সাকিবের ব্যাটিং বীরত্বে বাংলাদেশের কষ্টার্জিত জয়

সাকিবের ব্যাটিং বীরত্বে বাংলাদেশের কষ্টার্জিত জয়

সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাট হাতে সাকিব আল হাসান যেন অচেনা, বিবর্ণ, নিজেকে হারিয়ে খোঁজা একজন। তবে সাকিব রানে ফিরলেন, দলের প্রয়োজনে অসাধারণ এক ইনিংসে ম্যাচ জেতালেন। তার অপরাজিত ৯৬ রানের ইনিংসে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে কঠিন হয়ে পড়া দ্বিতীয় ওয়ানডেতে বাংলাদেশ জিতেছে ৩ উইকেটে।

এই জয়ে ১ ম্যাচ হাতে রেখেই সিরিজ নিশ্চিত করলো টাইগাররা। যা ২০০৯ সালের পর জিম্বাবুয়ের মাটিতে প্রথম সিরিজ জয়। এদিন সাকিব গড়েছেন আরেক কীর্তি। তৃতীয় বাংলাদেশী হিসেবে ১২ হাজার রানের এলিট ক্লাবে প্রবেশ করেছেন।

হারারে স্পোর্টস ক্লাবে টস জিতে আগে ব্যাট করে জিম্বাবুয়ে। ওয়েসলি মাধেব্রের ফিফটির (৫৬) সাথে দলপতি টেইলরের ৪৬, ডিওন মায়ের্স ও সিকান্দার রাজার ত্রিশোর্ধ্ব দুই ইনিংসে ৯ উইকেটে ২৪০ রানের পুঁজি স্বাগতিকদের। বাঁহাতি পেসার শরিফুল ইসলাম নেন ক্যারিয়ার সেরা ৪ উইকেট।

জবাবে বাংলাদেশের টপ-মিডল অর্ডারে সাকিব ছাড়া দাঁড়াতে পারেনি কেউই। তিন নম্বরে নেমে শেষ পর্যন্ত ম্যাচ জিতিয়েই মাঠ ছেড়েছেন টাইগার অলরাউন্ডার। তার ৯৬ রানের অপরাজিত ইনিংসের সাথে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের ২৬, শেষদিকে মোহাম্মদ সাইফউদ্দিনের অপরাজিত ২৮ রানের ইনিংস দুটি জয়ের পথে রেখেছে কার্যকর ভূমিকা।

লক্ষ্য তাড়ায় নেমে সাবধানী শুরু বাংলাদেশের। উদ্বোধনী জুটিতে আসে ৪০ রান। তবে এরপর ১০ রানের ব্যবধানে ৩ উইকেট হারায়। লুক জঙ্গের করা ১০ম ওভারে ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে সিকান্দার রাজার দারুণ এক ক্যাচে পরিণত হন ওপেনার তামিম ইকবাল।

হাঁটুর চোট নিয়ে খেলা তামিম আগের ম্যাচে খালি হাতে ফেরার পর আজ করেছেন ৩৪ বলে ২০রান। আউট হওয়ার আগে অবশ্য তার ব্যাটে ছিল দারুণ কিছু শট। আরেক ওপেনার লিটন দাসও টিকেননি বেশিক্ষণ। রিচার্ড এনগারাভার বলে পুল খেলতে গিয়ে মিড অনে টেইলরকে দেন সহজ ক্যাচ।

৩৩ বলে ৪ চারে ২১ রানেই থামেন আগের ম্যাচের সেঞ্চুরিয়ান। লুক জঙ্গের করা পরের ওভারেই মোহাম্মদ মিঠুন (২) বাজে এক শটে উইকেট বিলিয়ে আসেন। ৩ উইকেটে ৫০ রানে পরিণত হয় বাংলাদেশ।

মোসাদ্দেক হোসেনকে নিয়ে সাকিব আল হাসানের জুটি থামে ২৪ রানে। ভুল বোঝাবুঝিতে রান আউটে কাটা পড়েন মোসাদ্দেক (৫)। ৭৫ রানেই ৪ উইকেট নেই বাংলাদেশের।

এক প্রান্ত আগলে রেখে তিন নম্বরে নামা সাকিব দেখেছেন উইকেট বিলিয়ে দেওয়ার প্রদর্শনী। ব্যাট হাতে বেশ বাজে সময় পার করা টাইগার অলরাউন্ডারের ঘুরে দাঁড়ানোর দিনে কিছুটা সঙ্গ দিতে পেরেছেন কেবল মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ।

আরেক দফা দলের বিপদে ত্রাতা হতে পারতেন রিয়াদ। তবে সাকিবের সাথে ৫৫ রানের জুটি ভাঙেন মুজারাবানি। অফ স্টাম্পের বাইরে দেওয়া শর্ট বলে অযথা কাট করতে যান রিয়াদ, টাইমিং গড়বড়ে উইকেটের পেছনে ক্যাচে পরিণত হন ২৬ রানে।

রিয়াদের বিদায়ের পর সিকান্দার রাজাকে দারুণ এক কাভার ড্রাইভে চার মেরে ৫৯ বলে ফিফটিতে পৌঁছান সাকিব। তবে অন্য প্রান্তে চিত্রটা ছিল একই রকম। অসময়ে স্লগ সুইপ খেলতে গিয়ে মেহেদী হাসান মিরাজ (৬) ও ডাউন দ্য ট্র্যাকে এসে খেলতে গিয়ে স্টাম্পড হন আফিফ হোসেন (১৫)।

ততক্ষণে বল রানের সমীকরণও বেড়ে যায়, তবে সাইফউদ্দিনকে নিয়ে ৮ম উইকেট জুটিতে সে পথটাও সহজ করেন সাকিব। ব্যক্তিগত ৮৭ রানে অবশ্য শর্ট থার্ড ম্যানে সাকিবের কঠিন ক্যাচের সুযোগ মিস করে এনগারাভা।

সাকিব-সাইফউদ্দিন জুটিতে ৬৯ রান তুলে অবিচ্ছেদ্য ছিলেন। ৫ বল আগেই জয় নিশ্চিত করেন দুজনে। সাকিব শেষ পর্যন্ত ১০৯ বলে ৮ চারে ৯৬ ও সাইফউদ্দিন ৩৪ বলে ২৮ রানে অপরাজিত ছিলেন।

জিম্বাবুয়ে ইনিংসের প্রথম ওভারেই দলকে ব্রেক থ্রু দেন তাসকিন আহমেদ। ওপেনার তিনাশে কামুনুকামে (৫ বলে ১ রান) কাট করতে গিয়ে ক্যাচ দেন পয়েন্টে আফিফ হোসেনকে।

তাসকিন পঞ্চম ওভারেই পেতে পারতেন দ্বিতীয় শিকারের দেখা। কিছুটা আক্রমণাত্মক ভঙিতে খেলতে চেয়েছেন আরেক ওপেনার তাদিওয়ানাশে মারুমানি। ওভারের তৃতীয় বলে থার্ড ম্যানে ক্যাচ মিস করেন সাইফউদ্দিন।

ওভারে আরও দুইবার হাফ চান্স দেন মারুমানি। পরের ওভারে আক্রমণে এসেই অবশ্য তাকে বোল্ড করেন মিরাজ। জীবন পেয়েও ১৩ রানের বেশি করতে পারেনি।

৩৩ রানে ২ উইকেট হারানোর পর রেগিস চাকাবভাকে নিয়ে অধিনায়ক ব্রেন্ডন টেইলরের প্রচেষ্টা। সাকিবের বলে চাকাবভা বোল্ড হলে ভাঙে ৪৭ রানের জুটি, ৩২ বলে ২৬ রান আসে তার ব্যাট থেকে।

ডিওন মায়ের্সকে নিয়ে টেইলর অবশ্য নিজের সহজাত ব্যাটিংই করছিলেন। শরিফুলের করা ২৫তম ওভারে আউট হন দূর্ভাগ্যজনক হিট উইকেটে। ৫৭ বলে ৫ চার ১ ছক্কায় খেলেন ৪৫ রানের ইনিংস। সাকিবের বলে ৩৪ রান করে মায়ের্সও বিদায় নিলে জিম্বাবুয়ে পরিণত হয় ৫ উইকেটে ১৪৬ রানে।

সিকান্দার রাজাকে নিয়ে মাধেব্রে ৬ষ্ঠ উইকেট জুটিতে যোগ করেন ৬৩ রান। শরিফুলের বলে তামিমের দুর্দান্ত ক্যাচে ফিরতে হয় মাধেব্রেকে। খেলেন ৬৩ বলে ৫ চার ১ ছক্কায় ৫৬ রান। নিজের পরের ওভারে শরিফুল ফেরান লুক জঙ্গে (৮) ও ব্লেসিং মুজারাবানিকে (০)।

সাইফউদ্দিনের বলে রাজাও ৩০ রান করে আউট হলে জিম্বাবুয়ে থামে ৯ উইকেটে ২৪০ রানে। শরিফুলের ৪ উইকেটের সাথে ২ উইকেট সাকিবের। একটি করে শিকার তাসকিন, সাইফউদ্দিন ও মিরাজের।

সংক্ষিপ্ত স্কোরঃ

জিম্বাবুয়ে ২৪০/৯ (৫০), কামুনুকামে ১, মারুমানি ১৩, চাকাবভা ২৬, টেইলর ৪৬, মায়ের্স ৩৪, মাধেভ্রে ৫৬, সিকান্দার ৩০, জঙ্গে ৮, মুজারাবানি ০, চাতারা ৪*, এনগারাভা ৭*; তাসকিন ১০-০-৩৮-১, সাইফউদ্দিন ১০-০-৫৪-১, মিরাজ ৭.২-০-৩৪-১, শরিফুল ১০-০-৪৬-৪, সাকিব ১০-০-৪২-২

বাংলাদেশ ২৪২/৭ (৪৯.১), তামিম ২০, লিটন ২১, সাকিব ৯৬*, মিঠুন ২, মোসাদ্দেক ৫, মাহমুদউল্লাহ ২৬, মিরাজ ৬, আফিফ ১৫, সাইফউদ্দিন ২৮*; মুজারাবানি ৯.১-১-৩১-১, জঙ্গে ৮-০-৪৬-২, এনগারাভা ৯-১-৩৩-১, মাধেভ্রে ১০-০-৩৯-১, সিকান্দার ৬-০-৩৩-১

ফলাফলঃ বাংলাদেশ ৩ উইকেটে জয়ী

ম্যাচসেরাঃ সাকিব আল হাসান (বাংলাদেশ)।

৯৭ প্রতিবেদক

Read Previous

১২ হাজারি ক্লাবের সদস্য হলেন সাকিব

Read Next

যেভাবে বিপর্যয় কাটিয়ে দলকে জেতালেন সাকিব

Total
20
Share