উসমান খাজার মিশনঃ অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটে বৈচিত্র্য আনা

উসমান খাজার মিশনঃ অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটে বৈচিত্র্য আনা

ক্রীড়াঙ্গনে বিভিন্ন দেশের মূল একাদশে প্রায়ই দেখা যায় অন্য দেশের খেলোয়াড়দের অনুপ্রবেশের গল্প। ইংল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ডসহ বিভিন্ন ক্রিকেট খেলুড়ে দেশের হয়ে খেলছেন অন্য দেশের তারকারা। কানাডা, হংকং, সংযুক্ত আরব আমিরাত, নেদারল্যান্ডস সহ আইসিসির সহযোগী দেশগুলোতে রয়েছে ভারত, পাকিস্তানের খেলোয়াড়দের আধিক্য।

তবে এদিক দিয়ে অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দল অনেক বেশি পিছিয়ে ছিল। এখন অবশ্য তাদের দলে অন্য দেশের খেলোয়াড়রাও বিরাজমান আছেন। ২০১১ সালের অ্যাশেজ সিরিজে সিডনিতে অভিষেক হয় অস্ট্রেলিয়ার টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান উসমান খাজার। তিনিই অস্ট্রেলিয়ার প্রথম মুসলিম ক্রিকেটার এবং প্রথম পাকিস্তানি বংশদ্ভূত ক্রিকেটার যিনি অস্ট্রেলিয়াকে প্রতিনিধিত্ব করছেন।

তবে এর পরের গল্পটা সহজ ছিল না খাজার জন্য। ক্যারিয়ারের বিভিন্ন সময়ে বর্ণ বাদের শিকার হয়েছিলেন। তবে তা নিয়ে প্রায়ই কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছেন। সেসব অভিজ্ঞতাগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে বিভিন্নতার পক্ষে সরব হয়েছেন। জাতিগত বৈষম্য ভিত্তিক আচরণের বিরুদ্ধে তার সরব প্রতিবাদের ফল আজ অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় দলে খাজা ছাড়াও ফাওয়াদ আহমেদ, অ্যাশটন অ্যাগারদের মত ক্রিকেটারদের আসা।

৩৪ বছর বয়সী উসমান খাজা ইএসপিএন ক্রিকইনফোকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে জানান অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে এমন জাতিগত বৈষম্য তার পছন্দ ছিল না। তবে এখন সে সমস্যা কাটিয়ে উঠেছে তারা।

‘আমি মনে হয় খুব ছোট ছিলাম, আমার এসব ভালো লাগতো না। এসব থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করতাম,’

পিএসএলে ইসলামাবাদ ইউনাইটেডের হয়ে খেলার জন্য আবুধাবিতে অবস্থান করছেন খাজা, সেখানেই সাক্ষাতকারে এসব বলেন তিনি।

‘ক্রিকেটের মাধ্যমে আমার পরিচিতি। যখন ক্রিকেটে আমার নামডাক ছড়াচ্ছিল, উপমহাদেশ থেকে লোকেরা আমার কাছে এসে বললো, আমাকে অস্ট্রেলিয়া দলে দেখে তারা ভীষণ খুশি। অজি দলে জায়গা করে নেওয়ায় আমার জন্য তারা গর্ব অনুভব করে। এতদিন তারা অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দলকে সমর্থন করতো না। আমার জন্য এখন তারা সমর্থন করে।’

‘এরপর ঘটনা হরহামেশাই ঘটেছে। বুঝতে পারলাম আমার পূর্বতন অবস্থানের জন্য এমন হচ্ছে। ছোটবেলায় পাকিস্তান থেকে এখানে যখন এসেছিলাম, আমার একদমই সমর্থন ছিল না।’

‘আপনারা টেলিভিশনের পর্দায় যাদের দেখেন, তারা আমার মত না। চারপাশে অ্যালকোহলের ছড়াছড়ি। সেখানে আমার মত পাকিস্তানের একজন মুসলিম ছেলের এসব পছন্দ না হওয়াই স্বাভাবিক।’

খাজা ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া দলে এখন খেলছেন অ্যাশটন অ্যাগার। অ্যাগারের মা একজন শ্রীলঙ্কান। এছাড়াও দক্ষিণ এশিয়া থেকে আগত ফাওয়াদ আহমেদ ও গুরিন্দর সান্ধুরাও খেলেছেন অজি জাতীয় দলে।

বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার ক্লাবগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ার ক্রিকেটারদের আধিক্য দেখা যাচ্ছে। উপমহাদেশে যেসব বাচ্চার ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ আছে, তাদের পরিবারের কাছে এখন খাজা হলেন অনুকরণীয়। খাজা এও বলেছেন, অজি ক্রিকেটে তাদের প্রবেশাধিকার হলে তিনিও খুশি হবেন।

‘অস্ট্রেলিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে আমার অবস্থান নিয়ে আমি জানি। উপমহাদেশ থেকে অনেক ভালো ক্রিকেটার এখানে আসছে। আমার মনে হয় তাদের পিতামাতা এখন সমর্থন দিচ্ছে এবং বলছে খাজা যেহেতু আছে, তাহলে তাদের বাচ্চারাও পারবে। বিবিএলের প্রতি তাদের আগ্রহও বেশ ফুটে উঠেছে।’

‘ছোট থাকতে অস্ট্রেলিয়ার অনেকেই বলেছিল আমি কখনও জাতীয় দলে সুযোগ পাবো না। আমার গায়ের রঙ সঠিক নয়। আমি দলের জন্য উপযোগী না এবং তারাও আমাকে সুযোগ দিবে না। মানসিকভাবে তখন নাড়া দিতো। তবে এখন আর কেউ বলে না এসব।’

‘ আমি জোর দিয়ে মা-বাবাদের বলার চেষ্টা করি তারা যেন তাদের বাচ্চাদের অন্তত একটিবার সুযোগ দেয়। এটা ঠিক যে এটি কণ্টকাকীর্ণ পথ। খুব সহজে সবার মাঝে আসবেও না। নানা মুনির নানা মত আসবে, তবে কারো সাথে তাদের সমর্থন দিতে হবে না। তারা নিজেরা যেটা ভালো বুঝবে, সেটাই করবে। যদি নিজেদের ধরে রাখতে পারে, তবে তারা আরিও শক্তিশালী হবে। যখন উচ্চ আসনে যেতে পারবে, তখন তারা বেশ অনুভব করবে।’

গত বছর অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে চলমান বর্ন বিরোধী আচরণের কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন খাজা। একে ব্যর্থ পদ্ধতি আখ্যায়িত দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে আরও বেশি বাইরের দেশের ক্রিকেটারদের অনুপ্রবেশ চান বলেও দাবি করেন তিনি।

অভিষেকের প্রায় এক যুগ হলেও এখনও অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে এই ইস্যু নিয়ে কাজ করে চলেছেন খাজা। উদাহরণ হিসেবে তিনি অস্ট্রেলিয়ার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ড ক্রিকেট দলের ভূয়সী প্রশংসা করেন।

‘আগের চেয়ে এখন বেশ ভালো অবস্থানে আছে। উপমহাদেশ থেকে বিভিন্ন ক্রিকেটার অস্ট্রেলিয়ায় আবাসন নিয়ে এখন ক্রিকেটে ব্যস্ত হচ্ছে। তবে আমি যখন এসেছিলাম,তখন এমনটা ছিল না। ঘরোয়া ক্রিকেট খেলার সময় উপমহাদেশ থেকে আসা একমাত্র ক্রিকেটার আমিই ছিলাম।’

‘আমাদের আরও বহু দূর পথ যেতে হবে। ইংল্যান্ড দলে দেখুন। তারা এই বিভিন্নতার ব্যাপারটি অনেক আগে পার করে এসেছে। ক্রিকেটে আমাদের একসাথে পদচারণা। কিন্তু তাদের মধ্যে এখন বিভিন্নতা নিয়ে। আমার মতে অস্ট্রেলিয়ারও এ বিষয়টা শিক্ষা নেওয়া উচিত। আমরা আগেও ভালো ক্রিকেট খেলতাম। তবে এখন বিভিন্ন জেনারেশনেরও আসা দরকার।’

‘অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে সুবিধা-অসুবিধা উভয়ই আছে। এটি আপনাকে শক্তিশালী করবে। কিন্তু আমার মনে হয় একই সময়ে এমন বৈষম্যমূলক আচরণ আপনাকে খেলা থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে। তবে এখন লোকেরা বুঝতে শিখেছে এবং সমাজে বিভিন্নতা কমে আসছে, যা অজি ক্রিকেটের জন্য অনেক বেশিই ভালো।’

খাজা বর্তমানে এ ব্যাপারটি নিয়ে আরও কাজ করে চলেছেন এবং অস্ট্রেলিয়ায় দক্ষিণ এশিয়ার ক্রিকেটারদের আরও অনুপবেশের জোর দিচ্ছেন।

একইসাথে দক্ষিণ এশিয়ার ক্রিকেটারদের যেন তাদের বাবা মায়েরা পূর্ণ সমর্থন দেন, সেটিও উল্লেখ করেন তিনি। নিজের মা-বাবা প্রথম দিকে তার ক্রিকেট খেলাকে সমর্থন দেননি বলেও জানান খাজা। যদিও তার একাডেমিক ক্যারিয়ার বেশ সমৃদ্ধ। ক্রিকেটে সম্পূর্ণভাবে প্রবেশের বিমান বিষয়ক শিক্ষায় ব্যাচেলর ডিগ্রিও নিয়েছিলেন এ তারকা ক্রিকেটার।

‘আমি মনে করি বাবা-মায়েরা তাদের সন্তানদের জন্য শিক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করে থাকেন। যখন আমি ছোট ছিলাম, আমার মাও আমাকে বেশি করে পড়াশোনা করতে বলতেন। তারা বুঝতে চাইতো না যে ক্রিকেটে আমার অপার সম্ভাবনা রয়েছে। আপনি জানেন আপনি কি হতে চান। সেটা ডাক্তার, উকিল কিংবা যেকোন কিছু হতে পারে।’

‘তাই বেশিরভাগ সময় মা-বাবারা তাদের সন্তানদেরকে খেলাধুলা থেকে দূরে রাখতে চাইতো। কেননা তারা মনে করতো খেলাধুলায় কোন ভবিষ্যৎ নেই। তবে এখন সেই মানসিকতার পরিবর্তন হচ্ছে। এখন অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটেও অনেক পরিবর্তন এসেছে। পুরো বিশ্বে বিভিন্ন টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট হচ্ছে। একজন ক্রীড়াবিদ হিসেবে এখন স্বাচ্ছন্দ অনুভব করতে পারবেন। আপনাকে ডাক্তার কিংবা উকিল হওয়ার জন্য কেউ জোর করবে না। উপমহাদেশে মা-বাবারা ধীরে ধীরে বুঝলেও এখন তারা সমর্থন দিচ্ছে।’

অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দলে খাজার আগমনের পর তার পরিবার তাকে সমর্থন দিয়েছে। তবে সবার ক্ষেত্রে তা সমান নয়। ১৯৯৯ সালে অস্ট্রেলিয়া বনাম পাকিস্তানের মধ্যকার বিশ্বকাপ ফাইনালে তার ঘরে অল্প কিছু পাকিস্তান সমর্থক ছিল।

‘যখন আমি ছোট ছিলাম, অস্ট্রেলিয়ার আগেকার জেনারেশনের সাথে আমার খাপ খাইয়ে নিতে কষ্ট হচ্ছিল। তারা বিভিন্ন সময়ে তিক্ত আচরণ করতো। কিন্তু অ্যাডাম গিলক্রিস্টই অস্ট্রেলিয়া দলে আমাকে নিয়ে আসায় প্রেরণা জুগিয়েছে। আমি তাকে অসম্ভব ভালোবাসি। একজন বামহাতি ক্রিকেটার গিলক্রিস্ট, যিনি মানুষকে বিনোদন দিতেন। অসম্ভব ভালো মনের মানুষ, যাকে আমি চিনি। বিশ্বের অন্যতম সেরা ক্রিকেটার সে।’

পিএসএলে খেলার প্রতি সবসময় আগ্রহ অনুভব করেছিলেন খাজা। যখন এ টুর্নামেন্ট হয়, তখন অস্ট্রেলিয়ার খেলা থাকে বিধায় তার খেলার সুযোগ হয় না। তবে জাতীয় দলে ২০১৯-এর পর এখন পর্যন্ত আর সুযোগ না পাওয়ায় এবার তিনি পিএসএলে খেলার সময় পেয়েছেন। তবে অজি দলের বিভিন্ন ফরম্যাটে আরও খেলার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন তিনি।

‘অজি দলে সীমিত ওভারের একাদশ থেকে বাদ পড়ায় আমি অনেক হতাশ হয়েছিলাম। কেননা আমার মনে হচ্ছিল আমি অনেক ভালো স্কোর করছিলাম। দলও জয় পাচ্ছিল এবং পারফর্ম করছিল। কিন্তু দল থেকে আমাকে বাদ দেওয়ায় আমি রীতিমতো হতাশ হয়েছিলাম।’

‘এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ দলে সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনাও কম, কেননা এর আগে শুধুমাত্র ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর রয়েছে। এরপর তারা বিশ্বকাপের জন্য প্রস্তুতি নিবে। আপনি ভালো খেললেও সুযোগ পাবেন কীনা, তা আপনি নিজেও জানেন না। আমি এখনও আশা ছাড়িনি। অস্ট্রেলিয়ার তিন ফরম্যাটে আবারও খেলতে চাই। আপনি কখনই জানেন না আপনার চারপাশে আগামীতে কি ঘটতে পারে। খেলাধুলা খুব দ্রুতই পরিবর্তন করে দিতে পারে।’

৯৭ ডেস্ক

Read Previous

নতুনদের জন্য জাতীয় দলের পথ কঠিন হচ্ছে

Read Next

যে তিন উইকেট সারাজীবন মনে রাখবেন রাশিদ খান

Total
28
Share