সফল বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি কাপ, চাওয়া প্রতিবছর আয়োজনের

সফল বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি কাপ, চাওয়া প্রতিবছর আয়োজনের

সদ্য সমাপ্ত বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি কাপ বাংলাদেশ ক্রিকেটের আশার পালে এক পশলা হাওয়া বইয়ে দিল। বিপিএলের (বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের) বাইরে স্থানীয় ক্রিকেটারদের নিয়ে একটা ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টের দাবি সাম্প্রতিক সময়ে বেশ জোরালোভাবেই উঠেছিল। করোনা পরবর্তী দেশের ক্রিকেট ফেরাতে গিয়ে হুট করেই আবির্ভাব বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি কাপের। যে আয়োজনে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) বেশ সফলই বলতে হয়।

বিপিএলের আদলে হলেও ছিলনা কোন বিদেশি ক্রিকেটার। যে কারণে তরুণ কিংবা বাদ পড়া ক্রিকেটারদের সামনে ছিল নিজেদের মেলে ধরার দারুণ সুযোগ। সুযোগ কাজে লাগিয়ে জমজমাট এক টুর্নামেন্টই উপহার দিয়েছে পাঁচ দলের ক্রিকেটাররা। ব্যাটে-বলে বেশ লড়াই হয়েছে, ছিল রোমাঞ্চ ছড়ানো ম্যাচ। বিপিএলে লো স্কোরিং ম্যাচ নিয়মিতই বিরক্ত করতো দর্শকদের। তবে বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি কাপে দেখা মিলেছে রান উৎসবের।

গতকাল (১৮ ডিসেম্বর) ফাইনালের মধ্য দিয়ে পর্দা নামে টুর্নামেন্টের। ৫ রানে গাজী গ্রুপ চট্টগ্রামকে হারিয়ে শিরোপা ঘরে তোলে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের জেমকন খুলনা। এদিন বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন জানিয়েছেন বিপিএলের চাইতেও এই টুর্নামেন্ট বেশি ভালো লেগেছে তার কাছে।

গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে বিপিএলের চেয়ে এই টুর্নামেন্টটা অনেক বেশি ইন্টারেস্টিং মনে হয়েছে। এটার পেছনে সব চেয়ে বড় কারণ হচ্ছে এতগুলো লোকাল প্লেয়ার সুযোগ পাওয়া এবং এতগুলো ছেলেকে দেখার সুযোগ কিন্তু অন্যান্য বছর আমাদের হয়না।’

বিপিএলে বিদেশি ক্রিকেটাররাই ম্যাচে বেশি প্রভাব রাখে, যেখানে স্থানীয় প্রতিষ্ঠিত ক্রিকেটারদের বাইরে তরুণদের সুযোগ মিলেনা বললেই চলে। তবে শুধু স্থানীয় ক্রিকেটারদের নিয়ে বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি কাপ মাঠে গড়িয়েছে বলে তরুণদের পাশাপাশি ঘরোয়া ক্রিকেটের অন্যান্য অভিজ্ঞ ক্রিকেটাররাও নিজেদের সামর্থ্যের জানান দিতে পেরেছেন।

টুর্নামেন্ট শেষে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক ও সর্বোচ্চ উইকেট সংগ্রাহকের তালিকায় নজর দিলেই যা স্পষ্ট। সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের তালিকায় সেরা ১০ জনের মধ্যে সবার উপরে গাজী গ্রুপ চট্টগ্রামের লিটন দাস। ১০ ম্যাচে প্রায় ৫০ গড়ে রান করেছেন ৩৯৩। তালিকার দুই নম্বরে আছেন ফরচুন বরিশাল অধিনায়ক তামিম ইকবাল (৩২৪)।

দল প্লে-অফে না গেলেও ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে বেশ উজ্জ্বল ছিলেন মিনিস্টার গ্রুপ রাজশাহী অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরি সহ তার ব্যাট থেকে ৮ ম্যাচেই এসেছে ৩০১ রান।

সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের শীর্ষ ১০ এ নাম আছে ইয়াসির আলি রাব্বি (২৯৪), সৌম্য সরকার (২৯২), মুশফিকুর রহিম (২৮৭), মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের (২৭৪) মত অভিজ্ঞদের সাথে তরুণ নাইম শেখ (২৬০), জাতীয় দল থেকে লম্বা সময় বাইরে থাকা জহরুল ইসলাম অমি (২৫৪) ও যুব বিশ্বকাপ জয়ী দলের পারভেজ হোসেন ইমনের (২৩৩)।

রান সংখ্যার চাইতে তরুণ ক্রিকেটারদের ব্যাটিং ধরণ, মানসিকতা নজর কেড়েছে দারুণভাবে। নাজমুল হোসেন শান্তকে বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ কান্ডারি হিসেবে দেখেন খোদ বিসিবি সভাপতি।

তিনি বলেন, ‘শান্ত (নাজমুল হোসেন), আমার কাছে মনে হচ্ছে ওর কনফিডেন্স লেভেলটা দিন দিন বাড়ছে এবং ভবিষ্যতের জন্য একটা খুব ভালো প্লেয়ার সংযোজন হয়েছে।’

সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের তালিকায় উপরের দিকে না থাকলেও আফিফ হোসেন, আকবর আলি, আনিসুল ইসলাম ইমন, তৌহিদ হৃদইয়ের মত প্রতিভাবান ক্রিকেটাররা আরও একবার যতটুকু সুযোগ পেয়েছেন তাতেই আস্থার প্রতিদান দিয়েছেন। টি-টোয়েন্টি মত ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ত ফরম্যাটে চাপের মুহূর্তে নিজেদের সেরাটা নিংড়ে দেওয়ার সামর্থ্য রাখেন এসব ক্রিকেটার। টুর্নামেন্টে চোখে লাগার মত ফিল্ডিং করেছেন তরুণরা।

এদিকে বল হাতে টুর্নামেন্টজুড়ে আধিপত্য বিস্তার করেছে পেসাররা। সর্বোচ্চ উইকেট সংগ্রাহকের তালিকায় শীর্ষ ১০ এ একমাত্র স্পিনার ভূমিকা বদলে টুর্নামেন্টে বোলার হিসেবে আবির্ভাব হওয়া রবিউল ইসলাম রবি। সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি অভিজ্ঞ মুস্তাফিজের (২২) সাথে এই তালিকায় নাম আছে মুক্তার আলি (১৭), শরিফুল ইসলাম (১৬), কামরুল ইসলাম রাব্বি (১৬), শহিদুল ইসলাম (১৫), রবিউল ইসলাম রবি (১৩), হাসান মাহমুদ (১১), শফিকুল ইসলাম (১১), রুবেল হোসেন (১১) ও মুকিদুল ইসলামের (১১)।

এমন একটি ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট নিশ্চিতভাবেই নির্বাচকদের সামনে টি-টোয়েন্টির দল নির্বাচনে নানা বিকল্পের পরিধিটা বাড়িয়েছে। পরপর দুইটি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ছাড়াও আগামী দুই বছর টি-টোয়েন্টি ম্যাচের সংখ্যা নেহাত কম নয় বাংলাদেশের। ফলে তারুণ্য নির্ভর উজ্জীবিত একটি টি-টোয়েন্টি দল গঠনে কাজটা সহজই হতে পারে নির্বাচকদের জন্য। বিশেষ করে পর্যবেক্ষণের সুযোগতো অন্তত থাকছেই।

বিপিএলের বাইরেও এমন সফল টুর্নামেন্টে আয়োজনের ভাবনা বিসিবিরও। পাপন বলেন, ‘বোর্ডে আমরা এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি যে প্রতি বছরই আমরা এটা রাখতে চাই। নির্ভর করছে অনেক কিছুর ওপরে। এফটিপি, আমাদের আইসিসি ইভেন্ট, সব কিছু মিলিয়ে সুযোগ যদি থাকে তাহলে এটাকে প্রেফারেন্স দিব। প্রতি বছরই হোক এটাই আমাদের ইচ্ছা।’

এদিকে টুর্নামেন্টে তরুণ ক্রিকেটার বিশেষ কর যুব বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্যদের পারফরম্যান্সে মুগ্ধ চ্যাম্পিয়ন জেমকন খুলনা অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। তিনি বলেন, ‘সবমিলিয়ে টুর্নামেন্ট আমার মনে হয় যে খুবই ভালো হয়েছে, খুব ভালো ক্রিকেট খেলা হয়েছে। বিশেষ করে আমি মুগ্ধ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ক্রিকেটারদের নিয়ে, তারা যেভাবে পারফর্ম করেছে, সাহসী এবং সেন্সিবল ব্যাটিং করেছে।’

‘তাদের বোলিং, ফিল্ডিং সবমিলিয়ে পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে দুর্দান্ত। আমার মনে হয় এটা আমাদের সবার জন্যও খুব ভালো একটা প্রতিযোগিতা তৈরি করবে যেটা আমি সবসময় বিশ্বাস করি। আমাদের ক্রিকেটের প্রতিযোগিতা বাড়াতে আমাদের সাহায্য করবে।’

জেমকন খুলনা কোচ মিজানুর রহমান বাবুলও বিপিএলের আগে এমন একটা টুর্নামেন্ট প্রতি বছর আয়োজনের দাবি রাখেন। নিজের দাবি পেছনে দিয়েছেন যুক্তিও, ‘আমি বলব অন্যান্য বিপিএল বা অন্যান্য টুর্নামেন্টে বিদেশি খেলোয়াড় খেলে চারটা/ পাঁচটা। উপরে তারা ব্যাটিং ও করে দেয়, বোলিং ও করে দেয়। তবে এই টুর্নামেন্টে আমরা নিজেরা খেলছি।’

‘২২০ রান হয়, এই রানও চেজেবল, চেজ হয়েছে। এই খেলাগুলা- উপরদিকে মারা, শুরুতে ভালো বোলিং করা সব আমাদের ছেলেরাই করছে। সুতরাং এরকম টুর্নামেন্ট যেখানে আমাদের ছেলেরাই খেলবে সেটা যদি কন্টিনিউ করে তাহলে আমাদের ক্রিকেট অনেক উন্নতি করবে, যেমনটা ভারত করছে।’

‘এটা অবশ্যই ভাল হবে যদি বিপিএলের আগে হয়। যারা ভাল পারফর্ম করবে তাদেরকে টিম নিতে পারবে (যারা টিম করছে)। আমরা কীভাবে ক্রিকেটার বাছাই করি? যে ন্যাশনাল লিগে ভালো খেলে, প্রিমিয়ার লিগে ভালো খেলে। ঐ ফরম্যাট আর এই ফরম্যাট এক না। সুতরাং এরকম টুর্নামেন্ট বিপিএলের আগে হলে অবশ্যই ভাল।’

মিনিস্টার গ্রুপ রাজশাহী কোচ সারোয়ার ইমরানের চোখেও বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি কাপের অন্যতম সাফল্য তরুণদের পারফরম্যান্স। তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টির অন্যতম সাফল্য তরুণদের পারফরম্যান্স। বিপিএলে বেশিরভাগ সময়ই বিদেশি ক্রিকেটাররা ম্যাচের নায়ক হয়ে যায়। কিন্তু এই আসরে আমাদের দেশের ছেলেরা দেখিয়েছে সুযোগ পেলে তারাও দায়িত্ব নিতে পারে। তাই আমি মনে করি এই আয়োজন নিয়মিত হওয়া উচিত।’

বেক্সিমকো ঢাকা কোচ ও বিসিবির পরিচালক খালেদ মাহমুদ সুজন মনে করেন যে উদ্দেশ্য নিয়ে টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হয়েছে তা পুরোপুরিভাবে সফল হয়েছে। সুজন বলেন, ‘আমি মনে করি এই টুর্নামেন্টের যেটা উদ্দেশ্য ছিল সেটা ভালো ভবেই পুরণ হয়েছে। প্রত্যেকটা ম্যাচ দেখেন বেশ উত্তজনাপূর্ণ হচ্ছে। আবার অনেক ছেলে পারফর্ম করছে যাদেরকে আমরা এক্সপেক্টই করিনি।’

উদাহরণ হিসেবে টেনেছেন সাইফ হাসান, রবিউল ইসলাম রবিদের পারফরম্যান্স, ‘ সাইফ হাসানের ব্যাপারে যে কথাটা উঠেছিল যে সাইফ টি-টোয়েন্টি পারবে না। কিন্তু ও যেভাবে ব্যাট করেছে অনেককেই ভুল প্রমাণিত করে দিয়েছে সাইফ। সুতরাং আমার মনে হয় বাকি যারা আছে রবির কথা যদি বলেন হয়তবা বিপিএল যদি ওভাবে হত বিদেশি ক্রিকেটার থাকত কোন টিমে খেলারই সুযোগ পেত না। তো এটা একট বড় সাইন যে আমাদের ছেলেরা খেলার সুযোগ পাচ্ছে। জায়গা মত ব্যাটিং করার সুযোগ পাচ্ছে।’

খালেদ মাহমুদ সুজনও চান এমন টুর্নামেন্ট নিয়মিত আয়োজন হোক, ‘ভবিষ্যতে এই টুর্নামেন্টটা যদি আমরা কন্টিনিউ করতে পারি তাহলে আমার মনে হয় আগামী কয়েকবছরে আমরা বেশ কিছু তরুণ ক্রিকেটার পেয়ে যাব। যারা ইন্টারন্যাশনল ক্রিকেটে ভারো খেলবে আমাদের ম্যাচ জেতাতে সাহায্য করবে।’

নাজমুল হাসান তারেক

Read Previous

ভারতের কাটা ঘায়ে নুন ছিটালেন শোয়েব আখতার

Read Next

চূড়ান্ত হল আফগানিস্তান-অস্ট্রেলিয়া টেস্টের সূচি

Total
58
Share