শেষ ম্যাচে বাংলাদেশকে পাত্তা দিল না শ্রীলঙ্কা

শেষ ম্যাচে বাংলাদেশকে পাত্তা দিল না শ্রীলঙ্কা

আগের দিন শ্রীলঙ্কান কোচ মিকি আর্থার জানিয়েছিলেন অন্তত একটি জয় নিয়ে বাড়ি ফিরতে চান। ব্যাটিং ব্যর্থতায় প্রথম দুই ম্যাচ হেরে সিরিজ খোয়ানো শ্রীলঙ্কার ব্যাটিং বিভাগ শেষ ম্যাচে দারুণ কিছু করবে বিশ্বাস ছিল আর্থারের। আর্থারের এমন কথা ঠিকই আমলে নিয়েছেন অধিনায়ক কুশল পেরেরা। তিনবার জীবন পেলেও ১২০ রানের ইনিংসে দলকে বড় সংগ্রহ এনে দেন। বল হাতে বাংলাদেশকে পরাজয় উপহার দেয়ার মত আগুন ঝরানো বোলিং করেন পেসার দুশমান্থ চামিরা।

চামিরার ক্যারিয়ার সেরা বোলিংয়ে পুড়ে ছারখার বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইন আপ। কুশল পেরেরার সেঞ্চুরির সাথে শেষদিকে ধনঞ্জয়া ডি সিলভার ফিফটিতে বাংলাদেশের জন্য ২৮৭ রানের লক্ষ্য দেয় সফরকারীরা। পেসার চামিরা পাঁচ উইকেটের সাথে ওয়ানিন্দু হাসারাঙ্গা, রমেশ মেন্ডিসের স্পিন ঘূর্ণিতে কুপোকাত টাইগাররা। ১৮৯ রানে গুটিয়ে ম্যাচ হেরেছে ৯৭ রানের বড় ব্যবধানে।

২৮৭ রানের লক্ষ্য তাড়ায় নামা বাংলাদেশ আরেক দফা টপ অর্ডারের ব্যর্থতা দেখলো। লঙ্কান পেসার চামিরা দ্বিতীয় ওয়ানদের মত এদিনও চড়াও হন টাইগার ব্যাটসম্যানদের উপর। ২৮ রানেই হারিয়েছে তিন উইকেট।

লিটন দাসের টানা ব্যর্থতায় ওপেনিংয়ে তামিম ইকবালের সঙ্গী হওয়া নাইম শেখ টিকেছেন মাত্র ২ বল। ইনিংসে নিজের প্রথম বলেই চামিরা ফেরান নাইমকে, অফ স্টাম্পের বাইরের গুড লেংথ বলে শট খেলতে গিয়ে স্লিপে কুশল মেন্ডিসকে ক্যাচ দেন মাত্র ১ রান করে।

সাকিব আল হাসানের চেনা ছন্দে ফিরতে অপেক্ষা বাড়লো আরও। প্রথম দুই ম্যাচের ১৫ রান করা টাইগার অলরাউন্ডার এদিন ফিরেছেন চামিরার দ্বিতীয় ওভারে রমেশ মেন্ডিসকে ক্যাচ দিয়ে। চামিরার বাউন্সারে ফুল শট খেলতে গিয়ে শর্ট মিড উইকেটে ক্যাচ দেন মাত্র ৪ রান করে।

৯ রানে ২ উইকেট হারানো বাংলাদেশ মুশফিকুর রহিম ও তামিমের জুটিতে স্বপ্ন দেখছিল। তবে চামিরার টানা তৃতীয় শিকার হয়ে তামিম ফিরেছেন দলীয় ২৮ রানে। ২৯ বলে ১৭ রানের ইনিংসের ইতি ঘটে উইকেটের পেছনে নিরোশান ডিকওয়েলাকে ক্যাচ দিলে। আম্পায়ারের আউটের সিদ্ধান্তে অবশ্য রিভিউ নিয়েও বাঁচতে পারেননি।

চতুর্থ উইকেট জুটিতে মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতকে নিয়ে ৫৬ রানের জুটিতে বিপর্যয় কাটানোর চেষ্টা মুশফিকের। অভিষিক্ত রমেশ মেন্ডিসের বলে উড়িয়ে মারতে গিয়ে ধরা পড়েন লং অনে ধনঞ্জয়া ডি সিলভার হাতে। আগের দুই ম্যাচে ৮৪ ও ১২৫ রানের ইনিংসের খেলা মুশফিক এদিন থেমেছেন ৫৪ বলে ২৮ রানে।

তিন ম্যাচেই বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতার চিত্র প্রায় একই রকম। প্রথম ম্যাচে ৯৯ রানে, দ্বিতীয় ম্যাচে ৭৪ রানে ও আজ শেষ ম্যাচে ৮৪ রানে ৪ উইকেট হারায় টাইগাররা। আগের দুই ম্যাচে মুশফিকের ব্যটে পথ খুঁজে পাওয়া বাংলাদেশ এদিন চতুর্থ ব্যাটসম্যান হিসেবে হারায় তাকেই।

প্রায় দুই বছর পর ওয়ানডে খেলা মোসাদ্দেক আগের ম্যাচে ১০ রানে ফিরলেও আজ তুলে নেন ক্যারিয়ারের তৃতীয় ফিফটি। কিন্তু সেটিকে টেনে নিতে পারেননি ৭২ বলে ৫১ রানের ইনিংসের ইতি ঘটে রমেশ মেন্ডিসের বলে শর্ট থার্ডম্যানে বিনুরা ফার্নান্দোকে ক্যাচ দিলে। ভাঙে রিয়াদের সাথে ৪১ রানের জুটি, বাংলাদেশ পরিণত হয় ৫ উইকেটে ১২৫ রানে। আর ম্যাচে ফিরতে পারেনি বাংলাদেশ।

মাঝে আফিফ হোসেনকে (১৬) নিয়ে কেবল হারের ব্যবধান কমানোর মত জুটি গড়তে পেরেছেন রিয়াদ। নিজের প্রথম স্পেলে ৩ উইকেট নেয়া চামিরা দ্বিতীয় স্পেলের দ্বিতীয় ওভারে মেহেদী হাসান মিরাজ (০) ও তাসকিন আহমেদকে (০) বিদায় করে ক্যারিয়ারের প্রথম পাঁচ উইকেট শিকার করেন।

চামিরার সাথে হাসারাঙ্গা, রমেশ মেন্ডিস উইকেট শিকারে যোগ দিলে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের ৫৩ রানে কেবল হারের ব্যবধানটাই কমাতে পারে বাংলাদেশ। ৬৩ বলে ২ চার ১ ছক্কায় ৫৩ রান করে রিয়াদ আউট হন শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে। ৪২.৩ ওভারে বাংলাদেশ গুটিয়ে যায় ১৮৯ রানে। ৯ ওভারে ১৬ রান খরচায় চামিরার নেয়া ৫ উইকেট তার ক্যারিয়ার সেরা বোলিং ফিগার। হাসারাঙ্গা, মেন্ডিস নেন দুইটি করে উইকেট। অভিষিক্ত পেসার বিনুরা ফার্নান্দোর শিকার রিয়াদ।

এর আগে টস জিতে ব্যাট করতে নামা শ্রীলঙ্কা অধিনায়ক কুশল পেরেরার ব্যাটে চড়ে বাংলাদেশের জন্য বড় লক্ষ্য ছুঁড়ে দেয়। ১১.২ ওভার স্থায়ী ওপেনিং জুটিতেই ধানুশকা গুনাথিলাকাকে নিয়ে যোগ করেন ৮২ রান। তাসকিন আহমেদের শিকারে ভাঙে জুটি। গুনাথিলাকার (৩৯) সাথে তাসকিন একই ওভারে ফেরান পাথুম নিশাঙ্কাকেও (০)।

বিনা উইকেটে ৮২ থেকে ২ উইকেটে ৮২ রানে পরিণত হওয়া শ্রীলঙ্কাকে খুব একটা অস্বস্তিতে পড়তে দেননি পেরেরা। কুশল মেন্ডিসকে নিয়ে তৃতীয় উইকেট জুটিতে যোগ করেন ৬৯ রান। জমে যাওয়া এই জুটিও ভাঙেন তাসকিন, তার তৃতীয় শিকার হয়ে মেন্ডিস ফিরেছেন ২২ রান করে। ব্যাক অফ লেংথের ডেলিভারিকে উড়িয়ে মারতে গিয়ে মিড অফে ধরা পড়েন তামিমের হাতে।

তবে তিনবার জীবন পেয়ে ক্যারিয়ারের ৬ষ্ঠ ও বাংলাদেশের বিপক্ষে তৃতীয় ওয়ানডে সেঞ্চুরি তুলে নেন পেরেরা। ৯৯ বলে সেঞ্চুরিতে পৌঁছানো লঙ্কান দলপতি ১২২ বলে ১২০ রান করে শরিফুল ইসলামের বলে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদকে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরের পথ ধরেন। ততক্ষণে ধনঞ্জয়া ডি সিলভার সাথে জুটিতে যোগ হয় ৬৫ রান।

সিরিজে প্রথমবার খেলতে নেমে ৭ রানেই থামতে হয় নিরোশান ডিকওয়েলাকে। রান আউটে কাটা পড়েন শরিফুলের সরাসরি থ্রোতে। তবে ফিফটির দেখা পান ধনঞ্জয়া। ওয়ানিন্দু হাসারাঙ্গাও টিকতে পারেননি বেশিক্ষণ, ২১ বলে ১৮ রান করে তাসকিনের চতুর্থ শিকার হয়েছেন মিরাজকে ক্যাচ দিয়ে।

৪০ ওভারে ২১৭ রান তোলা লঙ্কানরা শেষ ১০ ওভারে তোলে ৬৯ রান। ৬৮ বলে ফিফটি তোলা ধনঞ্জয়া শেষ পর্যন্ত অপরাজিত ছিলেন ৭০ বলে ৫৫ রানে, অভিষিক্ত রমেশ মেন্ডিস অপরাজিত ৮ রানে। আজ ৪ উইকেট নেয়ার পথে ওয়ানডেতে ৫০ উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করেন তাসকিন। বর্তমানে তার উইকেট সংখ্যা ৫২।

টাইগার স্পিনারদের প্রথম দুই ম্যাচে ঠিকঠাক সামলাতে না পারা শ্রীলঙ্কান ব্যাটসম্যানদের দেখে অবাক হয়েছিলেন কোচ মিকি আর্থার। নেটে স্পিন সাবলীল খেলা কুশলে পেরেরা, ধানুশকা গুনাথিলাকারা কেন মাঠে স্পিন খেলতে পারছেন না তা নিয়ে হতাশাও প্রকাশ করেছিলেন। তবে আজ শেষ ম্যাচে কোচকে খুশি করার মত স্পিন সামলিয়েছে সফরকারী ব্যাটসম্যানরা। সাকিব, মিরাজ, মোসাদ্দেকের ২৩ ওভারে কোনো উইকেটই দেয়নি তারা।

সংক্ষিপ্ত স্কোরঃ

শ্রীলঙ্কা ২৮৬/৬ (৫০), গুনাথিলাকা ৩৯, পেরেরা ১২০, নিসাঙ্কা ০, মেন্ডিস ২২, ধনঞ্জয়া ৫৫*, ডিকওয়েলা ৭, হাসারাঙ্গা ১৮, মেন্ডিস (রমেশ) ৮*; শরিফুল ৮-০-৫৬-১, তাসকিন ৯-০-৪৬-৪

বাংলাদেশ ১৮৯/১০ (৪২.৩), তামিম ১৭, নাইম ১, সাকিব ৪, মুশফিক ২৮, মোসাদ্দেক ৫১, মাহমুদউল্লাহ ৫৩, আফিফ ১৬, মিরাজ ০, তাসকিন ০, শরিফুল ৮, মুস্তাফিজ ০*; চামিরা ৯-১-১৬-৫, বিনুরা ৬.৩-০-৩৩-১, হাসারাঙ্গা ১০-০-৪৭-২, মেন্ডিস ৭-০-৪০-২

ফলাফলঃ শ্রীলঙ্কা ম্যাচে ৯৭ রানে জয়ী, বাংলাদেশ ২-১ এ সিরিজ জয়ী।

৯৭ প্রতিবেদক

Read Previous

ইউটিউবে দেখা যাবে ডিপিএলের ম্যাচ

Read Next

নিখুঁত ক্রিকেটের আক্ষেপ ঝরলো তামিমের কণ্ঠে

Total
1
Share