এদিক-ওদিক ঘুরে ঝুঁকি নিয়ে অনুশীলন, প্রত্যাবর্তনে প্রস্তুত রাব্বি

এদিক-ওদিক ঘুরে ঝুঁকি নিয়ে অনুশীলন, প্রত্যাবর্তনে প্রস্তুত রাব্বি

পেসার কামরুল ইসলাম রাব্বি জাতীয় দলে প্রথমবার ডাক পান ওয়ানডে স্কোয়াডে। তবে সেবার অভিষেক না হলেও পরের বছরই ডাক পড়ে টেস্ট দলে। এবার অভিষেকও হয়, কিন্তু মাত্র ৭ টেস্ট খেলেই অনেকটা বাতিলের খাতায় নাম লিখিয়ে ফেলেন। এরপর প্রথম শ্রেণির সাথে সীমিত ওভারের ফরম্যাটে ধারাবাহিকভাবে পারফর্ম করেও নজর কাড়তে পারছেন না। বাদ পড়তে হয় করোনাকালীন দেশের প্রথম ঘরোয়া টুর্নামেন্ট বিসিবি প্রেসিডেন্টস কাপেও।

তবে এরপর ফিরেছেন বাকি টুর্নামেন্টগুলোতে। যেখানে বল হাতে দেখিয়েছেন ঝলক। বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি কাপে ফরচুন বরিশালের হয়ে হ্যাটট্রিক সহ টুর্নামেন্টের তৃতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি। সদ্য সমাপ্ত ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগে (ডিপিএলে) দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি (১৬ ইনিংসে ২৫ উইকেট)। যদিও এবারও যথারীতি আলোচনার বাইরে।

‘ক্রিকেট৯৭’ কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে ২৯ বছর বয়সী এই পেসার জানিয়েছেন জাতীয় দলের বাইরে থেকে অপর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধায় নিজেকে কিভাবে পরিচালনা করছেন। সাথে নিজের টেস্ট অভিষেকের সময়টায় পুরোপুরি প্রস্তুত না থাকা কিংবা এখন সব ফরম্যাটের জন্যই প্রস্তুত জানানো সহ কথা বলেছেন নানা বিষয়ে। বিসিবির নতুন প্রকল্প ছায়া দল ‘বাংলা টাইগার’, বিসিবির ‘এ’ দলের ঢিলেঢালা কার্যক্রম নিয়েও তুলে ধরেছেন নিজের ভাবনা। নিচে পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হল-

ক্রিকেট৯৭: বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি কাপের পর ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ (ডিপিএল), টানা দুইটি ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টে দারুণ পারফরম্যান্স করলেন। নিজে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?

রাব্বি: করোনার সময় তো আসলে কোন ফ্যাসিলিটিজ ছিল না। তারপরও এদিক ওদিক গিয়ে কষ্ট করে অনুশীলন করলাম। এরপর মা শা আল্লাহ টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের দুইটা টুর্নামেন্টই ভালো হয়েছে। মূলত যদি বলি আল্লাহর অশেষ রহমত এবং আমার কঠোর পরিশ্রম।

ক্রিকেট৯৭: বিসিবি প্রেসিডেন্টস কাপে সুযোগ পাননি। তখন হতাশা কাজ করলেও বলেছেন হয়তো নিজের আরও উন্নতির দরকার। এরপর ফিরে এসেই এমন বোলিং। মাঝের সময়টায় বিশেষ কোন কাজ করেছেন?

রাব্বিঃ বিসিবি বাংলাদেশ জাতীয় দল, যুব দল, এইচপির ক্রিকেটার নিয়ে একটি টুর্নামেন্ট আয়োজন করে। যেখানে ৬০-৭০ জনের মত প্লেয়ার ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে কোনো দলেই আমার নাম ছিল না। এর আগে এমন কখনোই হয়নি। আমার প্রায় ১২ বছরের ক্যারিয়ার। যেখানে শেষ ১০ বছরে আমি আল্লাহর রহমতে বোর্ডের অধীনে সব লিগ, টুর্নামেন্টে খেলেছি। বিসিবি প্রেসিডেন্টস কাপে প্রথম বাদ পড়ি।

এই বাদ পড়ার কোন ব্যাখ্যা আমি খুঁজে পাইনি, তারাও আমাকে দিতে পারেনি। বিপিএলে আমি চ্যাম্পিয়ন দলে খেলেছি, এর আগে ডিপিএলও আমার ভালো হয়েছে। সব মিলিয়ে আমি কোনো কারণ খুঁজে পাইনি। এটা ব্যাপার না, তাদের কাছে হয়তো ঐ সময় অন্য আরও অনেক খেলোয়াড় ছিল।

ক্রিকেট৯৭: বাদ পড়ার পর সময়টা কিভাবে কাজে লাগালেন?

রাব্বিঃ তবে এরকম মাঝে মাঝে বাদ পড়লে কিছু ভালো জিনিস কাজ করে। যেমন কঠোর পরিশ্রমটা আরও বাড়িয়ে দিতে হবে। নিজেকে নিয়ে চিন্তা করার অনেক সময় থাকে। আমি সেটাই চিন্তা করেছি, আমার হয়তো কোনো ঘাটতি ছিল। আমার সেসব ঘাটতি পূরণ করতে হবে। তখন আমি আরও পরিশ্রম করি।

ক্রিকেট৯৭: নির্দিষ্ট কারও সাথে কাজ করেছেন?

রাব্বি: জাতীয় দলের সাবেক বাঁহাতি পেসার মঞ্জুরুল ইসলাম ভাইয়ের সাথে কিছু সময় কাজ করি। আমাদের একটা পরিচিত একাডেমি আছে যেখানে মঞ্জু ভাইও আছেন। আমি সেখানে যাই এবং আমার ঘাটতির জায়গাগুলো নিয়ে কাজ করি। সেখানে ভালো কিছু দিক নির্দেশনা পাই। এসব আমাকে অনেক সাহায্য করেছে, উনি লেভেল থ্রি কোর্স করা কোচ।

ঐ সময়টা আমি আসলে এভাবেই কাজ করেছি, কিভাবে উন্নতি করা যায় নিজেকে। নিজেকে নিয়ে চিন্তা করার সময় পেয়েছি যে কেন আমি টুর্নামেন্টে নাই, আমার ঘাটতিগুলো কোন জায়গায়। এর সাথে ফিটনেসে উন্নতি নিয়েও কাজ করি। টি-টোয়েন্টিতে বল করার জন্য ভ্যারিয়েশনের প্রয়োজন, লোকাল ব্যাটসম্যানদের দুর্বল জায়গাগুলো নিয়ে চিন্তা করি।

ক্রিকেট৯৭: ঘরোয়া ক্রিকেটে সব ফরম্যাটেই নিয়মিত পারফর্ম করছেন। অথচ নামের পাশে টেস্ট বোলার ট্যাগ লেগে আছে, জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন এই এক ফরম্যাটেই…

রাব্বি: প্রথম কথা হল আমার টেস্ট অভিষেক, এটা আমি বলবোনা যে নির্বাচকরা আমাকে নিয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিসিবি লম্বা সময় ধরে চেষ্টা করছিল টেস্টের জন্য পেস বোলার খোঁজার। উনারা দেখছিল যে টেস্টের জন্য পেসার হিসেবে কাদের নেয়া যায়। তখন ঘরোয়া লিগে আমার লঙ্গার ভার্সন খুব ভালো যাচ্ছিলো, জাতীয় লিগে আমি সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি হই। আমি তখন অনেক বেশি বল করেছি, আমার বিভাগীয় দলে কোনো পেসার ছিলনা। যে কারণে আমাকে প্রচুর বল করতে হয়েছে। পরে পারফরম্যান্স মূল্যায়ণ করে তারা আমাকে জাতীয় দলে সুযোগ দেয়।

ক্রিকেট৯৭: আপনি নিজে ঐ সময়টায় টেস্টের জন্য প্রস্তুত ছিলেন?

রাব্বি: আমি বলবো যে ঐ সময়টায় টেস্ট খেলার জন্য যে মেধা প্রয়োজন আমার সেটায় ঘাটতি ছিল। ক্রিকেটের সবচেয়ে কঠিন ফরম্যাট হল টেস্ট ক্রিকেট। টেস্টের মধ্যে সবই থাকে, ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টি কিংবা টি-১০। আমি আসলে ঐ সময় অতটা প্রস্তুত ছিলাম না। ধরেন এখন যদি বলা হয় আমি বলবো যে আমি টেস্টের জন্য আলহামদুলিল্লাহ প্রস্তুত। অভিজ্ঞতাটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কেউ জাতীয় দলে খেলে তৈরি হয়, কেউ জাতীয় দলের বাইরে থেকে তৈরি হয়।

ক্রিকেট৯৭: ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে ঘরোয়া ক্রিকেটে ধারাবাহিক সাফল্য পাচ্ছেন। সীমিত ওভারের ক্রিকেটের জন্য এখন নিজেকে কতটা প্রস্তুত মনে করছেন ?

রাব্বি: ঐ সময় আমি কিন্তু এমন না যে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে খারাপ ছিলাম। ২০১৬ সালের ডিপিএলে আমি সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি। আমি ধারাবাহিকভাবে প্রতি মৌসুমে সেরা ৫জন পেসারের মধ্যে ছিলাম। আমি ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টি সবসময় পছন্দ করতাম। কিন্তু বিসিবির দরকার ছিল ঐ সময় টেস্টের পেস বোলার। যে কারণে আমাকে টেস্টে নেওয়া হয়। তবে আমি প্রথম জাতীয় দলে ডাক পাই ওয়ানডের জন্য, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে।

বাংলাদেশে এসেছিল জিম্বাবুয়ে, দলের সাথে থাকলেও আমাকে খেলানো হয়নি সেবার কোনো কারণে। আমি এখনো শেখার চেষ্টা করছি। আমি বলবো যতটুকু শিখেছি এবং এই সময়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি তাতে আমি আত্মবিশ্বাসী এখন জাতীয় দলের হয়ে ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টি খেলতে আমি প্রস্তুত। সেটা বোলিং, ব্যাটিং, ফিল্ডিং যেটাই হোক। আমি বিশ্বাস করি এখন সুযোগ পেলে সেটা আমি ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারবো ইন শা আল্লাহ।

ক্রিকেট৯৭: জাতীয় দল থেকে দূরে সরে যাওয়ার পর এখনো পর্যন্ত যে সময়টা, তাতে মানসিকভাবেও নিশ্চয়ই উন্নতি হয়েছে?

রাব্বি: অবশ্যই, যেটা বললাম অভিজ্ঞতা। ক্রিকেটটা খেলতে হবে ভয়ডরহীন মানসিকতায়। বড় বড় তারকা ক্রিকেটারদের দিকে তাকালেই দেখা যায় ভয়ডরহীন ক্রিকেট খেলা কতটা জরুরী। এখন আলহামদুলিল্লাহ ভয়ডরহীন ক্রিকেট খেলতে যা দরকার তা ভেতরে আছে যে আমি পারবো।

ক্রিকেট৯৭: আমাদের ক্রিকেট কাঠামো জাতীয় দল কেন্দ্রিক, জাতীয় দল থেকে ছিটকে যাওয়ার পর নিজেকে ঘষা মাজা করার জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা ছিলনা। কিভাবে নিজেকে পরিচালনা করেছেন?

রাব্বি: করোনার সময়টায় আমি বাইরে গিয়ে অনেক অনুশীলন করেছি। কারণ তখন কেবল জাতীয় দল, এইচপির ক্রিকেটাররা অনুশীলনের সুযোগ পাচ্ছিলো বিসিবির অধীনে। আমি বা আমরা যারা একসময় জাতীয় দলে খেলেছি তাদের জন্য কিন্তু ‘এ’ দলের সেরকম কোনো জায়গা ছিলনা। যে কারণে বাইরে অনুশীলন করতে হয়েছিল। খুবই কঠিন হয় কামব্যাক করাটা। আপনি ফ্যাজিলিটিজ না পেলে সবকিছু আপনার নিজেকেই বহন করতে হয়। কিন্তু আমাদের যে কাঠামো তাতে বাইরে কয়টা উইকেট থাকে ভালো মানের?

কংক্রিটের উইকেটে অনুশীলন চালিয়ে যেতে হয়। ভালো মানের মাঠও পাবেন না ফিল্ডিং করার। আমি ঝুঁকি নিয়ে লোকাল জিমে। আমার বাসার পেছনে একটা জিম ছিল যেখানে অনেক লোক জিম করতো। সেখানে আমি নিজেও মাস্ক পরে গিয়ে জিম করেছি। এই জিনিসগুলো আসলে মনে পড়ে। খুব ঝুঁকি ছিল, করোনা পরিস্থিতি তখন খুব উর্ধ্বগামী। তখন থেকে শুনছিলাম যে বায়ো-বাবল করে টুর্নামেন্ট আয়োজন হতে পারে। তো বায়ো-বাবলে যখন ঢুকবো তখন নাহয় আমি নিরাপদ।

কিন্তু তার আগে যদি আমি করোনা পজিটিভ হই তাহলেতো আমার টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। আবার ফিটনেস না ঠিক রাখলে আমি টুর্নামেন্টে গিয়েও লাভ নাই। ঝুঁকি নিয়ে আমাদের জিম, অনুশীলন করতে হয়েছে। কারণ ৮ টা থেকে শহরে জ্যাম শুরু হয়ে যায়, আমাকে সাড়ে ৫ টার মধ্যে উঠে ৬ টার দিকে রওয়ানা দিতে হয়েছে। আমি অনুশীলন করেছি সেই মহাখালি। আসলেই মিরপুরের বাইরে কোনো ফ্যাসিলিটিজ নাই।

ক্রিকেট৯৭: সম্প্রতি বিসিবি ‘বাংলা টাইগার’ নামে ছায়া দল গড়তে যাচ্ছে। যেখানে বাদ পড়া কিংবা পাইপলাইনের ক্রিকেটারদের জন্য জাতীয় দলের সম মানের সুযোগ সুবিধা থাকবে। এটাকে কতটা ইতিবাচকভাবে দেখছেন?

রাব্বি: এটা হওয়া উচিত ছিল আরও ১০ বছর ২০ বছর আগে। সত্যি কথা বলতে এর আগেও ‘এ’ দল ছিল। ‘এ’ দলটা এমন ছিল যে হঠাত করে ডেকে একটা ট্যুরে পাঠিয়ে দিত। এখন দেখেন জাতীয় দল থেকে যদি একটা খুব ভালো খেলোয়াড়ও দুইটা সিরিজ খারাপ খেলার পর বাদ পড়ে তার কিন্তু আর কোনো জায়গা নেই কামব্যাক করার। যদি হিসাব করে দেখেন বয়সভিত্তিক থেকে জাতীয় দল পর্যন্ত ঐ খেলোয়াড়ের পেছনে কোটি টাকা খরচ বোর্ডের।

যখন সে খারাপ করে তখন পুরো টাকাটাই বৃথা যাওয়ার মত, সাথে ছেলেটার ক্যারিয়ারও নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এই টাকাটা যখন খরচ করাই হচ্ছে যদি ‘বাংলা টাইগারের’ মত একটা দল আগে থেকেই থাকতো তাহলে এই ছেলে কামব্যাক করার, নিজেকে গড়ে তোলার সুযোগ পেত। এখানে ভালো করে আবার জাতীয় দলে ফিরতে পারার সুযোগ থাকতো। এতে আসলে উপকৃত হবে দেশ, ট্যালেন্ট হারিয়ে যাবেনা। আমি মনে করি এখন যে সিদ্ধান্তটা নেওয়া হয়েছে এটা খুবই চমৎকার।

আমি দোয়া করি আমি বা আমরা সুযোগ পাই বা না পাই তাতে সমস্যা নেই কিন্তু এই দলটা যেন সঠিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। জাতীয় দল থেকে বাদ পড়া, বয়স ভিত্তিক থেকে উঠে আসা, একাডেমি দলে থাকা ক্রিকেটারদের নিয়ে এই দলটা সঠিক পথেই হাঁটবে আশা করি। যাদের কাছে দায়িত্ব সিসিডিএমের কাজী ইনাম ভাই ও খালেদ মাহমুদ সুজন ভাই তারা দুজনেই ক্রিকেটের জন্য নিবেদিত প্রাণ।আমি বিশ্বাস করি ভালো কিছুই হতে যাচ্ছে।

নাজমুল হাসান তারেক

Read Previous

ডিপিএল শেষে কে পেল কত অংকের প্রাইজমানি

Read Next

শিরোপা বঞ্চিত হয়েও তামিম বলছেন উপভোগ করেছেন

Total
60
Share