অ্যান্ডি রবার্টসকে এখনো মনে পড়ে তালহা জুবায়েরের

তালহা জুবায়ের

বাংলা গানের কিংবদন্তী শিল্পী প্রয়াত অ্যান্ড্রু কিশোর গেয়েছিলেন, ‘তুমি হাজার ফুলে মাঝে একটি গোলাপ, হাজার তারার মাঝে একটি চাঁদ’। তবে ২০০১ সালে বাংলাদেশের উঠতি পেসারদের নিয়ে কাজ করতে এসে এক ঝাঁক প্রতিভাবানের মধ্য থেকে অ্যান্ডি রবার্টস বেছে নেন দুইটি গোলাপ। ‘এরা বিশেষ প্রতিভাবান, এদের খেয়াল রেখ’ বলে যান ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাবেক এই পেসার। ঐ দুই গোলাপের একজন মাশরাফি বিন মর্তুজা, অন্যজন তালহা জুবায়ের।

বাংলাদেশের মত বিরুদ্ধ পেস বোলিং কন্ডিশনে জাত পেসার উঠে আসতে পারে এই ভাবনার বীজটা প্রথম বুনেছেন এই দুজনই। গতির ঝড়ে টালমাটাল করার সামর্থ্য নিয়েই আবির্ভাব। দুজনের ক্যারিয়ারই জর্জরিত চোটে। চোটকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শুধু খেলে যাওয়া নয়, বাংলাদেশের পেসারদের আদর্শ বনে যাওয়ার মত সাফল্য পেয়েছেন মাশরাফি। তবে এই চোট আর বোর্ডের অযত্নে অঙ্কুরেই বিনষ্ট তালহা। বোর্ডের অযত্ন শব্দটা অবশ্য শুরুর দিকে মাশরাফির সাথেও জড়িয়ে ছিল।

গতির জন্য বাংলাদেশ ক্রিকেটে প্রথম সুনাম কুড়ান তালহা, মাশরাফি। মাশরাফির চাইতে তালহার গতি বেশি ছিল বলেও জানা যায়। নিয়মিত ১৪০ এর আশে পাশে করতে পারতেন বল, যা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যেন স্বপ্নের চেয়েও বেশি কিছু। সাথে ইনসুইংটা ছিল দুর্দান্ত।

মাত্র ১৬ বছর বয়সে ২০০২ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্ট অভিষেক। যে ম্যাচে এক ইনিংস বল করার সুযোগ পেয়ে শুরুতেই ফেরান মারভান আত্তাপাতু ও মাহেলা জয়াবর্ধনের মত ব্যাটসম্যানকে। ঐ বছর টেস্ট খেলেছেন আরও পাঁচটি। একই বছর অভিষেক ওয়ানডেতেও। ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে শিকার ৪ উইকেট। জায়গা পান ২০০৩ বিশ্বকাপেও, খেলেছেন দুইটি ম্যাচ।

ততদিনে চোট তার নিত্যসঙ্গী হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) কিশোর তালহাকে সামলাতে পারেনি, সঠিক পরিচর্যা করতে পারেনি। যা তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকে থামিয়ে দেয় দুই বছরেই। লম্বা বিরতির পর চোট কাটিয়ে ফেরা তালহাকে ২০০৪ সালে ভারতের বিপক্ষে চট্টগ্রাম টেস্টে নামানো হয়। ঐ ম্যাচে উইকেট শূন্য থাকা এই পেসার জাতীয় দলে আর সুযোগ পাননি। এক ম্যাচের পারফরম্যান্স দেখে তাকে বাদ দেওয়া নিয়েও আছে আক্ষেপ।

মাত্র ৭ টেস্ট ও ৬ ওয়ানডে খেলেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বঞ্চিত হলেও ঘরোয়া ক্রিকেট খেলে গেছেন ২০১৪ সাল পর্যন্ত। ৭৩ প্রথম শ্রেণির ম্যাচে তার ঝুলিতে ২২২ উইকেট। ৩৫ বছর বয়সী তালহা বনে গেছেন কোচ, কাজ করছেন বয়সভিত্তিক পর্যায়ে। পেশাদার ক্রিকেটকে বিদায় বললেও অ্যামেচার ক্রিকেটে কালে ভদ্রে দেখা মিলে এই ডানহাতিকে। সম্প্রতি কক্সবাজারে শেষ হওয়া সাবেক ক্রিকেটারদের লেজেন্ডস চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতেও খেলেছেন। আর সেখানেই কথা বলেছেন নিজের ক্যারিয়ার, ভবিষ্যত পেসার ও অ্যান্ডি রবার্টসের পুরোনো স্মৃতি নিয়ে।

এখনো সাবেক ক্যারিবিয়ান পেসার অ্যান্ডি রবার্টসকে মনে পড়ে উল্লেখ করে তালহা বলেন, ‘অ্যান্ডি রবার্টসকে অবশ্যই মনে পড়ে। আমার জীবনের শুরুটা ওখান থেকেই। ঐ ক্যাম্পের পর ও আমার আর মাশরাফির কথাই বলে গিয়েছিল। আমাদের দুজনের দিকে খেয়াল রাখার জন্য। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমার হয়নি, মাশরাফির হয়েছে। আমার ইনজুরিগুলো সাপোর্ট করেনি আমাকে। ওই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে অনেক কষ্ট লাগে।’

পেসারদের চোটের পেছনে অ্যাকশনই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। ক্যারিয়ারের এক পর্যায়ে ভারতের এমআরএফ ফাউন্ডেশনে গিয়ে অ্যাকশন শুধরে নেন মাশরাফিও। তবে তালহা জুবায়ের সে পথে যাওয়ার আগেই বাতিলের তালিকায় পড়ে যান। নিজের চোটের জন্য মিশ্র অ্যাকশনকে দায়ী করছেন ৩৫ বছর বয়সী সাবেক এই পেসার, অভিযোগ আছে সঠিক পরিচর্যার অভাবের।

তালহা বলেন, ‘অবশ্যই অ্যাকশনের সমস্যাই ছিল। আমার মিক্সড অ্যাকশন ছিল। কিন্তু আমার এই ইনজুরি নিয়ে যারা দায়িত্বে ছিলেন তাদের কাছ থেকে সাহায্যটা পাইনি, ট্রিটমেন্ট বা গাইডলাইন। নিজের খরচেই করিয়েছি। কিন্তু ওটাও যথেষ্ট ছিল না।’

দেশের ক্রিকেটে পেসারদের উন্নতিতে পেস সহায়ক উইকেট তৈরির অভ্যাসকে গুরুত্ব দিচ্ছেন তালহা জুবায়ের, ‘আপনি যদি উইকেট না দেন তাহলে আমরা কোথায় বোলিং করবো। এত ফ্ল্যাট উইকেটে খেললে আসলে ঐ গতিটা থাকেনা, বডিও সাহায্য করেনা। পেস বোলিং কিন্তু অনেক কষ্টের ব্যাপার। এত দূর থেকে দৌড়ে আসবেন কিন্তু আপনি দেখবেন ফলাফল হল হাঁটুর উপরে বল উঠছেনা। উইকেট কিপার পর্যন্ত বল পৌছাচ্ছে না। এটা দেখে ডিমোরালাইজড হয়ে যায় বোলাররা। রিদমটাও নষ্ট হয়ে যায়।’

‘আমি দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে দেড় মাসের ট্যুর শেষে দেশে ফিরে আবাহনী মাঠে টানা অনেকদিন উইকেট কিপারকে ৩০ গজের মধ্যে রেখে বল করেছি। কিন্তু এটা যত সময় গেছে রিদম নষ্ট হতে হতে কিপার আবার ১৫ গজের মধ্যে চলে এসেছে। আমি বলছিনা দক্ষিণ আফ্রিকার মত উইকেট বানানোর। কিন্তু অন্তত পেস বোলারদের বলটা যেন ক্যারি করে। তাতে ভালো বল হবে, ব্যাটসম্যানকেও কোয়ালিটি বল বেশি ফেস করতে হবে। এখন স্পিনে ভালো, তখন পেসেও ভালো হবে।’

বর্তমানে যুব দলের পেসারদের নিয়ে কাজ করা সাবেক এই পেসার আশাবাদী কয়েকজনের ব্যাপারে, ‘গত অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে যারা ছিল শরিফুল (ইসলাম), সাকিব (তানজিম হাসান) ছিল। মৃত্যুঞ্জয়ও ছিল যদিও সে ইনজুরিতে থাকায় খেলতে পারেনি। আমাদের ভবিষ্যতের জন্য ভালো একজন খেলোয়াড় হবে। ওর যে সামর্থ্য, ক্যালিবার আশা করি ও ভালোভাবে কামব্যাক করবে। বাংলাদেশকে ভালো সাপোর্ট দিতে পারবে। এবারের বিশ্বকাপ দলে আগেই আমি বলতে চাইনা, তারপরেও এই দলে বেশ কিছু তরুণ পেসার আছে। যারা আমাদেরকে ভালো একটা কিছু উপহার দিতে পারবে।’

পেশাদার ক্রিকেটকে বিদায় বললেও সাবেকদের মিলন মেলায় পরিণত হওয়া টুর্নামেন্টগুলোতে বল হাতে দেখা যায় ডানহাতি এই পেসারকে। সদ্য সমাপ্ত লেজেন্ডস চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে খেলেছেন এক্সপো রেইডার্সের হয়ে। মজার ছলে টুর্নামেন্ট হলেও মাঠের ক্রিকেটে ছিল উত্তাপ। এত বছর পর এসেও বল হাতে নিলে পুরোনো তালহা জুবায়েরকেই খুঁজে পান নিজে। যদিও আগের মত ব্যাটসম্যানরা আর ভয় পায়না। তবে মনের সাথে শরীরের পার্থক্যটা ঠিকই টের পান বল করতে গেলে। নতুন বলে দুই একবার সুইং করাতে পারলেও সেটি ধারাবাহিক হয়না।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের আক্ষেপের নাম হয়ে থাকা তালহা বলেন, ‘ফান তো অবশ্যই। তবে যখন খেলতে নামি তখন এসব মনে থাকেনা। (ব্যাটসম্যানকে ভয় পাওয়ানো) এখনতো সম্ভব না (হাসি)। এখনতো ঐ পেস নাই, রান আপেও রেস্ট্রিকশন আছে। আর ঐ বয়সটাতো আসলে নাই। হয়না আসলে, একটা দুইটা বল নতুন বলে হয় কিন্তু তারপর সেটা কন্টিনিউ হয়না। আমি কিন্তু ব্যাটসম্যানের সাথে খুব চিল্লাচিল্লি করছিলাম। কারণ ও আমাকে প্রথম বলে একটা ছক্কা মেরেছে। আমার মাথা তখনই গরম হয়ে গেছে। নের ভেতরেতো ঐ জেদটা আছে। কিন্তু যখন বল করতে যাই সেটাতো আর যায়না।’

নাজমুল হাসান তারেক

Read Previous

বাংলাদেশের আতিথেয়তায় মুগ্ধ ওয়েস্ট ইন্ডিজ

Read Next

রাজস্থানের ‘অন্যরকম’ কোচিং স্টাফ

Total
14
Share