চট্টগ্রামে দ্বিতীয় দিন শেষে এগিয়ে বাংলাদেশ

চট্টগ্রামে দ্বিতীয় দিন শেষে এগিয়ে বাংলাদেশ

চট্টগ্রাম টেস্টের দ্বিতীয় দিনের বিজ্ঞাপন হয়ে থাকলো মেহেদী হাসান মিরাজের সেঞ্চুরি ও শেষ সেশনে ক্যারিবিয়ান ব্যাটসম্যানদের নিয়ে মুস্তাফিজুর রহমানের রিভিউ পর্ব। মিরাজের ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরিতে ভর করে প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের সংগ্রহ ৪৩০। জবাবে ২ উইকেট হারিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দিন শেষ করেছে ৭৫ রান তুলে।

জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামের উইকেট বিবেচনায় চার স্পিনারের সাথে একজন পেসার নিয়ে মাঠে নামে বাংলাদেশ। যেখানে পেসার আবু জায়েদ রাহির জায়গায় মুস্তাফিজুর রহমানের অন্তর্ভূক্তি জাগিয়েছে নানা প্রশ্ন। তবে সব ছাপিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ইনিংসের শুরুতেই নিজের দলে থাকা নিয়ে প্রশ্নের অবসান ঘটান বাঁহাতি এই পেসার। যেখানে টেস্ট আম্পায়ার হিসেবে এই ম্যাচ দিয়ে অভিষিক্ত শরফুদ্দৌলা ইবনে সৈকত আলোচনায় ছিলেন ভালোভাবে।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ ইনিংসের শুরুতে এক প্রান্ত থেকে বল করেন মুস্তাফিজুর রহমান অন্য প্রান্ত থেকে সাকিব আল হাসান। একমাত্র পেসার হিসেবে নামা মুস্তাফিজ প্রথম থেকেই মুগ্ধ করেছেন বোলিং বৈচিত্র্য দিয়ে। মূল অস্ত্র কাটারের সাথে স্টক ডেলিভারি, ইয়র্কার ও হাল্কা ইনসুইং করেছেন নিয়মিত। ইনিংসের ৫ম ওভারেই পান উইকেটের দেখা আর তখন থেকেই শুরু হয় আম্পায়ারের সাথে রিভিউ রিভিউ খেলা।

৫ম ওভারের চতুর্থ বলে বাঁহাতি ওপেনার জন ক্যাম্পবেলের বিপক্ষে এলবিডব্লিউর আবেদন মুস্তাফিজের। আম্পায়ার শরফুদ্দৌলা ইবনে সৈকত আউট না দিলে রিভিউ নেয় বাংলাদেশ, রিভিউ জিতে জন ক্যাম্পবেলকে (৩) সাঝঘরের পথ দেখান মুস্তাফিজ। পরের বলেই আবারও জোরালো আবেদন, এবার অভিষিক্ত ব্যাটসম্যান শ্যাইনে মোসেলে। এবার আঙুল তুলে দেন আম্পায়ার, কিন্তু রিভিউ নেয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। টিভি রিপ্লেতে দেখা যায় পরিষ্কার ইনসাইড এজ। বেঁচে যান বাঁহাতি ব্যাটসম্যান মোসেলে।

৭ম ওভারের শেষে বলে মোসেলের বিপক্ষে আবারও আবেদন মুস্তাফিজের। আম্পায়ারের দেওয়া নট আউটের সিদ্ধান্তে রিভিউ বাংলাদেশের, বল ব্যাটের সাথে সংযোগ না হলেও আম্পায়ার কলের বদলৌতে নট আউট থেকে যান মোসেলে। তখনো ৭ বল খেলে খালি হাতে এই ব্যাটসম্যান। তবে ১১তম ওভারে আর শেষ রক্ষা হয়নি অভিষিক্ত এই বাঁহাতির। মুস্তাফিজের করা ১১ তম ওভারের পঞ্চম বলে জোরালো আবেদন এলবিডব্লিউর।

আম্পায়ার শরফুদ্দৌলা দিলেন নট আউটের সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশের দেওয়া রিভিউ নষ্ট হয়। কিন্তু পরের বলেই আবারও আবেদন, এবার আম্পায়ার দিলেন আউট, রিভিউ নিল মোসেলে। টিভি রিপ্লেতে পরিষ্কার আউট দেখা যাওয়ায় ২ রানেই থামে তার অভিষেক ইনিংস। মুস্তাফিজের তোপে ২৪ রানে দুই উইকেট হারানো ওয়েস্ট ইন্ডিজ পরে বেশ ভুগেছে টাইগার স্পিনারদের সামলাতেও। তবে শেষ পর্যন্ত কোন বিপদ না ঘটিয়ে দিন শেষ করে।

 

View this post on Instagram

 

A post shared by cricket97 (@cricket97bd)

২৯ ওভার ব্যাট করে ক্যারিবিয়ায়নদের সংগ্রহ ২ উইকেটে ৭৫। ৪৯ রান নিয়ে অপরাজিত আছেন অধিনায়ক ক্রেইগ ব্র্যাথওয়েট। ১৭ রানে অপরাজিত আরেক অভিষিক্ত ক্রুমাহ বোনার।

বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসে সাদমান ইসলাম থেকে মুশফিকুর রহিম হয়ে সাকিব আল হাসান, ক্রিজে টিকেছেন কিন্তু ইনিংস লম্বা করতে পারেননি। সাদমান, সাকিবের ফিফটি থেমেছে যথাক্রমে ৫৯ ও ৬৮ রানে। তবে ক্রিজে টিকে, দুই-একটি জীবন পেয়ে ঠিকই কাজে লাগান মিরাজ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে চট্টগ্রাম টেস্টের দ্বিতীয় দিনে স্বীকৃত ক্রিকেটে নিজের প্রথম সেঞ্চুরিটা হাঁকান।

৭ উইকেটে ৩২৮ রান নিয়ে লাঞ্চে যাওয়ার সময় মিরাজ অপরাজিত ছিলেন ৪৬ রানে। লাঞ্চের পর বাংলাদেশের স্কোরবোর্ডে যোগ হয় ১০২ রান, যেখানে তার ব্যাট থেকেই আসে ৫৭ রান। ৯৯ বলে ফিফটি ছোঁয়া মিরাজ তিন অঙ্কে পোঁছান ১৬০ বলে ১৩ চারের সাহায্যে।

এমনিতে ব্যাটিং অলরাউন্ডার হিসেবে বয়সভিত্তিক থেকে পরিচিতি পাওয়া মিরাজ জাতীয় দলে এসেই পুরোদস্তুর বোলার বনে যান। আজ সহ ৪৩ ইনিংসে ব্যাট হাতে নেমে সবচেয়ে বেশি (২৬ বার) খেলেছেন ৮ নম্বর পজিশনে। এই পজিশন থেকে লেজের ব্যাটসম্যানদের নিয়ে খুব বেশি কিছু করার সুযোগ না পেলেও আজ ঠিকই নিজের সামর্থ্যের জানানটা দিয়ে রাখলেন এই অলরাউন্ডার।

ক্যারিয়ারে আগের দুই ফিফটিও অবশ্য হাঁকিয়েছেন যথাক্রমে ৮ ও ৯ নম্বরে নেমে। তবে এবার আর ফিফটিতে সন্তুষ্ট থাকেননি, তুলে নিয়েছেন সেঞ্চুরিই। ৮ নম্বরে নেমে বাংলাদেশের পক্ষে টেস্ট সেঞ্চুরি করা ৪র্থ ব্যাটসম্যান তিনি। এর আগে এই কীর্তি আছে খালেদ মাসুদ পাইলট, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ও সোহাগ গাজীর। ইয়ুথ টেস্ট ও টেস্ট ফরম্যাট- উভয় জায়গাতেই সেঞ্চুরি করা একমাত্র বাংলাদেশি ব্যাটসম্যান অবশ্য মিরাজ।

 

View this post on Instagram

 

A post shared by cricket97 (@cricket97bd)

তাইজুল ইসলামের (১৮) সাথে ৮ম উইকেটে ৪৪ ও নাইম হাসানের সাথে (২৪) নবম উইকেটে যোগ করেন ৫৭ রান। শেষ ব্যাটসম্যান মুস্তাফিজ যখন ক্রিজে আসেন তখনো মিরাজের সেঞ্চুরির জন্য প্রয়োজন ছিল ৮ রান। কর্নওয়াল, ওয়ারিক্যানদের সামলে বন্ধুর সেঞ্চুরির পথটা সহজ করেন মুস্তাফিজ।

১৪৮ তম ওভারেরর প্রথম বলে বাঁহাতি স্পিনার ওয়ারিক্যানকে ডিপ ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে চার মেরে ৯৭ রানে পৌঁছান মিরাজ। পরের বলে কাট শটে নেন দুই রান। ৯৯ তে থাকা মিরাজ তৃতীয় বলটি দেন ডট। তবে চতুর্থ বলেই প্যাড সুইপে ফাইন লেগে পাঠিয়ে নিয়ে নেন দুই রান, দুই হাত শূন্যে ছুঁড়ে লাফিয়ে করেন উদযাপন। ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরির পর অবশ্য টিকেননি বেশিক্ষণ। কর্নওয়ালকে উড়িয়ে মারতে গিয়ে ধরা পড়েন লং অনে বিকল্প ফিল্ডার হজের হাতে।

শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে ফেরার আগে মিরাজ থেমেছেন ১৬৮ বলে ১৩ চারে ১০৩ রানে। যদিও ব্যক্তিগত ২৪ রানের পর ৭১ ও ৮৫ রানেও দুইবার জীবন পান এই অলরাউন্ডার। ৭১ রানে স্টাম্পিং মিস করে উইকেট রক্ষক জশুয়া ডা সিলভা ও ৮৫ রানে স্লিপে দাঁড়িয়ে লেগ স্পিনার বোনারের বলে ক্যাচ ছেড়েছেন কর্নওয়াল। মুস্তাফিজ অপরাজিত ছিলেন ৩ রানে।

এর আগে ৫ উইকেটে ২৪২ রান নিয়ে দিন শুরু করা বাংলাদেশ দিনের তৃতীয় ওভারেই হারায় লিটন দাসের উইকেট। আগের দিন ৩৪ রানে অপরাজিত থাকা লিটন ওয়ারিক্যানের বলে বোল্ড হয়ে ফিরেছেন ৩৮ রান করে। যদিও সাজঘরে ফেরার আগে উইকেট রক্ষক জশুয়া ডা সিলভার গ্লাভস আগে স্টাম্প ছুঁয়েছে কিনা সেটি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করায় টিভি আম্পায়ার হয়ে আসে সিদ্ধান্ত, যেখানে স্পষ্ট হয় বলই আগে স্টাম্পে আঘাত হানে।

লাঞ্চের খানিক আগে উইকেট দিয়ে আসেন সাকিবও। বেশ নিয়ন্ত্রিত ব্যাটিংয়ে নিজের ২৫ তম টেস্ট ফিফটি তুলে নিয়ে ফিরেছেন কর্নওয়ালের অফ স্টাম্পের বাইরের বল খেলতে গিয়ে। পয়েন্টে দাঁড়ানো ক্রেইগ ব্র্যাথওয়েটকে ক্যাচ দিলে থামে তার ১৫০ বলে ৫ চারে সাজানো ৬৮ রানের ইনিংসটি।

ক্যারিবিয়ায়নদের পক্ষে সবচেয়ে বেশি ৪৮ ওভার বল করা জোমেল কর্নওয়ালের শিকার সর্বোচ্চ ৪ উইকেট। রাখিম কর্নওয়াল তুলে নেন দুই উইকেট। যদিও ক্যাচ মিস না হলে তার উইকেট সংখ্যা বাড়টে পারতো আরও। একটি করে উইকেট ভাগাভাগি করেন ক্রুমাহ বোনার, শ্যানন গ্যাব্রিয়েল ও কেমার রোচ।

সংক্ষিপ্ত স্কোর (২য় দিন শেষে):

বাংলাদেশ ৪৩০/১০ (১৫০.২), সাদমান ৫৯, তামিম ৯, শান্ত ২৫, মুমিনুল ২৬, মুশফিক ৩৮, সাকিব ৬৮, লিটন ৩৮, মিরাজ ১০৩, তাইজুল ১৮, নাইম ২৪, মুস্তাফিজ ৩*; রোচ ২০-৫-৬০-১, গ্যাব্রিয়েল ২৬-৪-৬৯-১, কর্নওয়াল ৪২.২-৫-১১৪-২, ওয়ারিক্যান ৪৮-৮-১৩৩-৪, বোনার ৩-০-১৬-১

ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৭৫/২ (২৯), ব্র্যাথওয়েট ৪৯*, ক্যাম্পবেল ৩, মোসলে ২, বোনার ১৭*; মুস্তাফিজ ৮-২-১৮-২

২য় দিন শেষে ১ম ইনিংসে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৮ উইকেট হাতে রেখে ৩৫৫ রানে পিছিয়ে।

চট্টগ্রাম থেকে, ক্রিকেট৯৭ প্রতিবেদক

Read Previous

মিরাজের রেকর্ড গড়া সেঞ্চুরি, বাংলাদেশের ৪০০ পার

Read Next

‘রোটেশন পলিসি’ তে হতাশ ইংলিশ কিংবদন্তী

Total
12
Share