যুক্তরাষ্ট্রের বিলাসী জীবন মাড়িয়ে যেভাবে ঢাকা লিগে তৌকির খান

যুক্তরাষ্ট্রের বিলাসী জীবন মাড়িয়ে যেভাবে ঢাকা লিগে তৌকির খান

জন্ম বাংলাদেশের নীলফামারীর সৈয়দপুরে, অন্য অনেকের মত তার শৈশব, কৈশোর কেটেছে ক্রিকেট উন্মাদনা নিয়ে। তবে বয়সভিত্তিক কিংবা ক্রিকেটার হওয়ার মত কোনো মঞ্চে নয়, খেলেছেন নেশা থেকে। বছর ছয়েক আগে পরিবারের সাথে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে, তৌকির খান ওখানে পড়াশোনা করেন আইটি (ইনফরমেশন টেকনোলজি) নিয়ে।

তবে ক্রিকেটের যে নেশায় বুঁদ হয়েছেন সেটির খোঁজ করেছেন ক্রিকেট প্রধান খেলা নয় এমন দেশটিতে গিয়েও। না তখনো পেশাদার ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন উঁকিঝুঁকি দেয়নি মনে, কেবল একটু ব্যাট-বল আর সবুজ ঘাসে মেতে থাকতে চেয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বাঙালি কমিউনিটিতে ৬ মাসের মাথায় সে খোঁজও পেয়ে যান।

তবে শুধু শখের বশে নয় এক অন্যরকম জগতের খোঁজই পেয়ে গেলেন। এমনিতে ক্রিকেটে যুক্তরাষ্ট্র খুব বড় কোনো নাম নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির ক্রিকেট অবকাঠামোয় এসেছে দারুণ পরিবর্তন। প্রতিনিয়ত যেন নিজেদের ছাড়িয়ে যাওয়ার পসরা সাজাচ্ছে। বাঙালি কমিউনিটিতে খেলে নজরে আসা তৌকির খান এরপর নাম লেখান দেশটির রাজ্য দলগুলো নিয়ে হওয়া টুর্নামেন্টগুলোতে।

যেসব টুর্নামেন্টে খেলে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইংল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, আফগানিস্তানের মত দলগুলোর জাতীয় ও ঘরোয়া লিগের ক্রিকেটাররা। সময়ের সাথে সাথে বাংলাদেশের ছেলে তৌকির পরিচিত মুখ বনে যান যুক্তরাষ্ট্রের ক্রিকেটে। তবে পেশাদার ক্রিকেটে এসেই যে স্বপ্ন দেখেছেন বাংলাদেশের হয়ে খেলবেন। ততদিনে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পেয়ে দেশটির জাতীয় দলে খেলার পথেও ছিলেন।

No description available.

নাম লেখাতে লেখাতেও ফিরে এসেছেন। যদিও তখনো বাংলাদেশ ক্রিকেটের সাথে কোনো সম্পর্কই ছিল না। সে পথ কিংবা সুযোগও যেন পাচ্ছিলেন না। তবে কিছুটা দেরিতে হলেও সুযোগ এসেছে তৌকির খানের জন্য। যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন টুর্নামেন্টে খেলতে যাওয়া বাংলাদেশী ক্রিকেটারদের সাথে একই সাথে খেলার সুবাদে দেশের ক্রিকেটের হাওয়া কিছুটা হলেও গায়ে লেগেছিল।

বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে খেলা ফরহাদ রেজাই প্রথম দেশে আসার রাস্তাটা তৈরি করে দেন। বিসিবির কোচ মিজানুর রহমান বাবুলকে জানিয়েছেন বাংলাদেশী তৌকিরের যুক্তরাষ্ট্র জয়ের গল্প। সে এক দারুণ গল্প, যাত্রা শেষে সদ্য সমাপ্ত ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগে (ডিপিএল) অভিষেকও হয়ে যায়।

পরের গল্পটা ২৩ বছর বয়সী এই ক্রিকেটারের মুখেই শোনা যাক, ‘যুক্তরাষ্ট্রে যতগুলো টুর্নামেন্টে আমি খেলেছি তার বেশিরভাগেই ব্যাটে-বলে পারফর্ম করেছি। বেশ কয়েকটি টুর্নামেন্টের সেরা হয়েছি। ফরহাদ রেজা ভাই আমার কথা মিজানুর রহমান বাবুল স্যারকে জানালে উনার সাথে আমার যোগাযোগ শুরু হয়। শুরুতে উনি আমার কাছ থেকে ম্যাচের স্কোরকার্ড চাইতো যে আমি কেমন করছি ওখানে। আমি আমার ফিফটি, সেঞ্চুরি করা ম্যাচগুলোর স্কোরকার্ড পাঠাতাম নিয়মিত।’

‘উনি কিছুটা অবাক হতেন। আমাকে এরপর বলেছেন যে তুমি কতটা ভালো খেল সেটা ফুটেজ দেখে বুঝতে হবে। এরপর আমি উনাকে ম্যাচের ভিডিও ফুটেজ পাঠাতাম। একটা সময় উনি আমার উপর আশ্বস্ত হলেন, আমাকে নানাভাবে পরামর্শ দিতেন।’

‘সর্বশেষ বিপিএলে চ্যাম্পিয়ন রাজশাহী রয়্যালসের নেট বোলার হিসেবে আমাকে দেশে নিয়ে যান। উনার সাথে তখন সরাসরি কাজ করি। উনি পছন্দ করেন আর সেবারই আমাকে জানান আমাকে ডিপিএলে প্রাইম দোলেশ্বরের সাথে চুক্তিবদ্ধ করছেন।’

চুক্তিবদ্ধ হয়ে দেশেই পড়ে রইলেন তৌকির। ডিপিএল শুরুও হল, এক রাউন্ড মাঠেও গড়ালো। প্রথম ম্যাচে সুযোগ পাননি একাদশে, এরপরই দেশে করোনা পরিস্থিতি খারাপ হয়, লকডাউনে স্থগিত সব ধরণের খেলাধুলা। বিপাকে পড়ে যান এই ক্রিকেটার, ফিরতে পারছিলেন না যুক্তরাষ্ট্রেও, ততদিনে পড়াশোনায়ও খানিক দূরত্ব।

৮ মাস দেশে কাটিয়ে কোন আশার আলো না দেখে ফিরে গেলেন যুক্তরাষ্ট্রে। কবে ফের খেলা শুরু হবে সে অনিশ্চয়তা কাটছিলনা সহসায়। পড়াশোনায় মনযোগ দিলেন, কিছুটা হতাশ সময় শেষে পরিবারের সমর্থনে অনুশীলন, ফিটনেসেও ফিরলেন। আবার একটা দীর্ঘ বিরতি পর সদ্য সমাপ্ত টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে স্থগিত হওয়া ডিপিএল মাঠে গড়ায় চলতি বছর ৩১ মে থেকে।

কিন্তু দেশে টুর্নামেন্ট শুরুর আগে করানো করোনা টেস্টে পজিটিভ হলেন প্রাইম দোলেশ্বরের এই অলরাউন্ডার। সব কিছু পেছনে ফেলে মাঠে নামার সুযোগ পেলেন খুব কম। শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবের বিপক্ষে অভিষেকে ব্যাট করার সুযোগ পাননি, বল হাতে ৪ ওভারে খরচ করেন ৩৯ রান।

আবার একাদশে সুযোগ পেতে অপেক্ষা করতে হয় বেশ কয়েকটি ম্যাচ। শেষদিকে একাদশে জায়গা পান প্রাইম ব্যাংকের বিপক্ষে একটি ম্যাচে। বল হাতে ৪ ওভারে ২৬ রান দেওয়ার পর ঐ ম্যাচে ওপেন করতে নেমেও শুরুটা ভালো হয়েছিল। রুবেল হোসেনকে পুল শটে হাঁকানো ছক্কায় ধারাভাষ্যকারের প্রশংসাও কুড়িয়েছেন। কিন্তু ৮ রানেই থামতে হয় তাকে।

অনিয়মিত সুযোগেও ইতিবাচক পারফরম্যান্সে কোচ মিজানুর রহমান বাবুলের মন জয় করেন। টুর্নামেন্টে নিজেদের শেষ ম্যাচেও খেলার কথা ছিল, তবে শেষ মুহূর্তে নাম বিভ্রান্তিতে তাকে একাদশের বাইরে থাকতে হয়। খেলোয়াড় তালিকায় তার পরিবর্তে দলটির আরেক ক্রিকেটার তৌফিক খানের নাম অন্তর্ভূক্ত হয়ে যায়।

ডিপিএল শেষে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে গেছেন তৌকির। তবে নিজেকে প্রস্তুত রাখছেন যেকোনো সময় দেশের ঘরোয়া ক্রিকেট শুরু হলেই যেন ফিরে আসতে পারেন। ভিডিও আদান-প্রদানের মাধ্যমে নিয়মিতই কাজ করছেন কোচ মিজানুর রহমান ও বিসিবি ট্রেইনার তুষার কান্তি হাওলাদারের সাথে।

No description available.

বাংলাদেশ ক্রিকেটের বাস্তবতা বলে ২৩ বছর বয়সে ঘরোয়া লিগে নাম লিখিয়ে জাতীয় দল পর্যন্ত যাওয়ার পথটা কঠিন। তবে সে চ্যালেঞ্জ কিংবা সুযোগের অপেক্ষা করতে তাড়াহুড়ো নেই তৌকিরের। ক্রিকেট ভালোবাসেন বলেই যুক্তরাষ্ট্রের বিলাসী জীবন ত্যাগেও নেই কোনো আপত্তি।

তিনি বলেন, ‘স্বপ্নটা বাংলাদেশ দলের জার্সি গায়ে চাপানো। আমার এখন বয়স ২৩, বাস্তবতা কঠিন। তবে নিজের কাজটা সঠিকভাবে, সৎভাবে করে গেলে যেকোনো কিছুই সম্ভব। হয়তো আমার জন্য কোনো সুযোগ অপেক্ষাও করতে পারে। সেসব নিয়ে আসলে না ভেবে খেলাটা উপভোগ করতে চাই, আর সেটা দেশের যেকোনো পর্যায়ের ক্রিকেট হলেই আমি খুশি।’

‘মিজান স্যারের সাথে আমার নিয়মিত কাজ করা হচ্ছে। আমার ড্রিলগুলো উনি দেখে দেন ভিডিওর মাধ্যমে। উনি নানাভাবে অনুপ্রেরণা জোগান। আমিও আমার মত করে সর্বোচ্চটা দিচ্ছি অনুশীলনে, ফিটনেস নিয়ে কাজ করছি প্রতিনিয়ত।’

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ক্রিকেট লিগ, ক্যাপিটাল ক্রিকেট প্রিমিয়ার লিগ, নিউ ইয়র্ক বাংলাদেশী ক্রিকেট লিগ, ফিলাডেলফিয়া মেট্রোপলিটন ক্রিকেট লিগ সহ বাংলাদেশী কমিউনিটির অনেক টুর্নামেন্টেই খেলেছেন পেস বোলিং অলরাউন্ডার তৌকির খান।

যেসব টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ জাতীয় দলকে প্রতিনিধিত্ব করা তাপস বৈশ্য, আবুল হাসান রাজু, ইলিয়াস সানি, সোহরাওয়ার্দী শুভ, ফরহাদ রেজারাও নিয়মিত খেলেন। ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটার আন্দ্রে রাসেল, কাইরন পোলার্ড, পাকিস্তানি কামরান আকমল, উমর আকমলরা নিয়মিত মুখ।

নাজমুল হাসান তারেক

Read Previous

বিগ ব্যাশে আবার ফিরছে হোম-অ্যাওয়ে ম্যাচ

Read Next

ইংল্যান্ডে বায়ো-বাবলে থেকেও করোনার কবলে ভারতীয় দল

Total
27
Share