৩৫ বছর কেটে গেছে, বিশ্বাসই হচ্ছেনা শহীদের

৩৫ বছর কেটে গেছে, বিশ্বাসই হচ্ছেনা শহীদের

১৯৮৬ সালের আজকের দিনে (৩১ মার্চ) প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে নামে বাংলাদেশ। সেবার শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত এশিয়া কাপে মরাতোয়ায় পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যাত্রা শুরু বাংলাদেশের।

গাজী আশরাফ হোসেন লিপুর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ইমরান খান, ওয়াসিম আকরামের পেস, সুইংয়ের পাশাপাশি আব্দুল কাদিরের লেগ স্পিনে কুপোকাত হয়ে ৯৪ রানেই অলআউট হয়। তবে আগে ব্যাট করা বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ ৩৭ রান আসে মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান শহীদুর রহমান শহীদের ব্যাট থেকে। যেখানে দলের ৮ ব্যাটসম্যানই ছুঁতে পারেননি দুই অঙ্ক।

স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে ৩৭ রানের ইনিংস খেলেন চট্টগ্রামের শহীদ। ৬০ বলের ইনিংসটিতে ছিলনা কোন বাউন্ডারি, পুরো ইনিংসেই বাংলাদেশ দলের কোন ব্যাটসম্যান বাউন্ডারি হাঁকাতে পারেনি। ফলে শহীদের ৩৭ রানের ইনিংসটির মহাত্ম বেড়ে যায় আরও, ইমরান খান, ওয়াসিম আকরামদের গতির সাথে সুইং সামলে নিতে হয়েছে সিঙ্গেলস, ডাবলস। সামলাতে হয়েছে আব্দুল কাদিরের লেগ স্পিন, গুগলি, ফ্লিপার। অবশ্য আউটও হয়েছেন কিংবদন্তী এই স্পিনারকে ফিরতি ক্যাচ দিয়ে।

৩৫ বছর আগে দেশের প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচে সর্বোচ্চ স্কোরারের ক্রিকেট ক্যারিয়ার থেমেছে দুইটি আন্তর্জাতিক ওয়ানডে খেলেই। এতদিন পর এসে স্মৃতি হাতড়াতে গিয়ে ‘ক্রিকেট৯৭’ এর সাথে আলাপে বেমালুম ভুলেই গেলেন বছরের হিসাব। অবাক, বিস্ময়ে চট্টগ্রামের পুরোদস্তুর এই ব্যবসায়ী বলেন,

‘৩৫ বছর হয়ে গেল? আমিতো বিশ্বাসই করতে পারছিনা। মনে হচ্ছে এইতো সেদিনকার কথা, আহা সময়!’

তারা যখন ক্রিকেট খেলেছেন তখন বাংলাদেশ ক্রিকেটের কিছুই ছিলনা। কিছুই না থাকার সময়টায় শখের বশেই খেলেছেন, অনিশ্চিত ভবিষ্যত আর অপেক্ষার প্রহরকে বিদায় বলে দ্রুতই সরে যান এই পেশা (যদিও তখন ক্রিকেটকে পেশা হিসেবে নেওয়ার অবস্থা ছিলনা) থেকে। ১৯৮৬ সালে এশিয়া কাপে খেলার সময়ও পাননি কোন ম্যাচ ফি, আইসিসির কাছ থেকে পাওয়া অংশগ্রহণ ফির পুরোটাই বোর্ড কাজে লাগায় একই বছর ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত সহযোগী দেশগুলোর আইসিসি ট্রফিতে।

এশিয়া কাপ, আইসিসি ট্রফির পরই ক্রিকেট ছেড়ে ব্যবসায় মনযোগী হন, তার আগে একবছরের মত ইংল্যান্ডে কাটিয়েছেন প্রবাস জীবনও। বর্তমানে বেশ কিছু ব্যবসার সাথে জড়িত সাবেক এই ক্রিকেটারের আছে চট্টগ্রামে রেস্টুরেন্ট ব্যবসাও। চট্টগ্রাম এম এ আজিজ স্টেডিয়াম সংলগ্ন ‘রয়েল হাট’ এর মালিক শহীদুর রহমান শহীদ।

শহীদুর রহমান শহীদ
বাঁয়ে লিগ ক্রিকেটে মোহামেডানের বিরুদ্ধে ব্যাট করছেন আবাহনীর শহীদ – ডানে মোহামেডানে খেলার সময়ের শহীদ- ছবি কৃতজ্ঞতাঃ নাজমুল আমিন কিরণ

এই প্রতিবেদকের সাথে মুঠোফোনে ৩৫ বছর আগের সেই ম্যাচের স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে শহীদুর রহমান বলেন, ‘পাকিস্তান তখন অন্যতম শক্তিশালী দল। তাদের ক্রিকেটে একটা খারাপ সময় যায়। আর সেটা ইমরান খানের নেতৃত্বে কাটিয়ে উঠে, সেবার এশিয়া কাপে আসা তাদের দলটা ছিল সব দিক দিয়ে শক্তিশালী। আমরা তখন হাঁটি হাঁটি পায়ে ক্রিকেট খেলা শুরু করেছি। আমাদের ক্রিকেট তখন তৃনমূলে সেভাবে ছড়ায়নি। ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, রাজশাহী এমন কয়েকটা অঞ্চল ভিত্তিক দেশের ক্রিকেট ছিল।’

‘তো শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত এশিয়া কাপে ভারত অংশ নেয়নি। আমাদের তখন কোন কোচ ছিলনা, ট্রেনার ছিলনা, মানে এখন যেসব সুযোগ সুবিধা পায় ক্রিকেটাররা সেসবের কিছুই ছিলনা। তবে কাউকে না কাউকে তো শুরু করতে হত। আমরা ছিলাম সেই শুরুর সৈনিক। আমাদের তো হারানোর কিছু ছিলনা। প্রতিপক্ষ যেমনই হোক কেবল নিজেদের খেলাটা খেলবো। তাদের সাথে খেলার অভিজ্ঞতাটাই তো অনেক। পাকিস্তানের বিপক্ষে হল আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের যাত্রা।’

আগে ব্যাট করতে নেমে দল হারিয়েছে ১৫ রানেই তিন উইকেট। সেখান থেকে অন্য প্রান্তের আসা যাওয়ার মিছিলের ভীড়ে শহীদের ৩৭ রান। দেশের হয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ, প্রতিপক্ষে ইমরান খান, ওয়াসিম আকরাম, জাকির খান, আব্দুল কাদিররা। নিজের এমন ইনিংসের পেছনে তখনকার জৌলুসপূর্ণ ঢাকা লিগের অবদানই তুলে ধরেন মোহামেডান, আবাহনীর মত ক্লাবে দীর্ঘদিন খেলা শহীদ।

নিজের ইনিংসকে মূল্যায়ণ করতে গিয়ে ৫৮ বছর বয়সী সাবেক এই ক্রিকেটার বলেন, ‘আসলে আমাদের তো দিক নির্দেশনা দেওয়ার কেউ ছিলনা। আমরা নিজের সহজাত খেলাটাই খেলতে চেয়েছি। ঢাকা লিগে তখন যে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্রিকেট হত সেটাই বড় মঞ্চে আমাদের একমাত্র সম্বল ছিল। তখনকা ঢাকা লিগও তো আসলে এত জমজমাট ছিল যে আপনার ভেতর অন্যরকম একটা আত্মবিশ্বাস তৈরি করে দিবে। আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচ মানে তখন ২৫ হাজার দর্শক গ্যালারিতে। এত দর্শকের সামনে আপনি যখন খেলবেন স্বাভাবিকভাবেই এটা আন্তর্জাতিক আঙিনায় কাজে দিবে।’

‘আমার যে ইনিংসটা, আমি আসলে একটু হিট করতে পছন্দ করতাম। এটা আমার সহজাত খেলা। প্রতিপক্ষ না ভেবে আমি রান করাতে মনযোগ দিতাম। ঐ ম্যাচেও সেটাই করেছি, রানের জন্য আমার যে ক্ষুধা সেটা অব্যাহত ছিল। আমার ইনিংসটা কিন্তু ফিফটি হয়ে যেত। আগের রাতে বৃষ্টির কারণে আউটফিল্ড এতটাই ভেজা ছিল যে বল খুব একটা যেতনা। জাকির খানকে আমি বেশ কয়েকটা হুক খেলেছি যেগুলো আউটফিল্ড স্বাভাবিক হলে নির্ঘাত চার। কিন্তু ভেজা ছিল বলে বল পড়েই আঁটকে গিয়েছিল।’

‘শারীরিকভাবেই আমার ফিটনেস মারমুখী ঘরানার ছিল, মেরে খেলতে পছন্দও করতাম। আমার কাছে মনে হত রানের কোন বিকল্প নেই, রান করতে হলে আবার মারতে হবে।’

‘আরেকটা বিষয় আমি যেটা মনে করি ক্রিকেট কিন্তু মাইন্ড গেম। এখানে পড়াশোনাটার একটা বড় প্রভাব আছে। তখনকার সময় আমরা যারা ক্রিকেট খেলতাম বেশিরভাগই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। এটা কিন্তু বাস্তবতা, জীবনের অনেক ক্ষেত্রের মত ক্রিকেটেও নূন্যতম পড়াশোনা প্রয়োজন।’

তখনকার সময় বাংলাদেশ ক্রিকেটকে আন্তর্জাতিক ম্যাচের জন্য অপেক্ষা করতে হত তীর্থের কাকের মত। কালে ভদ্রে পাওয়া সুযোগের অপেক্ষা থেকে জীবন কাটানোর মত অবস্থা ছিল খুব কম ক্রিকেটারেরই। ঘরোয়া লিগের আর্থিক লেনা দেনা নিয়েও সময়টা অনিশ্চয়তায় কাটতো ক্রিকেটারদের। যে কারণে অনিশ্চিত জীবনকে ছুটি দিতে গিয়ে ক্রিকেট থেকে সরে আসেন শহীদুর রহমান। এশিয়া কাপে পাকিস্তানের পর খেলেছেন শ্রীলঙ্কার বিপক্ষেও, রান করেছেন ২৫। দুই ম্যাচে মোট ৬২ রান করা এই ব্যাটসম্যান ঐ বছরই খেলেছেন ইংল্যান্ডে আইসিসি ট্রফি। এরপরই গুটিয়ে ফেলেন ক্রিকেট ক্যারিয়ার।

ক্রিকেট ছাড়া প্রসঙ্গে তার ভাষ্য, ‘আমরা যখন ক্রিকেট খেলি তখন এত কাড়ি কাড়ি টাকা, সুযোগ সুবিধার কথা স্বপ্নেও ভাবতো না কেউ। আমাদের ছিল ক্রিকেটের প্রতি টান। কিন্তু একটা সময় আর্থিক নিরাপত্তাও জরুরি হয়ে আসে। পরিবার চায়না এমন অনিশ্চিত জীবন যাপন করি, নিজেরও দায়বদ্ধতার জায়গা তৈরি হয়। ঢাকা লিগে খেলেছি (আবাহনী ও মোহামেডান) সেখানেও ধীরে ধীরে আর্থিক ব্যাপার জটিল হয়ে আসছিল। পাওনা পারিশ্রমিকের জন্য কর্মকর্তাদের পেছনে ঘুরতে হত। জাতীয় দলে ম্যাচ কিংবা পারিশ্রমিক তো তখন কল্পনাতেও আসতো কালে ভদ্রে।’

‘এশিয়া কাপে অংশগ্রহণ বাবদ দল একটা এমাউন্ট পেয়েছিল। আমাদের কোন ম্যাচ ফি ছিলনা। সেখান থেকে আমি ভালো করাতে আমাকে দিয়েছিল ৩০০ কি ৫০০ ডলার, ঠিক মনে নেই। ওটাও আমি দলের সবার মধ্যে ভাগ করে দিই। বোর্ড যে টাকা পেয়েছে সেটা পুরোটা খরচ করেছে ইংল্যান্ড আইসিসি ট্রফিতে। তখন আইসিসি ট্রফিতে নিজেদের অর্থ খরচ করে যেতে হত। সব মিলিয়ে যখন দেখলাম সামনে কোন লক্ষ্য নেই তখনই পিছু হটে আসি। উপায়ও ছিলনা, আপনার সামনে যখন কোন লক্ষ্য নেই তখন তো আপনি জানেন না কি করবেন পরবর্তী ধাপে।’

ক্রিকেট ছেড়ে এখন পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী, তবে ক্রিকেটের সাথে দূরত্ব কমেনি এটুকুও। নিজ শহর বন্দর নগরী চট্টগ্রামে ক্রিকেট পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কাজ করছেন। কোচ নিয়োগ দিয়ে নগরীর প্যারেড মাঠে গড়ে তুলেছেন রাইজিং স্টার ক্রিকেট একাডেমি। যেখানে নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিচ্ছে ১০০ এর বেশি খুদে ক্রিকেটার। একই নামে চট্টগ্রামের ক্রিকেটে ঐতিহ্যবাহী ক্লাব রাইজিং স্টার ক্লাবকে চটগ্রাম প্রিমিয়ার লিগে করছেন পৃষ্ঠপোষকতা।এই ক্লাবের হয়েই ক্যারিয়ারের শুরুতে খেলেছেন শহীদুর রহমান। ৯০ এর দশকে দেশের ক্রিকেট নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবির) নির্বাচন শুরু হলে সে সময় থেকেই আছেন কাউন্সিলর হিসেবে।

যাদের সাথে দেশের হয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন তাদের সাথেও এখনো আছে যোগাযোগ। রকিবুল হাসান, গাজী আশরাফ হোসেন লিপু, গোলাম নওশের প্রিন্সদের সাথে (বর্তমানে ইংল্যান্ড প্রবাসী) কথা হয় নিয়মিতই। আর ঐ ম্যাচে খেলা চট্টগ্রামের আরো দুই ক্রিকেটার নুরুল আবেদিন নোবেল ও মিনহাজুল আবেদিন নান্নুর সাথে দেখা হয় নিয়মিতই। নোবেল-নান্নু দুজনেই আবার আপন ভাই। দুই ভাইয়ের একসাথে জাতীয় দলের একাদশে থাকার ঘটনা বাংলাদেশ ক্রিকেটে এখনো পর্যন্ত এই একটাই। নান্নু জাতীয় দলের বর্তমান প্রধান নির্বাচক, নোবেল বিসিবির চট্টগ্রাম বিভাগীয় দলের কোচ।

নাজমুল হাসান তারেক

Read Previous

দিনব্যাপী চার দলের স্বাধীনতা গোল্ড কাপ

Read Next

প্রথম ওভারে ব্র‍্যাথওয়েটের সেঞ্চুরি, ধীরগতিতে শ্রীলঙ্কা

Total
31
Share