তামিমের সেঞ্চুরি, জিম্বাবুয়েকে হোয়াইটওয়াশ করল বাংলাদেশ

তামিমের সেঞ্চুরি, জিম্বাবুয়েকে হোয়াইটওয়াশ করল বাংলাদেশ

আইসিসি ওয়ার্ল্ড কাপ সুপার লিগের অংশ বলে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তিন ম্যাচ ওয়ানডে সিরিজটি ছিল বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ। পূর্ণ ৩০ পয়েন্ট অর্জনে নজর ছিল টাইগার অধিনায়ক তামিম ইকবালের। যে কারণে হাঁটুর চোটে ঝুঁকি নিয়েও খেলেছেন ৩ ম্যাচেই। প্রথম দুই ম্যাচে ব্যর্থ হলেও তামিমে সেঞ্চুরিতে ভর করেই জিম্বাবুয়েকে তাদের মাটিতে প্রথমবার হোয়াইট ওয়াশের স্বাদ দিল বাংলাদেশ।

আগে ব্যাট করে ২৯৯ রানের লক্ষ্য ছুঁড়ে দিয়েছিল জিম্বাবুয়ে। শেষদিকে ব্যাটিং বিপর্যয় না হলে লক্ষ্যটা হতে পারতো আরও বড়। জিম্বাবুয়ে ইনিংসে ভীত গড়ে দেন ওপেনার রেজিস চাকাবভা। তার ক্যারিয়ার সেরা ৮৪ রানের ইনিংসের সাথে সিকান্দার রাজা ও রায়ান বার্লের শতরানের জুটি। দুজনেই পেয়েছেন ফিফটির দেখা।

জবাবে তামিমের ১১২ রানের ইনিংসের সাথে বেশ কয়েকটি কার্যকর ইনিংসে ৫ উইকেটের জয় বাংলাদেশের। ৩ বছর পর জাতীয় দলের জার্সিতে খেলতে নামা নুরুল হাসান সোহান অপরাজিত ছিলে ৪৫ রানে, লিটন দাস, সাকিব আল হাসান ও মোহাম্মদ মিঠুন খেলেছেন ত্রিশোর্ধ্ব ইনিংস। শেষদিকে আফি হোসেনের ছিল ক্যামিও ইনিংস।

আজকের জয়ে কেনিয়া, ওয়েস্ট ইন্ডিজের পর জিম্বাবুয়েকে নিজেদের মাটিতে হোয়াইট ওয়াশ করলো বাংলাদেশ। মুখোমুখি ৭৮ লড়াইয়ে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে এটি বাংলাদেশের ৫০ তম ওয়ানডে জয়।

হারারে স্পোর্টস ক্লাবে আজ (২০ জুলাই) দুই দলের ব্যাটসম্যানরাই রান পেয়েছেন। যেখানে বড় স্বস্তি নিশ্চিতভাবেই বাংলাদেশের, আগের দুই ম্যাচে জয় পেলেও অধিনায়ক তামিমের চিন্তার কারণ ছিল টপ অর্ডারের ব্যর্থতা।

টপ অর্ডারে চিন্তা মুক্তিতে নিজেই রেখেছেন বড় ভূমিকা, ১১ ইনিংস পর ওয়ানডে সেঞ্চুরি পেলেন বাঁহাতি এই ব্যাটসম্যান। ১৪ তম সেঞ্চুরির দিনে ছাপিয়ে গেছেন বাকি ১৩ সেঞ্চুরিকে, নিজের দ্রুততম সেঞ্চুরি ছিল আজকেরটি।

লক্ষ্য তাড়ায় নেমে উদ্বোধনী জুটিতে তামিম ইকবাল ও লিটন দাস তোলে ৮৮ রান। দুজনেই ছিলেন সাবলীল, ৮ম ওভারে চাতারাকে তামিম হাঁকান এক ছক্কা, দুই চার, ওভারে রান আসে ১৯।

পাওয়ার প্লেতে বাংলাদেশের স্কোরবোর্ডে ৫৭ রান। ১৪তম ওভারে ওয়েস্লি মাধেব্রেকে স্কয়ার লেগে ঠেলে দিয়ে ৪৭ বলে ফিফটিতে পৌঁছান তামিম।

তবে ঐ ওভারেই লিটনকে মারুমানির ক্যাচে পরিণত করেন মাধেব্রে। ৩৭ বলে ৩ চারে তার ব্যাটে ৩২ রান। লিটন বিদায় নিলেও সাবলীল ব্যাটিংয়ে ১৭ ওভারেই দলীয় সংগ্রহ ১০০ পার করেন সাকিব-তামিম জুটি।

২৪তম ওভারে ডাউন দ্য ট্র্যাকে এসে তামিম ইনসাইড আউট শটে এক্সট্রা কাভার দিয়ে ছক্কা হাঁকান মাধেব্রেকে। তার আগেই সাকিবে সাথে জুটির ফিফটি পূর্ণ হয়।

ভালো শুরু পেয়েও সাকিব আউট হলে লম্বা হয়নি জুটি। আগের ম্যাচে দুর্দান্ত এক ইনিংসে দল জেতানো সাকিব এদিন করেছেন ৪২ বলে ৩০ রান। লুক জঙ্গের অফ স্টাম্পের খানিক বাইরের বলে ক্যাচ দেন উইকেটের পেছনে।

যদিও আম্পায়ারের সিদ্ধান্তে অসন্তোষ ছিলেন টাইগার অলরাউন্ডার। তার বিদায়ে ভাঙে ৫৯ রানের জুটি। তবে তামিম ছন্দ হারাননি, ২৮তম ওভারে ব্যাকওয়ার্ড স্কয়ার লেগ দিয়ে চার হাঁকিয়ে ঢুকে পড়েন নব্বইয়ের ঘরে।

৩০ তম ওভারে চাতারাকে মিড অফ দিয়ে চার মেরে ৮৭ বলেই পৌঁছেছেন ১৪তম ওয়ানডে সেঞ্চুরিতে।

তাকে যোগ্য সঙ্গ দেন মোহাম্মদ মিঠুন, দুজনের ৫৭ রানের জুটি ভাঙে তামিম আউট হলে। সেঞ্চুরির পর তামিম অবশ্য বেশি দূর যেতে পারেননি।

৯৭ বলে ৮ চার ৩ ছক্কায় ১১২ রান করে ডোনাল্ড টিরিপানোর বলে ক্যাচ দেন উইকেটের পেছনে। পরের বলেই নতুন ব্যাটসম্যান মাহমুদউল্লাহ রিয়াদকে (০) ফিরিয়ে হ্যাটট্রিক সম্ভাবনা জাগান টিরিপানো।

এরপর পঞ্চম উইকেট জুটিতে দলকে জয়ের বন্দরেই পৌঁছে দেওয়ার পথে ছিলেন মোহাম্মদ মিঠুন ও নুরুল হাসান সোহান। ২০১৮ সালের পর জাতীয় দলের জার্সিতে ও ২০১৬ সালের পর ওয়ানডে খেলতে নেমে সহজাত ব্যাটিং করেন সোহান।

সর্বশেষ ঢাকা লিগের পারফরমায়ন্স টেনে এনেছেন এদিনও। নিজের মোকাবেলা করা প্রথম বলেই হাঁকান চার। অন্য প্রান্তে মিঠুন কিছুটা ধীরে খেললেও হাত খুলেই খেলছেন সোহান। ৩৭তম ওভারে টিরিপানোর মাথার উপর দিয়ে উড়িয়ে হাঁকানো চারে ছিল কব্জির সুনিপুন ব্যবহার।

ক্রিজে কাটানো পুরো সময়ই ব্যাট করেছেন ১০০ এর বেশি স্ট্রাইক রেটে। ৫৭ বলে ৩০ রান করে মাধেব্রের দ্বিতীয় শিকার হন মিঠুন, তাতে ভাঙে ৬৪ রানের জুটি। এরপর আফিফ হোসেনকে নিয়ে বাকি কাজ অনায়েসেই সারেন সোহান।

২ ওভার হাতে রেখেই জয় পাওয়ার পথে সোহান ৩৯ বলে ৬ চারে ৪৫ ও আফিফ ১৭ বলে ৩ চার ১ ছক্কায় ২৬ রানে অপরাজিত ছিলেন।

এর আগে জিম্বাবুয়ে ইনিংসে উদ্বোধনী জুটিতে রেজিস চাকাবভা ও তাদিওয়ানাশে মারুমানি তুলেছেন ৩৬ রান। নিজের প্রথম ওভার করতে এসেই মারুমানিকে(১৯ বলে ৮ রান) এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলেন সাকিব।

মারুমানির বিদায়ের পর অধিনায়ক ব্রেন্ডন টেইলরকে নিয়ে ৪২ রানের জুটি চাকাবভার। মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ভাঙেন জুটি, ২৮ রান করা টেইলর ফিরেছেন কাভারে তামিমকে সহজ ক্যাচ দিয়ে।

এরপর ডিওন মায়ের্সকে নিয়ে চাকাবভার ৭১ রানের জুটি। ৬২ বলে চাকাবভা তুলে নেন ক্যারিয়ারের তৃতীয় অর্ধ শতক। এ জুটিও ভাঙেন রিয়াদ, নিজের ৮ম ওভারে সরাসরি বোল্ড করেন ৩৪ রান করা মায়ের্সকে।

পরের ওভারে কাটারে বিভ্রান্ত করে মুস্তাফিজুর রহমান ফেরান নতুন ব্যাটসম্যান ওয়েস্লি মাধেব্রেকে (৩)। শর্ট মিড উইকেটে ক্যাচ দেন সাকিবকে।

দারুণ খেলতে থাকা চাকাবভা ছুটছিলেন সেঞ্চুরির দিকেই। তবে তাসকিন আহমেদের অসাধারণ এক ডেলিভারিতে বোল্ড হয়েছেন ক্যারিয়ার সেরা ৮৪ রানের ইনিংস খেলে। ৯১ বলে ৭ চার ১ ছক্কায় সাজান ইনিংসটি।

২ উইকেটে ১৪৯ থেকে ৫ উইকেটে ১৭২ রানে পরিণত হয় জিম্বাবুয়ে। সেখান থেকে রায়ান বার্লকে নিয়ে সিকান্দার রাজার ৮০ বলে ১১২ রানের জুটি। ৪৯ বলে ক্যারিয়ারের ১৭তম ফিফটি ছুঁয়েছেন রাজা।

সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে দ্রুত গতিতে রান তোলেন বার্লও। মুস্তাফিজ-সাইফউদ্দিনকে নিয়মিত হাঁকান চার, ছক্কা। সাকিবের হাতে ক্যাচ দিয়ে বেঁচে গিয়ে ৩৮ বলে ক্যারিয়ারের তৃতীয় ফিফটি ছুঁয়েছেন।

মুস্তাফিজের বলে রাজা মোসাদ্দেককে ক্যাচ দিলে ভাঙে দুজনের শতরানের জুটি। ৫৪ বলে ৭ চার ১ ছক্কায় ৫৭ রান তার ব্যাটে। বেশিক্ষণ টিকেননি বার্লও, ৪৩ বলে সমান ৪ টি করে চার, ছক্কায় ৫৯ রান করে সাইফউদ্দিনের বলে লিটনের ক্যাচে পরিণত হন।

ঐ ওভারে সাইফউদ্দিন তুলে নেন আরও দুই উইকেট। প্রথম ৭ ওভারে ৭৯ রান খরচায় উইকেট শূন্য সাইফউদ্দিনের ইনিংস শেষে বোলিং ফিগার ৮-০-৮৭-৩!

রাজা-বার্লের বিদায়ের পর বড় সংগ্রহের সম্ভাবনা জাগানো জিম্বাবুয়ে অলআউট হয়েছে ২৯৮ রানে। ১৪ রানে শেষ ৫ উইকেট হারিয়েছে স্বাগতিকরা। শেষ ৯.৩ ওভারে তাদের স্কোরবোর্ডে যোগ হয় ৯৪ রান।

সংক্ষিপ্ত স্কোরঃ

জিম্বাবুয়ে ২৯৮/১০ (৪৯.৩), চাকাবভা ৮৪, মারুমানি ৮, টেইলর ২৮, মায়ের্স ৩৪, মাধেভ্রে ৩, রাজা ৫৭, বার্ল ৫৯, জঙ্গে ৪*, টিরিপানো ০, চাতারা ১, মুজারাবানি ০; তাসকিন ১০-১-৪৮-১, সাইফউদ্দিন ৮-০-৮৭-৩, মুস্তাফিজ ৯.৩-০-৫৭-৩, মাহমুদউল্লাহ ১০-০-৪৫-২, সাকিব ১০-০-৪৬-১

বাংলাদেশ ৩০২/৫ (৪৮), লিটন ৩২, তামিম ১১২, সাকিব ৩০, মিঠুন ৩০, মাহমুদউল্লাহ ০, নুরুল ৪৫*, আফিফ ২৬* ; জঙ্গে ৭-০-৪৪-১, টিরিপানো ৭-০-৬১-২, মাধ্রভ্রে ১০-০-৪৫-২

ফলাফলঃ বাংলাদেশ ৫ উইকেটে জয়ী

ম্যাচসেরাঃ তামিম ইকবাল (বাংলাদেশ)

সিরিজসেরাঃ সাকিব আল হাসান (বাংলাদেশ)।

৯৭ প্রতিবেদক

Read Previous

শোয়েব আখতারের চোখে অলটাইম ওয়ানডে একাদশ

Read Next

দেশে ফেরার আগে মাহমুদউল্লাহদের তামিমের শুভকামনা

Total
7
Share