দুই অধিনায়ককেই সঠিক প্রমাণ করলেন মিরাজ

জয় দিয়ে সিরিজ শুরু করল বাংলাদেশ

সিরিজ শুরুর আগে শ্রীলঙ্কা অধিনায়ক কুশল পেরেরা জানিয়েছেন বাংলাদেশের স্পিনেই ভয় তাদের। অন্যদিকে বাংলাদেশ অধিনায়ক তামিম ইকবাল দলে তরুণদের ব্যর্থতা প্রসঙ্গে স্পিনার মেহেদী হাসান মিরাজকে আলাদা করে তুলে ধরেন। দলে মিরাজের অতীত অবদান ও ভবিষ্যতে আরও বেশি কিছু দেয়ার সামর্থ্যের কথাও জানান। প্রাসঙ্গিকতা ভিন্ন হলেও প্রথম ওয়ানডেতে দলের জয়ে দারুণ অবদান রেখে মিরাজ যৌক্তিক প্রমাণ করেছেন দুই অধিনায়ককে।

বাংলাদেশের দেয়া ২৫৮ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে আজ (২৩ মে) মিরপুর শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে লঙ্কানরা হেরেছে ৩৩ রানে। যেখানে সফরকারীদের টপ, মিডল অর্ডারের ধস নামান মিরাজ। অফ স্পিন ভেলকিতে তুলে নেন গুরুত্বপূর্ণ ৪ উইকেট। তার গড়ে দেয়া মঞ্চে ওয়ানিন্দু হাসাঙ্গার ঝড়ো ৭৪ রানও বৃথা যায়। মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন, মুস্তাফিজুর রহমানরা বাকি কাজ শেষ করেন।

তামিম ইকবালের ৫২, মুশফিকুর রহিমের ৮৪ ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের ৫৪ রানে ভর করে বাংলাদেশ পায় ২৫৭ রানের পুঁজি। ৪৮.১ ওভারে ২২৪ রানে গুটিয়ে যায় শ্রীলঙ্কা।

লঙ্কান ইনিংসের পঞ্চম ওভারেই ব্রেক থ্রু দেন মিরাজ। ধানুশকা গুনাথিলাকা ফিরতি ক্যাচ দেন মিরাজকে। ১৯ বলে ২১ রান করে তার বিদায়ে ভাঙে ৩০ রানের উদ্বোধনী জুটি। নতুন ব্যাটসম্যান পাথুম নিশাঙ্কাও টিকেননি বেশিক্ষণ। মুস্তাফিজের বলে শর্ট মিড উইকেটে আফিফ হোসেনের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফিরেছেন ৮ রান করে।

৪১ রানে ২ উইকেট হারানো শ্রীলঙ্কাকে পথ দেখায় অধিনায়ক কুশল পেরেরা ও কুশল মেন্ডিসের ৪১ রানের জুটি। তবে দলের ভীত শক্ত করার জন্য যথেষ্ট ছিল না সেটি। সাকিব আল হাসান ও মিরাজের তোপে ২ উইকেটে ৮২ রান থেকে ৬ উইকেটে ১০২ রানে পরিণত হয় সফরকারীরা।

নিজের দ্বিতীয় ওভারে মেন্ডিসকে (২৪) মিরাজের ক্যাচে পরিণত করে পেরেরা-মেন্ডিস জুটি ভাঙেন সাকিব। মিরাজের দ্বিতীয় শিকার হয়ে অধিনায়ক পেরেরাও মেন্ডিসের পথ অনুসরণ করেন। বোল্ড হওয়ার আগে তার ব্যাট থেকে আসে ৫০ বলে ৩০ রান। মিরাজে ঘূর্ণি মায়ায় আটকে গিয়ে দুই অঙ্ক ছোঁয়ার আগেই সাজঘরের পথ ধরতে হয় ধনঞ্জয়া ডি সিলভা (৯) ও আশেন বান্দারা (৩)। দুজনেই হয়েছেন বোল্ড।

মূলত তখনই ম্যাচ থেকে ছিটকে যেতে পারতো পেরেরার দল। তবে হাসারাঙ্গার ব্যাটে নাটকীয়তার শুরু। দাসুন শানাকাকে (১৪) নিয়ে ৭ম উইকেটে ৪৭ ও ৮ম উইকেটে ইসুরু উদানাকে নিয়ে যোগ করেন ৬২ রান। ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ফিফটিকে ম্যাচ জয়ী ঝড়ো ইনিংসে রূপ দেয়ার দ্বারপ্রান্তেই ছিলেন।

৩১ বলে ফিফটি তুলে নিয়ে ছুটছিলেন সে পথেই। তবে সাইফউদ্দিনের বলে ডিপ স্কয়ার লেগে আফিফের হাতে ক্যাচ দেন ৬০ বলে ৪ চার ৫ ছক্কায় ৭৪ রান করে। আর তাতেই লঙ্কানদের জয়ের স্বপ্নটা ফিকে হয়ে যায়। তখনো দলের জয়ে প্রয়োজন ৩৬ বলে ৪৭ রান। তবে সেই সমীকরণ আর মেলাতে পারেনি লঙ্কান লেজের ব্যাটসম্যানরা।

৩৯তম ওভারে নিজের ৭ম ওভারের শেষ বলটি ছোঁড়ার পর ক্রিজে পা মচকে পড়েন মুস্তাফিজ। ব্যথার তীব্রতা সহ্য করতে না পেরে ছাড়তে হয় মাঠও। তবে ফিরে এসেছেন ২ ওভার পরেই। লঙ্কানদের শেষ দুই উইকেটও তুলে নেন নিজে। ম্যাচে ৯ ওভার বল করে তার শিকার ৩৪ রানে ৩ উইকেট। সর্বোচ্চ ৪ উইকেট নেয়া মিরাজ ১০ ওভারে খরচ করেন ৩০ রান। সাইফউদ্দিনের শিকার ৪৯ রানে ২ উইকেট।

একমাত্র উইকেট নিয়ে সাকিব এদিন স্পর্শ করেছেন স্বীকৃত ক্রিকেটে (প্রথম শ্রেণি, লিস্ট এ ও টি-টোয়েন্টি মিলে) আব্দুর রাজ্জাকের পর দ্বিতীয় বাংলাদেশী হিসেবে ১০০০ উইকেটের মাইলফলক।

আগে ব্যাট করা বাংলাদেশ ২৫৭ রানের পুঁজি পায় দলের অভিজ্ঞ ও সিনিয়র ক্রিকেটারদের ব্যাটে চড়ে। ওপেনিংয়ে আরেক দফা ব্যর্থ হয়েছেন লিটন দাস। বাংলাদেশের ওপেনিং জুটি টেকেনি ৯ বলের বেশি। দুশমান্থ চামিরার বলে প্রথম স্লিপে ক্যাচ দিয়েছেন কোনো রান না করেই।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজের পর প্রথমবার জাতীয় দলের হয়ে ব্যাট হাতে নেমে খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি সাকিব। বিশ্বকাপের পর আবারও তিন নম্বরে নেমে নিশাঙ্কাকে ক্যাচ অনুশীলন করিয়ে ফিরেছেন ৩৪ বলে ১৩ রান করে। গুনাথিলাকার অফ স্পিনে ডাউন দ্য উইকেটে এসে উড়িয়ে মারার চেষ্টা করলেও শটে ছিলনা জোর, লং অনে সহজ ক্যাচ লুফে নেন নিশাঙ্কা। আউট হওয়ার আগে তামিমের সাথে জুটি ৩৮ রানের।

সাকিবের পর মুশফিকের সাথে তামিমের ৫৬ রানের জুটি। যে জুটি গড়ার পথে তুলে নেন ক্যারিয়ারের ৫১তম ওয়ানডে ফিফটি। তবে ফিফটিকে বড় ইনিংসে রূপ দিতে ব্যর্থ হয়েছেন ধনঞ্জয়া ডি সিলভার বলে এলবিডব্লিউর ফাঁদে পড়ে। থেমেছেন ৭০ বলে ৬ চার ১ ছক্কায় ৫২ রানে। রিভিউ নিলেও বাঁচতে পারেননি।

প্রথম ওভারের শেষ বলে চার মেরে ব্যক্তিগত রানের খাতা খোলা তামিম প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে তিন ফরম্যাট মিলে ১৪ হাজার রানের ক্লাবে প্রবেশ করেন। আজ মাঠে নামার আগে তার রান ছিল ১৩৯৯৮।

পরের বলেই ধনঞ্জয়া ফেরান মোহাম্মদ মিঠুনকে। খালি হাতে ফেরা মিঠুন এলবিডব্লিউর ফাঁদে পড়ে রিভিউ নিলেও লাভ হয়নি। বাংলাদেশ পরিণত হয় ৪ উইকেটে ৯৯ রানে।

সেখান থেকে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ও মুশফিকুর রহিমের ১০৯ রানের জুটিতে ঘুরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ। দুজনেই তুলে নেন ফিফটি। মুশফিক ক্যারিয়ারের ৪০ তম ওয়ানডে ফিফটিকে টেনে নিচ্ছিলেন সেঞ্চুরির দিকে। চায়নাম্যান লাকশান সান্দাকানকে রিভার্স সুপ খেলতে গিয়ে বিপদ ডেকে আনেন। থার্ড ম্যান অঞ্চলে ক্যাচ দেন উদানাকে। ততক্ষণে নামের পাশে ৮৭ বলে ৪ চার ১ ছক্কায় ৮৪ রান।

ক্যারিয়ারের ২৪ তম ফিফটি তুলে নেওয়া মাহমুদউল্লাহকে নিজের তৃতীয় শিকারে পরিণত করেন ধনঞ্জয়া। তার ইয়র্কারে বোল্ড হওয়ার আগে ৭৬ বলে ৫৪ রান আসে মাহমুদউল্লাহর ব্যাট থেকে।

মুশফিক-মাহমুদউল্লাহর বিদায়ের পর আফিফ-সাইফউদ্দিন দলীয় সংগ্রহ ২৫০ পার করেন। শেষ ১০ ওভারে ৬৪ রানের বেশি তুলতে পারেনি বাংলাদেশ। আফিফ ২২ বলে ২৭ ও সাইফউদ্দিন ৯ বলে ১৩ রানে অপরাজিত ছিলেন।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

বাংলাদেশ ২৫৭/৬ (৫০), তামিম ৫২, লিটন ০, সাকিব ১৫, মুশফিক ৮৪, মিঠুন ০, মাহমুদউল্লাহ ৫৪, আফিফ ২৭*, সাইফউদ্দিন ১৩*; চামিরা ৮-০-৩৯-১, ধনঞ্জয়া ১০-০-৪৫-৩, গুনাথিলাকা ২-০-৫-১, সান্দাকান ১০-০-৫৫-১

শ্রীলঙ্কা ২২৪/১০ (৪৮.১), গুনাথিলাকা ২১, পেরেরা ৩০, নিসাঙ্কা ৮, মেন্ডিস ২৪, ধনঞ্জয়া ৯, বান্দারা ৩, শানাকা ১৪, হাসারাঙ্গা ৭৪, উদানা ২১, সান্দাকান ৮*, চামিরা ৫; মিরাজ ১০-২-৩০-৪, মুস্তাফিজ ৯-০-৩৪-৩, সাইফউদ্দিন ১০-০-৪৯-২, সাকিব ১০-০-৪৪-১

ফলাফলঃ বাংলাদেশ ৩৩ রানে জয়ী।

৯৭ প্রতিবেদক

Read Previous

ডোমিঙ্গোর সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করছে বিসিবি

Read Next

পরাজয়ের দায় ব্যাটসম্যানদের দিলেন কুশল পেরেরা

Total
16
Share