‘আমি কিন্তু এই বয়সে একজন বাচ্চার সাথে পারবো না’

মোহাম্মদ রফিক খালেদ মাহমুদ সুজন

বয়স ৫০ পেরিয়েছে, পেশাদার ক্রিকেটকে বিদায় বলেছেন এক যুগ আগে। পেশাদার ক্রিকেটকে ছুটি বললেও বিনোদনমূলক ক্রিকেটে এখনো দেখা মেলে বাংলাদেশের কিংবদন্তী স্পিনার মোহাম্মদ রফিকের। বল হাতে মায়াবী স্পিনে ঘায়েল করার মন্ত্র ভুলেননি এখনো, ব্যাট হাতে ধুম ধাড়াক্কা শটও আগের মত। সাবেকদের নিয়ে আয়োজিত লেজেন্ডস চ্যাম্পিয়ন ট্রফিতে কক্সবাজার শেখ কামাল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ব্যাটে-বলে রফিক ছিলেন দুর্দান্ত।

ফাইনালে তার দল একমি স্ট্রাইকার্সকে চ্যাম্পিয়ন করার পথে তুলে নেন পাঁচ উইকেট। ৭০ বলের ফরম্যাটে যা অনন্য কীর্তিই বলা চলে। হাঁটি হাঁটি পা পা করে বাংলাদেশ ক্রিকেটের উত্থানের দিনগুলোতে আবির্ভাব রফিকদের। কিছু পেতে নয়, বরং দু হাত ভরে দিতেই যেন ক্রিকেট বিধাতা এমন মাটির মানুষদের পাঠায়।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের কিছুই ছিলনা যুগ পেরিয়ে সাকিব আল হাসানের মত বিশ্ব তারকার আলোর ঝলকানি পড়ার মত সময়টাও পেরিয়ে যাচ্ছে। বদলে গেছে দেশের ক্রিকেটের ইট, পাথর ব্যস্ত ক্রিকেটীয় সূচিতে ধুলো জমার সুযোগ কমই আসে। তবে ধুলো না জমলেও স্মৃতির আয়নায় ঠিকই পুরোনো কিছু দিন, পুরোনো কিছু মুখ বারবার ভেসে আসবে।

মোহাম্মদ রফিক নিশ্চিতভাবেই তাদেরই একজন। ক্যারিয়ারের বেশিরভাগ সময় টেস্টে প্রতিপক্ষকে দ্বিতীয় ইনিংসে বল করতে পারেননি। পাঁচ দিনের ম্যাচ দল তিনদিনেই হেরে বসতো বলে বেশিরভাগ সময় চতুর্থ কিংবা পঞ্চম দিনের উইকেট থেকে স্পিনার হিসেবে বিশেষ কোন সুবিধা আদায় করতে পারেননি।

তবে সব ছাপিয়ে ৩৩ টেস্টে মাত্র ৪৮ ইনিংস বল হাতে নিয়েও প্রথম বাংলাদেশি বোলার হিসেবে ১০০ টেস্ট উইকেট শিকার করেন। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে বিদায়ী ম্যাচেও বল করতে পারেননি এক ইনিংসের বেশি। ভাগ্যক্রমে ঐ ইনিংসেই মার্ক বাউচার ও রবিন পিটারসেনকে আউট করে পূর্ণ করেন ১০০ টেস্ট উইকেট।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় বলার এক যুগ পর এসেও বল হাতে ঘুর্ণি কারিশমা যেন আগের মতই। লেজেন্ডস চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ম্যান অব দ্য ফাইনাল ও টুর্নামেন্ট সেরার পুরষ্কার জিতেছেন ব্যাটে বলে পারফর্ম করে। ৭৫ রানের পাশাপাশি টুর্নামেন্টে উইকেট নিয়েছেন ৮ টি। ৭০ বলের টেন ডট টেন ফরম্যাটের ফাইনালে পাঁচ উইকেট নেওয়া রফিক জানালেন নিয়মিতই খেলেন বিনোদনমূলক ক্রিকেট। পরের টুর্নামেন্টে পাঁচ উইকেট নিয়ে কে তার পাশে বসে সেটা দেখতেও মুখিয়ে আছেন।

কক্সবাজারে ফাইনাল শেষে গত ২০ ফেব্রুয়ারি উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, ‘অনেক জায়গায় এ ধরণের টুর্নামেন্ট খেলছি, প্রচুর ফ্রাই ডে ক্রিকেটও খেলি। এ বছরও করোনার মাঝ থেকে করোনার পর মিলয়ে ৫ টি টুর্নামেন্ট খেলেছি। আমরা তো ওরকম কাজ করিনা। দেখা যায় আসি, হাত ঘুরাই, খেলি, ফান করি। অবশ্যই ভালো লাগে। ১০ ওভারের খেলায় বল করে পাঁচ উইকেট। অন্য কেউ পেয়েছে কিনা আমি জানিনা। হতে পারে এটা একটা ইতিহাস। সুতরাং এটা পরের টুর্নামেন্টে কে ভাঙে সেটাই দেখার বিষয়।’

ব্যাটসম্যানের দুর্বল জায়গা বের করে বল করেই এখনো সাফল্য পান বলে জানান এই টাইগার কিংবদন্তী, ‘যাকেই আমি বল করি আগে আমি তার দুর্বল পয়েন্ট চিন্তা করি। ঐ দুর্বল পয়েন্টের ভেতরেই বল করার চেষ্টা করি। দেখা যাচ্ছে ঐ ফাঁদে ব্যাটসম্যান পা দিল। এটা মানসিকতার ব্যাপার। আমার যে বয়স আমি কিন্তু এই বয়সে একজন বাচ্চার সাথে পারবো না। আমার খেলোয়াড়ি জীবনের অভিজ্ঞতাটা ব্যবহার করি।’

‘বাসায় ফিরে কিন্তু ব্যাট বল আর ধরেও দেখিনা। সত্যি কথা বলতে কি আমি যখন মাঠে নামি তখন মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকি যে আমি একজন পেশাদার ক্রিকেটার। আমি কখনো চিন্তা করিনা যে আমার বয়স হয়ে গেছে, ওর সাথে আমি পারবোনা। তবে তার সাথে কিভাবে প্রতিদ্বদ্বিতা করা যায় সেই মানসিকতা আমার থাকে। ওটাই দেখা যায় কাজে দিচ্ছে।’

বাংলাদেশের সর্বশেষ টেস্ট সিরিজ নিয়ে নিজের অভিমত জানাতে গিয়ে ২২৬ আন্তর্জাতিক উইকেটের মালিক বলেন, ‘কোন জিনিসই যদি ভালোভাবে না করেন আপনি জিততে পারবেন না। সমর্থক হিসেবে আমার মনে হয়েছে ওরা (বাংলাদেশ) জেতার আগেই জিতে গেছে। চট্টগ্রামে হেরে যাওয়ার পর ব্যাক করা কঠিন ছিল। হতে পারে ঢাকায় ফিরে ওরা কামব্যাক করবে বলে আশাবাদী ছিল। কিন্তু সিরিজের প্রথম ম্যাচ হারের পর জিনিসটা কঠিন। ম্যানেজমেন্টের একটা চাপ, মিডিয়া ও সমর্থকদের চাপও ছিল। এখানে সব পেশাদার ক্রিকেটার খেলে। যেটা চলে গেছে সেটা ভুলে যাওয়া উচিত।’

মোহাম্মদ রফিকদের সময়টা বাংলাদেশের স্পিন বিভাগের সোনালী যুগ ছিল। তারা থাকাকীলনই আবির্ভাব হয় সাকিব আল হাসান, আব্দুর রাজ্জাকদের মত স্পিনারদের। ফলে রফিকদের বিদায়ের পর কারা সামলাবে পরবর্তী সময় তার একটা প্রতিচ্ছবি তৈরি হয়েই ছিল। বর্তমানে যার ঘাটতি দেখেন রফিক, যা ভবিষ্যতের জন্যও আশনি সংকেত।

কিংবদন্তী এই বাঁহাতি স্পিনারের মতে, ‘সাকিব আল হাসান ও আব্দুর রাজ্জাক বা অন্যরা যাদের নির্বাচকরা তখন নিয়ে আসে এটা কিন্তু আমার হাত ধরেই এসেছে। নির্বাচকরাই বলতো রফিক এটা সাকিব, এটা রাজ্জাক, এদের দেখাও, শেখাও। আমিও তাদের নিয়ে প্র্যাকটিস করতাম যে এটা এভাবে কর ওভাবে কর। সবচেয়ে বড় কথা ওদের কাছ থেকেও আমি অনেক কিছু শিখতে পারি, ওরা আমার কাছ থেকে।’

‘শেখার কোন শেষ নেই। সুতরাং আজকে এদের দিয়েছি কিন্তু এদের পরে কে আসবে? এ ধরণের প্লেয়ার কিন্তু এখন তৈরি হচ্ছে না। এখ যদি তৈরি নাহয় আর এই জায়গাটায় গ্যাপ পড়ে সেটা সত্যি কথা বাংলাদেশ ক্রিকেটেই গ্যাপ তৈরি করবে।’

কক্সবাজারে সাবেকদের মিলনমেলায় এক ঝাঁক ভক্ত সমর্থক গ্যালারি থেকে ‘রফিক রফিক’ বলে স্লোগান দিচ্ছিল। ফাইনাল ম্যাচ জুড়েই ছিল তাদের এমন ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। চ্যাম্পিয়ন হওয়া ম্যাচ শেষে রফিক জানিয়েছেন তার মহল্লার ছেলেরাই তার খেলা দেখতে ছুটে আসে কক্সবাজার। মানুষের এমন ভালোবাসার জন্য কৃতজ্ঞ রফিক মনে করেন দেশের জন্য কিছু হলেও করতে পেরেছেন বলেই মানুষ তাকে এমন ভালোবাসা দেয়।

রফিক বলেন, ‘যারা এসেছে তারা আমার মহল্লার। ওরা ঘোরার জন্য আসেনি শুধু খেলা খেলা দেখতে আসছে। বাংলাদেশের মানুষ আসলে পছন্দ করে যে রফিক ভালো ক্রিকেট খেলেছে। হয়তো সে রকম ক্রিকেট উপহার দিতে পেরেছি বলে মানুষ ভালোবাসে। দেশকে কিছু দিয়েছি বলে দেশের মানুষ পছন্দ করে।’

৯৭ প্রতিবেদক

Read Previous

রাজস্থানের ‘অন্যরকম’ কোচিং স্টাফ

Read Next

শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটকে নতুন রূপ দিতে নতুন ভূমিকায় টম মুডি

Total
2
Share