বদলে যাওয়া দৃশ্যপট স্বপ্নের মত লাগে শরিফুলের

বদলে যাওয়া দৃশ্যপট স্বপ্নের মত লাগে শরিফুলের

পঞ্চগড়ের প্রত্যন্ত এক অঞ্চলে অভাব অনটনের সংসারে বেড়ে ওঠা, তবে ক্রিকেট মাথায় গেঁথে গিয়েছিল ছোটবেলা থেকেই। ২০১৫ সালে মুস্তাফিজুর রহমানের অভিষেক ম্যাচ টিভিতে দেখে মামার অনুপ্রেরণা ‘চাইলে তুমিও পারবে।’ সেই তুমিও পারবের জোর এত বেশিই ছিল যে তখনো ক্রিকেট বলই হাতে না নেয়া শরিফুল ৬ বছরের ব্যবধানে মুস্তাফিজের জাতীয় দলের সতীর্থ।

নিজেদের গ্রামেবিদ্যুৎ না থাকায় খেলা দেখতেন আধাঘন্টা দূরত্বের মউমারি বাজারে গিয়ে। বাঁহাতি এই পেসারের ৬ বছরের এই যাত্রায় বদলেছে সে প্রেক্ষাপটও, তার ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ খেলার এক বছরের মাথায়ই গ্রামে বিদ্যুৎ আসে। যেখানে প্রত্যক্ষভাবে ভূমিকা রেখেছে তারা ক্রিকেট ক্যারিয়ার।

যুব বিশ্বকাপ জয়ী দলের প্রথম সদস্য হিসেবে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপান। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্ট অভিষেক এই তরুণের। পঞ্চগড়ের নগরডাঙ্গা গ্রাম থেকে উঠে এসে এত অল্প সময়ে বদলে যাওয়া দৃশ্যপট এখনো স্বপ্নের মত লাগে শরিফুলের। মুঠোফোনে ‘ক্রিকেট৯৭’ কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে শরিফুল কথা বলেছেন নানা বিষয়ে। পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল নিচে-

ক্রিকেট৯৭: ২০১৫ সালে মুস্তাফিজের অভিষেক ম্যাচ যখন দেখছিলেন তখনো আপনি ক্রিকেট বলে খেলা শুরু করেননি। অথচ ২০২১ সালে এসে আপনি এখন মুস্তাফিজের জাতীয় দলের সতীর্থ। এই পুরো যাত্রাটাকে আপনি কিভাবে দেখেন?

শরিফুলঃ এটা আসলে স্বপ্নের মত। আমি নিজেও মাঝে মাঝে ভাবি কি ছিলাম, কি হলাম, স্বপ্নের মত লাগে। কিন্তু এই সময়টায় অনেক পরিশ্রমও করেছি। তবে সবকিছুর পরেও আমার কাছে এখনো স্বপ্নের মতই লাগে। যাদের খেলা টিভিতে দেখতাম তাদের সাথে এখন খেলছি। এটা একটা অন্যরকম আনন্দ দেয় নিজেকে।

ক্রিকেট৯৭: যুব দলের হয়ে নজরটা ভালোভাবে কেড়েছিলেন। যুব বিশ্বকাপ জয়ে রেখেছেন দারুণ ভূমিকা। ঐ দলটার সবার আগে জাতীয় দলে আপনি। যুব দলের সতীর্থদের মধ্যে কে সবার আগে অভিনন্দন জানালো?

শরিফুলঃ সবার আগে অভিনন্দন জানিয়েছে আকবর আলি। এরপর রাকিবুল (ইসলাম), রিশাদ (হোসেন), কোচরা। পরে একে একে সবাই অভিনন্দন জানিয়েছে।

ক্রিকেট৯৭: আপনি জাতীয় দলে, বাকিরাও কিন্তু আশেপাশে আছে। জাতীয় দলের ধরা ছোঁয়া দূরত্বেই। তাদের সাথে কি নিয়ে বেশি আলাপ হয়?

শরিফুলঃ আমরা সবাই বন্ধু, আমাদের সবসময় কথাবার্তা সেভাবেই হয়। একজন আরেকজনের সাথে সবকিছু শেয়ার করি। ওরা জিজ্ঞেস করে জাতীয় দলের অভিজ্ঞতা কেমন? আমি তাদের বলি যে এখানে কিছুটা পার্থক্যতো আছেই অনূর্ধ্ব-১৯ দলের সাথে। কিন্তু প্রক্রিয়া একই রকম সেটাই জানাই। একটু পরিশ্রম করতে হবে সেটা ওরা নিজেরাই বুঝে। নিজেদের স্কিল, ফিটনেস উন্নতির ধারাবাহিকভাবে করে যেতে হবে আমিও তাদের পরামর্শ দিই।

ক্রিকেট৯৭: মুস্তাফিজকে দেখে ক্রিকেটে সিরিয়াস হওয়া, এরপর ঘরোয়া ক্রিকেট খেলার বদলৌতে কাছ থেকে দেখা, একই দলেও খেলছেন। এখন তো আরও কাছাকাছি, জাতীয় দলের সতীর্থ। দুজনের কেমন সম্পর্ক? তাকে দেখেই যে ক্রিকেটকে সিরিয়াসভাবে নিয়েছেন সে কথা জানিয়েছেন?

শরিফুলঃ উনার সাথে প্রতিনিয়ত কথা হয়। এখনো কোয়ারেন্টাইনে উনি, তবে এর মধ্যেও কথা হচ্ছে আমাদের। যখন ক্যাম্পে থাকি তখন তো আরও বেশি কথাবার্তা হয়, উনার সাথে আড্ডা দিই, সবকিছুই শেয়ার করি। কোনো পরামর্শ চাইলে উনিও যথাসাধ্য সাহায্য করে। উনাকে বলা হয়েছে যে আপনাকে দেখে আমি আজ ক্রিকেটে এসেছি। উনি বলল আলহামদুলিল্লাহ, এটা অনেক বড় ব্যাপার যে আমাকে দেখে অন্তত একজন ক্রিকেটার জাতীয় দল পর্যন্ত পৌঁছেছে।

ক্রিকেট৯৭: জাতীয় দলের সাথে আছেন বেশ কয়েকটা সিরিজ ধরে। পেস বোলিং কোচ ওটিস গিবসনের সাথে আলাদা কিছু নিয়ে কাজ করছেন?

শরিফুলঃ নতুন কিছু চেষ্টা করছি অবশ্যই। যেমন ইনসুইংটা নিয়ে বেশি কাজ করা হচ্ছে, গত কিছুদিন ধরেই অনুশীলনে চেষ্টা করছি। এর বাইরে গতি, লাইন লেংথ, স্লোয়ার সবকিছু নিয়েই কোচদের সাথে কাজ করা হচ্ছে। এসবতো সময়ের ব্যাপার, ধীরে ধীরে আয়ত্ব হবে।

ক্রিকেট৯৭: নিজেকে আমূলে বদলে ফেলে সফল হওয়া তাসকিন আহমদকে কাছ থেকে দেখছেন। নিজের অনুধাবন কি?

শরিফুলঃ আসলে উনাকে দেখলে একটা জিনিসই বুঝা যায় ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়। উনার ইচ্ছে শক্তিটা অনেক বেশি ছিল। নিজের প্রতি বিশ্বাসটাও দৃঢ় ছিল যে উনি পারবে, আবারও জাতীয় দলে ব্যাক করতে পারবে, উনার সেরাটা দিতে পারবে। উনি কঠোর পরিশ্রম করেছে লকডাউনের সময়টায়। সেটার ফলই এখন খুব ভালোভাবে পাচ্ছে। চেষ্টা করবো উনার মত ফিটনেস নিয়ে কাজ করার, সাথে নিজের গতিটাও বাড়ানোর।

ক্রিকেট৯৭: ইতোমধ্যে টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি অভিষেক হয়ে গেল। ওয়ানডেতেও হয়তো সামনেই অভিষেক হয়ে যাবে। আপনার নিজের পছন্দের ফরম্যাট কোনটি?

শরিফুলঃ না আলাদা কোনো পছন্দ নেই। আমার কাছে যখন যে খেলাটা আসে সেটাই খেলি, সেরাটা দেয়ার চেষ্টা করি। পছন্দের ফরম্যাট বলতে আমার কাছে মনে হয় ক্রিকেট খেলা হলেই হল। আমার কাছে ভালো লাগে, খেলা হলেই হল, খেলাটা উপভোগ করি। সেটা টেস্ট, ওয়ানডে কিংবা টি-টোয়েন্টি যে ফরম্যাটেই হোক।

ক্রিকেট৯৭: আপনার ক্রিকেটে আসার পেছনে পরিবারের সমর্থন অনেক বড় ভূমিকা রেখেছে। বাবা-মায়ের চোখে আনন্দটা ধরা দেয়?

শরিফুলঃ আমার পরিবার এখন অনেক খুশি। আব্বু-আম্মু অনেক খুশি, বিশেষ করে আব্বুর দিকে তাকালেতো চোখে মুখে খুশি দেখি, যেটা আসলে ভাষায় প্রকাশ করা যাবেনা। উনি সবসময় একটা জিনিসই চান যতদিন খেলবো ততদিন যেন ভালো খেলোয়াড়ের সাথে ভালো মানুষ হয়েও দেশকে সেবা দিতে পারি।

ক্রিকেট৯৭: আপনার যে মামা টিভিতে মুস্তাফিজের বোলিং দেখিয়ে বলেছে তুমিও পারবে। আপনার একাডেমিতে ভর্তি হওয়ার পেছনে যার অবদান অনেক, সেই মামা কতটা তৃপ্ত আপনাকে নিয়ে নেয়া ঝুঁকি সফল হওয়াতে?

শরিফুলঃ আমাদের বাসাতো পাশাপাশি। আমরা মামা-ভাগ্নে বোঝা যায়না, বন্ধুর মত সম্পর্ক আমাদের। যেখানেই যাই আমরা একসাথে যাই, ঘুরি। উনি বলে তোমাকে অনেক ঝুকি নিয়ে পাঠাইছিলাম, আল্লাহ রক্ষা করেছে তুমি সফল হয়েছো। মামা (মাহমুদ আল আয়ান) নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে করে যে আমার উঠে আসার পেছনে উনার নেয়া ঝুঁকিটা কাজে লেগেছে। আমার মামা আর ভাই (আশরাফুল ইসলাম) দুজনেই সবসময় আমার বাবা-মাকে বলতো দিয়ে দেখিনা কি হয়। তাদের দুজনের ভূমিকা আলাদা করে বলার উপায় নেই।

ক্রিকেট৯৭: আপনার ক্রিকেট শুরুর সময়টাতে গ্রামে বিদ্যুৎ ছিলনা, এমনকি ঘরোয়া ক্রিকেটও যখন খেলে ফেলেন তখনো না। এখন কি গ্রামে বিদ্যুৎ এসেছে?

শরিফুলঃ বিদ্যুৎ আসছে, আমরা বিদ্যুতের যুগে প্রবেশ করেছি শেষ পর্যন্ত (হাসি)। আমি প্রথমবার প্রিমিয়ার লিগ খেলার এক বছর পরেই এসেছে।

ক্রিকেট৯৭: বিদ্যুৎ আসার পেছনে আপনার কোনো ভূমিকা?

শরিফুলঃ আমাদের ইউএনও স্যারই বলেছে যে ওদের গ্রামে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা হোক। এরপরই আসলে দ্রুত গতিতে কাজ সম্পন্ন হয়েছে। আমাদের ইউপি চেয়ারম্যান মামা ইউএনও কে জানিয়েছে বিষয়টা, এরপরই আসলে ইউএনও উদ্যোগ নিয়ে সব কাজ দ্রুতই শেষ করান। আমি প্রিমিয়ার লিগে খেলার পর এসব হয়েছে।

ক্রিকেট৯৭: একদিন পরই ঈদ, গ্রামে আছেন। আগের ঈদের সাথে এখনকার বদলে যাওয়া জীবনের কোন পার্থক্য খুঁজে পান?

শরিফুলঃ ঈদ তো গ্রামে করবো এবার। গ্রামের ঈদ সবসময়ই একটু আলাদা হয়। আগের মতই আছে সব। আমরা বন্ধুরা সবাই মিলে ঘুরতে যাই। তবে এবার হবেনা কারণ সামনে শ্রীলঙ্কা সিরিজ, বিসিবি থেকে নির্দেশনা দেয়া আছে যেন লোক সমাগমে খুব না যাই। প্রতি ঈদেই ঘুরতে যাই, এবার যাবোনা। এবার বাসায় বাবা-মায়ের সাথেই পুরো সময় কাটাবো।

নাজমুল হাসান তারেক

Read Previous

গিবসনের চোখে মুস্তাফিজই সেরা, নাম্বার ওয়ান

Read Next

অ্যাশেজ হারলে স্মিথকে অধিনায়কত্ব বুঝিয়ে দিবেন পেইন!

Total
18
Share