অস্ট্রেলিয়া সিরিজেই বিশ্বকাপের টিকিট কাটবে শামীম, বিশ্বাস কোচের

অস্ট্রেলিয়া সিরিজেই বিশ্বকাপের টিকিট কাটবে শামীম, বিশ্বাস কোচের

বয়সভিত্তিকেই শামীম হোসেন যে আলো কেড়েছেন তা খুব কম ক্রিকেটারই পারেন। ব্যাট হাতে খুনে মেজাজ, বল হাতে কার্যকর, সাথে দুর্দান্ত ফিল্ডিং মিলিয়ে কমপ্লিট প্যাকেজ। যুব বিশ্বকাপ জয়ী দলের এই সদস্য এসবের জোরেই ইতোমধ্যে গায়ে চাপিয়েছেন জাতীয় দলের জার্সি। জিম্বাবুয়ে সফরে টি-টোয়েন্টি অভিষেকে দেখিয়েছেন ঝলক। তার শৈশব কোচ শামীম ফারুকী মনে করেন আসন্ন অস্ট্রেলিয়া সিরিজই তাকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দলে জায়গা করে দিবে।

শামীম জিম্বাবুয়েতে খেলেছেন দুইটি টি-টোয়েন্টি। অভিষেক ম্যাচে দলের বিপর্যয়ে ১৩ বলে ২৯ রান, যদিও হেরেছে দল। নিজের দ্বিতীয় ম্যাচেই খেলেছেন ১৫ বলে অপরাজিত ৩১ রানের ম্যাচ জেতানো ইনিংস। যতক্ষণ ক্রিজে ছিলেন কখনোই মনে হয়নি সদ্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা দেওয়া কেউ ব্যাট করছে। নিজের সহজাত ভয়ডরহীন ক্রিকেটই খেলেছেন।

জিম্বাবুয়ে থেকে দেশে ফিরবেন আগামীকাল (২৯ জুলাই), এসেই সরাসরি অস্ট্রেলিয়া সিরিজের বায়ো-বাবলে ঢুকবেন। শামীমের জন্য অস্ট্রেলিয়া সিরিজ হবে নিজের সামর্থ্য প্রমাণের অন্যতম মঞ্চ। আর এই সিরিজে ভালো করলে আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের স্কোয়াডে ২০ বছর বয়সী এই ক্রিকেটারের সম্ভাবনা প্রকট হবে। অন্য অনেকের মত তার ছোট বেলার কোচ শামীম ফারুকীরও এমনটাই বিশ্বাস।

‘ক্রিকেট৯৭’ এর সাথে আলাপে চাঁদপুর ক্লেমন ক্রিকেট একাডেমির কোচ শামীম ফারুকী জানিয়েছে শামীম হোসেনকে প্রথম দেখা,তার সাথে কাজ করা সহ নানা গল্প। জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার পরও নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে গুরু-শিষ্যের। লম্বা দৌড়ের ঘোড়া হতে হলে শামীমকে কি নিয়ে কাজ করতে হবে বাতলে দিচ্ছেন সেসবও।

তিনি বলেন, ‘শামীমের সাথে নিয়মিতই কথা হয়। প্রথম ম্যাচের (জিম্বাবুয়েতে) পর তাকে বলেছি তুই যদি আর ৮-১০ টা বল ক্রিজে থাকতি ম্যাচ জিতিয়ে আসতে পারতি। পরের ম্যাচে অবশ্য দারুণভাবে ম্যাচ শেষ করেছে। তবে ওর উন্নতির জায়গা আছে বেশ কিছু। আমি তাকে নিয়মিত সেসব ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি। ওর যে শট খেলার প্রবণতা সেটা টি-টোয়েন্টির জন্য পারফেক্ট, তবে অন্য ফরম্যাটে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।’

‘টি-টোয়েন্টিতেও তার শট নির্বাচনে আরও দক্ষ হতে হবে। অফে স্টাম্পের বাইরের যেসব বল সে ক্রস ব্যাটে খেলতে যায় সেসবে ফিল্ডার সেটাপ করে ওকে আটকানো সহজ হয়ে যায়। সময়ের সাথে সাথে আশা করি এসব শিখবে। আমি বিশ্বাস করি সে নিজের মেধার জোরে অনেক দূর যাবে।’

‘ওকে বলেছি জিম্বাবুয়েতে সফল হয়েছিস, তবে অস্ট্রেলিয়া সিরিজ কঠিন চ্যালেঞ্জ। আর এটা তোর সুবর্ণ সুযোগও, এখানে ভালো করা মানে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পথে আরেক ধাপ এগিয়ে যাওয়া।’

২০১২ সালে ১১ বছর বয়সে চাঁদপুর ক্লেমন ক্রিকেট একাডেমিতে শামীম ফারুকীর অধীনে হাতেখড়ি শামীম হোসেনের। খেলা পছন্দ হলেও বয়স কম আর শারীরিক গঠন বিবেচনায় ঐ বছর তাকে না খেলানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কোচ। তবে শামীমের মন খারাপ হওয়া দেখে শেষ পর্যন্ত জেলা দলের সাথে খেলা দেখতে পাঠান।

সে গল্প জানাতে গিয়ে শামীম ফারুকী বলেন, ‘বয়সভিত্তিকের মেডিকেল হয়। আমি চিন্তা করলাম ওকে মেডিকেল করাবো না। কারণ তখন নিয়ম ছিল একটা পর্যায়ে ২ বছরের বেশি খেলা যায়না। ঐ মৌসুমে তার মেডিকেল করালে খুব বেশি ম্যাচ পেতনা, মানে দাঁড়াচ্ছে সে কেবল ঐ পর্যায়ে পরের বছরই খেলতে পারতো। আমার পরিকল্পনা ছিল তাকে দুই বছরই যেন বেশিরভাগ ম্যাচ খেলাতে পারি।’

‘আমার এই সিদ্ধান্তে সে খুব মন খারাপ করে, মুখ কালো করে ফেলে। ছোট ছিল তো, ভেবেছে স্যার বোধহয় গ্রাম থেকে আসছি বলে আমাকে পছন্দ করেনি। আমি কিছুটা ভয় পেয়ে যাই যে এই ছেলেতো মন খারাপ করে খেলায় মনযোগ হারাবে। আমি তখন ওকে দলের সাথে রাখার সিদ্ধান্ত নিই, ম্যাচ খেলাবোনা আগেই বলে দিয়েছি। দলের সাথে থেকে পরিবেশটা বুঝার জন্য।’

ঐ বছর আর খেলা না হলেও পরের বছর কুমিল্লায় খেলতে গিয়ে তাক লাগিয়ে দেন শামীম সহ দলের কম বয়সী বাকি ক্রিকেটাররাও।

শামীম ফারুকীর ভাষায়, ‘পরের বছর ওরা গেল কুমিল্লায়, ওই ব্যাচে ছিল শামীম সহ বেশ কয়েকজন ছোট ছেলে। ওখানকার সেক্রেটারি আমাদের কোচ জয়নালকে বকাঝকাও দিয়েছে এমন ছোট ছেলেদের নিয়ে যাওয়ার জন্য। পরে খেলা দেখেতো উনি তাজ্জব, শামীম সহ পুরো দলই ভালো খেলেছে।’

কিন্তু শামীম হোসেন ব্যাট হাতে আরও বড় চমক দেখান পরের বছর ফেনীতে খেলতে গিয়ে। দুর্দান্ত ইনিংসের পথে হারিয়েছেন ৬ টি বলও।

সে গল্প শোনা যাক তার প্রথম কোচের মুখেই, ‘পরের বছর আমি দল নিয়ে যাই ফেনীতে। প্রথম ম্যাচে শামীম ফিফটি হাঁকায় ওয়ান ডাউনে নেমে। একদম বলের মেধা বিচার করে খেলেছে। সিঙ্গেল, ডাবলস সহ মারারটা মেরেছে, ভালো বল দেখেশুনে খেলেছে। ফিফটির আগে কোনো ছয় ছিলনা, কিন্তু এরপরের ৮-১০ বলে করে ফেলে ৪০।’

‘যার মধ্যে ছক্কা মেরে ৬ টা বলই হারিয়ে ফেলে, ফেনীর কোচ, নির্বাচক রবিন এসে বলে শামীম ভাই ও (শামীম পাটোয়ারি) তো বল হারিয়ে ফেলছে সব। পরে ৯০ রানে আউট হয়, তারাও বল হারানো থেকে বেঁচে যায়!’

শামীমকে নিয়ে একবার চট্টগ্রামে যান কোচ ফারুকী, মূলত স্কুল ক্রিকেটের কম্বাইন্ড একটা দলের সাথে রেখে অভিজ্ঞ করার লক্ষ্যে। কিন্তু সেখানকার কোচ সাবেক জাতীয় দলের ক্রিকেটার নুরুল আবেদিন নোবেল এ নিয়ে খানিক অসন্তোষ প্রকাশ করেন। পরে শামীম ফারুকী ও শামীম হোসেন দুজনকেই কিছুটা শিক্ষা দিতে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেন। যে চ্যালেঞ্জ শামীম হোসেন উতরে গেছেন প্রথম বলেই।

বিষয়টি তুলে ধরে ফারুকী বলেন, ‘সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগ নিয়ে স্কুল ক্রিকেটের একটা কম্বাইন্ড দল গঠন করা হয়। চট্টগ্রামের নুরুল আবেদিন নোবেল ভাইয়ের সাথে আমিও কোচ হিসেবে ছিলাম। আমি শামীমকেও নিয়ে গিয়েছি যেন দেখতে পারে বিভাগীয় দলগুলো কেমন হয়। একটা আইডিয়া হবে। নোবেল ভাই আমার উপর একটু বিরক্ত হয়েছিল, এত ছোট একটা বাচ্চা নিয়ে যাওয়াতে।’

‘উনি আমাকে শিক্ষা দিতে হোক কিংবা শামীমকে ট্রাই করতে হোক প্রথমে ওকেই ব্যাটিংয়ে পাঠিয়েছে। ওর থেকে প্রায় দ্বিগুন উচ্চতার একজন, সিলেটের একটা পেসারকে পাঠায় বল করতে। তার দেওয়া বাউন্সার শামীম এমনভাবে হুক করেছে চট্টগ্রাম মহিলা কমপ্লেক্সের পেছনের জঙ্গলে গিয়ে পড়েছে। নোবেল ভাইতো পুরো তাজ্জব হয়ে গিয়েছিল। এখন মাঝে মাঝে উনি ফোন দিয়ে বলে শামীম ফ্রি থাকলে একটু পাঠান আমার দলের খেলা আছে।’

এরপর তরুণ এই ক্রিকেটারকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বয়সভিত্তিকে নিজেকে প্রমাণ করেছেন, বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপিতে) বাছাই উতরে সেখানেই চলে যান। এরপর যুব দলের হয়ে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স, যুব বিশ্বকাপে চোটের কারণে অবশ্য কিছুটা পিছিয়ে পড়েছিলেন।

কিন্তু যুব বিশ্বকাপের পর যেখানেই খেলেছেন যেন নিজেকে ছাড়িয়ে গেছেন। ফল হিসেবে এখন জাতীয় দলের ঢেরায়। শামীম সহজাত প্রতিভা তাই তাকে নিয়ে খুব বেশি কাজ করেননি কোচ শামীম ফারুকী। বেসিক ধরিয়ে দিয়ে খেলতে বলেছেন নিজের খেলাটাই।

তিনি বলেন, ‘ওকে নিয়ে খুব বেশি কাজ করিনি। আমি শুরু থেকেই দেখেছি ও সহজাত প্রতিভা। একটা জিনিস তো বুঝেনই ক্রিকেটের কিছু বেসিক জিনিস আছে। আমি শুধু ওকে সেগুলো ধরিয়ে দিয়েছি, বাকিটা ও যেভাবে খেলেছে তা অবিশ্বাস্য। ওর ব্যাটের যে গতি তা নিয়ে আসলে বলার কিছু নেই। স্কিল, ড্রিল, ফিল্ডিং নিয়ে কিছু কাজ করেছি।’

নাজমুল হাসান তারেক

Read Previous

ভারতীয় দলে ইনজুরি, ইনজামাম বলছেন ‘সমস্যা নেই’

Read Next

সিরিজে সমতা ফেরাল শ্রীলঙ্কা

Total
99
Share