জয়ের পথে এক পা দিয়ে রাখল বাংলাদেশ

জয়ের পথে এক পা দিয়ে রাখল বাংলাদেশ
Vinkmag ad

চট্টগ্রাম টেস্টের চতুর্থ দিনের খেলা শেষে উইকেটের চরিত্র নিয়ে রহস্য থেকেই যায়। দিনের শুরুতে মুমিনুল হক ও লিটন দাসের ১৩৩ রানের জুটি ব্যাটিং বান্ধব উইকেটের বার্তা দিলেও শেষ বিকেলে মেহেদী হাসান মিরাজের স্পিন ঘূর্ণিতে জয়ের সুবাস পাচ্ছে বাংলাদেশ। মুমিনুল হকের সেঞ্চুরিতে ক্যারিবিয়ানদের ৩৯৫ রানের পাহাড়সম লক্ষ্য ছুঁড়ে দেয় বাংলাদেশ। চতুর্থ দিন শেষে সফরকারীদের সংগ্রহ ৩ উইকেটে ১১০ রান।

২০১৮ সালের পর বাংলাদেশের কোন টেস্ট বৃষ্টির অবদান ছাড়া ৫ম দিনে গড়ালো। সর্বশেষ ২০১৮ সালের নভেম্বরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৫ম দিনে গড়ানো ম্যাচটি বাংলাদেশ জিতেছিল ২১৮ রানে। এরপর ২০১৯ সালে একই মাঠে আফগানিস্তানের বিপক্ষে হারা ম্যাচটিও ৫ম দিনে গড়ায় তবে ঐ ম্যাচে বৃষ্টির অবদানই ছিল বেশি।

শেষদিন জয়ের জন্য ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রয়োজন ২৮৫ রান, বাংলাদেশের ৭ উইকেট। কাঙ্ক্ষিত জয় ধরা দিলে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম জয় পাবে মুমিনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের আগের তিন ম্যাচেই টাইগাররা হেরেছিল ইনিংস ব্যবধানে।

জিততে হলে ক্যারিবিয়ায়নদের ভাঙতে হবে ২০০৮ সালের অক্টোবরে এই মাঠেই বাংলাদেশের দেওয়া ৩১৭ তাড়া করে ৩ উইকেটে নিউজিল্যান্ডের জেতার রেকর্ডটি। যা বাংলাদেশের মাটিতে এখনো পর্যন্ত সর্বোচ্চ রান তাড়া করার রেকর্ড।

এমন লক্ষ্যে খেলতে নেমে চা বিরতির আগে ৭ ওভার ব্যাট করে ক্যারিবিয়ানরা কোন উইকেট না হারিয়ে তোলে ১৮ রান। তবে চা বিরতির পর মিরাজের অফ স্পিন ভেল্কিতে ২০ রানের ব্যবধানে তিন উইকেট হারায় ক্যারিবিয়ানরা। প্রথম ইনিংসে ব্যাট হাতে সেঞ্চুরির পর বল হাতেও চার উইকেট নেন এই অলরাউন্ডার।

দ্বিতীয় ইনিংসে ইতোমধ্যে তিন উইকেট শিকার করা মিরাজ তিনটি উইকেট নিলেই ছুঁয়ে ফেলবেন দুইটি মাইলফলক। চতুর্থ বাংলাদেশি হিসেবে ১০০ টেস্ট উইকেটের পাশাপাশি একই ম্যাচে সেঞ্চুরি ও ১০ উইকেট শিকারির এলিট ক্লাবে ইয়ান বোথাম, ইমরান খান ও সাকিব আল হাসানের সাথে যোগ দিবেন।

দলীয় ৩৯ রানে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ওপেনার জন ক্যাম্পবেলকে (২৩) এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলেন মিরাজ। অধিনায়ক ক্রেইগ ব্র্যাথওয়েটকে শর্ট লেগে ইয়াসির আলি রাব্বির দারুণ এক ক্যাচে পরিণত করেন এই অফ স্পিনার। ১১ রানের ব্যবধানে অভিষিক শ্যাইনে মোসেলেও মিরাজের বলে এলবিডব্লিউর ফাঁদে পড়েন।

৫৯ রানে তিন উইকেট হারানো ক্যারিবিয়ায়নরা অবশ্যে সেশনের বাকি সময় কাটিয়েছে নির্বিঘ্নেই। দুই অভিষিক্ত ক্রুমাহ বোনার ও কাইল মায়ের্স অবিচ্ছেদ্য জুটিতে যোগ করেছেন ৫১ রান। বোনার ১৫ ও মায়ের্স অপরাজিত ৩৭ রানে।

৩৩ তম ওভারে মিরাজের বলে অবশ্য উড়িয়ে মারতে গিয়ে সুযোগ দিয়েছিলেন মায়ের্স। মিড অফ থেকে উল্টো দিক দৌড়ে দিয়েও বল তালুবন্দী করতে পারেননি মুস্তাফিজ। কঠিন ক্যাচটি মিস করে অবশ্য বাউন্ডারিও বাঁচাতে পারেননি।

এদিকে সাকিব আল হাসানের পর চোট পেয়ে মাঠ ছেড়েছেন তামিম ইকবালও। ২৯ তম ওভারের শেষ বলে মিরাজের বলে মায়ের্স ড্রাইভ করলে সেটি শর্ট কাভারে দাঁড়ানো তামিমের একটু সামনে পড়ে। তামিম ডাইভ দিয় বলের নাগাল না পেলেও আঙুলে পেয়েছেন চোট, ছেড়েছেন মাঠও। তার পরিবর্তে বদলি ফিল্ডার হিসেবে নামেন সাইফ হাসান।

এর আগে দ্বিতীয় ইনিংসে ৩ উইকেটে ৪৭ রান নিয়ে চতুর্থ দিন শুর করে বাংলাদেশ। ১৭ রানে অপরাজিত থাকা মুশফিকুর রহিম আজ করতে পারেননি এক রানের বেশি। রাখিম কর্নওয়ালের বলে সেশনের প্রথম ঘন্টাতেই এলবিডব্লিউর ফাঁদে পড়েন।

মুশফিক ফিরে গেলেও লিটন দাসকে নিয়ে ক্যারিবিয়ান বোলারদের দারুণভাবে সামলান ৩১ রা নিয়ে দিন শুরু করা মুমিনুল। লাঞ্চের আগেই পেয়েছেন ফিফটির দেখা, ৮৩ রান নিয়ে লাঞ্চে যাওয়া টাইগার অধিনায়ক সেঞ্চুরি তুলে নেন লাঞ্চের পর। এই সেঞ্চুরি দিয়ে তামিম ইকবালকে পেছনে ফেলে এককভাবে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ টেস্ট সেঞ্চুরির মালিক বনে যান।

আজকের সেঞ্চুরি সহ তার ১০ সেঞ্চুরির ৭ টিই চট্টগ্রামের এই মাঠে। এই নিয়ে ৮ বার জহুর আহমেদে চৌধুরী স্টেডিয়ামে ফিফটির দেখা পেয়ে ৭ টিকেই সেঞ্চুরিতে রূপ দিলেন বাঁহাতি এই ব্যাটসম্যান।

এতদিন ৯ সেঞ্চুরি নিয়ে দুজনেই যৌথভাবে ছিলেন শীর্ষে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সর্বশেষ টেস্টেই সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে যৌথভাবে শীর্ষে ছিলেন তামিম ইকবালের সাথে। গত বছর ফেব্রুয়ারিতে মিরপুরে প্রথম ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে খেলেছেন ১৩২ রানের ইনিংস।

প্রথম ইনিংসে ২৬ করে আউট হওয়া মুমিনুলের ব্যাটে ছিল কিছুটা জড়তা, অস্বস্তিতে ভুগেছেন শ্যানন গ্যাব্রিয়েলের দেওয়া শর্ট বলে। কর্নওয়াল, ওয়ায়রিক্যানদের স্পিন খেলতে গিয়ে ভুগেছেন। আউটও হয়েছেন ওয়ারিক্যানের বলে। তবে দ্বিতীয় ইনিংসে ছিলেন সাবলীল।

৮৪ বলে ফিফটি ছুঁয়েছেন ৫ চারে, লাঞ্চের আগে ছুটছিলেন সেঞ্চুরির দিকেই। লিটন দাসকে নিয়ে দলীয় সংগ্রহও বাড়িয়েছেন দ্রুততার সাথে। লাঞ্চে গিয়েছেন ১২৭ বলে ৯ চারে ৮৩ রানে। পুরো ইনিংসে ছিল বেশ ভালো নিয়ন্ত্রণ। বলের মুভমেন্ট বুঝে খেলেছেন শট, গ্যাব্রিয়েলের পাতা ফাঁদেও ধরা দেননি।

লাঞ্চের পর ৯০ এর ঘরে যেতে মুমিনুল খেলেন ২৩ বল। ৯৯ তে পৌঁছাতে খেলেছেন আরও ২১ বল। ৬০ তম ওভারের শেষ বলে ওয়ারিক্যানকে ফাইন লেগে ঠেলে দিয়ে পৌঁছান ৯৯ তে। এরপর তিন অঙ্ক ছুঁতে সময় নেন মাত্র ২ বল। কর্নওয়ালের করা ৬১ তম ওভারের চতুর্থ বলকে শর্ট কাভারে পাঠিয়ে ছুঁয়েছেন তিন অঙ্ক। পুরো ইনিংসের মত উদযাপনেও ছিলেন নিয়ন্ত্রিত। ১৭৩ বলে সেঞ্চুরি করার পথে হাঁকিয়েছেন ৯ চার।

তার সেঞ্চুরির সাথে লিটন দাসের ফিফটিতে বাংলাদেশের লিড পেরিয়েছে ৩৫০। সেঞ্চুরির পর ফিরেছেন মুমিনুল, লিটন ফিরেছেন (৬৯) তারও আগে সেঞ্চুরির আক্ষেপ বাড়িয়ে। দুজনে জুটিতে যোগ করেন ১৩৩ রান।

১১৫ রানের ইনিংস খেলার পথে মুমিনুল প্রবেশ করেছেন তিন হাজারি ক্লাবে। তার আগে বাংলাদেশিদের মধ্যে এই কীর্তি আছে হাবিবুল বাশার সুমন (৩০২৬), সাকিব আল হাসান (৩৯৩০), তামিম ইকবাল (৪৪১৪) ও মুশফিকুর রহিমের (৪৪৬৯)।

১৮২ বলে ১০ চারে ১১৫ রান করে মুমিনুল আউট হন গ্যাব্রিয়েলের বলে কেমার রোচককে স্কয়ার লেগে ক্যাচ দিয়ে। ততক্ষণে তার নামের পাশে ৩০০১ টেস্ট রান। তামিমের সাথে মুমিনুলই বাংলাদেশিদের মধ্যে দ্রুততম ৩ হাজার রান করা ব্যাটসম্যান। দুজনেরই লেগেছে সমান ৭৬ ইনিংস।

মুমিনুলের বিদায়ের পর তাইজুল ইসলাম (৩) ও মেহেদী হাসান মিরাজ (৭) টিকেননি বেশিক্ষণ। জোমেল ওয়ারিক্যানের শিকার হয়ে দুজনে ফিরেছেন ১ রানের ব্যবধানে। ৮ উইকেটে ২২৩ রানেই ইনিংস ঘোষণা করে বাংলাদেশ। ততক্ষণে লিড ৩৯৪।

চট্টগ্রাম থেকে, ক্রিকেট৯৭ প্রতিবেদক

Read Previous

মুমিনুলের সেঞ্চুরি, লিটনের ফিফটি, উইন্ডিজদের সামনে পাহাড়সম লক্ষ্য

Read Next

ঢাকা টেস্টেও অনিশ্চিত সাকিব

Total
15
Share