অন্ধকার জীবনের অলিগলি পেরিয়ে কাজী অনিক দিচ্ছেন বন্ধু চেনার বার্তা

কাজী অনিক

কথায় আছে সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ। দারুণ আগ্রাসণ, গতি আর লাইন লেংথ নিয়ে বয়সভিত্তিক থেকেই নজরে পড়া পেসার কাজী অনিকের সাথে হয়েছে এমন কিছুই। বয়স ২০ ছোঁয়ার আগেই খেলেছেন জাতীয় লিগ, ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ, বিপিএলের মত টুর্নামেন্ট। যুব দলের হয়ে পারফর্ম করেতো আলাদা করেই আলোচনায় ছিলেন। তবে ক্রিকেটের বাইরের বন্ধুদের আড্ডায় পড়ে ক্যারিয়ারের শুরুতেই পেয়েছেন বড় এক ধাক্কা।

জাতীয় লিগের ম্যাচ চলাকালীন ডোপ টেস্টে পজিটিভ হয়ে নিষিদ্ধ হয়েছেন দুই বছর। গত ৭ ফেব্রুয়ারি নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়া ২১ বছর বয়সী এই পেসারের চিন্তা ধারায় এসেছে আমূল পরিবর্তন। নিষেধাজ্ঞার সময়ে জীবন নিয়ে অনুধাবন, দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানো মানুষ, নিজের ক্যারিয়ার ভাবনা নিয়ে বাঁহাতি এই পেসার কথা বলেছেন ‘ক্রিকেট৯৭’ এর সাথে। নিচে পাঠকদের জন্য তা তুলে ধরা হল-

ক্রিকেট৯৭: দুই বছর ক্রিকেটীয় কার্যক্রম থেকে দূরে থাকা, এখন মুক্ত হলেন। অনুভূতিটা কেমন?

কাজী অনিক: সবার আগে বলবো যে আমি অনেক অনেক খুশি। কারণ একজন পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে আমি যখন বাসায় দুইদিন বিশ্রাম নেই তখনই মনে হয় দম বন্ধ হয়ে যাবে। এই দুইটা বছর আমার যে কিভাবে গেছে সেটা বলে বোঝানো যাবেনা। যাইহোক যেটা চলে গেছে সেটা গেছে। মুক্ত হওয়ার আনন্দটা ভাষায় প্রকাশ করার মত না।

ক্রিকেট৯৭: নিষেধাজ্ঞার সময়টা নিজেকে কিভাবে প্রস্তুত করেছেন?

কাজী অনিক: আমি ক্রিকেটের সাথেই যুক্ত ছিলাম, হয়তো কোন জায়গায় আমাকে অংশ নিতে দেয়নি কিন্তু আমি ক্রিকেটের সাথেই ছিলাম। ওখানে লেখাই ছিল আমি বোর্ডের অধীন কারও সাথেই অনুশীলন করতে পারবোনা। একা একা করতে হবে। আমি নিজে নিজেই অনুশীলন করেছি। একা ছিলাম, তবে ক্রিকেট নিয়েই ছিলাম।

ক্রিকেট৯৭: ডোপ কেলেঙ্কারির মত একটা স্পর্শকাতর বিষয়ে জড়িয়ে নিষিদ্ধ হওয়া, এই সময়টায় নিজের ব্যক্তিগত অনুধাবন কি?

কাজী অনিক: একজন ক্রিকেটার হিসেবে আমার কিছু জায়গায় ঘাটতি ছিল। বিশেষ করে আমি আমার বন্ধুদের নিয়ে খুব বেশি সময় কাটাতাম। পরে দেখলাম আমি যখন কোন বিপদে পড়ে গেছি আমার বন্ধু বান্ধবের কেউ আসেনি। অথচ যখন আমি ভালো একটা ছন্দে ছিলাম, আমার বাসার নিচে এসে দাঁড়িয়ে থাকতো, যে বন্ধু আসো একটূ আড্ডা দিই। যখন আমি নিষেধাজ্ঞায় পড়ি, একমাত্র সুজন (খালেদ মাহমুদ) স্যার আমাকে সবদিক দিয়ে সাহায্য করেছে।

আর্থিক সমস্যায় ছিলাম, এর বাইরে সব ধরণের বিষয়েই উনি সাহায্য করেছেন। আমি যখন এ জিনিসটা দেখতে পেলাম তখন থেকে আমার জীবনে ক্রিকেটের বাইরে বন্ধু কি জিনিস সেটা ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করছি। ওদের কাছ থেকে কোন সাহায্য পাইনি। এরপর থেকে সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে আমার বাবা-মা, আমার পরিবার ও ক্রিকেট নিয়েই থাকবো। আমার ক্রিকেটার বন্ধুরা কিন্তু খবর নিয়েছে আমি কি করছি, অনুশীলন করছি কিনা?

ক্রিকেট৯৭: জীবন থেকে পাওয়া এই শিক্ষার বাকিদের জন্য কি বার্তা দিতে চান?

কাজী অনিক: আমি সংক্ষেপে একটা বার্তা দিতে চাই। ভালো ক্রিকেটারের আগে ভালো মানুষও হতে হবে। ভালো বন্ধুবান্ধবের সাথে যেন চলাফেরা করে। তাহলে ভালো কিছু অন্তত শিখতে পারবে। আমার দিক থেকে মনে হয় ক্রিকেটারের বন্ধু ক্রিকেটারই হওয়া উচিত। কারণ একজন ক্রিকেটারই আরেকজন ক্রিকেটারের কষ্টটা বুঝবে। খারাপ সময়ে ক্রিকেটার বন্ধু ছাড়া অন্য কেউ উৎসাহ জোগাতে পারবে না।

ক্রিকেট৯৭: নিষিদ্ধ হওয়ার আগে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জাতীয় দলের আগের সব ধাপেই খেলে ফেলেছিলেন। দুই বছর পর এসে নিজেকে কোন অবস্থায় দেখছেন?

কাজী অনিক: আগেই যেটা বললাম যে সবাই হয়তো ভাবছে আমার বিরতি পড়েছে, কিন্তু আমি আসলে ক্রিকেটের সাথেই ছিলাম। হয়তো কোন টুর্নামেন্ট খেলিনি, বিসিবির কার্যক্রম থেকে বাইরে ছিলাম। তবে প্রতিনিয়ত নিজে নিজে অনুশীলন করেছি। বলতে পারি নিজেকে নিজে ভালো একটা সময় দিয়েছি। আল্লাহর রহমতে আমি মনে করি আমি একটা ভালো শেইপে আছি। আমার বিশ্বাস সামনে যদি কোন টুর্নামেন্টে সুযোগ পাই ইনশা আল্লাহ ভালো করবো।

ক্রিকেট৯৭: দুঃসময়ে খালেদ মাহমুদ সুজনের এগিয়ে আসার বিষয়টি যদি পরিষ্কার করতেন?

কাজী অনিক: এক মাস আগে আমি স্যারকে ফোন দিয়েছি যে আমার তো অনুশীলন করাটা জরুরি। একা একা তো করেছি, পুরোদমে অনুশীলনের জন্য আরকি। পরে স্যার রাজশাহীতে বাংলা ট্র্যাকে যেখানে উনি কোচিং করান, ওখানে সুযোগ করে দিয়েছেন। তো ওখানেই শেষ এক মাস অনুশীলন করেছি। স্যার তো ব্যস্ত থাকে, তবে যখনই এসেছে আমাকে অনুপ্রেরণা দিয়েছে, কথা বলেছে। আমার ভুল ছিল ভুলগুলো ধরিয়ে দিয়েছে যে তোর এগুলো করা উচিত হয়নি। আমি নিজে নিজেও অনুধাবন করলাম এসব।

ক্রিকেট৯৭: একদিকে নিষিদ্ধ, অন্যদিকে করোনার প্রভাব। আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়েও গিয়েছেন। জাতীয় দলের সিনিয়র ক্রিকেটাররা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন…

কাজী অনিক: করোনার সময়টাতে সবাই একটু সমস্যায় পড়েছিল। বিশেষ করে আমি খুব সমস্যায় পড়ে যাই। কোন খেলা ছিলনা, আমিও নিষিদ্ধ। সবচেয়ে বড় কথা আমার পুরো পরিবার আমার উপর নির্ভরশীল। আমি ক্রিকেট খেলে যা আয় করি তা দিয়েই আমার পরিবার চলে। আর আপনারাতো জানেন আমি বিয়ে করেছি, আল্লাহ রহমত করলে আগামী মাসে আমাদের প্রথম সন্তান ভূমিষ্ঠ হবে। সবমিলিয়ে আমি একটু সমস্যায় ছিলাম। কিছু সিনিয়র ক্রিকেটার যাদের সাথে আমার যোগাযোগ ছিল, এ ছাড়া সুজন স্যারকে ফোন দিয়েছি। উনারা সবাই আমাকে সাহায্য করেছে।

একদিন মুশফিক ভাই আমাকে ম্যাসেজ পাঠালো, যে আমি মুশফিক আমাকে কল কর। পরে কল দিলাম উনি বলল যে চিন্তা করিস না, আমি কিছুটা সাপোর্ট (আর্থিক) দিচ্ছি তুই ভালো করে অনুশীলন কর। রিয়াদ (মাহমুদউল্লাহ) ভাই, আমার বন্ধু আফিফ (আফিফ হোসেন ধ্রুব) সেও আমাকে বেশ সাহায্য করেছে। আফিফ তো আমার ভাইয়ের মত, লম্বা সময় ধরে এক সাথে খেলতেছি।

ক্রিকেট৯৭: বাংলাদেশের তরুণ ক্রিকেটাররা নিজেদের স্বপ্নের পরিধি সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখছে। সেখানে আপনি জানিয়েছেন লক্ষ্য পুরোদস্তুর অলরাউন্ডার হওয়া। হতে চান বিশ্বের এক নম্বর অলরাউন্ডার। এই আত্মবিশ্বাস আর সাহসিকতার পেছনে কারণ?

কাজী অনিক: আসলে কোচের পরে কিন্তু একজন ক্রিকেটার নিজে বুঝে যে আমি কোনটা হতে পারবো বা আমার সামর্থ্য কতটুকু। ছোটবেলা থেকেই আমার দুই সাইডই (ব্যাটিং, বোলিং) শক্তিশালি। আমাদের যুব দলের কোচ আব্দুল করিম জুয়েল স্যার আমার ব্যাটিং দেখে সরাসরিই বলেছে তুই বাংলাদেশের সেরা পেস বোলিং অলরাউন্ডার হতে পারবি যদি ব্যাটিংটা ঠিকমত চালিয়ে যেতে পারিস।

বয়সভিত্তিকে আমি মূলত ব্যাটসম্যানই ছিলাম। আর আমি ব্যাটিং করতেও উপভোগ করি। এমনকি কোন ম্যাচে ব্যাটিং খারাপ করে বোলিং ভালো করলেও মন খারাপ হত। আমি দুইটাই ভালো করতে চাই। আমার কাছে মনে হয় আমি পারবো। আফগানিস্তানের বিপক্ষে দুইটা ম্যাচ সেরার পুরষ্কারও জিতেছি অলরাউন্ড পারফর্ম করে। অনূর্ধ্ব-১৭ তে একটা সেঞ্চুরি আছে। আমি নিজে বিশ্বাস করি যে অনিক তোমার মধ্যে সামর্থ্য আছে, তুমি শুধু পরিশ্রম কর।

ক্রিকেট৯৭: যে গতি, আগ্রাসণ ও সামর্থ্য নিয়ে বয়সভিত্তিক থেকে খেলে আসছেন, বিশেষ করে ২০১৮ যুব বিশ্বকাপে ভারতের পৃথ্বী শ’কে যে বলে আউট করেছেন সেটা যে কারও স্বপ্নের ডেলিভারি। এখন নিজের বোলিংয়ে কোন দিকটা নিয়ে কাজ করছেন?

কাজী অনিক: হ্যা, এটা আমার এই ছোট্ট ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা একটা ডেলিভারি ছিল। বোলিং নিয়ে কাজ করতেছি ভোলা (আমিনুল ইসলাম ভোলা) স্যারের অধীনে। রাজশাহীতে সুজন স্যারের পরে উনি আরকি। আমার ইনসুইংটার উপরে জোর দিতেছে, ইয়র্কার নিয়ে কাজ করতেছি। স্যার বলছে গতি আপাতত ঠিক আছে, একটু পরিশ্রম কর সামনে আরও বাড়বে।

আমার ছোট বেলার কোচ তো জ্যাকি (মাহবুব আলি জ্যাকি) স্যার। কিন্তু উনাকে তো আমি পাচ্ছিনা, বিসিবির কোচ উনি। নিষেধাজ্ঞায় ছিলাম সাথে বিসিবির কোন প্রোগ্রাম ছাড়াতো উনাকে পাবোনা। সবমিলিয়ে এখন ভোলা স্যারের সাথেই কাজ চলছে। একটা সুযোগের অপেক্ষায়, আল্লাহ যেন আমাকে একটা সুযোগ দেয় জ্যাকি স্যারের সাথে কাজ করার। চেষ্টা করতেছি যে আমার মধ্যে যেন কোন ঘাটতি না থাকে। কোন নির্বাচক যেন বলতে না পারে যে আমার মধ্যে কোন ঘাটতি আছে।

নাজমুল হাসান তারেক

Read Previous

চেন্নাই টেস্টে জয়ের পথে এক পা দিয়ে রাখল ভারত

Read Next

সাকিবের ছুটি ‘একের ভেতর দুই’

Total
73
Share