তাসকিন আহমেদ ২.০; নেপথ্যে আছেন যারা

তাসকিন আহমেদ ২.০; নেপথ্যে আছেন যারা

দারুণ শুরুর পর ছন্দপতন, জাতীয় দল থেকে হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম। সেখান থেকেই একদম নিজ তাড়নায় নতুন উদ্যমে ফিরে এসেছেন তাসকিন আহমেদ। নিজেকে আমূলে বদলে ফেলেছেন, লম্বা সময় ফিটনেস, স্কিল, মাইন্ড ট্রেনিং নিয়ে কাজ করে সাম্প্রতিক সময়ে ছাপ রেখেছেন পারফরম্যান্সে। ভিন্ন রূপে ফিরে আসার পথে তাসকিনকে সাহায্য করেছেন বেশ কয়েকজন মানুষ।

যাদের মধ্যে ফিটনেস ট্রেনার দেবাশীস ঘোষ, বিসিবির কোচ মাহবুব আলি জাকি, খালেদ মাহমুদ সুজন ও মাইন্ড ট্রেনার সাবিত রায়হান অন্যতম। ‘ক্রিকেট৯৭‘ এর সাথে আলাপে চারজনই জানিয়েছেন কিভাবে কাজ করেছেন তাসকিনের সাথে।

মাহবুব আলি জাকি, বিসিবির পেস বোলিং কোচ

তাসকিন যখন থেকে বিসিবির অধীনে আসেন তখন থেকে পরিচর্যা করছেন মাহবুব আলি জাকি। এরপর জাতীয় দলে এসেও তার সান্নিধ্য ছাড়েননি ডানহাতি এই পেসার। যেকোনো সমস্যায় তাসকিনের অন্যতম ভরসার নাম জাকি। দল থেকে বাদ পড়ে দীর্ঘদিন বাইরে থাকার পর বিসিবির এই কোচকে নিয়েই নতুনভাবে ফিরে আসার পরিকল্পনা সাজান, যার পুরোটাই মাহবুব আলি জাকির হাতে গড়া। ২০২০ সালের শুরুতে নেয়া পরিকল্পনা অনুসারে লক্ষ্য তাসকিনের ঘন্টায় ১৫০ কিলোমিটার গতিতে বল করা। সে লক্ষ্য দূরে হলেও এখনো পর্যন্ত যা চেয়েছেন তা অর্জন হয়েছে বলে বিশ্বাস এই কোচের।

পুরো পরিকল্পনা নিয়ে মাহবুব আলি জাকি বলেন, ‘পুরো কাজটার ডিজাইন আমিই করেছি, মূল দিক নির্দেশনাটা আমার অধীনেই হয়। যখন প্রেসিডেন্টস কাপে সে ১৪৫ এর বেশি গতিতে বল করা শুরু করলো। কিন্তু সেটা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে কারণ আমরা তখন কাজ করতে পারছিলাম না (ফাঁকা সময়ের অভাবে)। আপনি যখন ফলোআপে না থাকবেন তখন কিন্তু কাজগুলো পিছিয়ে যাবে। প্রেসিডেন্টস কাপের পর বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি কাপে ওর গতি চলে আসলো ১৪০ এর আশেপাশে।’

No description available.

‘এরপর একটা ভালো সময় পেয়েছি সে সময়টা কাজে লাগিয়েছিলাম। যেটার ফল হিসেবে শ্রীলঙ্কাতে ধারাবাহিকভাবে ১৪০-১৪১ এ বল করে গেছে। এখন আবার সামনে শ্রীলঙ্কা সিরিজ। আসলে কাজ করার বিরতিটাই আমরা পাচ্ছিনা। যদি আমি সরাসরি না থাকি কাজটা কিন্তু হয়না। এটা নিয়ে তাসকিনের সাথে আমার দুইদিন ধরে কথা হচ্ছে। এখন আমরা সামনে যে শ্রীলঙ্কা সিরিজ আছে সেটা ধরেই এগোচ্ছি। এখন মূলত ম্যাচ ওরিয়েন্টেড কাজ করতেছি।’

‘আর সেভাবেই বাস্তবিক ও মানসিকভাবে আমরা পরিকল্পনা করছি। এই সিরিজটায় আমরা ম্যাচে ফোকাস করছি। কারণ এই সিরিজ ওর জন্য এবং আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখান থেকে আমরা ১৪২ ধারাবাহিকভাবে রেখে লাইন লেংথ কোনটা কতটুকু অর্জন করতে পারছে সেটা দেখবো। এরপর আমরা পরের ধাপে যাবো। লক্ষ্য ছিল ১৫০ গতিতে বল করানো। শুধু গতি নয়, গতির সাথে সুইং, ভালো জায়গায় বল করার ধারাবাহিকতা, বৈচিত্র সব থাকতে হবে।’

‘এই পুরো লক্ষ্যটাকে যদি পাঁচ ধাপে ভাগ করি তাহলে এখন আমরা প্রথম ধাপে আছি এবং এই ধাপে আমরা সফল। যা চাচ্ছি সবই ঠিকঠাক হচ্ছে। আমাদের যে ১৫০ গতি ছোঁয়ার লক্ষ্য সেটাতে একটু সময় লাগবে। আমরা পারবো, যে গ্যাপগুলো আছে সেগুলোতেই। তবে পরিকল্পনাতে আরেকটু ভিন্নতা আনতে হবে। ইতোমধ্যে একজন বিদেশি ট্রেনারও হায়ার করেছি। তো এই প্রোগ্রামগুলো আসার পর গ্যাপে গ্যাপে আমাদের কাজগুলো সারতে পারবো। এখন আবার লোডিং আনলোডিং ও কাজের চাপটা আসবে। পুরো ব্যাপারটার জন্য আসলে ফিটনেসের বিকল্প নেই।’

খালেদ মাহমুদ সুজন, বিসিবি পরিচালক ও দেশ বরেণ্য কোচ

তাসকিন আহমেদকে ছোটবেলা থেকেই দেখভাল করেছেন যারা তাদের একজন খালেদ মাহমুদ সুজন। দেশের অন্যতম সেরা এই কোচই তাসকিনকে শুরু থেকে নানাভাবে দিক নির্দেশনা দিতেন। জাতীয় দলে আসার পরেও কাজ করেছেন প্রতিনিয়ত। ভিন্ন রূপে তাসকিনের ফিরে আসার মিশনে লকডাউনের সময়ও ভিডিও দেখে দেখে কাজ করেছেন।

খালেদ মাহমুদ সুজন তাসিকেনের মানসিকতা বদলে ফিরে আসা প্রসঙ্গে বলেন, ‘করোনার সময় সামনাসামনি কাজ করাটা অনেক কঠিন ছিল। ও ভিডিও পাঠাতো, সেসব ভিডিও দেখে কথা বলতাম আমরা যে কীভাবে কি করা যায়। ও কষ্ট করছে অনেক মা শা আল্লাহ, পরিশ্রম করছে। আমি মনে করি তাসকিনের জন্যই বড় শিক্ষা এটা। এত কষ্ট, এত পরিশ্রমের পর যে ফল পাওয়া যায় এটা সে বুঝলো। ও একাই করেছে এটা, ও বুঝছে, ওর উপলব্ধি হয়েছে। আমি মনে করি পুরো কৃতিত্ব তারই। সে বেশ ভালো বল করেছে শ্রীলঙ্কায় এই গরমের মধ্যেও। ভালো লাগছে।’

Bangladesh in New Zealand - Taskin Ahmed won't go away wondering what might have been

দেবাশীস ঘোষ, ট্রেনার, মাশল ম্যানিয়া জিম

ধানমন্ডির মাশল ম্যানিয়া জিমনেশিয়াম যেন বাংলাদেশ দলের অঘোষিত জিমনেশিয়াম। জাতীয় দল কিংবা জাতীয় দলের বাইরের থাকা ক্রিকেটারদের মিলনমেলা এই জিমনেশিয়ামে। নিজেদের ফিট রাখার তাড়নায় বিসিবির জিমের বাইরে সবার প্রথম পছন্দ ট্রেনার দেবাশীস ঘোষের মাশল ম্যানিয়া।

তাসকিনের নতুন আঙ্গিকে ফিরে আসার পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ফিটনেসের। গত এক বছর ধরে টানা কাজ করেছেন দেবাশীস ঘোষের সাথে মাশল ম্যানিয়াতে। নিয়মানুবর্তিতার যে নব উদাহরণ তাসকিন দেখাচ্ছেন সেখানে ফিটনেস থাকবে উপরের দিকে। নিজেকে বিশ্বমানের ক্রিকেটার হিসেবে দেখার তাড়নায় শূন্য হাতে তাসকিনের শুরু করার গল্পটা শোনালেন ট্রেনার দেবাশীস।

দেবাশীস বলেন, ‘ও যখন জাতীয় দল থেকে বাদ পড়লো ফিটনেস খারাপ হয়ে গেল, কিছুটা নিয়ম শৃঙ্খলার বাইরে ছিল। গতবছর কড়া লকডাউন শুরু হল, ১০ দিন পর ও আমাকে ফোন দিয়ে বলল দাদা আমি জিম করবো। আমি বললাম এই সময়ে? সে বলল হ্যাঁ এখনই করবো। এমন হুট করে করার কারণ জানতে চাওয়ায় সে বলল ”দাদা আমি আবার জাতীয় দলে ফিরতে চাই। আমি শুধু জাতীয় দল না বিশ্ব ক্রিকেটেই অনেক বড় কিছু করতে চাই। যা হয়েছে তা হয়েছে, এখন নতুন তাসকিনকে যেন মানুষ দেখে। আমাকে সবাই বলে ফেলছে আমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবেনা। আমি জানি আমাকে দিয়ে কি হবে।’

‘আমি তাকে বললাম ঠিক আছে আমি আসবো, জিমও করাবো কিন্তু এই সময়ে ভাইরাস আক্রমণ করলে কিন্তু আপনি বাঁচবেন না। সে বলল ”দাদা যদি মরে যাই মরে যাবো।” মানে এতটাই তাড়না অনুভব করেছিল। জিমের সাথে সাথে ও খাদ্যাভাসে অনেক পরিবর্তন আনা শুরু করলো। আর খাদ্যাভাস তো আসলে এমন যে একদিনে হয়না। জিম করাতে গিয়ে তার পা দেখে তো অবাক, বললাম এই পা নিয়ে কিভাবে এতদিন খেলেছেন? আপনারতো পা শক্ত করতে হবে, কাপ মাশল, লোয়ার ব্যাক আর কোর মাশল (পেট) শক্ত করতে হবে।’

No description available.

‘সেদিন থেকে আস্তে আস্তে কাজ করতে করতে একবছরে বর্তমান অবস্থানে এসেছে। সামনের এক বছরে দেখবেন সে ১৫০ কিমি গতি ছুঁয়ে ফেলবে। ও কিছুদিন আগে নিউজিল্যান্ড থেকে এসেছে, যখন নেমেছে তখন দুপুর। সে বিকেলেই এসে পড়েছে দেখা করার জন্য যে দাদা আপনি শিডিউল তৈরি করেন আমি আসছি। শ্রীলঙ্কায় গেল আমার সাথে প্রতিদিনই কথা হত, কি করবে না করবে। ৮ উইকেট পেল, কিন্তু সে বলেছে দাদা আরও ভালো করতে হবে। বাংলাদেশকে বিদেশের মাটিতে টেস্ট জেতাতে হবে। ওর এই ক্ষিধাটা আগে ছিলনা।’

‘ফিটনেসের দিক থেকে প্রতিদিনই সে নিজেকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এখন সে অনেক শৃঙ্খলার মধ্যে চলে এসেছে। বন্ধু বান্ধব খুব একটা নেই, আড্ডা কম দেয়। ওর জীবন এখন বাসা, জিম আর খেলার মাঠে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। শ্রীলঙ্কা থেকে এসে ইতোমধ্যে পাঁচদিন জিম সেশন করে ফেলেছে। ঈদের দিন আমাকে বলেছে যে চলেন আমরা বালুতে যাই, বালুতে গিয়ে একটা হার্ড সেশন করি। বিশ্ব ক্রিকেটে অনেক বড় বোলার হতে গেলে ফিটনেসের আসলেই বিকল্প নেই।’

সাবিত রায়হান, আন্তর্জাতিক মাইন্ড ট্রেনার

শরীরের সাথে মনের জোরটাও যে গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বমানের বোলার হওয়ার মিশনে নেমে সেটা বুঝে গেছেন তাসকিনও। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মাইন্ড ট্রেনিং বিষয়টা এখনো পুরোপুরি মানিয়ে নেয়ার মত অবস্থানে না থাকলেও গত তিন বছর ধরে সেটা করে আসছেন এই পেসার। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক মাইন্ড ট্রেনার সাবিত রায়হানের সংস্পর্শে অবিশ্বাস্যরকম পরিশ্রম করছেন মানসিকভাবে শক্ত হতে।

সাবিত রায়হানের ভাষ্যমতে, ‘দেখেন মন আর শরীর একসাথে কাজ করে। ফিটনেস ভালো হওয়া জরুরী, একই সাথে মন শক্ত হওয়া জরুরী। সে যখন ফিটনেসের জন্য নিজেকে পুশ করছে তখন সে মনকেও ব্যবহার করছে। মন শক্ত থাকলে তার ফিটনেস ভালো হওয়ার পেছনে ভূমিকা রাখছে। এটা একটা কম্বাইন্ড এফোর্ট। দেখা যায় সে একটা জোরে বল করলো কিন্তু বলটা কোন কারণে খারাপ হয়ে গেল, পরের বলে কামব্যাক করার জন্য মানসিক শক্তি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।তাসকিনের ভাষ্যমতে সে মাইন্ড ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে বেশ উপকৃত হচ্ছে।’

No description available.

‘ইতোমধ্যে দলেও এর একটা প্রভাব পড়তে শুরু করেছে, অন্যরা তার কাছে এসে বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ করছে। একটা ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। ও যখন দেশে থাকে তখন আমাদের সরাসরি কাজ করা হয়। খেলার জন্য বিদেশে গেলে কিংবা টিম হোটেলে থাকলে আমাদের অনলাইনে ট্রেনিং চলে। বেশ লম্বা সময় ধরে সে ফিটনেস ও মাইন্ড ট্রেনিং দুটোই ধারাবাহিকভাবে করছে। তিন বছর ধরে কোন প্রকার ছাড় দেয়নি এই কাজটায়।’

‘নিউজিল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা যেখানেই গেল সেখান থেকেই সে কাজ করেছে। বেশ সিরিয়াসভাবেই নিয়েছে বিষয়টাকে। দেখা গেল ম্যাচে কোন বাজে স্পেল গেল, এটা নিয়ে সে রাত পার করতে চায়না। তার আগেই মাইন্ড ট্রেনিং সেশন করে, ঠিকঠাক করে ঘুমাতে যায়। একজন অ্যাথলেট হিসেবে অন্যদের জন্য নিশ্চিতভাবেই উদাহরণ। সে নিজে থেকেই এসব করেছে, কৃতিত্ব তার পাওনা, এই সিরিয়াসনেসটা ওর মধ্যে আছে।’

নাজমুল হাসান তারেক

Read Previous

পাডিকাল, সাকারিয়া, হারশালদের নিয়ে শ্রীলঙ্কা সফরে যাবে ভারত

Read Next

উইলোর পরিবর্তে বাঁশের ব্যাট, যা বলছে এমসিসি

Total
48
Share