওভারে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাদের সবচেয়ে কম দৈর্ঘের ইনিংস (অলআউট হওয়া ম্যাচে) এটি।

টস জিতে আগে ব্যাট করা বাংলাদেশ দারুণ শুরু পেয়েও শেষ দিকে মলিন ব্যাটিংয়ে ৮ উইকেটে ১২২ রানের বেশি করতে পারেনি। তবে মিরপুরের পিচ ও অজি ব্যাটসম্যানদের সিরিজজুড়ে অসহায় আত্মসমর্পণ বলছিল এ রানেও জয় সম্ভব।

কিন্তু মাত্র ৬২ রানে গুটিয়ে দিয়ে ৬০ রানের বিশাল জয়ই তুলে নিল টাইগাররা। ২০০৫ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৭৯ এতদিন ক্যাঙ্গারুদের সর্বনিম্ন টি-টোয়েন্টি স্কোর হলেও আজ পেছনে পড়ে গেল সেটি। আজকের ৬০ রানের জয় রানের হিসেবে টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বড় জয়, সবার উপরে আছে ২০১২ সালে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ৭১ রানে পাওয়া জয়টি।

যেখানে বল হাতে সাকিব ছড়িয়েছেন মুগ্ধতা। ৯ রানে ৪ উইকেট নিয়ে অজিদের হতাশায় পোড়ানোর পাশাপাশি নিজেও গড়েছেন দারুণ কীর্তি। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে দ্বিতীয় বোলার (প্রথম স্পিনার) হিসেবে ছুঁয়েছেন ১০০ উইকেটের মাইলফলক।

লক্ষ্য তাড়ায় নেমে শুরু থেকেই বিপাকে অস্ট্রেলিয়া। আগের ম্যাচে জয়ের নায়ক ড্যানিয়েল ক্রিশ্চিয়ান উঠে আসেন ওপেনিংয়ে। তবে ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারে নাসুম আহমেদের বলে বোল্ড হয়েছেন ৩ রান করে। সিরিজজুড়ে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা মিচেল মার্শও এদিনে থেমেছেন ৯ বলে ৪ রান করে। নাসুমের বলে মার্শ এলবিডব্লিউ হলে ১৭ রানেই ২ উইকেট হারায় অজিরা।

এরপর অধিনায়ক ম্যাথু ওয়েড ও বেন ম্যাকডারমটের ৩১ রানের জুটি। ওয়েডকে (২২ বলে ২২) বোল্ড করে জুটি ভাঙেন সাকিব। কার্যত সেখানেই অজিদের জয়ের স্বপ্ন হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। নিয়মিত বিরতিতে পড়তে থাকে উইকেট। ১০ রানের ব্যবধানে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদকে ফিরতি ক্যাচ দেন ম্যাকডারমটও (১৬ বলে ১৭)।

সিরিজে প্রথম ম্যাচ খেলতে নেমে নিজের প্রথম ওভারেই মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন তুলে নেন অ্যালেক্স ক্যারি (৩) ও ময়সেস হেনরিকসকে (৩)। স্লোয়ারে বোল্ড ক্যারি, খোঁচা মেরে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেন হেনরিকস।

নিজের তৃতীয় ওভার করতে এসে উইকেট মেইডেন সাকিবের। অ্যাশটন টার্নারকে (১) ফেরান কাভারে মাহমুদউল্লাহর হাতে ক্যাচে পরিণত করে। আর তাতেই আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে দ্বিতীয় বোলার হিসেবে ১০০ উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করেন টাইগার অলরাউন্ডার। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে সাকিবই ১ হাজার রান ও ১০০ উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করা একমাত্র ক্রিকেটার।

আগের ম্যাচে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বাজে টি-টোয়েন্টি ফিগারের দেখা পাওয়া সাকিব এদিন ফিরে এসেছেন দুর্দান্ত প্রতাপে। প্রথম ৩ ওভারে ৫ রান খরচায় ২ উইকেট, চতুর্থ ওভার করতে এসে ফেরান অজি শেষ দুই ব্যাটসম্যানকে। আর তাতেই ৬২ রানে গুটিয়ে গেল সফরকারীরা, সাকিবের বোলিং ফিগার ৩.৪-১-৯-৪! মাঝে আরও এক উইকেট নেওয়া সাইফউদ্দিনের শিকার ৩ ওভারে ১২ রান খরচায় ৩ উইকেট।

এর আগে পরিবর্তন আসা বাংলাদেশ উদ্বোধনী জুটি দারুণ শুরু এনে দেয়। সৌম্য সরকারের টানা ব্যর্থতায় নাইম শেখের সাথে ইনিংসের গোড়াপত্তন করেন শেখ মেহেদী। দুজনে ৪.৩ ওভার স্থায়ী জুটিতে তুলে ফেলেন ৪২ রান।

অ্যাশটন টার্নারের করা ইনিংসের প্রথম ওভারে সুইপ শটে মেহেদী হাঁকান চার। অ্যাশটন আগারের করা ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারে ডিপ স্কয়ার লেগ দিয়ে ছক্কা হাঁকান নাইম।

এরপর আক্রমণে আসা অ্যাডাম জাম্পার ওভার থেকে নাইম-মেহেদী নেন ১৪ রান। প্রথম ৩ ওভারে ৩৩ রান আসার পর এক ম্যাচ বিরতি দিয়ে একাদশে ফেরা পেসার নাথান এলিসের করা চতুর্থ ওভারে রানের গতি কমেছে, এসেছে মাত্র ২ রান।

পঞ্চম ওভারে টার্নারের নিরীহ এক ডেলিভারিতে বাজে শটে টপ এজ হয়ে মেহেদী (১২ বলে ১৩ রান) ক্যাচ দেন অ্যাশটন আগারকে। পাওয়ার প্লেতে বাংলাদেশের স্কোরবোর্ডে ১ উইকেটে ৪৬ রান। যা পাওয়ার প্লেতে সিরিজে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ।

সাকিব আল হাসান ও নাইম শেখের দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে ২৩ বলে এসেছে মাত্র ১৫রান। ড্যানিয়েল ক্রিশ্চিয়ানকে রিভার্স সুইপ করতে গিয়ে নাইম ২৩ বলে ২৩ রান করে ক্যাচ দেন শর্ট থার্ড ম্যানে।

অস্বস্তিতে ভোগা সাকিবও এরপর বেশিক্ষণ টিকেননি, জাম্পার বলে এলবিডব্লিউর ফাঁদে পড়ে থেমেছেন ২০ বলে ১১ রানে।

অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ১৪ বলে ১৯ রান করে দারুণ কিছুর ঈঙ্গিত দিয়ে ফিরেছেন আগারকে ফিরতি ক্যাচ দিয়ে। ওপেনিং থেকে অবনমন হওয়া সৌম্য ৪ নম্বরে নেমে করতে পারেননি ১৬ রানের (১৮ বলে) বেশি। ৯৬ রানে ৫ উইকেট হারায় বাংলাদেশ।

ক্রিজে এসেই আফিফ হোসেনের হাঁকানো দুর্দান্ত এক ছক্কায় ১৫ ওভার শেষেই বাংলাদেশ পেরোয় দলীয় ১০০। তবে এরপর নিয়ন্ত্রণ নেয় অজি বোলাররা। নাথান এলিসের করা ১৮তম ওভারে অফ স্টাম্পের বাইরের বল স্টাম্পে টেনে এনে ১৩ বলে ৮ রান করে বিদায় নেন নুরুল হাসান সোহান।

মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত ও আফিফ যেন বল ব্যাটেই লাগাতে পারছিলেন না। এলিসের দ্বিতীয় শিকার হয়ে আফিফ ফেরেন ১১ বলে ১০ রান করে। শেষ ৫ ওভারে ৩ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশের স্কোরবোর্ডে মাত্র ২০ রান।

প্রথম ৫ ওভারে ৪৩ রান নেওয়া বাংলাদেশ শেষ ৯০ বলে তুলতে পেরেছেন মাত্র ৭৯ রান। বড় সংগ্রহের আভাস দিয়ে দলীয় সংগ্রহ ৮ উইকেটে ১২২ রান।

সংক্ষিপ্ত স্কোরঃ

বাংলাদেশ ১২২/৮ (২০), মেহেদী ১৩, নাইম ২৩, সাকিব ১১, সৌম্য ১৬, মাহমুদউল্লাহ ১৯, নুরুল ৮, আফিফ ১০, মোসাদ্দেক ৪, সাইফউদ্দিন ০, মুস্তাফিজ ০*; টার্নার ২-০-১৬-১, অ্যাগার ৪-০-২৮-১, জাম্পা ৪-০-২৪-, এলিস ৪-০-১৬-২, ক্রিশ্চিয়ান ৪-০-১৭-২

অস্ট্রেলিয়া ৬২/১০ (১৩.৪), ক্রিশ্চিয়ান ৩, ওয়েড ২২, মার্শ ৪, ম্যাকডারমট ১৭, ক্যারি ৩, হেনরিকস ৩, টার্নার ১, অ্যাগার ২, এলিস ১, সুইপসন ১*, জাম্পা ৪; নাসুম ২-০-৮-২, সাইফউদ্দিন ৩-০-১২-৩, সাকিব ৩.৪-১-৯-৪, মাহমুদউল্লাহ ১-০-৯-১

ফলাফলঃ বাংলাদেশ ম্যাচে ৬০ রানে ম্যাচে জয়ী, ৪-১ ব্যবধানে সিরিজ জয়ী

ম্যাচসেরা ও সিরিজ সেরাঃ সাকিব আল হাসান (বাংলাদেশ)।

৯৭ প্রতিবেদক

Read Previous

দাপুটে পারফরম্যান্সে সাকিবের বিশ্বরেকর্ড

Read Next

মাঝে মাঝে রেকর্ডেও চোখ রাখেন সাকিব

Total
3
Share