সেদিনের এই দিনেঃ আকরাম খানের মহানায়ক হবার ম্যাচ

সেদিনের এই দিনেঃ আকরাম খানের মহানায়ক হবার ম্যাচ

১৯৯৭ সাল, ৪ এপ্রিল- ২৪ বছর আগের আজকের এই দিনে বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রেক্ষাপট আজকের মত ছিল না। তখনো পাওয়া হয়নি টেস্ট স্ট্যাটাস, খেলা হয়নি মর্যাদার আসর বিশ্বকাপে। ২ বছর পর (১৯৯৯) বিশ্বকাপের অংশ হতে জিততেই হবে আইসিসি ট্রফিতে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ম্যাচ।

এমন ম্যাচে বোলারদের দাপটে কুয়ালালামপুরের রাবার রিসার্চ ইন্সটিটিউট মাঠে নেদারল্যান্ডসকে ১৭১ রানে অলআউট করে দেয় আকরাম খানের নেতৃত্বাধীন দল। বল হাতে মোহাম্মদ রফিকের মত আকরাম খান নেন ২ টি উইকেট। ১ টি করে উইকেট পান সাইফুল সিওলাম, হাসিবুল হোসেন শান্ত ও আতহার আলি খান।

ব্যাট করতে নেমে অবশ্য বিপর্যয়ে পড়তে হয় বাংলাদেশ দলকে। ১৫ রানেই নেই ৪ উইকেট। কাউন্টি ক্রিকেট খেলা রোলান্ড লাফাভ্রের বোলিং তোপে ১৫ রানেই নেই ৪ উইকেট।

বৃষ্টি বাগড়ায় ম্যাচের দৈর্ঘ্য যায় কমে, তাতে কাজটা কঠিনই হয়ে পড়ে। ৩৩ ওভারে লক্ষ্য তখন ১৪১। মিনহাজুল আবেদিন নান্নুকে নিয়ে ৬২ রানের জুটি গড়ে বাংলাদেশের আশার পালে হাওয়া দেন আকরাম। পরে নান্নু, মনিরা ফিরে গেলেও সাইফুল ইসলামের সাহায্য নিয়ে দলকে জিতিয়ে মাঠ ছাড়েন আকরাম। ৯২ বলে ৩ চারে ৬৮ রান করে অপরাজিত থাকেন বাংলাদেশ দলপতি, বাংলাদেশ ম্যাচ জেতে ৮ বল ও ৩ উইকেট হাতে রেখে।

প্রেক্ষাপট বিবেচনায় আকরামের এই ইনিংসকে বাংলাদেশের ক্রিকেট বাস্তবতা বদলে দেবার ইনিংস বলে মনে করেন সেই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের ম্যানেজার, বাংলাদেশের প্রথম আন্তর্জাতিক অধিনায়ক গাজী আশরাফ হোসেন লিপু।

২৪ বছর আগের সেই ম্যাচ নিয়ে লিপুর স্মৃতিচারণ-

‘এই ম্যাচটা সম্পর্কে যদি আমি বলি, নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ম্যাচের আগে আমরা জানতাম যে এই ম্যাচ টা আমাদের জিততেই হবে। না জিতলে আমরা ওয়ার্ল্ড কাপে (১৯৯৯) কোয়ালিফাই করতে পারব কিনা সেটা নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়তে হত আমাদের।’

‘খেলা শুরু হল, আমরা খুব ভাল বোলিং করলাম, ১৭১ রানে নেদারল্যান্ডসকে আটকে দিলাম। কিন্তু আমাদের শুরুটা (ব্যাটিং) একদমই ভাল হল না। আনফরচুনেটলি আমরা চার-চারটি উইকেট হারিয়ে ফেললাম ১৫ রানের মধ্যেই। নাইমুর রহমান, সানোয়ার হোসেন, আমিনুল ইসলাম বুলবুল ও আতহার আলি খান- এই চারজনই প্যাভিলিয়নে ফিরে এসছে।’

‘এর মধ্যে খেলার মাঝখানে বৃষ্টি ইন্টারাপ্ট করল। তুমুল বৃষ্টি হয়েছিল, আমার মনে আছে আমাদের ড্রেসিংরুমের ভেতরেও কয়েক ইঞ্চি পানি হয়ে গিয়েছিল। মাঠের মধ্যেই ড্রেসিংরুম ছিল, টেম্পোরারি ড্রেসিং রুম। আমরা যথেষ্ট টেনশনে আছি, যে ৪ উইকেট হারিয়ে ফেলেছি। পরে যখন খেলা শুরু হল আবার, আমাদেরকে রিভাইজড টার্গেট দেওয়া হল। ১৪১ রান করতে হবে ৩৩ ওভারে।’

‘তখন আমাদের রিকগনাইজড ব্যাটসম্যান আছে আকরাম খান, মিনহাজুল আবেদিন নান্নু। এই দুজনকেই বলা যায় রিকগনাইজড ব্যাটসম্যান, এরপর অলরাউন্ডার, বোলার শুধু। তো আমরা খুবই টেনশনে, যে কি হতে পারে। দুর্দান্ত বল করেছিল রোলান্ড লাফাভ্রে।নেদারল্যান্ডসের হয়ে খেলেন, কাউন্টিতেও খেলতেন তখন। দারুণ বল করেছেন, ম্যাচ শেষে দেখেছিলাম ৭ ওভারে ৮ রান দিয়ে তিনি তিন-চারটা (আসলে ৩ টি) উইকেট নিয়ে নিয়েছিলেন।’

‘আকরাম খান আর মিনহাজুল আবেদিন নান্নু একটা জুটি গড়ে, তাদের জুটি থেকে ৬০ রান সম্ভবত (আসলে ৬২) এসেছিল। এই জুটিটা আমাদের একটা ফাইটিং এর মত জায়গায় নিয়ে যায়। অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে কিন্তু স্ট্রাইক রোটেট করে খেলছিল। কেউ কিন্তু চার মারা বা উচ্চভিলাসী কোন শট খেলতে চায়নি। আকরাম খানই নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, ২২ রান করে নান্নু আউট (রান আউট) হয়ে যান।’

‘আকরামের সঙ্গে পরে এসে সাইফুল সম্ভবত একটা সম্মানজনক অবস্থায় নিয়ে যায়। মাজে মনি (এনামুল হক মনি) আউট হয়ে গেছে, আমাদের টেইল শুরু হয়ে গেছে। আমর তখন বেশ বিপাকে, আমার মনে আছে সেদিন জুম্মার দিন ছিল। প্রচুর লোক এসেছিল মাঠে আমাদের খেলা দেখার জন্য। কমেন্টেটররা কমেন্ট্রি করছিল, বেতারে লাইভ কমেন্ট্রি হচ্ছিল। জাফরউল্লাহ শারাফাত, শামীম আশরাফ তারা সবাই ছিলেন। প্রচুর দু’আ হয়েছিল, এই বৃষ্টি যেন থামে, আমরা যেন ম্যাচটা খেলতে পারি।’

‘অসাধারণ একটা ইনিংস খেললেন আকরাম খান। আমার এখনো মনে আছে, যে সেরকম এক চাপের মধ্যে, আর্টিফিশিয়াল উইকেটে কিন্তু খেলা হচ্ছিল, আউটফিল্ড ভেজা। কাজেই বাউন্ডারি বের করা যাচ্ছে না, আকরাম খানের ৬৮ রানের মধ্যে মাত্র ৩ টি বাউন্ডারি ছিল। বেসিকালি তারা স্ট্রাক রোটেট করে খেলছিলেন, ১ ও ১.৫ কে ২ বানানোর চেষ্টা করছিলেন। তারা প্রচুর সিঙ্গেল ও ডাবলস নিয়েছিলেন। সাইফুল অসাধারণ সাপোর্ট দেয়, আকরাম বেশিরভাগ সময় স্ট্রাইক নিচ্ছিলেন, সাইফুল এর মাঝেও ১৮ রান করেন। সাথে এক্সট্রাও কিছু পেয়েছিলাম (২২ রান) , তাতে কয়েক বল হাতে থাকতেই (৮ বল) আমরা ম্যাচটা জিতে যাই।’

‘আমার মনে হয়, সেটা আমার দেখা আকরাম খানের অন্যতম সেরা এক ইনিংস। সেরা বলতে আমি বুঝাচ্ছি, এটা একটা প্রোডাক্টিভ ইনিংস ছিল। অনেকে কিন্তু অনেক বড় বড় রান করেন, তবে সেই রান কিন্তু দলকে জয়ের বন্দরে ভেড়াতে পারে না। আকরাম খানের এই ইনিংসটা ছিল একটা ম্যাচ উইনিং ইনিংস। এবং আমার মনে হয় বাংলাদেশকে যে একটা স্তর থেকে আরেকটা স্তরে নিয়ে যাওয়া- ১৯৯৯ বিশ্বকাপ কনফার্ম করার জন্য এই ইনিংসটা খুবই প্রয়োজনীয় ছিল।’

‘সময়োপযোগী ও দারুণ ম্যাচিউর এক ইনিংস খেলেছিলেন আকরাম। এরকম ইনিংস তিনি আরো খেলেছেন, তবে এই ইনিংস অন্য সব ইনিংসকে ছাপিয়ে গেছে। আমার মনে হয় বাংলাদেশ ক্রিকেটকে আকরাম খান ঋণী করে ফেলেছিলেন সেদিনের সেই ইনিংসটা খেলে। সেই ইনিংসের কথা আমি কখনোই ভুলতে পারবো না।’

‘পরবর্তীতে তো আমরা আইসিসি ট্রফি জিতে চ্যাম্পিয়ন হলাম, সেকথা সবাই জানে। আমার মনে হয় এই প্রজন্মের অনেকেই জানে না যে আজ থেকে প্রায় ২৪ বছর আগে আকরাম খান দুর্দান্ত এক ইনিংস খেলেছিলেন, যেই ইনিংস বাংলাদেশের একদিনের ক্রিকেটের চেহারাটা পুরোটাই পালটে দিয়েছিল। সেই জিনিসটাও তাদের জানা উচিত। আজকাল অনেক তারকা আছেন ক্রিকেটের, নিশ্চয়ই তারা অনেক বড় মাপের খেলোয়াড়। আকরাম খানও কিন্তু অনেক বড় মাপের একজন খেলোয়াড় ছিলেন তার সময়ের।’

শিহাব আহসান খান

Read Previous

করোনা টেস্টে পজিটিভ দেবদূত পাডিকাল

Read Next

যেকারণে বিমানবন্দর থেকে বের হননি মুস্তাফিজুর রহমান

Total
55
Share