সাবেকদের অসহায়ত্বের কারণ পর্যাপ্ত পড়াশোনার অভাব

সাবেকদের অসহায়ত্বের কারণ পর্যাপ্ত পড়াশোনার অভাব

বর্তমান জাতীয় দল কিংবা ঘরোয়া ক্রিকেটে নিয়মিত অংশ নেওয়া বেশিরভাগ খেলোয়াড়ই পড়াশোনায় খুব একটা ভালো অবস্থানে নেই। শুধু এখনকার নয়, গত ১৫-২০ বছর পেছনে ফিরে গেলেও অবস্থাটা প্রায় একই রকম। অথচ দেশের ক্রিকেটের উত্থানই হয়েছিল এক ঝাঁক মেধাবী ও শিক্ষিত ক্রিকেটারের হাত ধরে। অবশ্য ক্রিকেট তখন সীমাবদ্ধই ছিল একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মাঝে।

সময়ের পালাবদলে ক্রিকেট ছড়িয়েছে দেশের আনাচে-কানাচে। বর্তমান জাতীয় দলের দিকে নজর দিলেই চোখে পড়বে মুস্তাফিজুর রহমান, শরিফুল ইসলামদের মত ক্রিকেটারদের। যারা উঠে এসেছেন একেবারেই তৃনমূল থেকে, যেখানে পড়াশোনার চাইতে তাদের ক্রিকেট মেধাই ছিল মূখ্য। যে প্রতিভার বদলৌতে আজ তারা বিশ্ব মঞ্চে। শুধু মুস্তাফিজ-শরিফুল নয় বর্তমান জাতীয় দলেই মুশফিকুর রহিম, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ছাড়া উচ্চ শিক্ষিত বলার উপায় নেই কাউকেই।

জাতীয় দলের বাইরে ঘরোয়া ক্রিকেটে চিত্রটা আরও খারাপ। আর একটা সময় গিয়ে এর চড়া মূল্যও দিতে হয় ক্রিকেটারদের। পেশাদার ক্রিকেট শুরুর পরই বেশিরভাগের পড়াশোনা থামে হয় মাধ্যমিক নাহয় উচ্চ মাধ্যমিকে। খেলোয়াড়ি জীবন শেষে কিংবা মাঝপথে বাঁক বদলের তেমন কোনো সুযোগই তাদের কাছে থাকেনা।

হয়ে পড়ে অসহায়, বাধ্য হয়ে ক্রিকেট বোর্ডে চাকরি খোঁজে। সাবেক ক্রিকেটার বলে বিসিবিও যোগ্যতাকে এক পাশে রেখে নিয়োগ দেয়। কৃতজ্ঞতা দেখাতে গিয়ে অনেককেই করে নিতে হয় আপোশ। বিশ্লেষকদের মতে ক্রিকেট বোর্ডে কাজ করা সাবেকদের অনেক কিছুতেই নীরব থাকার পেছনে ভূমিকা রাখে এ ধরণের অসহায়ত্ব।

ক্রিকেটীয় সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছাতে না পারা ক্রিকেটারদের অসহায়ত্বের অন্যতম উদাহরণ পেসার শাহাদাত হোসেন রাজিব। জাতীয় দলের তার ফেরার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়েছে আরও বছর পাঁচেক আগেই। বিতর্কিত আচরণে দফায় দফায় নিষিদ্ধ হয়েও অন্তত জীবিকার টানে ঘরোয়া ক্রিকেটে ফেরার আকুতি জানিয়ে মুক্ত হয়েছেন কয়েকবারই। রাজিব নিজেই জানিয়েছেন অর্থ আয়ের অন্য কোনো পথ তার জানা নেই, পড়াশোনা না করায় কোনো চাকরি পাওয়াও তার জন্য কঠিন।

জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক খালেদ মাসুদ পাইলট ‘ক্রিকেট৯৭’ কে বিষয়টির স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তবে কম শিক্ষিত ক্রিকেটারদের বোর্ডে নিয়োগ দিলেও তাদের ব্যবহারের ভিন্ন পন্থাও দেখিয়েছেন এই উইকেট রক্ষক ব্যাটসম্যান।

তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আমাদের ক্রিকেট খেলোয়াড়রা খুব অসহায়। এখন যারা খেলছে বা আজকে থেকে ১৫-২০ বছর আগে আমাদের সময় যারা ঢাকা লিগ খেলেছে তাদের মাত্র ৫ শতাংশ শিক্ষিত। টেনেটুনে কেউ এসএসসি, কেউ এইচএসসি পাশ করে। দুই একজন অনার্স, মাস্টার্স করে, এমবিএ করেছে। যারা এমবিএ করেছে তারা কিন্তু ক্রিকেট বোর্ডে চাকরি করেনা। তারা দেখা যাচ্ছে ব্যাংকের ম্যানেজার কিংবা বড় বড় প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিয়ে ফেলেছে।’

‘আর যারা অসহায় তাদের মধ্যে দুই একজন হয়তো আকরাম ভাইয়ের মত ব্যবসা বানিজ্য বা দুর্জয় (নাইমুর রহমান দুর্জয়), মাশরাফির (মাশরাফি বিন মর্তুজা) মত এমপি হয়েছে। ২-৩ শতাংশ এমন হয়েছে। বাদ বাকি যে অল্প শিক্ষিত সাবেক ক্রিকেটার, তারা রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। এখন তাদের কিছু করার নাই, বাধ্য হয়ে ক্রিকেট বোর্ডে চাকরি করছে। মানে ২০-৫০ হাজার টাকার চাকরি হলেও সে করবে, তার একটা জায়গা দরকার। অসহায় অবস্থায় চাকরিতে ঢুকছে, অসহায় অবস্থায় বিসিবি তাকে নিচ্ছে।’

‘কিন্তু অভিভাবক হিসেবে বিসিবির উচিৎ ছিল এমন করা যে ‘ওকে তুমি আসো, আমরা তোমার খেলোয়াড়ি ব্যাকগ্রাউন্ড কাজে লাগাবো। ভালো বেতন দিব তবে আমার এখানে তোমাকে আগে ৬ মাস গ্রুমিংয়ে থাকতে হবে। তোমার কি কি কাজ করতে হবে, ভবিষ্যত পরিকল্পনা কি এসব বল।’ শুরুতেই তাকে জিজ্ঞেস করবে যে কোথায় তুমি কাজ করতে উপভোগ করবে? ওর নিজস্ব একটা ভাবনাওতো থাকে যে আম্পায়ারিং করবে, কিংবা কোচ হবে, ম্যানেজমেন্টে যাবে।’

পাইলটের মতে কম শিক্ষিত হলেও তাদের খেলোয়াড়ি ব্যাকগ্রাউন্ড কাজে লাগিয়ে, বোর্ডের অধীনে ট্রেনিং করিয়ে একটা পর্যায়ে নিয়ে আসা সম্ভব। সে ক্ষেত্রে সারা দেশে বিসিবির নানা কার্যক্রমে যুক্ত করার সুযোগ থাকে।

তিনি বলেন, ‘অনেকে মাঠের কাজ উপভোগ করে। তাকে বলুন তোমাকে আমি নিব কিন্তু ৩ মাস হোক ৬ মাস হোক ট্রেনিংয়ের মধ্যে থাকতে হবে। সেখানে ঠিকঠাক বোঝাশনার পর তোমাকে সংশ্লিষ্ট বিভাগে দায়িত্ব দেওয়া হবে। কাউকে আপনি ঢাকায় দিলেন, কাউকে নারায়ণগঞ্জ কিংবা কাউকে চট্টগ্রামে।’

বোর্ডে কাজ করা সাবেক ক্রিকেটারদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে সংশয় আছে জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার শফিকুল হক হীরারও। সাকিব আল হাসানের ছুটি ইস্যুতে বিতর্কের সময়ই জার্মান ভিত্তিক একটি সংবাদমাধ্যমকে এমন সন্দেহের কথা জানান।

বিসিবির ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের প্রধান আকরাম খানের নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সাকিব যে ই-মেইল দিয়েছে, সেটি কেউ পড়েনি৷ এটি পড়ার সামর্থ্য আকরামের আছে কিনা, আমি তা-ও তো জানি না৷ আমি জানি না, ও কতটা শিক্ষিত৷’

এদিকে ভবিষ্যত নিশ্চয়তার বাইরে খেলোয়াড়ি জীবনেও পড়াশোনার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন বাংলাদেশ জাতীয় দলের প্রথম আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ম্যাচে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক শহীদুর রহমান শহীদ।

সম্প্রতি ‘ক্রিকেট৯৭’ এর সাথে আলাপে সাবেক এই ব্যাটসম্যান বলেন, ‘আরেকটা বিষয় আমি যেটা মনে করি ক্রিকেট কিন্তু মাইন্ড গেম। এখানে পড়াশোনাটার একটা বড় প্রভাব আছে। তখনকার সময় আমরা যারা ক্রিকেট খেলতাম বেশিরভাগই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। এটা কিন্তু বাস্তবতা, জীবনের অনেক ক্ষেত্রের মত ক্রিকেটেও নূন্যতম পড়াশোনা প্রয়োজন।’

নাজমুল হাসান তারেক

Read Previous

হারারে টেস্ট প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে বলছেন টেইলর

Read Next

তামিমের খেলা নিয়ে সংশয়, রিয়াদ ফিরলে একাদশে ৮ ব্যাটসম্যান

Total
123
Share