সিস্টেমের বাইরে যেয়ে স্বীকৃতি পেতে চেয়েছিলেন শাহরিয়ার নাফিস

আইসিএল ঢাকা ওয়ারিয়র্স
Vinkmag ad

২০০৮ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেটে দুর্যোগ হয়ে আসে নিষিদ্ধ ইন্ডিয়ান ক্রিকেট লিগ (আইসিএল)। আফতাব আহমেদ, শাহরীয়ার নাফিস, হাবিবুল বাশার, মোহাম্মদ রফিক, তাপস বৈশ্য, ধীমান ঘোষ, মোশাররফ রুবেল, অলক কপালি, ফরহাদ রেজা সহ ১৪ জন ক্রিকেটার যোগ দিলেন আইসিএলে। আইসিএলে যোগ দিয়ে নিষিদ্ধ হওয়া, এরপর দেশে ফিরে নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি, এলোমেলো ক্রিকেট ক্যারিয়ার।

ঢাকা ওয়ারিয়র্স নামের দলটিতে খেলা বাঁহাতি ওপেনার শাহরীয়ার নাফিস এক যুগ পর উন্মোচন করছেন সেই সময়কার ঘটনা প্রবাহ। মোহাম্মদ আশরাফুলের কাছে প্রস্তাব আসা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আইসিএল থেকে প্রস্তাব এবং সব ছেড়ে নিজের যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত সবকিছু নিয়েই কথা বলছেন। নিজের ইউটিউব চ্যানেলে শাহরীয়ার নাফিস ভক্তদের করা আইসিএল ইস্যুতে সব প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন ধারাবাহিকভাবে। দ্বিতীয় পর্বে যেসব বিষয় উঠে এসেছে তা তুলে ধরা হল পাঠকদের জন্য।

আইসিএলে যোগ দেওয়ার নৈপথ্য ছিল ক্যারিয়ার বাঁচানো

‘আমি যদি ২০০৭ থেকে ২০০৮ সময়কালে ফিরে যাই। একটি প্লেয়ার ২০০৫ সালে অভিষেক হল, ২০০৬ সালে ১ হাজার রান করলো (প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে ওয়ানডেতে এক পঞ্জিকা বর্ষে), টেস্টে ভালো খেললো। তাকে যদি একটি নির্দিষ্ট টুর্নামেন্টে মাত্র ৩-৪ টি ম্যাচ (২০০৭ বিশ্বকাপ) খারাপ খেলার কারণে ছুঁড়ে ফেলার চিন্তা করা হয় তাহলে সে নিজেকে কীভাবে প্রতিষ্ঠিত করবে?’

‘ঐ সময়টায় বাংলাদেশ দল বেশিরভাগ ওয়ানডে ম্যাচই খেলতো, টেস্ট খুবই কম। এরপরও যখন যেখানে সুযোগ পেতাম চেষ্টা করতাম ভালো কিছুর, একটি ম্যাচ সুযোগ পেলেও কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু কেন জানি আমার কোন ভালো খেলাই কারও জন্য ঐ সময় যথেষ্ট ছিল না। আপনি একটা সিরিজ খেলবেন, সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হবেন, ম্যান অব দ্য সিরিজ হবেন এরপর একটা সিরিজ খারাপ খেললেই বাদ পড়ে যাবেন।’

‘এমন কিছু হলে আসলে একটা ক্রিকেটারের জন্য কি ধরণের বার্তা দেওয়া হয় এ নিয়ে আমি কনফিউজড ছিলাম। আমি যখন এশিয়া কাপ (২০০৮) খেলতে পাকিস্তানে ছিলাম তখন এমনও কথা আমার কানে এসেছে প্রয়োজনে একজন পেসারকে দিয়ে ওপেন করানো হবে তবুও শাহরীয়ার নাফিসকে সুযোগ দেওয়া হবেনা। এরকম পরিস্থিতি ছিল আমার জন্য জাতীয় দলের অবস্থাটা।’

‘আমি আরেকটা জিনিস নিয়ে সবার দৃষ্টি ঘোরাতে চাই। ২০০৭ সালে বাংলাদেশের সেরা ওয়ার্ল্ড কাপ। এর আগে ২০০৫ থেকেই বাংলাদেশ ভালো ক্রিকেট খেলে আসছে। ২০০৭ বিশ্বকাপে দুর্দান্ত করেছে দল হিসেবে। কিন্তু ২০০৭ বিশ্বকাপের পরই বাংলাদেশ দলের যে স্তম্ভ গুলো ছিল হাবিবুল বাশার সুমন, মোহাম্মদ রফিক, এনামুল হক জুনিয়র, জাভেদ ওমর বেলিম, নাজমুল হোসেন, রাজিন সালেহ, তাপস বৈশ্যদের একে একে সরিয়ে দেওয়া হয়। এই সরিয়ে দেওয়ার তালিকায় আমি হয়তো পরের নামটা ছিলাম।’

‘তখন আমি দেখলাম আমি যখন দুই একটা ম্যাচ খারাপ খেলি এরপরই বাদ, ভালো খেলেও আমার সুযোগ মিলছিলনা। তখন আমি একটা বিষয়ে স্পষ্ট হলাম যে আমাকে বোধহয় আর সুযোগ দিবেনা। আমিও নিজের অবস্থান শক্ত করতে পারবোনা। আরেকটা জিনিস আমার খারাপ লাগে যে একজন খেলোয়াড় প্রতিবছর ১ হাজার রান করবেনা। একবছর করলো তার পরের বছর দুই-তিনটা ম্যাচ খারাপ করার কারণে যদি আপনি মনে করেন জাতীয় দলে আমি তাকে রাখবোইনা তাহলে এটা দূর্ভাগ্যজনক।’

‘২০০৫ থেকে ২০০৬ সালে আমার যে পারফরম্যান্স তারপর ২০০৭ ও ২০০৮ সালে আমার সাথে যে আচরণ করা হইয়েছে তা আমাকে ব্যথিত করেছে। আরেকটা ছোট্ট ঘটনা মনে আছে ২০০৮ সালে জাতীয় দলের স্থায়ী চুক্তি থেকে বাদ দিয়ে অস্থায়ী চুক্তিতে রাখা হয়। ৬ মাসের চুক্তিতে রাখে যদি ভালো করি, টিকে থাকি তবেই আমাকে চালিয়ে নিবে। এর অর্থ হল আপনি এই প্লেয়ারের উপর আর ভরসা রাখছেন না বা তাকে আপনি আর সুযোগ দিবেন না।’

‘সবমিলিয়ে ২০০৭ থেকে ২০০৮ সালের সময়কালে আমার জন্য জাতীয় দলে এমন একটা অবস্থান তৈরি হয়েছিল। এমন পরিস্থিতি যে হয় আমি নিজে থেকে সরে যাবো নাহয় আমার ক্রিকেট ক্যারিয়ার ওখানেই থেমে যাবে। ঐ সময়ের আচরণটা আমাকে তখনো ব্যথিত করেছে, এখনো করে ভবিষ্যতেও করবে, সবসময় করবে।’

‘তখন আমি চিন্তা করলাম আমার এমন একটা মঞ্চ দরকার যেখানে ভালো করলে টিম ম্যানেজমেন্ট, গণমাধ্যম দেখতে পারবে যে শাহরীয়ার নাফিস ভালো খেলছে। এবং আমরা ওকে পর্যাপ্ত সুযোগ দিব। ঐ পরিস্থিতিতেই আমার আইসিএল খেলার প্রস্তাবটা আসে। আমি আগেও বলেছি আশরাফুল যখন আমাকে বলেছে আমি কিন্তু ফু দিয়ে উড়িয়ে দেওয়ার মত কাজ করেছি। কিন্তু এশিয়া কাপ থেকে এসে যখন আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পেলাম তখন শক্তভাবেই বিবেচনা করতে শুরু করি। ‘

‘আমার কাছে মনে হয়েছিল এখানে গিয়ে যদি আমি ভালো খেলি আমার দুইটা লাভ হবে। এক, আমার আত্মবিশ্বাস বাড়বে অন্যদিকে সবাই দেখবে যে ও ভালো খেলছে আমরাই ওকে পর্যাপ্ত সুযোগ দেইনি। শুধুমাত্র এই একটা কারণে আমার আইসিএলে যোগ দেওয়া। আমি চেয়েছিলাম এই সিস্টেমের বাইরে গিয়ে এমন একটা জায়গায় খেলতে যেখানে মানটাও ভালো আবার ভালো খেললে স্বীকৃতিও মিলবে। আমি এখনো বিশ্বাস করি যে আইসিএলে গিয়ে ভালো খেলতে পেরেছি বলেই আত্মবিশ্বাস নিয়ে ফিরতে পেরেছি।’

‘এরপর জাতীয় দলে কতটা সুযোগ পেয়েছি, পেলে কি হত, এসব আসলে বিতর্কের ব্যাপার। আমি সেদিকে যাচ্ছিনা। কিন্তু আমি মনে করি আইসিএলে যদি আমি না যেতাম তাহলে আমার ক্যারিয়ারই হয়তো শেষ হয়ে যেত।’

এক সেকেন্ডের জন্যও ভাবেননি আইসিএলে গেলে নিষিদ্ধ হবেন

‘আইসিএলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত যখন নিয়েছিলাম তখন বিশ্বের কোন দেশেই আইসিএলে খেলার কারণে নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয়নি। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড, ভারতীয় বোর্ড কিংবা আইসিসি কেউই তখনো এটাকে নিষিদ্ধ বলেনি। বিষয়টা ছিল টুর্নামেন্টটা তখন অস্বীকৃত। আমার মাথায় ছিল অস্বীকৃত ও নিষিদ্ধের মধ্যে পার্থক্য আছে। যেহেতু বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড আইসিএলকে নিষিদ্ধ করেনি সেহেতু ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাবে কিংবা নিষিদ্ধ হব এই ব্যাপারটা একটা সেকেন্ডের জন্যও চিন্তা করিনি।’

‘আমরা যখন আইসিএলে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার ঘোষণা দিই তখন বিসিবি আমাদের নিষিদ্ধ করে। আমরা যখন চুক্তিবদ্ধ হওয়ার কথা চলছে, আইসিএল নিয়ে আলাপ হচ্ছে তখনো আইসিএল বিসিবি কর্তৃক নিষিদ্ধ ছিলনা। আমরা চুক্তিবদ্ধ হয়ে ঘোষণা দেওয়ার পরই বিসিবি ১০ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করে। যোগ দেওয়ার আগে কিন্তু আমরা জানতাম না।’

‘যেদিন আমাদের নিষিদ্ধ করার ঘোষণা আসে সেদিনটি আমার জন্য অনেক কঠিন ছিল। কারন আমি একজন খেলোয়াড় হিসেবে চেয়েছি বাংলাদেশ দলকে প্রতিনিধিত্ব করতে। বাংলাদেশের জার্সি গায়ে জড়িয়ে খেলতে। আমি যখন আইসিএলে যোগ দেই তখন একটাই স্বপ্ন ছিল যে আমি আইসিএলে যাব, ভালো খেলবো, বাংলাদেশের সকল মানুষ ও বোর্ডের সামনে আমার পারফরম্যান্স তুলে ধরবো। নিষেধাজ্ঞা আমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছে কিন্তু আশাবাদী ছিলাম এই নিষেধাজ্ঞা বা কঠিন সময় বেশিদিন থাকবেনা। আমি বিশ্বাস রাখতাম যে আমি যখন আইসিএলে ভালো খেলে ফিরবো বিসিবি তাদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবে।’

আইসিলে সব ম্যাচ পাতানো এমন গুজব ‘ভিত্তিহীন ও বানোয়াট’

‘এটি একদমই ভিত্তিহীন ও বানোয়াট একটা কথা। এরকম কোন ব্যাপার আমার বা আমাদের দলের কারোরই জানা নেই। এটি একটি মিথ্যা প্রচার বলে মনে করি। আমরা যখন আইসিএল খেলতে গিয়েছিলাম আমাদের অবস্থাটা বোঝার চেষ্টা করেন। আমরা সবাই ১০ বছরের জন্য নিষিদ্ধ । আমরা ঢাকা ওয়ারিয়র্স ও আইসিএল বাংলাদেশ নামক দলের হয়ে খেলছি। আমাদের লক্ষ্য ছিল ভালো খেলে নিজেদের প্রমাণ করবো এবং আমাদের ভালো খেলার মাধ্যমে আমাদের দলের নাম যেন উপরের দিকে উঠে আসে।’

‘এরকম পরিস্থিতিতে আমরা সবাই সতর্ক ছিলাম যেহেতু বাংলাদেশে কিছুটা হলেও বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। যাতে আমাদের নামের সাথে বা আমাদের কারণে আর কোন বিতর্ক যেন সৃষ্টি না হয়। এরকম কোন প্রস্তাব আমার জানা নেই এবং আমি বিশ্বাস করি আমি যে দলে খেলেছি এই দলে কোন খেলোয়াড় বা ম্যানেজমেন্টের কেউই জানেনা।’

৯৭ প্রতিবেদক

Read Previous

শেষ টেস্টের জন্য ইংল্যান্ডের ১৪ সদস্যের স্কোয়াড

Read Next

১৯ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু আইপিএল!

Total
11
Share