বাংলাদেশকে মাটিতে নামিয়ে চট্টগ্রামে মহাকাব্য লিখলেন কাইল মায়ের্স

বাংলাদেশকে মাটিতে নামিয়ে চট্টগ্রামে মহাকাব্য লিখলেন কাইল মায়ের্স

টেস্ট ক্রিকেট মানেই রোমাঞ্চকর এক মঞ্চ, যেখানে এক সেশনেই বদলে যেতে পারে পুরো ম্যাচের দৃশ্যপট। চট্টগ্রাম টেস্টের প্রথম চারদিন চালকের আসনে থেকেও ক্যারিবিয়ান অভিষিক্ত কাইল মায়ের্সের ব্যাটে হারই সঙ্গী হল বাংলাদেশের। রেকর্ড গড়ে বাংলাদেশকে ৩ উইকেটে হারানোর দিনে বেশ কয়েকটি রেকর্ডে নাম লেখান কাইল মায়ের্স নিজেই।

বাংলাদেশের মাটিতে সর্বোচ্চ রান তাড়ার রেকর্ড ছিল নিউজিল্যান্ডের। ২০০৮ সালে জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে বাংলাদেশের দেওয়া ৩১৭ রান ৩ উইকেট হাতে রেখেই তাড়া করে কিউইরা। এবার একই মাঠে ৩৯৫ তাড়া করে রেকর্ডটি নতুন করে লিখলো খর্ব শক্তির দল নিয়ে বাংলাদেশে আসা ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এশিয়ার মাটিতেও যা সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জেতার রেকর্ড। এটি ওয়েস্ট ইন্ডিজের টেস্ট ইতিহাসেরই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান তাড়ার রেকর্ড। সবমিলিয়ে সর্বোচ্চ রান তাড়ার রেকর্ডটিও অবশ্য ওয়েস্ট ইন্ডিজেরই (৪১৮)।

 

View this post on Instagram

 

A post shared by cricket97 (@cricket97bd)

সাগরিকার ছলনাময়ী উইকেট পঞ্চম দিনে এসেও সহায়তা করেনি টাইগার স্পিনারদের। ব্যাটিং করার জন্য অপ্রত্যাশিতভাবে বেশ ভালো উইকেটই ছিল। তবে দিনের শুরুতে বেশ কিছু সুযোগ দিয়েও বেঁচে যান ক্যারিবিয়ান ব্যাটসম্যানরা। যে সুযোগ কাজে লাগিয়ে টানা দুই সেশন ও ৭৩.৪ ওভার উইকেটবিহীন রাখে টাইগার বোলারদের। ততক্ষণে জয়ের সাথে একগুচ্ছ রেকর্ডও নিশ্চিত হয় সফরকারীদের।

৩৯৫ রানের লক্ষ্য তাড়ায় নেমে চতুর্থ দিন শেষ সেশনে দ্রুতই তিন উইকেট হারানো ক্যারিবিয়ানদের পথ দেখান দুই অভিষিক্ত ব্যাটসম্যান কাইল মায়ের্স ও এনক্রুমাহ বোনার। ৫৯ রানে তিন উইকেট হারানো ওয়েস্ট ইন্ডিজকে আর কোন বিপদে না ফেলে অপরাজিত ছিলেন দুজনেই, অবিচ্ছেদ্য ছিলেন ৫১ রানের জুটি গড়ে।

আজ দিনের প্রথম সেশনে ক্যাচ মিস, রিভিউ না নেওয়ার কারণে হতাশায় পোড়া বাংলাদেশকে চা বিরতির আগে স্রেফ নিরব দর্শক বানিয়ে রাখলো এই দুই ব্যাটসম্যান। আগেরদিন জয়ের আভাস পাওয়া বাংলাদেশ পারলোণা ম্যাচই বাঁচাতে।

লাঞ্চের আগে মায়ের্স অপেক্ষায় ছিলেন সেঞ্চুরির (৯১*) বোনারের অপেক্ষা ছিল ফিফটির (৪৩*)। দুজনেই লাঞ্চের পর পেয়েছেন সেঞ্চুরি ও ফিফটি। ক্রিকেট ইতিহাসের ১০৯ তম ব্যাটসম্যান হিসেবে মায়ের্স অভিষেক ম্যাচে দেখা পেলেন সেঞ্চুরির ।

গত ১০ বছরে এই বাঁহাতিই ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে এই কীর্তি গড়লেন। ২০১১ সালে ভারতের বিপক্ষে অভিষেক ম্যাচেই সেঞ্চুরি হাঁকান ক্যারিবিয়ান ব্যাটসম্যান কারর এডওয়ার্ড, খেলেছেন ১১০ রানের ইনিংস।

১৭৮ বলে নিজের অভিষেক সেঞ্চুরি ছোঁয়ার মাধ্যমে মায়ের্স সবমিলিয়ে ৮ম ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের তৃতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে অভিষেক ম্যাচের চতুর্থ ইনিংসে সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন। তবে সেখানেই থেমে থাকেননি, গড়লেন অনন্য এক রেকর্ডও। টেস্ট অভিষেকে ৬ষ্ঠ ব্যাটসম্যান হিসেবে সেঞ্চুরিকে রূপ দিলেন ডাবল সেঞ্চুরিতে, যা চতুর্থ ইনিংসে প্রথম। অভিষেক ম্যাচে দুই ইনিংস মিলিয়ে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের তালিকাতেও মায়ের্সের অবস্থান চতুর্থ (২১০* ও ৪০)।

আরেক অভিষিক্ত বোনারকে নিয়ে গড়েন ২১৬ রানের জুটি। যে পথে দুজনে গড়েছেন চতুর্থ ইনিংসে দুই অভিষিক্ত ব্যাটসম্যানের সর্বোচ্চ জুটির রেকর্ড। আগের সর্বোচ্চ ছিল ১৩৪, বাংলাদেশের বিপক্ষে করাচি টেস্টে এই জুটি বাঁধেন দুই পাকিস্তানি অভিষিক্ত ব্যাটসম্যান মোহাম্মদ হাফিজ ও ইয়াসির হামিদ।

তবে সব ছাপিয়ে দলকে বিপর্যয় থেকে টেনে তুলতে মায়ের্স-বোনার যে জুটি গড়েছেন তা নিঃসন্দেহে টেস্ট ক্রিকেটের সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে দেয়। চা বিরতির পর তাইজুলের বলে এলবিডব্লিউর ফাঁদে পড়ে সাঝঘরে ফেরেন বোনার। ২৪৫ বলে ১০ চার ১ ছক্কায় ৮৬ রান করে সেঞ্চুরি বঞ্চিত হন। জার্মেইন ব্ল্যাকউডও (৯) দ্রুত ফিরলে আশার পালে হাওয়া পায় বাংলাদেশ। তবে জশুয়া ডা সিলভাকে নিয়ে জয়ের পথ একটুও কঠিন হতে দেননি মায়ের্স।

জশুয়া যখন তাইজুলের বলে বোল্ড হয়ে ফিরছেন তখন ওয়েস্ট ইন্ডিজের জয়ের জন্য প্রয়োজন মাত্র ৩ রান। তার আগেই দুজনে ঠিক ১০০ রানের জুটি গড়েন, জশুয়ার অবদান ছিল ২০ রান। এরপর দলকে জয় থেকে এক রান দূরত্বে রেখে মিরাজের চতুর্থ শিকার হয়ে খালি হাতে ফেরে কেমার রোচও।

কিন্তু দিনের খেলা ২.৩ ওভার বাকি থাকতেই জয়সূচক রান নেন রেকর্ড বয় কাইল মায়ের্স। ৩ উইকেটে জয় পাওয়া ম্যাচে ৩০৭ বলে ২০৭ রানের মহাকাব্যিক ইনিংস খেলেন বাঁহাতি এই ব্যাটসম্যান। হার না মানা ইনিংসটি সাজিয়েছেন ২০ চার ৭ ছক্কায়।

 

View this post on Instagram

 

A post shared by cricket97 (@cricket97bd)

পঞ্চম দিনেও উইকেট থেকে কোন সাহায্য না পাওয়ার পাশাপাশি টাইগারদের আক্ষেপের জায়গা হয়ে থাকবে দিনের প্রথম সেশনে ক্যাচ মিস ও রিভিউ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত। প্রথম সেশনের মত খুব বেশি সুযোগ না দিলেও চা বিরতির আগে শেষ ওভারের তৃতীয় বলে বোনারের দেওয়া স্টাম্পিংয়ের সুযোগ মিস করেন লিটোন দাস।

শেষ বিকেলেও মায়ের্সের রান আউটের সুযোগ মিস করেন মুমিনুল হক। নাইমের বলে শর্ট কাভার থেকে তার থ্রো করা বল সরাসরি স্টাম্পে লাগলেই ১৬০ রানে ফিরতে পারতেন দুর্দান্ত এক ইনিংস খেলা মায়ের্স।

এই হারের ফলে এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশের খেলা টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের সবকটি ম্যাচই হারের খাতায় যোগ হল। এর আগের তিন ম্যাচে ইনিংস ব্যবধানে হারের পর এবার ৩ উইকেটে হারলো মুমিনুল হকের দল।

সংক্ষিপ্ত স্কোরঃ

বাংলাদেশ ৪৩০ও ২২৩/৮ (ইনিংস ঘোষণা)

ওয়েস্ট ইন্ডিজ ২৫৯ ও ৩৯৫/৭ (১২৭.৩), ব্র্যাথওয়েট ২০, ক্যাম্পবেল ২৩, মোসলে ১২, বোনার ৮৬, মায়ের্স ২১০*, ব্ল্যাকউড ৯, জশুয়া ২০, রোচ ০, কর্নওয়াল ০*; মিরাজ ৩৫-৩-১১৩-৪, তাইজুল ৪৫-১৮-৯১-২, নাইম ৩৪.৩-৪-১০৫-১

ফলাফলঃ ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৩ উইকেটে জয়ী

ম্যাচসেরাঃ কাইল মায়ের্স (ওয়েস্ট ইন্ডিজ)।

চট্টগ্রাম থেকে, ক্রিকেট৯৭ প্রতিবেদক

Read Previous

মায়ের্স-বোনারের রেকর্ড গড়া জুটি, টাইগার শিবিরে হতাশা

Read Next

টুইটার জুড়ে চলছে কাইল মায়ের্স বন্দনা

Total
6
Share