শেষ ম্যাচেও বড় পরাজয়, হোয়াইটওয়াশ হল বাংলাদেশ

শেষ ম্যাচেও বড় পরাজয়, হোয়াইটওয়াশ হল বাংলাদেশ

জিততে হলে ভাঙতে হত বেসিন রিজার্ভে সর্বোচ্চ রান তাড়ার ৩২ বছর আগের পুরোনো রেকর্ড। ১৯৮৯ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে ২৫৩ রান তাড়া করে জিতেছিল স্বাগতিক নিউজিল্যান্ড। আজ (২৬ মার্চ) সিরিজের শেষ ওয়ানডেতে আগে ব্যাট করে বাংলাদেশের জন্য অসম্ভব এক লক্ষ্য ছুঁড়ে দেয় কিউইরা। ওয়েলিংটনের বেসিন রিজার্ভে ৬ উইকেটে ৩১৮ রান তুলে সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহের রেকর্ড গড়ে। যা তাড়া করতে নেমে ১৫৪ রানেই গুটিয়ে যায় অসহায় আত্মসমর্পণ করা টাইগাররা।

বাংলাদেশকে ১৬৪ রানে হারিয়ে তিন ম্যাচ ওয়ানডে সিরিজ ধবলধোলাই করলো টম ল্যাথামের দল। জিমি নিশামের ৫ উইকেটের সাথে ম্যাট হেনরির শিকার ৪ উইকেট। টস জিতে আগে ব্যাট করা নিউজিল্যান্ড এই সিরিজে অভিষেক হওয়া দুই ব্যাটসম্যান ডেভন কনওয়ে ও ড্যামিল মিচেলের জোড়া সেঞ্চুরিতে পাহাড়সম পুঁজি পায়। অথচ শুরুটা ছিল ভিন্নরকম, বেসিন রিজার্বের ঘাসেভরা সবুজ উইকেটে নতুন বলে দাপট দেখিয়েছিল বাংলাদেশী পেসাররা।

নিউজিল্যান্ডের মাটিতে কোন ফরম্যাটেই এখনো পর্যন্ত জয়ের দেখা পায়নি বাংলাদেশ। তবে এবারের সফরে বেশ আশাবাদী ছিল দলের কোচ, অধিনায়ক ও টিম ম্যানেজমেন্ট। অন্তত ওয়ানডে সিরিজ শেষে এখনো সেটি স্বপ্নই বলা যায়। ইতিহাস গড়ে কিউই মুল্লুকে একটি জয় পেতে অপেক্ষা তিন ম্যাচ টি-টোয়েন্টি সিরিজ পর্যন্ত।

অথচ আজ (২৬ মার্চ) দেশের ৫০ তম স্বাধীনতা দিবসে দারুণ কিছু করার সুবর্ণ সুযোগ ছিল তামিম ইকবালদের সামনে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে প্রাপ্তির খাতায় ক্রিকেট থেকে যোগ হয়নি কিছুই।

ওয়েলিংটনে দিনের শুরুটা অবশ্য ভালোই করেছিল টাইগার পেসার তাসকিন আহমেদ, রুবেল হোসেনরা। পেসারদের জন্য কাঙ্খিত উইকেট বলতে যা বোঝায় তেমনটা পেয়ে আদায় করে নিয়েছেন ছোট ছোট সুইং। মাঝে মাঝে তাসকিন আহমেদের বল ভেতরে ঢোকানো আর বাইরে নেওয়ার সৌন্দর্য নজর কেড়েছে দারুণভাবে। ইনিংসের চতুর্থ ওভারে তার ভেতরে ঢোকানো পঞ্চম বলটি জানান দেয় এখানে পেসার কতটা সাহায্য পেতে পারে। তাসকিন-রুবেলের তোপে ৫৭ রান তুলতেই ৩ উইকেট হারিয়েছে স্বাগতিকরা।

৮ম ওভারে দলকে প্রথম সাফল্য এনে দেন তাসকিন। তাসকিন আর মুশফিকুর রহিম যেন ক্যাচ মিসের ক্ষেত্রে একই সুতোয় গাঁথা। আগের ম্যাচে জিমি নিশামের পর এদিনও তাসকিনের বলে হেনরি নিকোলসের (১৮) দেওয়া সহজ ক্যাচ মিস করেন মুশফিক। তবে পরের বলেই ফুল লেংথ থেকে করানো আউট সুইংয়ে গড়মিল করে গালিতে লিটন দাসের হাতে ক্যাচ দেন এই বাঁহাতি। ভাঙে ৪৪ রানের উদ্বোধনী জুটি। পরের ওভারে সিরিজে প্রথমবার খেলতে নামা রুবেল হোসেন ফেরান আরেক ওপেনার মার্টিন গাপটিলকে (২৬)।

একদিক থেকে তাসকিনের গতির সাথে সুইংয়ের মিশেলে করা বলে অস্বস্তিতে কিউই ব্যাটসম্যানরা। অন্যদিকে যার পুরো ফায়দা লুটেছেন রুবেল। নিজের করা তৃতীয় ওভারেই চোট কাটিয়ে সিরিজে প্রথম খেলতে নামা অভিজ্ঞ রস টেইলরকে ফেরালেন। যদিও আউট হওয়ার দুই বল আগে মিড অনে টেইলরের সহজ ক্যাচ ফেলেন মুস্তাফিজ। ১ বল পরেই মুশফিকের ক্যাচে পরিণত করে তাকে ৭ রানেই আঁটকান রুবেল। নিউজিল্যান্ড পরিণত হয় বিনা উইকেটে ৪৪ থেকে ৫৭ রানে তিন উইকেটে।

পরের গল্পটা কেবল ডেভন কনওয়ে ও ড্যারিল মিচেলের। শুরুটা অবশ্য কনওয়ের, অধিনায়ক ল্যাথামকে (১৮) নিয়ে বিপর্যয় কাটানো ৬৩ রানের জুটি। ল্যাথামের বিদায়ের পর মিচেলকে নিয়ে ১৫৯ রানের জুটিতে দলের বড় সংগ্রহ নিশ্চিতের পাশাপাশি তুলে নেন নিজের প্রথম ওয়ানডে সেঞ্চুরি। রোমাঞ্চকর সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন মিচেলও। আগের ম্যাচে প্রথমবার ওয়ানডেতে ব্যাটিং করতে নেমে ৭৬ রানে আউট হওয়া কনওয়ে আজ আর আক্ষেপে পুড়েননি।

৫২ বলে ফিফটি ছোঁয়া কনওয়ে সেঞ্চুরিতে পোঁছান ৯৫ বলে। ক্যারিয়ারে দ্বিতীয়বার ওয়ানডেতে ব্যাটিং করতে নেমেই পেলেন সেঞ্চুরির দেখা। শেষ পর্যন্ত মুস্তাফিজের বলে আফিফ হোসেনকে ক্যাচ দিয়ে ফিরেছেন ১১০ বলে ১৭ চারে সাজানো ১২৬ রানের ইনিংস খেলে। অবশ্য তাসকিনের করা ৪৫ তম ওভারে শর্ট ফাইন লেগে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ক্যাচ না ছাড়লে ফিরতেন ১০৫ রানেই।

কনওয়ের পর রুবেল দ্রুতই ফেরান জিমি নিশামকে (৪)। কিন্তু ততক্ষে তান্ডব শুরু করেন মিচেল। ৬৩ বলে ফিফটিতে পৌঁছানো মিচেল সেঞ্চুরি ছুঁয়েছেন রোমাঞ্চ ছড়িয়ে। মুস্তাফিজের করা শেষ ওভারে যখন স্ট্রাইকে তখন তার রান ৮৬ বলে ৮৩। টানা তিন বলে মুস্তাফিজকে চার মেরে পৌঁছান ৯৫ রানে। তৃতীয় বলটি নো হওয়াতে পরের বল ছিল ফ্রি হিট, লং অফে ঠেলে দিয়ে নিয়েছেন দুইরান। চতুর্থ বলে নিলেন সিঙ্গেল, পৌঁছালেন ৯৮ রানে। পঞ্চম বলে মিচেল স্যান্টনার দ্রুত গতিতে নিলেন তিন রান।

ফলে শেষ বলে স্ট্রাইকে থাকা মিচেলের সেঞ্চুরির জন্য প্রয়োজন দুই রান। দারুণভাবে প্রান্ত বদল করে ক্যারিয়ারের তৃতীয় ম্যাচেই পেয়ে গেলেন সেঞ্চুরির দেখা। অবশ্য দ্বিতীয়বার প্রান্ত বদলে রান আউটের সুযোগ থাকলেও বল রিসিভ করতে দেরি করা মুশফিকেরও অবদান আছে তার সেঞ্চুরিতে। শেষ পর্যন্ত ৯২ বলে ৯ চার ২ ছক্কায় অপরাজিত ১০০ রানে।

৭০ রান খরচায় সর্বোচ্চ ৩ উইকেট রুবেলের। ৫২ রান খরচায় এক উইকেট নেওয়া তাসকিন কতটা ভালো করেছেন তা অবশ্য বোলিং ফিগার দিয়ে বোঝানো অসম্ভব। ৮৭ রান দিয়ে এক উইকেট নেওয়া মুস্তাফিজ সবচেয়ে খরুচে বোলার।

লক্ষ্য তাড়ায় নেমে কিউই পেসার ম্যাট হেনরির তোপে বাংলাদেশ টপ অর্ডার বিধ্বস্ত হয় ইনিংসের প্রথম ৭ ওভারেই। একে একে ফেরান দুই ওপেনার তামিম ইকবাল , লিটন দাসের সাথে সৌম্য সরকারকে। তামিম (১), সৌম্য (১) দুই অঙ্ক ছুঁতে না পারলেও ২১ রান করা লিটন ছিলেন ছন্দে, তবে তাকে ফিরতে হয়েছে ট্রেন বোল্টের অবিশ্বাস্য এক ক্যাচে। হেনরির করা শর্ট অব লেংথের বলকে পুল করার চেষ্টা লিটনের, ব্যাটে-বলে সংযোগ ঠিকঠাক না হওয়াতে বল গেল থার্ড ম্যান অঞ্চলে।

বেশ খানিকটা দূর থেকে দৌড়ে এসে এক হাতে নেওয়া বোল্টের ক্যাচ নেওয়াটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়েছে খোদ বোলার হেনরির। ২৬ রানে তিন উইকেট হারানো বাংলাদেশ ম্যাচে ফেরাতো দূরের কথা ১০২ রান তুলতেই হারায় ৮ উইকেট। জিমি নিশামের মাঝের ঝড়ে ব্যর্থ হয়েছেন আগের ম্যাচে দারুণ এক ইনিংস খেলা মোহাম্মদ মিঠুন (৬), মেহেদী হাসান মিরাজ (০), শেখ মেহেদী হাসানরা (৩)। মুশফিকুর রহিমের ৪৪ বলে ২১ রান দীর্ঘায়িত করেছে ইনিংস।

তবে শেষদিকে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ যেন দলের বাকিদের দেখানোর চেষ্টা করলেন কিভাবে ব্যাট করতে হয়। যদিও তার হার না মানা ফিফটিতেও ফলাফলে প্রভাব পড়েনি এটুকুও। লেজের ব্যাটসম্যানদের নিয়ে খেলেছেন অসাধারণ বিনোদন জুগানো এক ইনিংস। তাসকিনকে (৯) নিয়ে ৮ম উইকেটে ২০ ও রুবেলকে (৪) নিয়ে ৯ম উইকেট জুটিতে যোগ করেন ৫২ রান। কিন্তু শেষ উইকেট জুটিতে মুস্তাফিজ ২ বলের বেশি না টিকাতে সেঞ্চুরির সুযোগ হাতছাড়া হয় রিয়াদের।

৬৪ বলে ফিফিটি তুলে নেওয়া রিয়াদ অপরাজিত ছিলেন ৭৩ বলে ৬ চার ৪ ছক্কায় ৭৬ রানে। কিউইদের হয়ে ২৭ রানে সর্বোচ্চ ৫ উইকেট নেন জিমি নিশাম। ম্যাট হেনরির শিকার ২৭ রানে ৪ উইকেট, কাইল জেমিসনের ভাগে একটি উইকেট।

সংক্ষিপ্ত স্কোরঃ

নিউজিল্যান্ড ৩১৮/৬ (৫০), গাপটিল ২৬, নিকোলস ১৮, কনওয়ে ১২৬, টেইলর ৭, ল্যাথাম ১৮, মিচেল ১০০*, নিশাম ৪, স্যান্টনার ৩*; তাসকিন ১০-১-৫২-১, সৌম্য ৮-০-৩৭-১, রুবেল ১০-১-৭০-৩, মুস্তাফিজ ১০-০-৮৭-১।

বাংলাদেশ ১৫৪/১০ (৪২.), তামিম ১, লিটন ২১, সৌম্য ১, মিঠুন ৬, মুশফিক ২১, মাহমুদউল্লাহ ৭৬*, মিরাজ ০, মেহেদী ৩, তাসকিন ৯, রুবেল ৪, মুস্তাফিজ ০; হেনরি ১০-২-২৭-৪, জেমিসন ৮-০-৩০-১, নিশাম ৭.৪-১-২৭-৫

ফলাফলঃ নিউজিল্যান্ড ম্যাচে ১৬৪ রানে জয়ী, ৩-০ ব্যবধানে সিরিজ জয়ী

ম্যাচসেরা ও সিরিজসেরাঃ ডেভন কনওয়ে (নিউজিল্যান্ড)।

৯৭ প্রতিবেদক

Read Previous

শুরুর ধাক্কা সামলে নিউজিল্যান্ডের রানের পাহাড়

Read Next

হোয়াইটওয়াশ হল দল, অধিনায়ক তামিমের সহজ স্বীকারোক্তি

Total
15
Share